ঋতুহীন-ঋতুদিন

সরোজ দরবার


নগর কলকাতায় আজও যেন একটু ছায়া ঘনিয়েছে। নতুন ভোরের আলো চুপিসারে ঢুকে পড়েছে ইন্দ্রাণী পার্কের বাড়িটায়। ক্যালেন্ডারের পাতা উলটে গিয়ে পৌঁছেছে তার শেষ দিনটিতে। প্রতিদিনের মতো খুব সকালে উঠে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন বারান্দায়। হাতে ধরা কফির কাপ থেকে একটু একটু করে ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে সকালের নিস্তব্ধতায়। একটুখানি ছায়া নরম রোদকে ঢেকে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে জেগে ওঠা পুরনো পাড়ার মাথার উপর দিয়ে। এই ছায়া দেখলেই তাঁর মনে পড়ে যায় বাড়িতে গানের রেকর্ডের মধ্যে থাকা ইপি রেকর্ডটির কথা। সুমিত্রা সেনের গাওয়া রবিঠাকুরের গান। একপিঠে ছিল ‘উতলধারা বাদল ঝরে’। আর অন্যপিঠে-‘ছায়া ঘনায়েছে বনে বনে...’। রেকর্ডটা ঘুরতে শুরু করলেই, তাঁকে ঘিরে ধরত পাড়া জুড়নো ঠান্ডা সনসনে হাওয়া। এই গানটাতেই যেন নেমে আসত তাঁর ইচ্ছাবৃষ্টি। ‘দেয়া’ কথাটার মানে যে মেঘ, এই গানেই তিনি প্রথম শুনেছিলেন। আসলে মানুষ যত বড় হয় ততো যেন তাঁকে ঘিরে ধরে শৈশবস্মৃতি। আজ এই, হালকা আলোর সকালে দাঁড়িয়েও সে কথাই মনে হচ্ছে তাঁর। এই সময়টা, অনেকদিনের অভ্যেসে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাটে তাঁর। কাটে গীতবিতানে, সঞ্চয়িতায়। যেন সারাদিনের চলার রসদ এই কয়েকটা ঘণ্টা থেকেই সঞ্চয় করে নেন তিনি। বাকি দিন সঙ্গে সঙ্গে থেকে যান রবীন্দ্রনাথ। কখনও কাগজের অফিসে, তাঁর সাজানো ছিমছাম ঘরটায় বসে মিটিঙয়ের ফুরসতেই আবার দেখা হয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। খুব প্রিয় একটা কবিতার অনুবাদ করে ফেলবেন তখন।
একটু পরে চোখ যাবে খবরের কাগজগুলোর দিকে। খুঁটিয়ে, খুঁটিয়ে সবগুলো দেখবেন। হঠাৎ একটা ক্যাপশন দারুণ মনে ধরে যাবে। চমৎকার। কী জানি, পরে যদি ভুলে যান, তক্ষুনি ফোনটা তুলে নিয়ে সম্পাদককে জানিয়ে দেবেন, তোদের কাগজ কিন্তু খুব ভালো হচ্ছে। সম্পাদক হয়তো আবদার করবেন একটা সাক্ষাৎকারের জন্য। কিন্তু তাঁর যে অনেক কাজ। ছবির কাজ চলছে। আর নিয়ম করে পড়ছেন মহাভারত। একেবারে যাকে বলে শিক্ষক রেখে। মহাভারতকে নিজের মতো পর্দায় আনা তাঁর স্বপ্ন। তবু তিনি সম্পাদককে হতাশ করবেন না। একটু একটু করে ছায়া কেটে রোদ উঠবে। এই রোদকেই বোধহয় পুজোর রোদ বলে। ঝকঝকে, যেন আকাশের আয়না থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে। রোদটা যেন ঠিক ‘খেলা’ ছবির অভিরূপের মতোই চঞ্চল, দুরন্ত। রোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে তাঁর ব্যস্ততা।
