ঋতুরঙ্গ

কেয়া মুখোপাধ্যায়



১৯৯৪ তে মুক্তি পেল ১৯শে এপ্রিল। শহুরে-শিক্ষিত দর্শক তখন বাংলা ছবি দেখেন না! ছবির পরিচালকও অনামী। কিন্তু ছবিটা সবাইকে চমকে দিল। অসামান্য ডিটেলিং, ক্ষুরধার সংলাপ আর গোটা ছবি জুড়ে অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতা; পর্দায় দর্শকের চোখ চুম্বকের মতো টেনে রাখার অপ্রত্যাশিত ক্ষমতা। সৃজনশীলতার সঙ্গে প্রতি পরতে বাস্তব বুদ্ধির মিশেল। চারদিকে সেনসেশন। আবির্ভাবেই শ্রেষ্ঠ ছবির জাতীয় পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীরও। বাঙালি আবার হলমুখী হতে বাধ্য হল। তারপর একে একে দহন, অসুখ, বাড়িওয়ালি, তিতলি, শুভ মহরৎ, চোখের বালি, অন্তরমহল, দোসর...। সব মিলিয়ে যেন আশ্চর্য দ্যুতিময় এক ঝিনুক-মালা! ১৯৯২ থেকে ২০১৩ মধ্যে অতগুলি ছবি, পুরস্কার, দেশে-বিদেশে সম্মান, এক ডজন জাতীয় পুরস্কার।
ঋতুপর্ণ ঘোষ। সত্যজিৎ রায়-পরবর্তী প্রজন্মের উজ্জ্বলতম প্রতিভূদের অন্যতম। প্রায় এককভাবে বাংলা ছবিকে খাদ থেকে তুলে এনে আবারো সম্মানের স্থানে বসানোর পুরোধা, এই মুহূর্তে বাংলা ছবির যে রমরমা, তার দিশারী, সত্যজিৎ রায় এবং নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের মধ্যেকার অনিবার্য সেতু। তাই নিঃসন্দেহে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে ঋতুপর্ণ ঘোষের ভূমিকা ‘আইকনিক’।


