ঋতুপর্ণ -A Seasonal Charm

অঙ্কুর কুণ্ডু


“ ”

Out , out , brief candle !

Life’s but a walking shadow , a poor player

That struts and frets his hour upon the stage

And then is heard no more : it is a tale

Told by an idiot , full of sound and fury ,

Signifying nothing .

(MACBETH , Act-5 , Scene-V)



-শেক্সপিয়ারের এই লাইনগুলি যদি ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় , তাহলে খুব একটা যথাযথ হবে না , পুরোটাই অর্ধসত্য ৷ তাহলে এইরকম ‘সেমি ট্রু’ কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম কেন , যেখানে উদ্দেশ্যের অলিন্দে থাকা ব্যক্তিটিই ‘মেটা ট্রু’ ! ঋতুপর্ণের জীবন মানেই রবীন্দ্রনাথের অধিক প্রভাব –ভুল ৷ রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস বা গল্পের শেষদিকটা ঠিকঠাক হয়নি বলেও দাবি করেছিলেন ঋতুপর্ণ ৷ তাও শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের লেখনীকে বারবার ভেঙে গড়ার যে একটা সুখানুভূতি থেকে যায় বাঙালীর মধ্যে , সেই উন্মত্ততা থেকেই ঋতুপর্ণ ঘোষ বেরিয়ে আসতে পারেননি বলেই রাবীন্দ্রিক প্রভাবটা এত লক্ষণীয় ৷ ইংরাজী সাহিত্যের রবীন্দ্রনাথ বলতে আমাদের মত আপাত মূর্খেরা শেক্সপিয়ারকে বোঝে ৷ যেহেতু জীবনের সরণ শূন্য হয় না কখনও , তাই তা সম্পূর্ণও নয় , অর্দ্ধেক ৷ ঋতুপর্ণের জীবনটাও ব্যতিক্রমী নয় ৷ সে কারণেই উপরোক্ত লাইনগুলি দিয়ে শুরু করেছিলাম লেখাটা ৷ এই লাইনগুলির প্রেক্ষাপটে কিন্তু ছিল লেডি ম্যাকবেথের আত্মহত্যা বা আত্মা-হত্যা , এখানেও ধীরে ধীরে প্রতিটা লাইন কিভাবে ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবনচক্র বর্ণনা করছে সেটাই দেখার ! লেডি ম্যাকবেথ্ ও ঋতুপর্ণ –বিতর্কের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে ? আপাতত তোলা থাক ! “ঋতুপর্ণ –A Seasonal Charm” শেষপর্যন্ত কি এখানেই আটকে থাকল ? দেখা যাক্ ৷



৩১শে অগস্ট্ চলে এল , ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিন ৷ শুভ জন্মদিন , ঋতুপর্ণ ঘোষ ৷ খাতা ও পেন নিয়ে আমাকে যদি কিছু লিখতে বলা হয় তবে কখনওই তাঁর জন্ম-মৃত্যু-সিনেমা-লিঙ ্গের বিতর্ক বিষয়ক কোনো কথা লিখব না ৷ কারণ মানুষটি নিজে তাঁর শরীর নিয়ে যেমন কাটাছেঁড়া করেছেন , তেমনই তাঁর অনুরাগীরা বিশেষতঃ বাঙালীরা তাঁকে নিয়ে কম লেখেননি ৷ অতএব নতুনত্ব কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না , তাও. . .



Out , out , brief candle !

