হাইওয়ে/জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

প্রথম পর্ব

ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়িটা। বিকেল থেকেই মেঘ ছিল, এখন অল্প অল্প বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে তার সাথে। অন্ধকার রাতে রাস্তার দু’পাশে জনবিহীন অঞ্চলে বহু-দূর পর্যন্ত হেড লাইটের আলোয় ঝলসে উঠছে। দু’পাশের গাছপালা দেখে বোঝা যায় হাওয়ার বেগও প্রবল, ঝড় উঠেছে। তবে প্রকৃতির সব চোখ-রাঙানি একরকম উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলেছে গাড়িটা। ওভার-নাইট ড্রাইভ করলে কাল ভোরবেলা হয়ত পৌঁছে যাবে গন্তব্যে। সেই গন্তব্যের কথা ভেবেই হয়ত নিরুদ্বেগ দৃষ্টিতে স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে পার্থ। বাতানুকূল গাড়ির ভেতর বাইরের প্রাকৃতিক রোষ প্রবেশ করে না। আর আজকাল মানুষের মনও বাতানুকূল হয়ে গেছে, কৃত্রিম ভাবে সাজানো অভ্যন্তরে বাইরের হাওয়া-বাতাস বিশেষ ঢোকে না। ড্রাইভার ক’দিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গেছিল, এখনও ফেরেনি... তাই পার্থ নিজেই আজ সারথি। পাশেই বসে আছে সর্বানী, কাছেই... কিন্তু গাড়ির ভেতরে এফএম-এ হিন্দি গান আর কাঁচ ভেদ করে আসা বাইরে মেঘের গর্জন ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। এফএম টা জোর করেই চালিয়ে রাখা, যাতে চোখে ঝিমুনি না আসে। হাইওয়ের রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে এমনিতেই সজাগ থাকতে হয়। তার ওপর আজ দুর্যোগের রাত।

দু’জনের মাঝে এই নৈঃশব্দ্যের অন্তরাল নতুন কিছু না। বিয়ের পর প্রায় ছ’বছর কেটে গেছে। নতুন করে বলার মত আর কী বা বাকি থাকে। নতুন কথার জন্ম হয় যখন নতুন কিছু ঘটে জীবনে। নতুন কথা জন্ম নেয় যখন একে অপরের জীবনের সব নতুন গুলো ভাগ করা নেওয়ার আগ্রহ থাকে। সেই আগ্রহে বহুদিন হ’ল ভাঁটা পড়েছে, নতুন কিছু ঘটেনি... নতুন কেউ আসেনি। ঘুরে ফিরে এসেছে দু’জনের অতীত। পার্থ নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে বহুজাতিক বাণিজ্যিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী হয়ে। আর সর্বানী? আছে একরকম মুম্বাইয়ের শহরতলিতে বিলাসবহুল দুই বেডরুমের অ্যাপার্টমেণ্টে, নরম সোফায়ে, সাজানো ড্রইংরুমে, এল ই ডি টিভি আর হাউসিং-এর অন্য মহিলাদের সাথে পার্টি করে... বেশ ব্যস্তই। সবাই যে চারপাশে খুব ব্যস্ত... নিজেকে ব্যস্ত না রাখলে চলবে কেন?

- - -

প্রথম দিকে সম্পর্কের মধ্যে তবু একটা উষ্ণতা ছিল। নিজের শহর ছেড়ে হঠাৎ করে একটা অচেনা পরিবেশে এলেও, নিজেকে কখনও একা মনে হ’ত না সর্বানীর। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও পার্থ ঠিক সময় বার করে নিতো ওর জন্য। অফিসের কাজের ফাঁকে নিয়মিত ফোন, আর এসএমএস... আর অফিস থেকে ফিরতে যত দেরিই হোক, ঘরে ঢুকেই হাতের ব্রিফ্‌কেসটা টান মেরে ফেলে হঠাৎ করে একটা উষ্ণ বন্ধনে জড়িয়ে ফেলা। তখন নিজেদের গাড়ি ছিল না, অফিস থেকে গাড়ি পাঠাতো। কত দিন আর হবে, পাঁচ বছর? কিন্তু এখন সেসব কথা মনে পড়লে, মনে হয় বহু যুগ আগের কথা। চোখের সামনে মানুষটা কেমন ধীরে ধীরে বদলে গেল। সর্বানী এখনও মাঝে মাঝে পার্থকে সময়-অসময়ে দূর থেকে দেখে। সেই মানুষটাই, অথচ যেন ঠিক সেই মানুষটা নয়। পার্থকে দেখে মনেই হয় না যে খেয়াল করছে, সর্বানী ওর দিকে তাকিয়ে আছে... হয়ত ওর কিছু আসে যায় না তাতে। নির্বিকার ভাবে ফ্ল্যাটস্ক্রিন এলইডি টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। নাহলে কোলে ল্যাপটপে নিয়ে পড়ে থাকে বিন ব্যাগের ওপর। হাতের কাছে এক পেগ হুইস্কি, খাঁজ কাটা কাঁচের গ্লাসে ভাসা বরফের টুকরো।