হীরের আংটি ছবির একটি দৃশ্য

আসলে বাঙালির মনকে বড় ভাল বুঝতেন ঋতুপর্ণ; তা সে সিনেমা পরিচালনাই হোক, টিভিতে টক শো সংযোজনাই হোক, পত্রিকার সম্পাদনাই হোক বা জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিকের কাজই হোক! আর এই দর্শকের পালস বোঝাটায় সাহায্য করেছিল পূর্বসূরী সত্যজিৎ রায়ের মতই তাঁরও বিজ্ঞাপনী জগতের ব্যাকগ্রাউন্ড। দুর্দান্ত কপিরাইটার ছিলেন ঋতুপর্ণ। তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু নজরকাড়া বিজ্ঞাপনী স্লোগানগুলো আমার খুব প্রিয়। বোরোলীনের সেই ক্যাচলাইন- ‘জীবনের নানা ওঠা-পড়া যেন সহজে গায়ে না লাগে’ কি ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’ অথবা ব্রিটানিয়া বিস্কুটের ‘তোমার সকাল-আমার সকাল-সবার সকাল,’ কিংবা মার্গো সাবানের সেই অমোঘ সম্মোহন ‘দেখতে খারাপ, মাখতে ভাল’ আর অবশ্যই আনন্দবাজারের ‘পড়তে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়’- অনেক ভাবনা-চিন্তার ফসল, অথচ কি প্রাঞ্জল! আর সেইসঙ্গে কি অব্যর্থ তার প্রভাব আজও!
ছবির মূল লক্ষ্য যেসব দর্শক, সেই ‘টার্গেট অডিয়েন্স’-এর কাছে সহজে পৌঁছে যেতে পারার শিক্ষা তো বিজ্ঞাপন দুনিয়া থেকেই পাওয়া। ঋতুপর্ণের সিনেমা তৈরিতেও তাঁর বিজ্ঞাপনী প্রশিক্ষণের ছাপ থাকত সর্বত্র। ছোট-ছোট জিনিসে, ডিটেলিং-এ তীক্ষ্ণ নজর। শিল্প নির্দেশনায় অসম্ভব খুঁতখুঁতে মনোভাব। ঠিক যেখানে যেটা যেভাবে থাকা উচিত, থাকত সেভাবেই। সেইসঙ্গে অনেক অভিনেতাদেরও ভীষণ ভরসার জায়গা ছিলেন ঋতু। অনেকসময়েই শটগুলো অভিনয় করে দেখিয়ে দিতেন কোথায় তাকাতে হবে, কোথায় হাতটা রাখতে হবে, কী ভাবে শাড়ির আঁচলটা ধরতে হবে। ছোট ছোট সিচুয়েশন কি সুন্দর বিল্ড করতেন! ঋতুপর্ণর ছবির ভাষা একেবারে তাঁরই নিজস্ব। সমসাময়িকদের থেকে আলাদা। চলচ্চিত্রের ভাষায় ঋতুপর্ণ যেমন বিস্ফার ঘটিয়েছেন নানা সামাজিক সত্যের, তেমনি মানুষের মনের অতলে ডুব দিয়ে তুলে এনেছেন ব্যক্তিজীবনের নানা গহন আর প্রবল সত্য, খুলে দিয়েছেন অনেক অচেনা দরজা-জানলা। এত সুক্ষ্ম ডিটেলস-এ মেয়েদের গহন অনুভূতিকে পরম মমতায় চিত্রায়িত করতে সত্যজিত রায়ের পর আর কেউ পারেন নি। ঋতুপর্ণ দেখিয়ে গেছেন ভারি সুন্দর গল্প বলা যায় ক্যামেরা দিয়ে। চাইলে, কবিতাও।
তবে ঋতুপর্ণ কোনদিনই সফল হবার সহজ ফর্মুলা নিয়ে খুশি থাকার মানুষ ছিলেন না। বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, বদলেছেন তাঁর গতিপথ। একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘যে ছবিটা করতে গিয়ে আমার নতুন কিছু শেখা হবে না, জানা হবে না, কেবল আমার মধ্যে যে স্কিলটা আছে, সেটাকে দিয়েই আমি একটা ছবি করে ফেলব, সে ছবিটা আমি আর করব না।’ তাঁর ছবির বিষয়বস্তু আর ভাষা একটা বড় ধরণের বাঁক নিচ্ছিল শেষদিকে, বদল দেখা যাচ্ছিল সাজপোষাকেও।
সমাজের সঙ্গে এক অদ্ভুত সংঘাত ছিল ঋতুপর্ণের। আসলে সমাজ যখন কাউকে সহজ সমীকরণে মেলাতে পারে না, তাকে নিয়ে কৌতূহল তখন অসীম হয়ে ওঠে। সেই কৌতূহল ঋতুপর্ণের জীবন যাপন নিয়ে, তাঁর যৌনতা নিয়ে, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে। এই কৌতূহলের মধ্যে মিশে ছিল এক সামাজিক গোঁড়ামির শ্লেষ আর কৌতুকও। এর ফলে কি খানিকটা একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি? কিন্তু এতে তাঁর সৃষ্টিশীল মনটা থামেনি। তাঁর চলচ্চিত্রের মেধা বাধা পায়নি এতটুকু। উল্টে সেক্সুয়াল ইনক্লিনেশনের মত একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপারে সমাজের এই নাক গলানোকে ঋতুপর্ণ চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মানুষকে ‘অল্টারনেটিভ সেক্সুয়ালিটি’ সম্পর্কে সংবেদনশীল করতে চেয়েছিলেন তাঁর সিনেমার মাধ্যমে। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বা ‘মেমরিজ ইন মার্চ’-এর মতো ছবিতে অভিনয়, ‘চিত্রাঙ্গদা’য় পরিচালনা আর অভিনয় বোধহয় তারই সাক্ষ্য বহন করছিল।

"আরেকটি প্রেমের গল্প থেকে"

