শ্বাপদের চোখ / অবিন সেন

শেষ পর্ব


লিলি ঠিক বলতে পারল না। তবে সে ফুটপাথে, রেল স্টেশনে হাত দ্যাখে। সে বিদ্যাধরের চেহারার বিবরণ দিলো। বিদ্যাধর যে কিছুক্ষণ আগেও সেখানে ছিল সেটা লিলি চেপে গেলো। লিলি বলতে পারল না। পারলনা বলে তার রাগ হল, রাগে তার বুকের ভিতরটা ধড় ফড় করছিল।
ঘর থেকে বের হবার সময় প্রবাল বলল
তুমি দেশী মদ খাও ? ঘরে ঢুকেই যেন দেশী মদের গন্ধ পেয়েছিলাম ?
লিলি এই কথার ও কোনো উত্তর দিলো না। সে মাথা নিচু করে থাকল।
লিলির ঘর থেকে বেরিয়ে
অর্ক বলল
বটব্যাল, আপনি এই নাম্বারটা আর বল্টুর নাম্বারটা ট্র্যাকিঙে দিন। বল্টুর ফোনটা তো পাওয়া যায়নি।
বটব্যাল মাথা নাড়ল।
কি বুঝছিস প্রবাল ?
প্রবাল কিছু বলল না। সে যেন কিছু ভাবছিল। বলল
খুনের মোটিভ কি ?Political, passion, love, sex…..কনটা? না সবকটাই ? লিলি দেখতে শুনতে ভালো। কথা বলে ভালো। মোটকথা আবেদনময়ী । বটব্যাল, তাই না ! প্রবাল রসিকতা করল। তার একাধিক এডমায়ার থাকতেই পারে।
বটব্যাল, পারে না? তদন্ত কি বলছে ?
গাড়িতে বটব্যাল সামনের সিটে বসেছিল। প্রবাল আর অর্ক পিছনে।
প্রবাল ঝুঁকে কথাটা বলল।
বটব্যাল বলল
না, স্যার সে রকম কোনো খবর নেই । এই এলাকায় আমার ইনফরমার খুব স্ট্রং। গত মাস ছয়েক ওরা স্বামী স্ত্রীর মতো থাকছিল। কিংবা রাক্ষস বিবাহ। সেও রসিকতা করল।
তা ভালো, সুখী দম্পতী ?
ঠিক তাই স্যার।
অর্থাৎ, বিবাহিত জীবনের স্বাদ, রাখেনি কোথাও কোনো খাদ । প্রবাল মুচকি হাসল। অর্ক, কাল তাহলে চালাও পানসী রতনপুর।
হুম! রতনপুর থানায় তা হলে একটা খবর দিয়ে দিতে বলি।
প্রবাল আবার বলল
বটব্যাল, বল্টুর criminal history কি ?
খারাপ কিছু নেই স্যার। দাগি অপরাধী নয়। তবে আজ একটা খবর পেলাম স্যার, বিকেলে। বল্টুর এন্টি পার্টির সনাতন হাজরা গত দু তিন দিন লা-পাতা। ওটা একেবারে দাগি আসামী। দু তিনটে খুনের মামলায় ঝুলছে। মাস খানেক বেলে ছাড়া পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গায়েব হয়ে গেলো কেন বোঝা যাচ্ছে না।
অর্ক তাকে সন্ধান লাগাতে বলল। আর বল্টুর godfather বিকাশ সামন্ত কেও একটু বাজিয়ে দেখতে বলল। যদি কোনো সূত্র পাওয়া যায়!