একটা হিসাব আমার অহংকারের কারণ , তবে তাতে কিছু নিখাদ দুঃখও আছে ৷ যেমন -২২শে এপ্রিল , ১৯৯২সালে আমার জন্ম ; সেই বছরেই পরের দিন অর্থাৎ ২৩শে এপ্রিল মারা যান শ্রী সত্যজিৎ রায় ; ১৯৯২-এই বাংলা সিনেমা জগতে ঋতুপর্ণ ঘোষ পদার্পণ করেন তাঁর প্রথম বাংলা ‘বই’ “হীরের আংটি” নিয়ে ৷ নব্বইয়ের গোড়ায় যখন বাংলা সিনেমা থেকে মুখ ঘোরাতে শুরু করেছেন বাংলার আপামর দর্শক , বিশেষ করে শহুরে ‘শিক্ষিত’ মনুষের মুখে মুখে বলিউডি খবর , তখনই একের পর এক আছড়ে পড়ল “হীরের আংটি” , “ঊনিশে এপ্রিল” , “দহন” সব সিনেমাগুলি প্রায় দুইবছরের ব্যবধানে যথাক্রমে ’৯২ , ’৯৪ , ’৯৭. . . সিনেমার সাফল্য মাপা হয় বক্স অফিসের মূল্যবান কালেকশানের নিরিখে ৷ বিংশ শতকের অন্তিম শতকে ধুঁকতে থাকা টলিউড বক্স অফিস হঠাৎই ফুলতে শুরু করে , কারণ হিসেবে যা উঠে আসে , তা কখনওই ঋতুপর্ণ ঘোষ নয় ; বরং কারণটা হল এক সৃজনশীল মননে দর্শকের আকুতি শুনতে পাওয়া রক্ত-মাংসের মস্তিষ্ক ৷ যে সময়ে বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমাও নিষ্প্রদীপ হতে বসেছিল , ঠিক তখনই ঋতুপর্ণের হাতেই উঠে এল দেশলাই কাঠি. . . অপেক্ষা ছিল বাংলা সিনেমার নবজন্মের কেকের ধারে মোমবাতি জ্বালানোর , কারণ তাঁর এক ফুঁ-তেই তো ধিকিধিকি জ্বলা মোমবাতির সলতে নিভেছিল , জ্বলেছিল চিরস্থায়ীভাবে মোমবাতি. . . টলিউড্ ৷



Life’s but a walking shadow ,

আশির দশকে অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিতে কনটেন্ট্ রাইটার হিসেবে যোগ দেন তিনি ৷ আগেই বলেছিলাম জীবনের সরণ শূন্য হয় না ৷ জীবন সম্পূর্ণ নয় , জীবন গোল নয় , জীবনের শুরু ও শেষের বিন্দুও এক নয় , অনেক বাঁক আছে ৷ জীবনের বাঁকে অর্থ উপার্জনের জন্য তাঁর অ্যাড্-এজেন্সিতে কাজ ৷ সেইসময় হিন্দী ও ইংরাজী বিজ্ঞাপনের অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর পেনের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য ৷ ইন্টারনেটেই পাওয়া যাবে তাঁর লেখা বোরোলীন বা ফ্রুটির ট্যাগলাইন ৷ অনেক জায়গায় পড়েছি যে তাঁর জীবন নাকি ট্র্যাজেডি ৷ যদিওবা পোয়েটিক্স্-এর ট্র্যাজেডির সংজ্ঞার সঙ্গে তাঁর জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ তার থেকে বরং বলা ভাল ‘মেটা-ট্র্যাজেডি’ বা ‘ট্র্যাজি-কমেডি’ –যে কথাগুলোর সংজ্ঞা নিয়ে একটু মতবিরোধ থাকেই ৷ আসলে ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ’ নামটার পরে কখনওই অতএব চিহ্ন দিয়ে সিদ্ধান্ত বাক্যে উপনীত হওয়া যায় না বা পূর্ণচ্ছেদ দেওয়া যায় না , পরিবর্তে নামের শেষে এলিপসিস্ ‘. . .’ দেওয়াটা যথার্থ বা যতিচিহ্ন না দেওয়াটা যথার্থ ৷ এই প্রসঙ্গে আমি যদি ‘অরুন্ধতী’ সিনেমাটির নাম নিই , তবে অনেকেই ভ্রু কুঁচকাবেন ৷ কিন্তু যদি আমি বলি যে ১৯৯৪-এর “ঊনিশে এপ্রিল” বা ১৯৯৭-এর “দহন” সিনেমাগুলি পরবর্তীকালে মুক্তিপ্রাপ্ত ২০১২-এর “৩ কন্যা” বা ২০১৪-এর “অরুন্ধতী”-র ভিত গড়তে শুরু করেছিল (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , আমি সিনেমা ‘হিট’ হওয়ার কথা বলিনি) , তবে কি আমাকে অত্যুৎসাহী মনে হবে ? মনে হয় না , নারীদের একক ক্ষমতা নিয়ে সিনেমার সাফল্য তো নব্বইয়ে লুকিয়েছিল ৷ হতে পারে যে তখনকার অস্তিত্ব এখন কেবলই ছায়া ৷ তা স্বাভাবিক , ঋতুপর্ণের জীবন শেষ হয়েছে ঠিকই , কিন্তু উদ্দেশ্যটা আছে ছায়া হয়েই ! ছায়ার মৃত্যু ঘটে না , অন্ধকারে কেবল বিশ্রাম নেয় , আলো ফুটলেই চলা শুরু !



