শ্বাপদের চোখ / অবিন সেন

প্রথম পর্ব



রেলগাড়ির পিছনে কোন ভেঙচি নয়, এই মাত্র বলল বদ্যি। ভাঙ্গা গড়ের পিছনে সূর্যকে ঢলে পড়তে দেখে বদ্যির মাথা ফড়িং এর মতো উড়নচণ্ডী হয়ে আছে। তার নাকের ডগায় চশমা ঝুলে পড়ছে। চশমার উপর বুড়ো রোদ, বিকেলের যেন রোঁয়া উঠে যাওয়া ক্লান্ত সালিক। ট্রেনটা চলে যেতে সে তার পিছু পিছু লাইন বরাবর দৌড়ল । ভেংচি কাটল। তখনি একটা বেড়াল ট্রেন লাইন পেরল। বদ্যি তখনি ভাবল ভেংচি কাটাটা মিথ্যা। ‘শালা ভেংচির আবার সত্যি মিথ্যা হয় নাকি’ পিছন থেকে কে যেন বলল। বদ্যি প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, টাল সামলে পিছন ফিরে দেখল, পিছনটা ফক্কা। সে বেমক্কা ভেবলু হয়ে গেল। সে ভয় পেয়ে লাইন ছেড়ে বন জঙ্গলের দিকে নেমে পড়ল। তার ভুতের ভয়। রেল লাইন এর কাটা পড়া ভূত। বনে কোন ভূত নেই, বদ্যি জানে। বনের দিকে এগতেই আবার সে ভম্বল হয়ে গেল। ‘এ কি রে মাইরি?’ সে নিজের মনে বিড় বিড় করল। ‘এখেনেও?’ সে দেখল সামনের বট গাছের নিচু ডাল থেকে কে যেন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। সে আর একটু কাছে এগিয়ে গেল। ছায়া ছায়া আধো অন্ধকারে বদ্যি একটা মৃতদেহ আবিষ্কার করে বসল। কার মৃতদেহ সে জানে না। ভয় পেয়ে বদ্যির খুব হাগা পেল। পেট চেপে ধরে বদ্যি বন বাদাড় ভেঙ্গে দৌড়ল। লোকাল পঞ্চায়েত মেম্বার অনাদি হাটুই এর বাড়ি গিয়ে সে সব কথা বলল। হাটুই প্রথমে আল বাল কথা ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছিল। তার পর কি ভেবে সে দু চার জন ছেলে ছোকরা জোগাড় করে দেখতে বের হল,কি ব্যাপার। তখন সন্ধ্যা হয় হয়।
খবর পেয়ে লোকাল থানার বড়বাবু তপন মল্লিক এসে ঘুরে ফিরে একটু দেখলেন। বদ্যিকে ধমক ধামক দিলেন বেশ করে। যেন তারই যতো অপরাধ হয়ে গিয়েছে লাশ আবিষ্কার করে। তিনি আরও দু এক জনকে প্রশ্ন করলেন। হাটুই মুরুব্বির মতো করে দু একটা মন্তব্য করলেন। কিন্তু লাশ শনাক্ত করা গেল না।
মৃতদেহটি এক পঁচিশ ত্রিশ বছর বয়সী তরুণের। মুখটি ক্ষত বিক্ষত। মনে হয় ভারি কিছু দিয়ে মুখে আঘাত করা হয়েছে। পরনে পরিষ্কার চেক জামা। জিনসের প্যান্ট । প্যান্টে বেল্ট লাগানোর সময় দু একটি ঘর মিস করে গিয়েছে। বড়বাবু লাশ চালান করার নির্দেশ দিয়ে লাল সুমোয় চড়ে বেরিয়ে গেলেন। কেসটা হয়তো এখানেই ধামা চাপা পরে যেত বেওয়ারিশ লাশ বলে।
ঘটনার দুই দিন পরে কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর হলধর সামন্ত ওরফে এইছ. ডি রতনপুর থানায় এলেন এক রাজনৈতিক দাদার সাগরেদ নিখোঁজ বল্টু দাশ এর তদন্তের কাজে। রতনপুর থানায় পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশ তিনি সনাক্ত করলেন বল্টু দাশের বলে। বল্টু যাদবপুর অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতার ছিল ডানহাত। পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল রাজনৈতিক বিবাদের জেরে হয়ত বল্টু খুন বা underground হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বল্টুর godfather যখন ক্রমাগত চাপ দিতে থাকল তখন পুলিশ নড়ে চড়ে বসে। তারপর যখন বল্টুর লাশ কলকাতা থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরে এক পাড়াগাঁয়ে পাওয়া গেলো তখন পুলিশের মনে ধন্ধ লাগল। সত্যই রাজনৈতিক হত্যা না অন্য কিছু? তরুণ গোয়েন্দা অফিসার আই.