“ঠাণ্ডা লাগলে বলো, এসিটা কমিয়ে দেবো।”, সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলল পার্থ। জানলার কাঁচের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গেছিল সর্বানীর, হঠাৎ পার্থর গলার আওয়াজে ফিরে এলো। কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারেনি, পার্থর দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কি?” পার্থ একই ভাবে স্টিয়ারিঙে হাত দিয়ে, এফএমে চলা গানে তাল দিতে দিতে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল “বললাম, ঠাণ্ডা লাগলে বলো... এসিটা কম করে দেবো।”
- “ওহ... নাহ! ঠাণ্ডা লাগলে আমি পেছনে গিয়ে বসব... এসি কমাতে হবে না।”
- “ওকে...”
সর্বানী আবার জানলার দিকে তাকিয়ে রইল। জানলার কাঁচগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে বাইরে বৃষ্টির জল, আর ভেতরে জমে ওঠা বাষ্পতে। আর তা না থাকলেও বাইরে রাত্রির আঁধার, কিছুই ভাল দেখা যাচ্ছে না। তবু জানলার বাইরে কি দেখছে কে জানে। হয়ত ঝাপসা কাঁচটাই দেখছে।

সর্বানীর এই হঠাৎ মুড সুইং-গুলো কিছুতেই বুঝতে পারে না পার্থ। মাঝে মাঝে মনে হয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের অ্যাডভাইস নেয়। অ্যাপয়ণ্টমেণ্ট নেওয়ার কথাও ভেবেছে একাধিকবার, কিন্তু পিছিয়ে এসেছে। সর্বানী ছেলেমানুষ না, ঠিক বুঝতে পারবে। তারপর কি ভাবে রিঅ্যাক্ট করবে। বাড়ির লোক, অন্য আত্মীয়স্বজনরা জানতে পারলে কি ভাববে, এইসব সাত-পাঁচ ভেবে বার বার পিছিয়ে আসে পার্থ। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, সর্বানীকে আর সেই প্রথম দিনের সর্বানীর মত লাগে না কিছুতেই। দু’জনের মধ্যেই কেমন একটা জোর করে মানিয়ে নেওয়া ওই খাঁজ কাটা গ্লাসে বরফের টুকরোর মতই হুইস্কির ওপর ভেসে থাকে। তা বেশ বুঝতে পারে পার্থ। মাতাল হওয়ার জন্য অবসর সময়ে হুইস্কির পেগ নিয়ে বসে না পার্থ, কিন্তু যদি এক পেগে নেশা না চড়ে...

- - -

ঝিরঝির করে বৃষ্টিটা পড়েই চলেছে, বোধহয় সারারাত এইভাবেই চলবে। রাত এখন গভীর, তার ওপর বৃষ্টিতে হাইওয়ে ভিজে, গাড়ি স্কিড করাও অসম্ভব না। বৃষ্টির রাতে হাইওয়েতে এইভাবে গাড়ি স্কিড করে ব্রেকফেইল করে... দুর্ঘটনা আকছার ঘটে এই ভাবে। এই ভাবেই দু’বছর আগে নম্রতাদের এস ইউ ভি টা ব্রেক ফেল করে হাইওয়েতে। নম্রতা, ওর হাসব্যাণ্ড আর বাচ্চা মেয়েটা। ঠিক কি ঘটেছিল কে জানে, সকালে স্থানীয় লোকজন দেখেছিল একটা সাদা এস উই ভি দুমড়ে মুচড়ে রাস্তার ধারে পড়ে আছে। হয়ত এমনই পিছল হাইওয়েতে কোনও লোডেড ট্রাক... গাড়ির গতি অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে পার্থ, রাস্তার এক পাশ দিয়ে চালাচ্ছে। পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে গোঁ গোঁ করে মাল বোঝাই ট্রাক, অথবা হুশ করে কখনও একটা জিপ চলে যাচ্ছে। হঠাৎ গাড়িটা রাস্তার ধারে নিয়ে এসে থামিয়ে দিলো পার্থ।
- “কি হ’ল? ইঞ্জিনের প্রবলেম?”
- “হুম... গাড়ির না, আমার।”
- “কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”
- “নাহ্‌... এখনও অনেকটা বাকি... একটু ব্রেক নিয়ে নিই।”
বাইরে বৃষ্টির তোর টা কমে এসছে, তবে ঝিরঝির করে পড়ছে এখনও। সর্বানী গাড়ির কাঁচটা নামিয়ে দেখল, জলের ছাঁট আসছে অল্প অল্প, বাইরে অল্প ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে।
- “আহ্‌, আবার কাঁচটা নামালে কেন? এসি চলছে তো...”
- “বাইরের হাওয়া আসুক...
- “আসুক... মশাও আসুক তার সাথে!”
- “দম বন্ধ হয়ে আসে, এতক্ষণ গাড়ির ভেতর জানলা বন্ধ করে...”
আর কথা বাড়াল না পার্থ, মুখ থেকে একটা অস্ফুটে শব্দ বার করে নিজের অসন্তোষটা বুঝিয়ে দিলো। তারপর গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল, হাইওয়ের ওপর। সর্বানী সেই দিকে ফিরেও তাকালো না। শুধু একবার পেছন ফিরে গাড়ির পেছনের দিকের সিটটা দেখল, তারপর আবার জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। ঠাণ্ডা জলের ছিটে ওর চোখে মুখে পড়ছে। আর এফ এম-এ গান ভেসে আসছে, “রোজ রোজ আঁখো তলে...”। পার্থর বিরক্ত হয়ে গাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে বিশেষ ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হ’ল না।
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান