অলক্তকের দাগ ও বৈশাখী রোদ্দুর

শ্রেয়স সরকার

আমি ঋতুপর্ণ ঘোষ সম্পর্কে লোকসমক্ষে কোনোদিন কিছুই বলতে চাই নি।কারণ সে আমার অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়। ভেবেছিলাম যা লিখেছি , তা শুধু আমার, আর কারো নয়।এক সান্ধ্য আড্ডায় এর কিছু অংশ পড়তেই, আমার ঘনিষ্ঠ রা বললেন এ তোমাকে প্রকাশ করতে হবেই।তাই আমার এক বিশেষ দিনের রোজনামচার কিছু অংশ, বন্ধুদের একান্ত অনুরোধে এখানে তুলে ধরলাম।

গৌরচন্দ্রিকা:
[ তোমার সঙ্গে পরিচয় অনেকদিনের। সেই ' উনিশে এপ্রিল' এর পারশে পাবদার সর্ষে ঝাল আর ঝিরিঝিরি আলুভাজার সুগন্ধ থেকে। সবাই বলে সে ছবির ক্ষমতা অনেক , কিন্তু কেউ বলেন না, সেই একটি দৃশ্যই আমার বিশ্বের সমস্ত খিদে মিটিয়ে দিতে পারে। কিংবা ধরা যাক 'আবহমানের' লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা , 'দহনের' সাবু-বার্লি , ' হীরের আংটির ' সরু চালের ভাত ,'দোসরের' জল ও গলা ভাত , 'উত্সব' এর লুচি - আলুরদম, ' সব চরিত্র কাল্পনিক' এর পান্তুয়া , 'চোখের বালি' ও 'অন্তরমহলের' প্রসাদ, 'খেলা' র কষা মাংস, 'বাড়িওয়ালি'র ইলিশমাছ্, 'শুভ মহরত ' এর সন্দেশ, 'নৌকাডুবির 'আপেল, 'তিতলির' চা, 'The Last Lear' ও ' Raincoat' এর পরোটা। এ সমস্তটা আসতে আসতে আমাকে গ্রাস করবে, যদি না মুক্তধারা হয়ে, সরস হয়ে সরস্বতীর আরাধনা করতে করতে সে আপন গতিপথ বদলে চলে যায়।]

…রোদ্দুর বলেছিল তোমায় আমি অন্ধকার থেকে টেনে বার করে বৃষ্টির মধ্যে, আলো দেখাব। আমি তো ভোম্বল হয়ে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। তুমি একটু হাসলে। তোমার 'খেলা' র অভিরূপ তোমাকে টানছে ক্রিকেট খেলবে বলে। শীতের মিষ্টি রোদ্দুর্। রাজা ও শীলা ভৌমিকের রোদ্দুর্। তুমি নিজেকে ভেঙ্গে দু খণ্ড হলে। একদিকে রাজা বলল , আমায় মুক্তি দাও, সদগতি হোক আমার্। অন্যদিকে শীলা ধমকে ওঠে, আমার স্বামীর সদগতি হলে, তোমার মৃত্যু আগে। এই টানাপোড়েনে না হল সদগতি, না তোমার ইচ্ছার দমন।প্রজাপতিরা খেলা করতে লাগল, কাচের বোতলে। অভিরূপ বলেছিল না , হোমওয়ার্ক করতে শেখো, কতদিন আর ছবি করে দেবে?
ছবিও কিছুদিন বেঁকে বসল। সে কি অভিমান।
অগত্যা কান্নার বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বর্ষাতি চাপালে। তোমার ভেতরে 'মনু ' উথাল - পাথাল করে অনুনয়-বিনয় করে বললে, ' আমি যে ভিজে যাচ্ছি!' বর্ষাতির বড় ভাগটা দিলে মনুকে, নায়িকা পেল বাকি অংশ, আর তলানিটা পেল মনুর বন্ধুপত্নী। তোমার লেখা গানের ট্রেনে করে যেতে যেতে মনুর বন্ধু বলেছিল, " তুই পাল্টালি না!"
বৃষ্টি থামল বটে, কিন্তু মেঘের মুখ আঁধার। পাহাড়ের কোলে পথ-হারানো তিতলি বলল, কই বলবে না আমার কথা? আমি অবাক হয়ে দেখলাম আষাঢ়ের প্রথম দিনে দার্জিলিংয়ের চায়ের কাপে, অল্প চিনি দিয়ে কড়া চা বানালে। Sandwich গুলো পড়ে রইলো গাড়িতে, নিয়ে আসবে নাকি? Filmstar হেসে বলল, " এখনো এতটা মনে আছে? " জনৈকা এক চা - বাগানের মেমসাহেব আর তার সপ্তদশবর্ষীয়া কন্যা তিতলি বলল, হ্যাঁ আছে।
তোমার যে মনে আছে, সেই কথাটা জানতেই, 'উত্সব' হল বাড়িতে। বাড়ির ছোট্ট মেয়েরা, ঘর-ঘর খেলা থামিয়ে, পুজোর কাজে হাত লাগাচ্ছে, তারপর তোমাকে বলছে, কই, দাও আমাদের স্বাতন্ত্র্য? তুমি তখন আপন মনে গড়ে যাচ্ছো উত্সবের মূর্তি! তাকে ভালো করে ফুলচন্দন দিয়ে পুজো করে , বাড়ির সবচেয়ে ছোট, অভাগা মেয়ের কপালে সিদুঁর পরিয়ে, পায়ে আলতা দিয়ে, তাকে বললে ' যা! তোকে মুক্তি দিলাম!' আর সে ছুটে গিয়ে মার কাছে গিয়ে বলছে,' মা, ও একটা আঁকার স্কুল খুলবে বলছে! আমরা এখানেই থাকব, আর উত্সবের vcd টা দেখব।" মা, মেয়ে আহ্লাদে আটখানা। তুমি দূরে দাঁড়িয়ে হাসছিলে, উত্সব পিঠ চাপড়ে বলল, " সাবাস্! " অলক্তকের দাগ মুছে যাচ্ছে আসতে আসতে, আর চাবির গোছা কাঁধে ফেলে, দুগ্গা ঠাকুর হেসে বললেন, ' আসি রে পরে আবার দেখা হবে।"
দেখা হল চরিত্রগুলো কাল্পনিক করতে গিয়ে। রাধিকা মিত্র তাঁর, জামশেদপুরি বাংলা এবং চমৎকার ইংরেজি বুলি মুখে নিয়ে এক খানি সুতির শাড়ি পরে, যখন কাজল পরা বিশালাক্ষী দিয়ে দেখছিলেন দরজার ফাঁকে, তখন মহালয়ার সকল বেদনা একত্রীভূত হয়ে বাজচ্ছে বীরেন্দ্রকিশোর ভদ্রের অপরূপ কন্ঠে।
সেই কন্ঠই বোধহয়, মুখর হয়ে বলল," কি পারবে তুমি? শুধু কবিতা লিখতে? "
ইন্দ্রনীল মিত্র তো তাই পারে। তেমন করেই তো গড়েছো তুমি ওকে! ছেড়ে যাওয়ার বেদনাটুকু সে জানে না, জানে পরিব্যাপ্ত সমস্তটা। তোমারই মত।
তাই ব্যাকুল হয়ে দিকশুন্যপুরের বাতাসে ভাসে, এক মরমি ডাক, " ট্যাক্সি টা ছেড়ো না, ট্যাক্সি তে আমার স্ত্রী আছে! "
তুমি খানিকটা হাসলে, আর ট্যাক্সির স্টার্ট টা দিলে বন্ধ করে।রাধিকা মিত্র lift এ আটকে গেলেন।
দরজাটা বোধহয় কেউ সাহস করে খুলতে পারল না, শেখর ও না। তুমি এমন করে এঁটে দিলে।
" ... I saw a big মাকড়শা, right in front of me. "
সে তো ছিলই। শেখর জানতে পারেনি। তুমি জানতে দাওনি। তাই আরশীনগরের কালো ঢাকাই শাড়ি পরা কাজরীর তোমার সঙ্গে কাপড় ভাঁজ করতে কোনো অসুবিধে হয়নি। সে তখন রাই কে গল্প বলছে, তাঁরই কবিতার ভাষায়- সেই পাগল লোকটার গল্প,যে অলকানন্দার জঙ্গলে কবিতা খুঁজতে গিয়েছিল, "লিপি আঁকা-বাঁকা, লিপি চিত্রিত।" সত্যি তো। নদীটা এঁকে-বেঁকে কোথায় গেল, তা দেখতে, পাগল ও কবি মানুষদের সঙ্গে অনেকদূর গেলে, অর্ধেক মৃত্যু লিখে, সেতুর ওপারে। দূর থেকে উলুধ্বনি শোনা যাচ্ছে। রাইকিশোরীর বিয়ে।
ঠিক তখন, জনৈকা এক 'বাড়িওয়ালি'র ও 'ফুল-মধুমাসে বিয়া'। তোমার কাছে নিমন্ত্রণপত্র ও এল। কিন্তু বিয়েটা হল না। প্রসন্ন বলেছিল, অভিশপ্ত বংশ তো। কাজের মেয়ে মালতী এসে শুনিয়ে গেল, " বসবার ঘরে জলখাবার দেওয়া হয়েছে, দিদি খেয়ে নিতে বলছে।"
বাড়িওয়ালি বনলতা রান্না করেছিলেন জম্পেশ। পরিচালক, তার সহ পরিচালক দুজনে আলাদা আলাদা করে খেলেন চেটেপুটে।নায়িকা সুদেষ্ণার গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত তুলিয়ে দিয়ে
তাকে বললে, গেয়ে ওঠ, তারপর খাবার পাবি। স্বপ্নিল আবেশের নকশিকাঁথা বুনে তুমি ঘুম পাড়ালে বনলতাকে।
ঘুমের মধ্যে সে অনেকগুলো ডাক দেখতে পেল--'দহন 'র রমিতার আর্তি , 'দোসর' র কাবেরীর দুখের মাধুরী, ' বিনোদিনীর বুকের ক্ষত, অন্তরমহলের বড়বৌ এর যাজ্ঞসেনী তেজ; সমস্ত ঘুরপাক খেতে খেতে, একেকটি স্বতন্ত্র স্বপ্ন হয়ে একেকটি আনুভূতিক স্তরে ঘোরাফেরা করতে লাগল। বনলতা জেগে উঠলেন: ঘাম দিচ্ছে, তুমি মুছিয়ে দিলে। মালতী এসে বলল, " চল, সিনেমাটা দেখে আসি, ও রিকশা ডেকে এনেছে।"
ছবিটি অসমাপ্ত রয়ে গেল।
ভরা পান্ডিত্যের পুকুর-পাড়ে দাঁড়িয়ে, নিজের অপরূপ প্রতিবিম্বিত অবয়ব দেখতে দেখতে, 'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় ' এমন দৃষ্টি মেলে, এক বাউল কন্ঠ যেন খুব দূর থেকে গেয়ে ওঠে -
" খ্যাপা, তুই আছিস আপন খেয়াল ধরে।
যে আসে তোরই পাশে, সবাই হাসে দেখে তোরে।।
জগতে যে যার আছে আপন কাজে দিবানিশি।
তারা পায় না বুঝে তুই কি খুঁজে ক্ষেপে -বেড়াস জনম ভরে।।
তোর নাই অবসর, নাইকো দোসর ভবের মাঝে।
তোরে চিনিতে যে চাই, সময় না পাই নানান কাজে।
আমরা লাভের কাজে হাটের মাঝে ডাকি তোরে!
তুই কি সৃষ্টিছাড়া, নাইকো সাড়া, রয়েছিস কোন নেশার ঘোরে ?
এ জগত আপন মতে আপন পথে চলে যাবে -
বসে তুই, আর-এক কোণে নিজের মনে নিজের ভাবে।।
খ্যাপা, তুই আছিস আপন খেয়াল ধরে..."
গানটির অন্তর্নিহিত বেদনা অকস্মাৎ ই সমস্ত জগতটাকে বিড়ম্বিত করে তোলে।

আপনার মতামত জানান