পি.এস. অর্ক মিত্রের কাঁধে তদন্তের দায়িত্ব ভার পড়ল।
অর্ক দেখল তদন্ত বলতে সে ভাবে কিছুই হয়নি। তবু যে টুকু হয়েছে তার রিপোর্টের উপর সে চোখ বোলাচ্ছিল। কেসটার একটা ভাগ রয়েছে কলকাতায় আর একটা ভাগ ছড়িয়ে আছে সুদূর রতনপুরে। কিন্তু মামলাটার রতনপুর কানেকশানের কোনো যোগসূত্র সে খুঁজে পাচ্ছিল না। যে সমস্ত জিজ্ঞাসাবাদের রিপোর্ট পাওয়া গেছে তাতে করে রতনপুরের কোনো ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। অর্কর মনে হচ্ছে সে যেন এক বিশাল হেঁয়ালির এক প্রান্তে বসে আছে আর অপর প্রান্তটা নিকষ অন্ধকার।
তবে অর্ক দেখল কালীঘাটের বেশ্যা মিস লিলি একটা অন্য কথা বলেছে। তদন্তকারী অফিসার লিখেছে লিলি জবানবন্দী দিতে এসে খুব খানিক কেঁদেছে। একটা নেকু পুশু গোছের ভাব ভালবাসা হয়ে গিয়েছিল তার, বল্টুর সঙ্গে। খুন হবার আগে কিছুদিন প্রায়ই বল্টু তার ঘরে রাত কাটাত। বিদ্যাধর নামে এক লোকের কথা বলেছে লিলি। বল্টুর তার সঙ্গে তার দেশের বাড়িতে যাবার কথা ছিল। হাত দেখাতে। গ্রামে। বিদ্যাধরের গ্রাম কোথায় ? লিলি জানে না।
অর্ক ঠিক করল সে লিলি কে আবার ভালো করে জেরা করবে। সে প্রবাল কে ফোন করার কথা ভাবল। প্রবাল সেন তার ছেলেবেলার বন্ধু। এক বহুজাতিক সংস্থায় সে ইঞ্জিনিয়ার। গোয়েন্দাগিরি তার নেশা। অর্ক যখনি কোনো জটিল কেস হাতে পায় তখনি সে প্রবালকে জুটিয়ে নেয় তার সঙ্গে। বেশ কিছু জটিল মামলা সমাধান করার ফলে পুলিশ মহলে প্রবালের একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে গেছে। ডি.সি.ডি.ডি. ও প্রবালকে যথেষ্ট পছন্দ করে। প্রশ্রয় দেয়।
প্রবাল অফিসের কাজে দিল্লী গিয়েছিল। কলকাতায় ফিরে দেখল এখানে বেশ গরম পড়ে গেছে। এই সময়টা তার কাজের চাপ কম থাকে । কাজ না থাকলে সে বড় বোর ফিল করে। অর্ক কে ফোন করার কথা সে ভাবছিল। যদি কোনো কেস থাকে! কিন্তু তাকে আর ফোন করতে হল না । অর্ক তাকে ফোন করল। বল্টু দাশ মার্ডার কেসের ব্যাপারে প্রবাল কে সে তার অফিসে যেতে বলল।
পরদিন অফিস ছুটির পরে প্রবাল অর্কর সঙ্গে দেখা করতে তার অফিসে গেল। তখন বিকেল। আকাশে মেঘ। ক’দিন যা গরম পড়েছে! কালবৈশাখী হতে পারে বোধহয়। হলে একটু স্বস্তি পাওয়া যাবে। প্রবাল ভাবল।
অর্ক তখন চেম্বারে ছিলনা। প্রবাল অপেক্ষা করল। বল্টু দাশের কেসটা সে পেপারে পড়েছে। ভিতরের পাতায় খুব ছোট করে বেরিয়েছিল।
অর্ক ফিরে এসে খানিক হাসি ঠাট্টা করল। তারপর সে কাজের কথায় ফিরে এলো। সে বলল—প্রবাল, কি মনে হচ্ছে তোর, রাজনৈতিক ব্যাপারে খুন?
প্রবাল ঘাড় নাড়ল। সে ও ঠিক বুঝতে পারছে না। তবে খুন হবার মতো বল্টু দাশের সে রকম কোনো পলিটিকাল রাইভ্যালরি ছিল বলে তো ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। সে নিতান্তই ছোট গুণ্ডা গোছের ছিল। ছোট-খাটো হুইপ হুজ্জতির বাইরে সে যেত না। পুলিশ রেকর্ডও সে কথাই বলছে। তবে ইদানীং সে বাড়ছিল। কারণ বল্টুর পলিটিকাল গডফাদারেরও খুব বোলবোলাও বেড়েছিল। আর বল্টু হয়ে উঠছিল তার ডান হাত। গোষ্ঠী দ্বন্দ্বেরও একটা আঁচ ক্রমে ক্রমে বারুদ সাজাচ্ছিল।
প্রবাল বলল- বল্টুর বিরোধী গোষ্ঠীর কাউকে তুলেছিস?
না, সে ভাবে তোলা হয়নি। দু একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
খুনের সময় ?
যে দিন লাশ পাওয়া যায় তার আগের দিন রাতে, অর্থাৎ ২১শে মার্চ।
খুনের ধরণ ?
সরু খুব ধারাল অস্ত্র গলায় বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর লাশকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে যেখানে লাশ পাওয়া গেছে সেখানে খুনটা করা হয়নি। খুনটা অন্য কোথাও করা হয়েছে।
অস্ত্রটা কি সরু কাঁচীর মতো?
তা হতে পারে।
অর্ক, এই ধরনের অস্ত্র কিন্তু গুণ্ডা জাতীয় অপরাধীরা ব্যাবহার করে না। প্রফেশনাল খুনিরাও সাধারণত করে না। আমাদের ভাই গোড়া থেকে ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবতে হবে। রতনপুরের কানেকশান খুঁজে বার করতে হবে।
অর্ক, এরকম খুন তো হামেশাই হয়, তবে পুলিশ এই কেস নিয়ে এতো ব্যতিব্যস্ত কেন?
ভাই, সরকারের উপর মহলের চাপ। প্রভাবশালী নেতার সাগরেদ।
ভাবছি, রতনপুর থেকে সুরু করব, না কলকাতা থেকে ?

****

মিস লিলির কোনো গল্প নেই। আর পাঁচটা সাধারণ বেশ্যার যেমন হয়। কোথা থেকে এলো, কি ভাবে এলো, এই সব সাতপাঁচ কথার অনুমান অনুসন্ধানের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু লিলির একটা গল্প তৈরি হচ্ছিল। তার আর বল্টুর। সেই গল্প এখন মৃত। লিলি জানে তার জন্যে মৃত মানুষের(পুরুষের) গল্পের কোনো প্রয়োজন নেই। তবু কি কাগজের উপর আবছা দাগ রয়ে গেছে ! তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে নেমেছে চারপাশে। গলির মুখে ঝাপসা আলো। লিলির ঘরে আলো জ্বলেনি। আবছা অন্ধকারের ভিতর বসে লিলি চুল আঁচড়াচ্ছিল । তার অঢেল চুল। সেই দেখেই বল্টু পাগল হয়েছিল তার প্রতি। চাদরের মতো সারা পিঠ তার চুলে ঢেকে থাকত। সেই চাদরের ভিতর মুখ ডুবিয়ে বল্টু তাকে আদর করত। আশ্চর্য আদর করত। পতিতার কাছে পুরুষের দাবি আদরের। বল্টু ছিল অন্য ধাঁচের। তার ছিল আদর দিয়ে আনন্দ। বল্টুর চায়না মোবাইলে মহম্মদ রফির গান বাজত। সে সেই গানের ভিতর ডুবে গিয়ে আদর নিয়ে খেলা করত। লিলির সাথে বল্টুর প্রথম পরিচয় লঞ্চে, সুন্দরবনের পথে। বল্টুর বন্ধুরা মিলে একটা লঞ্চ ভাড়া করেছিল, সুন্দরবনে ফুর্তি মারবে বলে। আর মেয়েছেলে। পাঁচজন মেয়ের মধ্যে লিলি ছিল একজন। চটকদার, চোখে লাগার মতো চোখমুখ, আর অঢেল চুল। মাঝ দরিয়ায় লঞ্চের উপর ছেলেরা বিয়ার খাচ্ছিল আর নারী শরীর নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতার রস রসিকতা নিয়ে মেতে ছিল। বল্টু তাদের থেকে একটু তফাতে ছিল। খালি গা পেটানো শরীর, সে দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখে সানগ্লাস। হাওয়ায় তার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। লিলিও রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। চানের পরে অতো চুল শুকায়নি। রোদের মধ্যে সারা পিঠে চুল মেলে লিলি। বল্টু তাকে অবাক হয়ে দেখছিল। বল্টু তার কাছে এগিয়ে এসে কি একটা বলল। লিলি শুনতে পায়নি হাওয়ায়। তার পর সানগ্লাস খুলে সে লিলির দিকে তাকায়। তার চুলে আলতো হাত রাখে। লিলি পুরুষ মানুষের চোখের ভাষা বোঝে। লিলি দেখছিল এক মুগ্ধ কিশোরের মতো, বল্টু তার দিকে তাকিয়ে। লিলি একটু হাসবে বলে দুই ঠোঁট খুলতে যাবে, তখনি লঞ্চটা দুলে উঠল। লিলি ভয়ে বল্টুকে জড়িয়ে ধরল। বল্টু প্রথমে সাড়া দ্যায়নি। সে টাল সামলেছে। তারপর তার বলিষ্ঠ দু হাত লিলিকে জড়িয়ে ধরেছে। ঘাড়ের মধ্যে, অঢেল চুলের রাশির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে। তারপর আনাড়ির মতো লিলির ঠোঁট খুঁজেছে তার মুখ। সেই প্রথম চুম্বন লিলিকে। লিলি দেখল বল্টু চুম্বন জানে না। কিভাবে মুখের মধ্যে জিভ নিতে হয়। বল্টু জানে না। সেই মাত্র শিখল। লিলি শেখাল। লিলির জিভের সঙ্গে বল্টুর জিভ কাঁপছিল। লিলি মনে মনে বলেছিল ‘কি আনাড়ি ছেলে রে বাবা, কোথায় কি ভাবে হাত রাখতে হয় তাই জানে না’। তবে লিলির ভালো লাগছিল। কবে প্রথম তার সতীচ্ছদ ছিন্ন হয়েছিল লিলির মনে নেই। তবে প্রথম ভালবাসার স্পর্শের মতো আহ্লাদ যেন লিলিকে পেয়ে বসেছিল। এমনটা কখনো ঘটেনি লিলির জীবনে। চড়া রোদে খোলা আকাশের নীচে লিলি আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরেছিল বল্টুকে। তার উড়ন্ত অজস্র চুল মখমলের মতো দুটি শরীরকে ঢেকে দিচ্ছিল। সেই জড়িয়ে ধরা বরাবরের মতো। লিলি ভেবেছিল। সেই নীল আকাশ আর আশ্চর্য রোদকে সাক্ষী রেখে।
লিলির কান্না পেল। বল্টু বলেছিল তাকে বিয়ে করবে। কিংবা বিয়ে না করলেই বা। বস্তুত লিলি আর বল্টুর এক আশ্চর্য সংসার তৈরি হচ্ছিল। অন্ধকারের মধ্যেই লিলি সাপের মতো মোটা একটা বিনুনি করল। বল্টুর খবর পাওয়ার পরে সে আর ঘরে লোক নিচ্ছে না। আজো সে নেবে না। সে উঠে আলো জ্বালাতে যাবে তখনি দরজায় খট খট কড়া নাড়ার শব্দ শুনল।
কে ?