রতনপুর একেবারে গ্রাম গঞ্জ নয়, মফস্বল বলা চলে। চারিদিকে আধুনিক দোকানপাট, খাবার দোকান, দু একটা বার ও চোখে পড়ে। রেল স্টেশন থেকে থানাটা দূরে, বাজারের মধ্যে।
থানার ওসি খবর পেয়ে বদ্যি, পঞ্চায়েত মেম্বর হাটুই ও আরো কয়েকজন উইটনেসকে থানায় ডাকিয়ে রেখেছিল।
অর্ক প্রথমে তদন্তের ফাইলটা দেখতে চাইল। দেখল তদন্ত বিশেষ কিছুই হয়নি। সে একটু বিরক্ত হল।
অর্ক ফাইলটা প্রবালকে দিল। বলল, ওসিকে লক্ষকরে
যে, বডি প্রথম আবিষ্কার করে তাকে ডেকে পাঠান।
বদ্যি ঘরে ঢুকতে তাকে একটা টুলে বসতে দেওয়া হল। রোগা সিরিঙ্গে চেহারা। মাথায় কদম-ছাট চুল। চোখগুলো কোটরগত । নাকটা খাড়া। নাকের ডগায় ঝুলন্ত চশমা। তার পুরো নাম বদ্যি ঘোষ। জাতে গোয়ালা। সে আর তার এক বিধবা পিসি ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই। বদ্যির বাপ পাড়ায় কবিরাজি করত। বদ্যি ও তাই করে। গাছ। গাছড়া, লতা পাতা দিয়ে জড়ি বুটি। তাতে যে রোজগারপাতি বিশেষ হয়, তা না। আসলে সে ন্যালাখ্যাপা। কথা বলতে বলতে হাত পা টেড়িয়ে যায়। লোকে বলে তার মাথায় ছিট আছে। তাই নামই তার হয়ে গেছে বদ্যি খ্যাপা। মাঝে মাঝে সে কোথাও উধাও হয়ে যায়। দু তিন দিন তার কোনো পাত্তা পাওয়া যায় না। সে কোথায় যায় তা কেউ জানে না। ছেলে ছোকরারা কানা ঘুষো করে, বদ্যির দু পয়সা রোজগার হলেই সে শহরে মাগি বাড়ি যায়। বদ্যি কে সে কোথা বললে সে কখনো রেগে যায়, কখনো মুখ খিস্তি করে, অশ্লীল অঙ্গ ভঙ্গি করে।
বদ্যি টুলে বসে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল, ছট ফট করছিল। তার তাকানো যেন স্বাভাবিক নয়। অর্ক তাকে মৃদু ধমক দিল
স্থির হয়ে বসুন। লাশ কি ভাবে দেখতে পেলেন ?
বদ্যি খানিক আমতা আমতা করল। তার পর বলল
তখন ট্রেন যাচ্ছিল। আমি ভেংচি দিচ্ছিলুম ট্রেন কে। তখন কে যেন পিছন থেকে বলল ভেংচি দিতে নেই। কে বলল, পিছন ফিরে দেখতে গিয়েই দেখি পিছনটা ফক্কা। আমার খুব ভুতের ভয় বাবু, তার ওপর আবার বেড়াল রাস্তা কাটল। কালো বেড়াল। আমি তখন ভয় পেয়ে রেল লাইন থেকে বনের দিকে নেমে পড়লুম। বনে ঢুকতেই দেখলুম বুড়ো বট গাছ থেকে কে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে।
অর্ক র খুব হাসি পাচ্ছিল। আবার রাগ ও। এ কাকে ধরে এনেছে! এ দেবে সাক্ষী ! অর্ক তাকে চলে যাবার জন্যে ইশারা করলে, প্রবাল তাকে থামতে বলল। প্রবাল বলল
বদ্যি, বনে ভুত নেই কেন ?
আমি তো বনে যাই, রোজ। লতা পাতা আনতে। ভুত থাকলে তো দেখতে পেতুম।
সে ওসিকে বলল
চলুন আগে স্পটটা দেখে আসি। এতো দিন পরে আর কি পাওয়া যাবে জানি না!
