ফিরে দেখা ঋতুপর্ণ

সায়ন্তন মাইতি


৩১শে মে ২০১৩-র পর থেকে একজনকে কেন্দ্র করে উপচে পড়া চৌবাচ্চার মত লেখা বেরিয়েছে এবং বেরিয়ে চলেছে। অনেক লেখাই পড়েছি। কোনোটা তাঁকে ‘ব্যক্তি’ করে, কোনোটা ‘শিল্পী’ করে। একসাথে তাঁর ‘ব্যক্তিত্ব’ এবং ‘শিল্পকর্ম’ কোথাও কোথাও একই লেখায় স্থান পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু আলাদা আলাদা প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে। ‘মিশে’ যেতে পারে নি। অথচ অন্যান্য শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই ঘোঁট পাকানোটা বেশ চলে দেখেছি। বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে শুরু করে সাহসী চরিত্রে অভিনয় কিংবা ব্যতিক্রমী কবিতা লেখা – সব ক্ষেত্রেই শিল্পীর থেকে বেশি উৎসাহী হয়ে সমালোচকেরা (দর্শক বা পাঠক বলছি না) তাঁদের স্পটলাইটের সামনের এবং পিছনের কেরিয়ারকে জবড়জং করে ছাড়েন।
আমার অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল, ঋতুপর্ণ ঘোষের ব্যক্তিজীবন ও সিনেমা এরকমভাবে একসাথে ঘেঁটে দেব (বেশিরভাগ সমালোচক যেমন ‘গসিপ’ তৈরী করেন, তেমন নয় অবশ্য)। গুণী সাহিত্যিকদের সাথে কথা বলেছি। অনেকে বলেছেন, ‘দুটো টপিকই ‘ভাস্ট’। ফিল্মমেকার হিসেবে উনি যেমন প্রোফাউণ্ড ছিলেন, তেমনি ওনার দৃষ্টান্তমূলক জীবনযাপন নিয়েও পাতার পর পাতা লিখে দেওয়া যায়। দুটোকে এক করা কঠিন’। তাছাড়া, লোকটা সুযোগ দিলে তো। অঞ্জন দত্ত যেমন ব্যাণ্ড, রক মিউজিক, আরবান ফোক নিয়ে অনেক সিনেমা বানিয়েছেন, এবং প্রতিটিতে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে। কিন্তু ঋতুপর্ণ শেষের দিকে ‘চিত্রাঙ্গদা’ ছাড়া জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন কই? কিভাবে টানব যোগসূত্র?
এখানেই ঋতু। এবং এজন্যই ঋতু। ‘আলাদা’ যৌনতার ভাগীদার হওয়াটা তাঁর কাছে আদৌ ‘জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ ছিল না। ওটা আমাদের পরচর্চায় নিমজ্জ সমাজের বদভ্যাস। সেই সমাজের অঙ্গ হওয়ায় আমার মধ্যেও ভাইরাস ঢুকেছে। তাই ঋতুর প্রিয় খাবার, প্রিয় গান, পছন্দের ট্যুরিস্ট স্পটসমেত হাজারটা ব্যক্তিগত কথা বাদ দিয়ে ‘ব্যক্তিগত জীবন’ বলতে সেক্সুয়াল প্রেফারেন্সটাকে হাইলাইট করছি। আসলে আর পাঁচটা স্বাভাবিক ব্যাপারের মতই তাঁর কাছে স্বাভাবিক ছিল সমকামী হওয়া। প্রেমের অনুভূতি সব প্রেমেই সমান। ভালোবাসা বয়স, ধর্ম, পরিবার, অর্থের মত লিঙ্গও মানে না। এই সত্যকে ঋতুপর্ণ নিজের জীবন এবং ফিল্ম দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। ....আবার ভুল বললাম, ‘দেখাতে’ তিনি কিছুই চান নি। ইগো সিণ্টোনিক মানেই কি নিজের ওরিয়েণ্টেশন জাহির করে বলতে হবে? ধরুন আমি যদি চাউমিনের মধ্যে ডিম সহ্য করতে না পারি, তাহলে কি সবাইকে ডেকে ডেকে বলব? নাকি, চক্ষুলজ্জার ভয়ে বন্ধুদের সাথে রেস্টুর্যারণ্টে বসে মুখ বুজে এগ চাউয়ের প্লেটটা সাবাড় করে ফেলব? ঋতুপর্ণ কখনো সমানাধিকার ‘চেয়ে’ ভোকাল হন নি, আদায় করে নিয়েছেন। স্বাভাবিক জিনিস সবাই যেভাবে আদায় করে। সিনেমাতেও ‘আলাদা করে’ দেখান নি। আর ওনার ‘না দেখানোই’ ওনার সমকামিতার প্রকৃতিবিরুদ্ধ না হওয়ার পক্ষে সওয়াল, যেটা বর্তমানে অনেক দেশ মনে করে, মনস্তত্ত্ববিদ এবং যৌন গবেষকরা তো বটেই। ‘He explored transgender lifestyles during the last several years of his life’ ওটা শুধু উইকিপিডিয়ার পাতাতেই লেখা আছে। বাস্তবে ঋতুপর্ণ নিজে থেকে কোনোদিন বলেছেন বলে মনে হয় না।
কৌশিক গাঙ্গুলির ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’র একটা ডায়লগ মনে পড়ছে। -‘চপল ভাদুড়িকে নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন? ওনার কেরিয়ার নিয়ে, না সেক্সুয়ালিটি নিয়ে?’ ঋতুপর্ণর উত্তরঃ ‘অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে সিনেমা করলেও এটাই বলতেন’?
ঋতুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তাই ওনার ‘ব্যক্তিগত জীবন’ বলতে শুধুমাত্র যৌনতাতেই থেমে থাকব না। আমার অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে, ওনার একাকীত্বের ছাপ এসেছে ওনার চরিত্রের মধ্যে। আর সে একাকীত্ব মানে শুধু ‘একা থাকা’ নয়। অনেক পরিজন পরিবেষ্টিত হয়েও মানুষ একা থাকতে পারে, মনের অন্তস্থলে যদি নিজের পৃথিবীকে আগলে একজন বসে থাকতে পারে, যে কোনো পারিপার্শ্বিক প্রভাবকে উপেক্ষা করে। ঋতুর চরিত্রদের মধ্যে এমন মানুষ বারবার এসেছে। ‘অসুখ’এর রোহিনী, ‘ঊনিশে এপ্রিল’এর সরোজিনী, ‘তিতলি’র রোহিত রায়, ‘বাড়িওয়ালি’র বনলতা, ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’এর হরিশ মিশ্র, ‘শুভ মহরৎ’এর পদ্মিনী চৌধুরী – সবাই তো অনেকের মধ্যে থেকেও একা। আর একাকীত্বে এক একজনের সাড়া এক একরকম। কাউকে বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায়, কাউকে বোঝা যায় না। কেউ একাকীত্ব নিয়ে খুশি, কেউ খুশি নয়, কেউ হয়তো সেটা জানেই না। পাশাপাশি ‘স্টার লাইফ’ সম্পর্কে আমরা না জেনে অনেক কথা বলি, কিন্তু স্টার লাইফ আসলে কী, তার মধ্যে কতরকম চড়াই উৎরাই থাকতে পারে, সেই ধারণা ঋতুপর্ণর সিনেমার ছত্রে ছত্রে।
এছাড়া নারীর চরিত্র ও মনস্তত্ত্ব চিত্রণে ঋতুপর্ণ ছিলেন এক জাদুকর। নিজের সমস্ত শরীর, মন দিয়ে তিনি রমণী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। তাই একজন নারীর চাওয়া, ভালোলাগা সবকিছু নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে তার সৃষ্টিতে। এবং কোথাও যেন সব সিনেমায় মুখ্য এবং গৌণ নারী চরিত্রের টানাপোড়েনই জয়ী হয়েছে। ‘বাড়িওয়ালি’র বনলতার দীপঙ্করের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, ‘তিতলি’তে মেয়ের চোখে মায়ের খলনায়িকা হয়ে ওঠা, আবহমানের ‘শিখা’র ‘শ্রীমতী’ হয়ে ওঠা, ‘অন্দরমহল’এ দুই জমিদার পত্নীর টানাপোড়েন – সব মিলিয়ে মনে অয় তিনিই তো ভিন্নতায় ভরা নারী চরিত্রের সফলতম রূপকার। ‘শুভ মহরৎ’ ও টেলিফিল্ম ‘তাহার নামটি রঞ্জনা’ -একই চরিত্র রাঙা পিসিমা দুই জায়গায় এসেছেন দুইভাবে। পুরুষ-ডমিনেটেড সিনেমাতেও মনে হয়েছে তাঁর ছোঁয়ায় নারীরা অনেক বেশি বোধগম্য হয়ে ঊঠছে পুরুষদের থেকে। আমি বলছি না, পুরুষ চরিত্র নির্মাণে তাঁর কোনো অপূর্ণতা আছে। কিন্তু কেরিয়ারের কুড়ি বছরের মধ্যেই নারী চরিত্রের যে ভিন্নতা তিনি দেখিয়েছেন, সেটা অভূতপূর্ব এবং অনবদ্য।