তবু আজ যেন সবকিছু অন্যরকম ঠেকছে। বারান্দার পিছনে কার যেন একটা দুরন্তপনা আঁচ করতে পারছেন তিনি। কে আসছে? অভিরূপ না? হ্যাঁ তাইতো। এত সকালে অভিরূপ কেন? ওর মধ্যে দিয়েই নিজের শৈশবকে এঁকে রেখেছিলেন পর্দায়। ঐ ছবিটার ভিতরেই ছিল তাঁর বাবা-মা, দাদু, পোষা কুকুর। ছিল স্কুল, স্কুল ছুটি আর অবনঠাকুর। শৈশবের আধা বিস্মৃত স্মৃতিলেখারা যেন বড় বেশি বেশি করে ঘিরে রেখেছিল সেই ‘খেলা’ঘর। আজ এই সকালে তবে কি তাঁর নিজের শৈশবই তাঁর কাছে ফিরে এসেছে? কিন্তু কেন? অভিরূপ ততোক্ষণে সবাইকে টপকে পৌঁছে গেছে ঠিক তাঁর পাশটিতে। স্বভাবসিদ্ধ সারল্যে বলছে, ওমা তোমার মনে নেই, আজ তোমার জন্মদিন না?
জন্মদিন? তাহলে তো এতক্ষণে ফোনের বন্যা বয়ে যেত। কত শুভেচ্ছার ফুল মাথা নাড়িয়ে বলে উঠত, জন্মদিনে ভালো থেকো মেঘপিয়ন। কই, কেউ তো কিছু বলছে না? কি রে অভিরূপ, কেউ তো বলেনি আজ জন্মদিন আমার? অভিরূপের কাছে এর উত্তর নেই। উত্তর দেবে তিতলি। সেও কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এবার সে বলবে, কেন এরকম একটা জন্মদিন হতে পারে না বুঝি? আমারও কি নতুন জন্মদিন হয়নি তোমার হাতে? একটা মেয়ে থেকে যেভাবে একটু একটু করে তুমি নারী করে তুলেছিলে, সে কি এক জনমে আমার জন্মান্তর নয়? সেদিন কেউ জানে না, শুধু তুমি জানতে, ওটা ছিল আমার আর একটা গোপন, একান্ত জন্মদিন। যেমন আজকেরটা তোমার, একটা গোটা নিজস্ব জন্মদিন।
এবার পুরোপুরি ফিরে তাকালেন তিনি। কে বলে কেউ আসেনি? ওই তো হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, মা-মেয়ে, মিঠু আর সরোজিনী। ওদের তো এক সময় বনিবনা ছিল না মোটে। সেও তো হল বেশ কিছুদিন আগের কথা। পরিবার বিশেষ করে যৌথ পরিবারের ধারণা তখন একটু একটু করে পালটে যাচ্ছে। বাঙালি সমাজের আঁচল থেকে অবশ্য সংস্কারের ছুতমার্গীয় ছোপগুলো এখনকার মতো ফিকে হয়ে যায়নি। সেই সময় তিনিই সরোজিনীর পাশে বন্ধু হিসেবে রেখেছিলেন সোমনাথকে। না আর কোনও গতে বাঁধা সম্পর্কের নামাবলী চাপা দেননি তাদের উপর। মিঠু তো সোমনাথকে জিজ্ঞেসও করেছিল, ওরা বিয়ে করেনি কেন? সোমনাথ উত্তর দিয়েছিল, দুজনের কারোরই সে দরকার পড়েনি। এও তো এক অন্য সামাজিকতা। অথচ তিনি তার জায়গা করে দিয়েছিলেন অত্যন্ত সফিস্টেকেটেড ভাবে। একটু এদিক ওদিক হলেই বেশ খানিকটা ক্লেদ এসে লাগত। তিনি লাগতে দেননি। তবু পরিবারের ভরকেন্দ্র তাতে বিপন্ন হয় না। শেষবেলায় দুই