a poor player/That struts and frets his hour upon the stage/And then is heard no more :

আমাদের সমাজ এমনিতেই জীবন্ত মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়ার থেকে জীবনোত্তর স্বীকৃতি দেওয়াতেই বিশ্বাসী ৷ ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব হলেও , তিনি মানুষ এবং এককালে সমাজে বাস করেছিলেন , ফলে নিয়মটি তাঁর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ৷ যাক্ , ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর পর যখন সেলিব্রিটিরা প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন তখন শর্মিলা-তনয়া সোহা আলি খানের কথাটা বেশ ভাল লেগেছিল ৷ তিনি বলেছিলেন যে সত্যজিৎ রায় এবং বর্তমান বাংলা পরিচালকগোষ্ঠীর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ ৷ আমি বোধহয় কিছুক্ষণ আগেই এই যোগসূত্রের একটা আঁচ দিয়েছিলাম ৷ ১৯৯২-এ মুক্তিপ্রাপ্ত বই “হীরের আংটি” দেখার কথা ছিল সত্যজিৎ রায়ের , সেই বছরেই সিনেমামহলকে শোকস্তব্দ্ধ করে চলে গেলেন উনি ৷ জীবিতকালে ঋতুপর্ণ অনেকবার শুনেছিলেন একই সারণীতে সত্যজিৎ ও নিজের নাম ৷ কিন্তু দু’জনের একই সারণীতে না থাকার সম্ভাবনা প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে ৷ সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনার গভীরতা অন্তহীন , সেখানে কিছু জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষ হোঁচট খেয়েছেন ৷ যতই তিনি মারাত্মক শরীর খারাপে আক্রন্ত হন না কেন , জেদবশতঃ শেষ বই “সত্যাণ্বেষী” এবং ডক্যুমেন্টরী “জীবনস্মৃতি” পার্থক্য গড়েছে সত্যজিৎ রায়ের সাথে , যাঁর শেষ সিনেমা ১৯৯১-এ মুক্তিপ্রাপ্ত “আগন্তুক” ‘ন্যাশানাল্ ফিল্ম্ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল ৷ কিন্তু. . . ঋতুপর্ণ ঘোষের চেক্-মেট্ করার অস্ত্র ছিল তাঁর অভিনয় ক্ষমতা ৷ পরিচালক হিসেবে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (হীরের আংটি) , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (চোখের বালি , নৌকাডুবি , চিত্রাঙ্গদা প্রভৃতি) ,

’ও হেনরি (রেনকোট) , অগাথা খ্রিস্টি (শুভ মহরৎ)-দের লেখাকে সিনেমার পর্দায় একটা অন্য মাত্রা দেওয়ায় তাঁর দক্ষতার পরিচয় পেয়েছি ৷ কিন্তু “আরেকটি প্রমের গল্প” বা “চিত্রাঙ্গদা”য় তাঁর অভিনয় ও সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং সংলাপের শুরু-শেষের টাইম-ইন্ ও টাইম্-আউট্ দেখে বলতে ইচ্ছা করে , “আহা , কি দেখিলাম ! জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না ৷” একটা সিনেমায় পারফেকশান্ আনার জন্য একজন অভিনেতার কিরকম ‘ইনভল্ভমেন্ট্’ প্রয়োজন , তার উদাহরণ “আরেকটি প্রেমের গল্প” সিনেমার জন্য ওনার ব্রেস্ট্ ইমপ্ল্যান্ট্ অপারেশন্. . . Myna Mukherjee তাঁর এক প্রতিবেদনে ঋতুপর্ণ প্রসঙ্গে বলেছিলেন , “Every story of his was personal , no matter how fictional .” এই কথাটা যখনই পড়ি তখনই গায়ে শিহরণ দেয় , ঋতুপর্ণের মৃত্যুতেও আমি এতটা উদ্বেলিত হইনি ! ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রায় পারফেকশানের কথা বলতেন এটা জেনেও যে ‘পারফেকশান্’ কথাটাই আপেক্ষিক ৷ এর মানে কোথাও তাঁর মনে সুপ্ত বাসনা ছিল যে তিনি পারফেকশানের কাছাকাছি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাবেন , যেখানে অন্যের উঠে আসা প্রায় অসম্ভব ৷ Myna Mukherjee ঋতুপর্ণ প্রসঙ্গে আরও বলেছিলেন , “The filmmaker who allowed himself to appear naked on the silver screen”. তাহলে এর পরেও কেন “সত্যাণ্বেষী” ? কেন “জীবনস্মৃতি” ? উত্তরটা এই অংশের হেডলাইনে আছে কি !