তারা বদ্যি কেও সঙ্গে নিলো।
সেই বুড় বট গাছের কাছে গিয়ে দেখল, দিনের বেলাতেই সেখানটা অন্ধকার অন্ধকার। এবং ততোধিক নির্জন। প্রবাল চারপাশের ঝোপ ঝাড় তন্ন তন্ন করে খুঁজছিল। কিছু একটা যদি পাওয়া যায়। যেন খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথর। তার খোঁজা বৃথা গেলো না। কিছু দূরে একটা ঝোপে সে একপাটি জুত আবিষ্কার করল। বল্টু দাশের লাশের পায়ে কোনো জুতো ছিল না। এটা কি তার হতে পারে? সে অর্ক কে বলল
অর্ক, জুতোর ছবি এখুনি MMS করে দে। আমি এখুনি confirmation চাই।
অর্ক, বটব্যাল কে ছবির MMS করল, আর বলল লিলির বর্ণনা শুনে বিদ্যাধরের যে স্কেচ আঁকানো হবার কথা সেটাও পাঠাতে বলল।
প্রবাল দেখল যেখানে জুতোটা পাওয়া গেছে সেখান থেকে একটা আবছা পায়ে চলা পথ চলে গেছে। প্রবাল সেই দিকে চলল। সঙ্গে ওসি। ওসি বলছিল
এটা ছিল এখানকার আদি জমিদার বাড়ি। পোড়ো বাড়ির চারপাশে বছরের পর বছর গাছপালা বেড়ে বেড়ে জঙ্গল হয়ে উঠেছে।
তারা গিয়ে একটা পরিষ্কার মতো জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। সেখানটা বোধ হয় জমিদার বাড়ির সিংহ দরজা ছিল। দরজা আর নেই। মাথায় কেবল একটু ছাউনি অবশিষ্ট আছে।
প্রবাল বলল
মি. মল্লিক, এখানটা এমন পরিষ্কার কেন ? লোকজনের আসা যাওয়া আছে ?
ইদানিং political antisocial দের আড্ডা হয়েছে এই পোড়ো বাড়িটা। একবার রেড করে কিছু বোমা পাওয়া যায়। সে সহসা বলল—মাস ছয়েক আগে এখানে একটা লাশ পাওয়া গেছিল। এমনি বেওয়ারিশ লাশ। তাকে বেশ উত্তেজিত লাগছিল। ঠিক এই ভাবেই গলায় ছুরি মেরে খুন।
প্রবালের চোখ চক চক করে উঠল। বলল
তদন্ত হয়নি?
মল্লিক মাথা নিচু করল। আমতা আমতা করল। বেওয়ারিশ লাশ কোনো খোঁজ খবর করেনি কেউ। তাই কদিন পরেই সব ধামা চাপা পড়ে গেছে। আমরা ভাবলাম একটা antisocial কমল।
প্রবাল কিছু বলতে গেলো, তখনি তার কাছে অর্কর ফোন এলো। অর্ক বলল,জুতোটা বল্টুর। আর একটা খারাপ খবর দিল। বিদ্যাধরের ছবি আঁকানো যাইনি। সকালে যখন পুলিশের লোক লিলিকে ছবি আঁকানোর জন্য লিলির ঘরে যায় তখন তারা দেখে লিলি মরে পড়ে আছে। একই ভাবে গলায় সরু ছুরি মেরে খুন। বটব্যাল তদন্ত করছে, বিস্তারিত পরে জানাবে।
খবরটা শুনে প্রবালের ভীষণ রাগ হল। নিজের উপর। কি বুদ্ধু সে। লিলি কে unprotected রাখা একে বারেই উচিত হয়নি। খুনি তাদের উপর চোখ রেখেছে, অথচ তারা .....ছিঃ, তার নিজের উপরেই ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করল।
প্রবাল বলল
মল্লিক, আপনার রাগ হয় না, যখন একটা নরকের কীট একের পর এক মানুষ মেরে যায় আর আমরা কিচ্ছু করতে পারি না!
হয়, স্যার। খুব রাগ হয়।
কিন্তু মাথা খাটাতে হবে বস। মাথা খাটাতে হবে।
সে আবার চারপাশটা খোঁজা শুরু করল। এক জায়গায় কয়েকটা আধ পোড়া ধুপের কাঠি, আর একটা কাগজের টুকরো খুঁজে পেল।আর কয়েকটা পোড়া পলিথিনির টুকরো। দেখে মনে হল কাগজের টুকরোটা কোনো জন্ম কুণ্ডলীর টুকরো হতে পারে। সে নিজের মনে ঘাড় নাড়ল। বলল
মল্লিক, এখানে যদি খুনটা করা হয়ে থাকে তা হলে রক্তের ছিটে পড়ে থাকার কথা। তাই না ? কিন্তু কোথাও কোনো দাগ নেই ?
হয়ত এতো দিন পরে দাগ মুছে গেছে, শিশিরে।
প্রবাল আবার মাথা নাড়ল। রক্তের দাগ এতো সহজে মোছে না বন্ধু।
সে আবার বলল
এখানে বিদ্যাধর নামে কাউকে চেনেন, হাত দেখে, কুণ্ডলী বানায় ?
না, নামটা চেনা মনে হচ্ছে না, দু একজন বাবাজী দোকানে বসে, হাত দেখে, তাদের মধ্যে কেউ আছে কিনা ওই নামে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।
না, এ বাবা, দোকানে বসে না, ফুটপাথে বসে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন। এখানেও আমার মনে হচ্ছে বিদ্যাধরের উপস্থিতি টের পাচ্ছি। চলুন গাড়ীর কাছে ফিরে যাওয়া যাক।
অর্ক তখন একটা সিগারেট টানছিল। প্রবালকে দেখে বলল
কি বুঝছিস ?
প্রবাল মাথা দোলাল
আমি এখন অনুমানের উপর ভিত্তি করে এগোচ্ছি। যেমন করে অঙ্ক কশা হয়। বিদ্যাধরের একটা সুত্র পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এবং লিলির খুনের পরে যেটা বলা যায় বিদ্যাধরই সবথেকে বেশি লাভবান হল, লিলি মারা যেতে। সুতরাং জ্যামিতিতে যেমন করে উপপাদ্য প্রমাণ করা হয় সেই ভাবে ধরে নেব বিদ্যাধর আর খুনি(ধরা যাক X) এক ব্যক্তি নয়। এবার এটা যদি মিথ্যা হয় তা হলে সত্যটা হল বিদ্যাধর( ধরা যাক A) আর X একই লোক। অর্থাৎ A আর X যদি ভিন্ন লোক না হন তবে তারা নিশ্চিত ভাবে এক লোক।
অর্ক হাসল। নির্ঘাত প্রবালের মাথা গেছে ।
বদ্যি গাড়িতে বসে ছিল। বসে বসে কি একটা চিবচ্ছিল।
প্রবাল গাড়িতে উঠেই একটা গন্ধ পেল। গন্ধটা যেন চেনা চেনা। সে পিছন ফিরে একবার তাকাল, কিছু বলল না।
থানায় পৌঁছে প্রবাল সবাইকে ছেড়ে দিতে বলল। সবাই চলে গেলে সে বলল
অর্ক, জনম কুণ্ডলীতে যে ফোন নম্বরটা পাওয়া গেছে সেটার শেষ টাওয়ার লকেশান জানা গেলো ?
হাঁ, কথাটা আমাদের পক্ষে খুব সকিং। ঠিক যে সময়ে লিলির ওখানে গিয়েছিলাম ঠিক সেই সময় ফোনের পজিশন ওখানেই ছিল। আর তার পর পরেই সুইচ অফ হয়ে যায়।
আচ্ছা, আচ্ছা, প্রবালের মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়।
অর্ক আবার বলল
লিলিকে খুনের মোটিফ ও পাওয়া যাচ্ছে। love/sex। খুন করার পরে লিলির কপালে সিঁদুর লেপে দিয়ে গেছে। আর খুন টা হয়েছে আমরা ওখান থেকে চলে আসার পরেই।
প্রবাল বলল, আমরা একটু সতর্ক হলেই লিলি খুন হত না। লিলির ঘরে আর একটা ঘরের দরজা ছিল, আমাদের সেই ঘরটা একবার দেখা উচিত ছিল।
হুম, সেই ঘরে একটা কাচের গ্লাসে হাতের ছাপ পাওয়া গেছে।
গ্রেট ! প্রবাল বলল।
অর্ক, এবার দুটো জিনিস খুঁজে বার করতে হবে একটা লম্বা পলিথিনের সিট, সঙ্গে নাইলন দড়ি। বটব্যাল কে বলে দে কালীঘাট চত্বরে লিলির বাড়ির আসে পাশে কোনো দোকান থেকে কেনা হয়েছে কিনা ! মিঃ মল্লিক আপনিও এই এলাকায় খোঁজ করতে পাঠান, কোনো দোকান থেকে কেনা হয়েছে কি না। বিকেলেই যাতে খবর পাই ।
দুপুরে তারা একটা গেস্ট হাউসে বিশ্রাম করছিল। অর্ক কথা বলল
বিদ্যাধরকে কি ভাবে পাওয়া যাবে, কিছু ভেবেছিস ?