ঋতুপর্ণ আজীবন পরীক্ষা করেছেন। কত নতুনভাবে নতুন কথা বলা যায়। সিনেমার টেকনিক্যাল দিকগুলোকে নিয়ে কত নতুনভাবে ভাবনাচিন্তা করা যায়। তিনি আজন্ম গবেষক। নিজের উপর পরীক্ষা করার অভ্যাসটা তাই ছাড়তে পারেন নি। তাঁর লিঙ্গান্তর নিয়ে অনেক পক্ষ-বিপক্ষ যুক্তি শোনা যায়। আমি বিতর্কে যাচ্ছি না। শিলাজিৎ বলেছেন, ঋতু নাকি নিজের অপূর্ণতার শোধ তুলেছিল নিজের উপরে। আমি একমত নই। আমার মনে হয় না, নিজেকে উনি কখনো অপূর্ণ মনে করতেন। নিজের কাছে নিজে সম্পূর্ণ ছিলেন বলেই ইচ্ছেমত কাটাছেঁড়া করা শুরু করেছিলেন। খুঁতযুক্ত অবজেক্টের উপর তো এত পরীক্ষা করা যায় না। কিন্তু পূর্ণতা পাওয়ার পর অনেক সময় যথেচ্ছাচারের নেশা পেয়ে বসে। হতে পারে ঋতুপর্ণ তেমন কিছুর শিকার। ....মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে, ‘এত অবহেলা না করলেই পারতেন, মিস ঘোষ। নিজের জন্য নয়, আমাদের জন্য।’ (‘মিস ঘোষ’টা ওনাকে সম্মান জানিয়েই। কোনো অপদস্থকর সম্বোধন নয়। যে মানুষটা নারী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন, এই ডাকটাই তাঁর কাছে কাম্য)
ঋতুপর্ণর সিনেমা যেমনভাবে প্রতি পদক্ষেপে মননশীল বাঙালীর বিশ্লেষণের বিষয় হয়েছে, ঋতুপর্ণ নিজে জীবদ্দশায় ততটা হতে পারেন নি। কারণ, বিশ্লেষণের প্রয়োজনটা কোথায়? ও তো একটা ‘ছক্কা’। ঋতু-আলোচনা সিনেমা ছেড়ে ব্যক্তিজীবনে ঢুকলেই প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে থাকত চোখ টিপে ব্যঙ্গের হাসি। ‘থাক থাক, ওর কথা আর বলতে হবে না’! এমন কী, সিনেমা যাদের কাছে অবসর বিনোদন নয়, তাদের অনেকের কাছেও ঋতুপর্ণ-র হাবভাব গর্হিত এবং বিরক্তিকর একটা বস্তু। ‘দেখলি, জয় ওর মায়ের সাথে শিশিরের অ্যাফেয়ারটা কী সুন্দরভাবে অ্যাক্সেপ্ট করল? মাকে কনসোল করার সিনটা এত্তো সুন্দর দেখিয়েছে না....’(প্রসঙ্গঃ উৎসব) – এই অবধি ঠিক আছে। কিন্তু সিনটা কে ‘দেখিয়েছে’ তার নাম উঠলেই ‘লোকটা বিশাল ট্যালেণ্টেড। কেন যে ছাই ওরকমভাবে থাকে’.... এই আলোচনা বোধ হয় এখনো চলে বেশ কিছু ইণ্টেলেকচুয়ালের মধ্যেও। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’র শো যখন নন্দনে বন্ধ হয়ে গেল, তখন নন্দন কর্তৃপক্ষ জানাল, মূল আপত্তি নাকি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। সিনেমা সেন্সরশিপের ছাড়পত্র পেয়ে গেলেও আর্ট সমঝদার (!) মুখ্যমন্ত্রীর মতে, কলকাতার দর্শকদের পক্ষে সমকামিতা দেখানোর মত উপযুক্ত বিষয় নয়। এমন নির্দেশ বাংলার ‘একদা’ মসনদ থেকে এলে সেই বাংলার মানুষ ঋতুপর্ণক সম্বন্ধে ‘মালটা হিজড়ে ছিল’ বলবে – এতে আর আশ্চর্যের কি আছে?
সবশেষে বলব, ব্যক্তি ঋতুপর্ণ আর চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণকে এক করে দেখতে চান? ইউটিউবে সার্চ করুন ‘মনে ঋতু’। তাঁর চলে যাওয়ার ঠিক পরদিন এবিপি আনন্দতে অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত আর দীপঙ্কর দে-র সাথে সাংবাদিক সুমনের আলোচনা। দেখুন ভিডিওটা। নিঃসঙ্গ, পঠন পাগল মানুষটাকে অনেক কাছ থেকে চিনতে পারবেন। আর সমকামীদের দেখলেই পাঁচ হাত ছিটকে যাওয়া বাতিকগ্রস্তদেরও শুনতে বলুন সেদিনের আলোচনাটা।



ভিডিও সৌজন্য- এবিপি আনন্দ

আপনার মতামত জানান