it is a tale/Told by an idiot ,

পরিষ্কার করে দিই যে শেক্সপিয়ার ‘it is a tale’ বলতে ‘life is a tale’ বুঝিয়েছেন ৷ যাই হোক , যখন আমি কলেজে পড়তাম , তখন বন্ধুদের মধ্যে তর্কের এক বিষয় ছিল –রবীন্দ্রনাথ ৷ রবীন্দ্র-বিরোধীদের অতি পরিচিত একটি যুক্তি হল যে রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক সচ্ছ্বলতাই তাঁর গুচ্ছ-গুচ্ছ লেখনীর মূল ভিত্তি ৷ একটা সময়ে আমিও রবীন্দ্র-বিরোধী ছিলাম বলে জানি যে এই কথাটা কতটা যুক্তিহীন ! আমার দ্বিধা নেই দাবি করতে যে ওনার যদি একটা লেখা বাদ দিয়ে আমি সব পড়ে থাকি তাও আমি রবীন্দ্রনাথকে বুঝি না বা চিনি না –শুধুমাত্র ওই একটা লেখা না পড়ার জন্য ৷ আসলে রবীন্দ্রানুরাগী ও রবীন্দ্রবিরোধী ব্যপারটা আস্তিক ও নাস্তিকের মতই ৷ বিরোধীপক্ষের মননে একবার হলেও তাদের বিরোধী শিবিরের ছোঁয়া লাগবেই ! ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহুরে প্রেক্ষাগৃহে সাফল্যলাভ করেছিল , কিন্তু অঞ্জন দত্তের মত খুব বেশি তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়নি এই বলে যে তিনি শুধু শহুরে ‘শিক্ষিত’ উচ্চ-মধ্যবিত্তদের জন্যই সিনেমা বানাতেন ৷ এক প্রতিবেদকের কলমে পড়েছিলাম তাঁর সম্বন্ধে কলকাতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটা লাইন –“Kolkata is one that could neither ignore nor embrace him” ৷ স্বাভাবিক ! রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস বাদ দিয়ে তিনি যে কয়েকটা ‘বই’ তৈরী করেছেন ‘সোশ্যাল ট্যাবু’ নিয়ে , সেইগুলো শহুরে দর্শকরা যেমন উপভোগ করেছেন তেমনই সমালোচনা ও নোংরা ইঙ্গিতে বিদ্ধ করেছেন তাঁর ‘Effeminate Men’ অ্যাটিটিউডকে ৷ যদিও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তিনিও প্রশ্ন করেছিলেন –‘জন্মগত শরীর নিয়ে আমরা যদি সুখী হই তাহলে ছেলেরা চুল , নখ কাটে কেন ? মেয়েরা কান বেঁধায় বা উল্কি আঁকে কেন ?’ ঋতুপর্ণের জীবনটা তো রূপকথার মতই হত ! নিজের সৃষ্টিশীলতায় তিনি এত প্রশংসা পেয়েছেন , যা আশাতীত ৷ গৌতম ঘোষ তাঁকে একবার প্রশ্ন করেছিলেন যে তাঁর বেশিরভাগ সিনেমার কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের গালে এত দাড়ি থাকে কেন ? উত্তরে উনি বলেছিলেন , “দাড়ি কখনও কখনও ছদ্মবেশ , ধরুন আপনি বাইসেক্সুয়াল ৷ কিন্তু দাড়ি রাখুন , স্ত্রী-সংসার নিয়ে থাকুন , মেনস্ট্রিম্ সমাজে চমৎকার মিশে যাবেন ৷ কেউ প্রশ্ন করবে না ৷” অনেকের মনে থাকবে স্টার জলসার অনুষ্ঠান ‘Ghosh & Co.’-এ তিনি মীরকে রীতিমত ধমকেছিলেন তাঁকে ‘মিমিক্’ করার জন্য এবং প্রশ্ন করেছিলেন যে যখন মীর তাঁকে ‘মিমিক্’ করে তখন সে কি শুধুই তাঁকে ‘মিমিক্’ করে নাকি পুরুষের শরীরে মহিলা ভঙ্গিমা আছে যাদের , তাদেরও অজান্তে ‘মিমিক্’ করছে ? এমনভাবে শুধু অন্ স্ক্রিন নয় , অফ্ স্ক্রিনেও ‘গে- লেসবিয়ান- বাইসেক্সুয়াল- ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি’র হয়ে সমাজে তাদের বিরুদ্ধে কুৎসিত মানসিকতাগুলি তুলে ধরেছেন ৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল কন্যা মাধুরীলতা , রেণুকা ; পুত্র সমীন্দ্রনাথ ; স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ; বৌঠান কাদম্বরী দেবী- দের মৃত্যুর মানসিক চাপ ৷ অপরদিকে সমাজের কুৎসাকে চোখের কোণে রেখে মধ্যমণি দিয়ে নিজের শরীররকে কাটাছেঁড়া করে রূপকথার অবসান ঘটালেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ ঘোষ !