নারীর অনুভব মিশে গিয়েছিল এক সকালের আলোয়। বাঙালিও হাসি হাসি মুখ করে অন্ধকার হল ছেড়েছিল নতুন এক আলোর সন্ধান নিয়ে। সেই প্রথম আলো কি আজ এই জন্মদিনের আলোয় না মিশে থাকতে পারে? ওরা তাই এসেছে। এসেছে কাবেরী-কৌশিকও। হ্যাঁ দোসর হয়েই এসেছে। আর কোন বিশ্বাসভঙ্গ নেই, নেই সন্দেহ, বিচ্ছেদের চোরা হাতছানি। আসলে সে সব তো তৈরি হয়েছিল এঁদের দুজনকে দোসরের সুতোয় বেঁধে ফেলার জন্যই। বিচ্ছিন্নতার বেদনা, মূলস্রোত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা তিনি নিজে হয়তো সইতে পারেন। এঁদেরকে সে কষ্টের ভাগীদার করেননি। বরং সম্পর্কের সুতোর জট ছাড়াতে ছাড়াতে যখন তাঁদের পৌঁছে দিয়েছিলেন উন্মেষে, তখন আমাদের আধুনিক হর পার্বতীও যেন আধুনিকতার অসুখ পেরিয়ে পৌঁছতে পেরেছিল কুমারসম্ভবের উপলব্ধিতে। সত্যি সম্পর্ক কী অদ্ভুত! ওই যে মল্লিকা দাঁড়িয়ে আছে, সে তো এখনও জানতে চায়, আচ্ছা একই সঙ্গে কী দুজন মানুষকে ভালোবাসা যায় না? কী উত্তর দেবেন তিনি। তিনি তো চান মল্লিকার জীবনের মহরৎ শুভ হয়ে উঠুক। তবু প্রশ্ন যে পিছু ছাড়ে না। পিছু ছাড়ে না নাছোড়বান্দা ভালোবাসা। মুখে মৃদু হাসি এনে, মল্লিকাকে প্রতিবারের মতো আজও তিনি শোনান গুরুদেবের কথা- ‘ এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে/ তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে,/গভীর কী আশায় নিবিড় পুলকে/ তাহার পানে চাই দু বাহু বাড়ায়ে।’ হয়তো এর উত্তর পাওয়া যায়, মল্লিকা জানে, শুধু দৃষ্টিটাকে পালটে নিতে হয়। এই তো এখানে দাঁড়িয়ে আছে রোহিনি। শুধু কী চোখের দৃষ্টিটাই হারাতে বসেছিল, মনেরটা কি নয়? সুধাময় তো এসেছেন। রোহিনি-সুধাময় দুজনেই জানেন আসলে অসুখটা রোহিনির মায়ের ছিল না। ছিল সময়ের। যে সময়ের বুক থেকে মূল্যবোধ, বিশ্বাস, পরিবার, পারিবারিকতা খুব দ্রুত উধাও হয়ে যেতে বসেছে। যে সময়ের দোরগোড়ায় সম্পর্করা শৌখিন ফুলদানি হয়ে সাজানো থাকছে, রূপ-রস-গন্ধ হারিয়ে। আর তিনি একটু একটু করে চাইছেন সব অসুখ সেরে যাক। সব ভাঙা জোড়া লাগুক। পরিবারগুলো উৎসব ফিরে পাক। রাধিকা চিনুক তার ইন্দ্রনীলকে। বলুক- ‘কী হবে অতীত নিয়ে, চলো পুনর্বার প্রেমে পড়ি।’ রোমির পাশে পাশে থাক ঝিনুক। আসলে সব চরিত্রই তো কাল্পনিক ছিল না। বাড়িওয়ালি বনলতার ওই একবিন্দু আকাঙ্ক্ষা তো কাল্পনিক নয়। রেনকোটের পকেটে রেখে দেওয়া নীরুর একজোড়া সোনার বালায় লেগে থাকা প্রেম তো কাল্পনিক নয়। তাঁর মালতী, অনিকেত, অপ্রতীমরা কেউই কাল্পনিক নয়, বরং আবহমান। সকলেই ধরে আছে সমকালের নিশান। আজ তারা সকলেই এসেছে, তাঁর জন্মদিনে। অবশ্য বিনোদিনী, মহেন্দ্র, বিহারী কিংবা রমেশ, হেমনলিনী, নলিনাক্ষরা এদের ভিড়ে আসে না। তিনি নিজেই তাদের কাছে যান। আজও হয়তো যাবেন।