কী করে ভুলি গীতিকার ঋতুপর্ণকে? মৈথিলি, ব্রজভাষা আর অবধীতে অনায়াস দক্ষতা ছিল তাঁর। তাই ছবির প্রয়োজনে যখন বাংলা আর হিন্দী ব্যবহার করতে মন চায়নি, মৈথিলী কি ব্রজবুলিতে কলম ধরেছেন। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ‘পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান।’ আর ‘মেমরিজ ইন মার্চ’-এর মৃত্যুদৃশ্যে তাঁর লেখা ‘সখী হম মোহন অভিসারে যাঁউ’ যেন তার নিজের জীবনের এলিজি হয়ে উঠল শেষ পর্যন্ত!
শুধুই কি চলচ্চিত্রকার? কি অসাধারণ মায়াময় কলম ছিল তাঁর! কয়েকবছর ধরে ‘রোববার’-এ ঋতুপর্ণর কলাম ‘ফার্স্ট পার্সন’ যত পড়েছি, তত মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর লেখা পড়ে কি সাক্ষাৎকার দেখে বোঝা যেত তাঁর বৈদগ্ধ্য, তাঁর পড়াশোনার সুবিশাল পরিধিটা। রবীন্দ্রনাথ আর রামায়ণ ও মহাভারত ছিল ঋতুপর্ণর প্যাশন। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর সঙ্গে বসে তলিয়ে পড়তে শুরু করেছিলেন মহাভারত। উদ্দেশ্য, মহাভারত ভিত্তি করে একটা ছবি করা। সে ছবিটা আর পেলাম না! মাকে নিয়ে তাঁর লেখাগুলো আমাকে বড় প্রভাবিত করে। প্রথমে ভাবতাম, আমিও আমার মাকে তার কিছুদিন আগে হারিয়েছি বলেই বোধহয় এমন মনে হয়। পরে অনুভব করলাম, শুধু নিজের মা নয় তো; কোথায় যেন সব মায়েদের কথাই বলা আছে সেখানে! ‘পৃথিবীর দীর্ঘতম অনন্ত উড়াল পুলে মা’র যাত্রা শুরু হয়ে গেছে…। মা চলে গিয়ে দুটো জিনিস শিখিয়ে দিয়ে গেল। মা’রা আসলে অমর। আর মা ছাড়া বাবা’রা বড্ড অসহায়।’ এ তো মা-কে যাঁরা হারিয়েছেন, তাঁদের সবার কথা!
প্রস্থানেরও তো একটা প্রস্তুতি লাগে! কিন্তু কোন প্রস্তুতি ছাড়াই, জীবনের চিত্রনাট্যের শেষে একটা অসম্ভব বিষাদময় মোড় রেখে, বড় অকালে চলে গেছেন ঋতুপর্ণ। আত্মপরিচয়ের একটা সঙ্কট ছিল তাঁর জীবনে। সেই সঙ্কটের কাছে কখনো হেরে যাননি। কিন্তু নিজেকে খুঁজে পেতে বড় শ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-‘জেন্ডার আইডেন্টিটিটা কোন স্থায়ী চিহ্ন নয়। এটা নদীর মত প্রবহমান। সেই প্রবাহের মধ্যেই আমরা কখনো নারী, কখনো পুরুষ। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া চিহ্নে নারী পুরুষ শুধু একটা সামাজিক প্রত্যাশার নির্মাণ। আর কিছু নয়।’ চিত্রাঙ্গদা একজন পুরুষ। পুরুষ-জন্মে নারী হতে চেয়েছিলেন তিনি। কখনো তা দৃপ্ত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আবার কখনো গভীর প্রেমে। নারী আর পুরুষ বোধের এই অন্তরঙ্গ মিলনেই শেষ পর্যন্ত ঋতুপর্ণ একজন পূর্ণ মানুষ, যিনি নিজের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের গভীর ভালোবাসার উজ্জ্বল বৃত্তে চিরস্থায়ী গৌরবের আসন করে নিয়েছেন।


আপনার মতামত জানান