দ্যাখ, আগে খুনির বৈশিষ্ট্য গুলো এক এক করে সাজাই। প্রথমে ধরে নিই খুনি আর বিদ্যাধর এক লোক নয়—ছয় মাস আগে এখানে ঠিক এমনি একটা খুন হয়, ঠিক যেমন ভাবে বল্টু দাশ খুন হয়। সেই খুনের কোনো কিনারা হয়নি। বিদ্যাধরের সঙ্গে সেই খুনের কি সম্পর্ক? বিদ্যাধরের আনাগোনা কালীঘাট চত্বরে। দু-নম্বর অমিল—বল্টু কে যদি খুন করে বিদ্যাধর তা হলে এতো দূরে রতনপুরে আসার কি দরকার ? কলকাতাতেই করতে পারতো। যেমন লিলি কে করা হল। কারণ এখানে বিদ্যাধর বা ওই জাতীও কোনো বাবাজীর হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।
এবার ধরা যাক বিদ্যাধর(A) খুনি, তা হলে সে বল্টুর সঙ্গে যখন লিলিকে দেখে তখন লিলির আবেদন তাকে আকৃষ্ট করে। সে দেখল বল্টু থাকলে কখনই লিলি কে সে পাবে না, লিলি যতই পতিতা হোক না কেন, কারণ লিলি বিদ্যাধরকে পছন্দ করে(করত) না।
তার কথার মাঝ খানে অর্ক কথা বলল
প্রবাল তোকে আজ গনিতে পেয়েছে।
আরে, সব তদন্ত মানেই গণিত আর জ্যামিতি। এবার সেই প্রমাণটা ধরা যাক
For equiangular triangles, the sides about the equal angles are proportional and those (sides) subtending equal angles correspond.
ধরা যাক ত্রিভুজ ABC (বিদ্যাধর) আর ত্রিভুজ XYZ (খুনি) এর কোনগুলি সমান। তা হলে প্রমাণ করতে হবে বিপরীত বাহুগুলি সর্বসম। এবার প্রমাণ করা হবে বাহু গুলি যদি অসমান না হয়, তবে তারা নিশ্চয়ই সমান।
প্রবাল যখন বক বক করছিল, তখনি ওসি মল্লিক এসে হাজির হলেন—
অর্ক, বলল খবর আছে ?
বল্টু খুনের আগের দিন এক সাধুবাবা পলিথিনের সিট আর দড়ি কিনেছিল। যশোদা ভাণ্ডার থেকে ।
দোকানদার আগে কখনো দেখেছে তাকে ?
না, আগে দেখেনি। তবে আজ সাধুবাবা আবার দোকানে এসেছিল কিছুক্ষণ আগে। বলে গেছে সন্ধ্যার সময় তিনি পুরানো জমিদার বাড়ির গেটের সামনে থাকবেন, হাত দেখবেন। তিনি একটা মাথা ধরার ওষুধ ও দিয়ে গেছেন।
প্রবাল সহসা উত্তেজিত হয়ে উঠল। কুইক, এখুনি জমিদার বাড়ি চলুন।
তারা চুপি চুপি গা ঢাকা দিয়ে যখন জমিদার বাড়ির কাছে গিয়ে হাজির হল ততক্ষণে সন্ধা হয়ে গেছে। চার দিকে নিবিড় অন্ধকার। যে যার position নিয়ে তারা দাঁড়াল। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। শুধু তারা শব্দের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিল। কোনো মানুষের শব্দ। ঠিক প্রবালের পিছনেই কি একটা পাখি ডেকে উঠল। তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তখনি সাইকেল প্যাডেল এর শব্দ শুনতে পেল তারা। সাইকেলটা ঠিক জমিদার বাড়ির বড় দরজার কাছে থামল। কিছু দেখা যাচ্ছিল না ভালো। শুধু হালকা ছায়া যেন নড়ছে ছড়ছে। তার পর ধপ করে একটা শব্দ। মনে হল মাটিতে ভারি কিছু পড়ল। সাইকেল stand করার ক্যাচ করে শব্দ হল। সেই শব্দ থামতেই একটা মৃদু টর্চ জ্বলে উঠল। তখনি প্রবাল একটা সিস দিল আর সঙ্গে সঙ্গেই চার পাশ থেকে সাতটা টর্চ জ্বলে উঠল।
অর্ক, তার রিভলভার তাক করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল
এক পা নড়লেই মৃত্যু।
যাত্রা দলের অভিনেতাদের মতো ঝাঁকড়া পরচুল। কপালে সিঁদুর। বিদ্যাধর বাবার চোখদুটি শ্বাপদের মতো জ্বলছিল, নাকের ডগার ঝুলন্ত চশমার ভিতর দিয়ে। সে দ্রুত কি একটা বার করতে গেলো। কিন্তু পারল না, মল্লিক এর বজ্রমুঠি তার মুখের উপর আছড়ে পড়ল। তার চোখের থেকে চশমা খুলে পড়ল।
প্রবাল তার মুখের সামনে গিয়ে বলল-
কি বাবা বিদ্যাধর ? সে আবার সেই ধেনো মদের মতো গন্ধটা পেল। তার পর টান মেরে তার পরচুল আর দাড়ি খুলে নিলো। বিদ্যাধর না বদ্যি ? সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল ।
বদ্যি কে দেখে সকলে অবাক ।
অর্ক বলল
সে কি ? বিদ্যাধরই বদ্যি ?