বাইরে থেকে ফিস ফিস শব্দ এলো—
আমি বিদ্যাধর !
লিলি, আলো জ্বেলে দরজা খুলে দিলো।
বিদ্যাধর জ্যোতিষ, ফুটপাথে কিংবা রেল স্টেশনে বসে হাত দ্যাখে। বল্টুর হাত দেখে সে বলেছিল, বল্টু একদিন বড় নেতা হবে। সেই থেকে বল্টু তার ভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদিন লিলির ঘরে নিমন্ত্রণ করে তাকে খাইয়ে ছিল। সেই থেকে বিদ্যাধর মাঝে মাঝে লিলির কাছে আসে। বল্টু না থাকলেও আসে। এটা সেটা খাবার আবদার করে। লিলির তাকে পছন্দ হয় না। তার চোখের দৃষ্টি ভালো না। লিলি তা বুঝতে পারে। কিন্তু বল্টুর জন্যে লিলি তাকে কিছু বলতে পারে না। বল্টু মারা যাবার পরে এই প্রথম এলো বিদ্যাধর। রোগা হাড়গিলের মতো তার চেহারা। চোখ বসা, চোখের নীচে কালি। নাকটা খাড়া। নাকের ডগায় সব সময় চশমাটা যেন ঝুলে থাকে। মাথায় বড় বড় চুল, যাত্রা দলের অভিনেতার পরচুলের মতো। কপালে লাল চন্দনের তিলক। তার বাড়ি কোথায় কোন গ্রামের দিকে। কোন গ্রাম লিলি জানে না। বল্টুকে সে তার গ্রামে নিয়ে যাবে বলেছিল।
বিদ্যাধর ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। তার চোখ দুটো কেমন লাল। লোভের মতো চিক চিক করছিল। লিলি তার মুখ থেকে মদের গন্ধ পাচ্ছিল। দিশি মদ।
একটু জল খাওয়াও তো মা জননী।
বিদ্যাধর যেন হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলল।
লিলি জল আনার জন্যে পিছনের ঘরে গেলো।
লিলির ঘরে ঘরের ভিতর ঘর। সামনের ঘরটা বাদ দিয়ে পিছনে একটা ছোট ঘর আছে। সে ঘরে সে রান্না করে। গ্যাসের উনুন। সেটা বল্টু কিনে দিয়েছিল। সে ঘরেও একটা ছোট দরজা আছে। ভিতর থেকে সেটায় খিল আটকান।
বিদ্যাধর, লিলির যাওয়াটা দেখছিল। পিছনটা। নিতম্ব। তার মাথাটা ভণ্ডুল হয়ে যাচ্ছিল।
লিলি জল নিয়ে ফিরে আস্তেই আবার দরজায় টোকা পড়লো।
লিলি সাড়া দিলো
কে?
বাইরে থেকে ইনস্পেক্টর বটব্যাল বলল
পুলিশ, দরজাটা খুলুন।
লিলি কিছু বলার আগেই বিদ্যাধর তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। লিলি তাকে চোখের ইশারা করল। সে পা টিপে টিপে ভিতরের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। সে পিছনের দরজা দিয়ে পালাবে।
লিলি সাড়া দিল
খুলছি!