full of sound and fury/Signifying nothing .

আমার এই লেখার অনেক জায়গায় একটি শব্দ আছে –‘বই’ ৷ সেটা ওই মানুষটির থেকেই ধার করা ৷ উনিই বলতেন –“cinema and book literally meant same thing –boi” ৷ রবীন্দ্রনাথের “চোখের বালি”র শেষটা পড়ে উনি সন্তুষ্ট হননি , তাই সিনেমায় কিছু পরিবর্তন করেছিলেন ; মানতে পারেননি তাঁর “রেনকোট” সিনেমাটির ভিত্তি ’O Henry-র লেখা “The Gift of the Magi” ছোটগল্পের কিছু অংশ ৷ সঞ্জয় নাগ পরিচালিত “মেমরিজ্ ইন্ মার্চ” সিনেমাটির অভিনেত্রী দীপ্তি নাভাল বলেছিলেন যে তাঁর বাংলা উচ্চারণ খারাপ থাকায় ঋতুপর্ণ তাঁর বলতে না পারা বাংলা সংলাপগুলি হিন্দিতেই বলার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন ৷ অতএব্ , যেখানে অন্যের সাহায্যে ডাবিং করে সফটওয়্যার ব্যবহার করলেই ঝামেলা মিটে যেত , সেখানে তিনি কোনোরকম কম্প্রোমাইজের দিকে হাঁটেননি ৷ ঋতুপর্ণ ঘোষের শৈল্পিক ক্ষমতা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা হলেও , ঢাকা পড়ে যায় ওনার চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আগ্রাসনের গল্পগুলি , যা তাঁকে আড়ালেই একটা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে ৷



যে যা বলুক , আমি অন্ততঃ বারবার ঋতুপর্ণের শরীরের প্রেমে পড়েছি ৷ তাঁর অঙ্গ-সঞ্চালন , কথা বলার ভঙ্গি , রাগত দৃষ্টি , সেক্স কোশেন্ট্ , শৈল্পিক ভাবনা –সবক্ষেত্রেই আমি ‘ঋতু’রই ছোঁয়া পেয়েছি ৷ ২১টি সিনেমার পরিচালক বা ১৮টির কাছাকাছি জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত ঋতুপর্ণ ঘোষ যতটা না চর্চিত , তার থেকেও বেশি মানুষটা আমার কাছে ‘আবেগতাড়িত’ ৷ আমি যে এখন এই কথাগুলি লিখছি , তাতে আজিনামোটো (রেডিও মির্চিতে মীরের অনুষ্ঠান যাঁরা অনুসরণ করেন , তাঁরা জানবেন) ছাড়াই লিবিডো আমাকে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে ৷ আরও অনেক কিছু বলার ছিল , কিন্তু পাঠকরা বিশ্বাস করবেন কি না জানিনা , আমি সেই মুহূর্তে নেই , কারণ হিসেবে উঠে আসছে সেই লিবিডোই৷ তাই প্রথমদিকে লেখার যে বুনোটটা তৈরী করেছিলাম , ধীরে-ধীরে তা হারিয়ে যাচ্ছে যেন ! “চিত্রাঙ্গদা”য় রবীন্দ্রনাথের সেই লেখনী মনে পড়ে –“পূজা করি রাখিবে মাথায় , সেও আমি নই , অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে পিছে , সেও আমি নই ৷” ঋতুপর্ণ ঘোষের ক্ষেত্রে কোনো সাব-টাইটেল হয়তো যথার্থ নয় ৷ তাই ঋতুপর্ণ ঘোষ এখন ‘A Seasonal Charm’ থেকে A Seasonal Change-এর পথে. . . হতে পারে -আমি পুরুষ !


আপনার মতামত জানান