যে ভারি জিনিশটা বদ্যি বহে এনেছিল সেটা দোকানদার নরহরি দত্ত। জীবিত তবে অজ্ঞান হয়ে আছে।
প্রবাল বলল—
বলেছিলাম না, ত্রিভুজ দুটি যদি অসমান না হয় তবে তারা সমান অবশই। আর তাদের বিপরীত বাহু গুলিও সর্বসম।
যে গন্ধটা লিলির ঘরে ঢুকেই পেয়েছিলাম। সেই গন্ধই বদ্যির মখে পেলাম এখানে। অবিকল এক। আর আমরা যে পলিথিন বিক্রেতা কে খুজছিলাম, তখন আমাদের সঙ্গে বাইরের লোক এক জনই ছিল। সে বদ্যি।
তা হলে উপপাদ্য প্রমাণ হয়ে গেলো।
প্রবাল একটু হাসল।
পরে দেখা গিয়েছিল, অদ্ভুত গন্ধ যুক্ত বদ্যি যেটা খেত সেটা এক ধরনের নেশার ড্রাগ যেটা সে বিভিন্ন গাছ গাছড়ার রস ছাল, শিকড় মিশিয়ে বানিয়েছিল। এটা ছিল তার নিজের আবিষ্কার। এই নেশার জিনিশ দিয়েই সে অন্য কে কাবু করত। বল্টু কে সে এভাবেই বশ করেছিল। বদ্যির মধ্যে একটা split personality কাজ করত। যখন সে বদ্যি, তখন সে ন্যালা খ্যাপা। আর যখন সে বিদ্যাধর তখন তার ভিতরকার শ্বাপদ বারিয়ে আসত। তার ভিতরকার অবদমিত কাম, লালসা জেগে উঠত। খুন করে সে আনন্দ পেত। কলকাতার অন্য এক বেশ্যা পল্লির আর একটি মেয়েকে সে এ ভাবেই খুন করে ছিল। পতিতা দের প্রতি তার ছিল অদ্ভুত ঘৃণা। প্রবাল, অর্করা যখন লিলির ঘরে ছিল তখন বিদ্যাধর পাশের ঘর থেকে সব কথা শুনছিল। তার পর পুলিশ চলে যেতে সে লিলি কে খুন করে। কারণ বিদ্যাধর হিশাবে সে ছিল অসম্ভব ধূর্ত। তার ধরা পড়ে যাবার ভয় ছিল। জেরায় সে বলেছে লিলিকে সে ঘৃণায় খুন করে। তাই যদি হবে তবে সে লিলির কপালে সিঁদুর লেপেছিল কেন? সে উত্তর বিদ্যাধর দ্যায়নি।
প্রবাল বলেছিল
বিদ্যাধর তার লালসার কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছিল। ঘৃণা তার বানানো কথা। প্রবাল পরে বলেছিল
অর্ক, লিলির মতো এক পতিতা বল্টু কে আঁকড়ে ধরে সমাজের মুল স্রোতে ফিরে আসতে চাইছিল, কিন্তু শ্বাপদের চোখ তা হতে দিল না। হয়ত পরকালে তারা আবার মিলিত হবে।
(সমাপ্ত)

আপনার মতামত জানান