আসলে কেউই তো কাল্পনিক নয়। যেমন এই জন্মদিনটাও নয়। আজ হয়তো কেউ বলবেন, তিনি প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন আর এক প্রান্তিকতাকে। কেউ বলবেন, আত্মমগ্নতাতেই জ্বলে উঠেছে তাঁর প্রদীপ। সে শিখার আলো যত না পরিধি ছুঁয়েছে, তার থেকেও বেশি আলোকিত করেছে স্বয়ং কেন্দ্রটিকেই। তাঁর বহুপ্রজতার বহুবিধ ব্যাখ্যান ছেপে বেরোবে এদিক ওদিক, মিশে থাকবে কাছের মানুষদের নস্টালজিয়ায়। অথচ আজ এই যে তাঁর সম্পূর্ণ নতুন একটা জন্মদিন, একে ছুঁতে পারবে না সেই সব অক্ষরমালা। ছুঁতে পারবে এই রোমি, ঝিনুক, মালতী, মল্লিকা, নীরু অপ্রতীমরাই। শিখার মধ্যে যেমন থাকে সলতের আত্মদহনের ইতিহাস, এদের মধ্যেই সেভাবেই তো আছেন তিনি। এরা প্রত্যেকে তাঁকে প্রতিবার জন্মদিনের মুখোমুখি হাজির করাবে। এদের প্রত্যেকের জন্মদিন তাঁর মনে ছিল। মনে করে এরা এবার থেকে প্রতিবার লিখবে তার জন্মদিনের শুভেচ্ছেবার্তা।
একসঙ্গে এতজনকে দেখে ছোট্ট অভিরূপটা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। সেইই তো আজ সবার প্রথমে এসেছে। পরিণতির কাছে এসেছে শৈশব। এক নতুন যাত্রার কাছে এসেছে আর একদিনের যাত্রার শুভারম্ভ। তফাৎ মাত্র এক জীবনের। আলতো করে তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর দু’জনেই একস্বরে বলতে শুরু করল... ‘খেলা খেলা দিয়ে শুরু/ খেলতে খেলতে শেষ/ কেউ বলেছিল ছি ছি/ কী বলেছিল বেশ... / কেউ বেসেছিল ভালো/ কেউ খুঁজেছিল আলো/ কেউ আলো খুঁজে পায়নি বলেই হয়তো নিরুদ্দেশ।’
দিনেরা নিরুদ্দেশ হয়, জন্মদিনেরা নয়। প্রতিবার সে ঠিক সাথী খুঁজে নেয়। আবার শুরু হয় খেলা। বিপ্রতীপে। এবার খেলা কর্তা থেকে কর্মের দিকে নয়, অভিমুখ বদলে তা কর্মের ভিতর দিয়ে সৃষ্টিকর্তার দিকে। যেখানে যখন যেদিন তার সন্ধান মেলে সেদিনটাই তাঁর ও তাঁদের ৩১ অগাস্ট। ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিন। এ খেলা আবহমানের। কেননা অভিরূপ জানে, তিনিও জানতেন, আজ আমরাও জেনেছি- ‘বাঁশি যতবার বাজে/ শুরু শেষ আর মাঝে/ ততোবার করে শুরু হয় খেলা থামতে চায় না যে...’।
স্রষ্টার খেলা ফুরোয়। সৃষ্টির খেলা ফুরোয় না। প্রতি জন্মদিনের কপালে সে এঁকে দিয়ে যায় দীর্ঘায়ু ফোঁটা।

আপনার মতামত জানান