সে গায়ের কাপড়টা ভালো করে গুছিয়ে নিলো। চুলের বিনুনিটা জড়িয়ে একটা খোঁপা করে নিলো।
দরজা খুলে দিতে প্রথমে বটব্যাল ঢুকলেন। তারপর শাদা পোশাকে অর্ক সঙ্গে প্রবাল।লিলির ঘরে আসবাব বলতে একটা ছোট টুল। প্ল্যাস্টিকের। একটা টি টেবিল গোছের। একটা খাট বা তক্তপোষ । আর একটা আলমারি কাম আলনা। তাতে একটা আয়না বসানো, যার সামনে বসেই সে সন্ধ্যায় কেশ প্রসাধন করছিল। অর্ক তাকে টুলটা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলতে বলল। প্রবাল আর সে বিছানার কিনারায় বসল। বটব্যাল বসল না। দাঁড়িয়ে থাকল।
অর্ক বলল
লিলি, তুমি বলেছ, ১৮ তারিখ, মানে ১৮ মার্চ বল্টুর সঙ্গে তোমার শেষ দেখা হয়। রাত্রে কি সে তোমার সঙ্গে ছিল ?
লিলি ঘাড় নাড়ে। সম্মতিসূচক ।
পরদিন সকালে কটার সময় সে তোমার এখান থেকে বের হয় ?
নটা, সাড়ে নটা হবে।
কোথায় যাচ্ছে, সেটা কি তোমায় বলেছিল?
বলেছিল বিকাশদার ওখানে যাবে।
বিকাশদা মানে নেতা বিকাশ সামন্ত ?
হ্যাঁ।
এবার প্রবাল কথা বলল
কোনো এক গ্রামের কোথা জবানবন্দিতে বলেছিলে। কোন গ্রাম ?
আমি নাম জানি না। তবে বিদ্যাধর বাবার সঙ্গে তার গ্রামে যাবার কোথা বলছিল।
বিদ্যাধর বাবা কে ?
হাত, দ্যাখে। সে ভালো লোক না।
সে প্রবালের চোখের দিকে চোখ তুলল। অল্প ওয়াটের আলোয় তার চোখ মুখ স্পষ্ট না। কেবল বড়ো বড় চোখ দুটো বেদনায় নিঝুম হয়ে ছিল। প্রবাল বুঝতে পারছিল। আর পাঁচটা পতিতার মতো সে না। ভদ্র ও বিপন্ন লাগছিল। এবং ভয়ের একটা ভার তার উপরে চেপে বসে ছিল। আগেরবার পুলিশ তাকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। পুলিশ তার বাড়িতে আসতে সে ভয় পেয়েছে। প্রবাল তার ভয় টের পাচ্ছিল।
লিলি, ভয় পেয়ো না। তুমি বল্টুকে ভালবাসতে ?
লিলি ঘাড় নাড়ল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছল।
প্রবাল বলল
এখানে বল্টুর কিছু জিনিশপত্র আছে? আমারা সে গুলো দেখব।
লিলি উঠে দাঁড়িয়ে আলমারি কাম আলনার কাছে গেলো। সেখান থেকে একে একে সে বল্টুর জামা, প্যান্ট, বারমুডা বার করে বিছানার একপাশে রাখল। পিঠে ঝোলানো একখানা ব্যাগ ও ছিল। সেটাও সে রাখল বিছানায়। তার চোখ উপচে কান্না আসছিল। জল গড়িয়ে দু গাল বেয়ে নামল। সে মুছলনা। বোধ হয় খেয়াল নেই।
জামা কাপড়ের মধ্যে কিছু পাওয়া গেলো না। ব্যাগের মধ্যে কিছু পার্টির লিফলেট। একটা খুর। ধারাল। আর একটা হাতে বানানো জন্ম ছক পাওয়া গেলো। তাতে বিভিন্ন রাশি নক্ষত্রের সিম্বল। কোনো নাম ঠিকানা নেই। কেবল নিচের দিকে একটা মোবাইল নাম্বার।
অর্ক মোবাইল নম্বরটা দেখাল লিলি কে।
লিলি বলতে পারল না। তবে কুণ্ডলীটা বিদ্যাধর বানিয়েছে সেটা সে বলল। নাম্বারটা তারই হতে পারে। বটব্যাল সঙ্গে সঙ্গে নাম্বারটা ডায়াল করল। সুইচ অফ।
লিলি, বিদ্যাধরকে কোথায় পাওয়া যাবে ?
প্রবাল জানতে চাইল।
(আগামীকাল সমাপ্য)

আপনার মতামত জানান