সে ফুল ফুটিয়া রইল আগম দরিয়ার মাঝে রে

সুমেরু মুখোপাধ্যায়


প্রপঞ্চমায়া ঋতুসংকল্পে ফুলগুলি ফুটে ওঠে কোলাহলে। পাহাড়ে অর্কিড, বেতালা শহরে পাথরকুচি, সুমনের গানে নাইন ও’ক্লক। ধানমন্ডি ৩২ জুড়ে নিষ্পাপ বকুল ফুল পড়ে আছে রাস্তা জুড়ে সার সার কফিনের মত শান্তিতে। বকুল তলা তার পদ্মপুকুরে কলকাতা ফর্দাফাঁই। ছান্দসিকের অমৃতবানী, যদি জোটে দুটি পয়সা, আমরাও ফুল কিনে আনি। ব্রহ্মার হাত থেকে ধীরে ধীরে পদ্মটি পড়ছে রাজস্থানে, এমন কয়েকপ্রস্থ অভিশ্রুতি ও সিরিয়ালসমূহ পার হলে, ফুলটি যাত্রা করে অমরত্বের পথে। ক্ষণিকের সাম্রাজ্যে অমরত্ব অলীক। মৃত্যুই পতন ও সিদ্ধ, ভাব সমাধি হলে তো কথাই নেই, পুলিশ একটু একশন দেখাতে পারে। পতনের কারণেই ইতিহাস কোণঠাসা, জন্মানোর কারণ বালখিল্য বাতুলতা, পিএনপিসি ও খুচরো হাসি। আমি যত কাছে যাই তার ততই সে হয়ে ওঠে অগম গ্রন্থাগার। কালি ক্রমশ বিস্ফারিত, বর্ণমালা বেহিসেবি, অচেনা লাগে মৃত্যুও যবনিকা পতনে। মৃত্যু বড় দীর্ঘ, ঋজু ও গাঢ়। মৃত্যু তাই উপত্যকা। উপত্যকা জুড়ে ফুটে আছে ফুল টেম্পোরারিটির ধ্বজা নিয়ে, হাসি ও রঙের সমাহার। আমাদের বর্তমান মৃত্যু অভিযান অনেক অর্থহীন হাসিতে খচিত, তবু একটি পয়সা বাঁচিয়ে রাখা যাক, খেলনাপাতির শহরে লাল-নীল সংসারে ইউজ-এন-থ্রো দর্শনের বাইরে। মৃত্যু বিরলতম ভাবে আপনার, এর চাইতে আপন বুঝিবা কিছু নেই। দীর্ঘ মফস্বলি সংলাপে ঘাসফুল গুলি কথা বলে অমৃতসমান। বেহিসেবি জঞ্জল সারাৎসার। গ্লানিময় শহরে গল্পেরা হতবাক, পরিত্যক্ত কারখানা বা মানসিক হাসপাতালের আনাচে লেগে থাকা মৃতবৎ ফুলগুলি এ সভ্যতায় বক্রোক্তি। স্মৃতিতে লোহ্যপেয় নয়। মরিচার মত অনভিপ্রেত ও হতবাক।


মৃত্যু আর ঠিক সাত মাস দূরে। ভিনসেন্ট এখন স্যাঁ রেমি শহরে। প্যারিসের কথা কেবল মনে বড়ে। ভাই, মা ও বোনকে চিঠি লেখা ছাড়া আঁকতে ইচ্ছা করে তাঁর। শরীর ভাল যাচ্ছে না। ছোট্ট শহরে রঙ কাগজ ক্যানভাসই বা কে যোগাবে? মানুষ বিত্তশালীদের ঘিরে জটলা করে। ডাকে টাকা আসে, তা ওষুধের বিল মেটাতেই শেষ। এর মধ্যে হাসপাতালে কাটে মাস তিনেক। বাড়ি ভাড়া জমে। ঋতুর পরিবর্তন ধরা পড়ে জানালায়। একটুকরো আলোককেও অসম্ভব শক্তিশালী লাগে তার। হেঁটে হেঁটে চলে যান এক এক পৃথিবীর উপর দিয়ে মক্ষিকাবৎ। মুক্ত আকাশ, প্রাণ অপরূপ শক্তিতে ফিরে আসতে চাইছে তার ক্যানভাসে। কাগজে। স্মৃতিটুকু এই জীবনের সঞ্চয়। আঁকছেন, শহরতলি, বন্ধু-বান্ধব- প্যারিসের রাস্তাঘাট, সব আসলে দিন শেষে হয়ে দাঁড়াচ্ছে এক একটা বাগান। ফুলেরা দুলছে গোছায় গোছায়। ‘ম সালে –কেও একটা ছোট্ট ক্যানভাস দিয়েছি, কালো পটভূমিতে লাল ও গোলাপি কিছু জেরানিয়ম ফুলের ছবি, প্যারিসে এরকম কয়েকটা ছবি আমি এঁকেছিলাম। (ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ , থিওকে লেখা চিঠি- স্যাঁ রেমি, ৪জানুয়ারি ১৮৯০)’ প্রতি চিঠির সঙ্গেই এই রকম দুই-একটা ক্যানভাস পাঠান ভিনসেন্ট ভান গঘ । আত্মীয়-বন্ধু কলকেই। ভাই থিও বিক্রি হলে কিছু রঙ, আঁকার সরঞ্জাম ও টাকা পাঠাবে, এমনটাও তো ঠিক নয়। নিজেকে ওইভাবে উৎপাদক ভাবতে নেই। ভিনসেন্ট জানেন, ইতিহাসকে এইভাবেই নথিভুক্ত করতে হয়। ইতিহাস সর্বদাই পতনের কারণ দর্শাবে এমনটা নয়।

লে ল্যারিয়ের রোজে বা দ্য গার্ডেন অফ দ্য হসপিটালে অফ স্যাঁ রেমি, ১৮৯০ । আঁকছেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। বাইরে বেরোনো নিষেধ। জানালাই যেন তার ক্যানভাস। বিশদে আঁকার কিই বা ছে। রেখার বুনোট কম, স্মৃতিরা স্বাধীন। রঙের মাতন বললে কম বলা হয়, উচ্ছ্বাস সুনামিসম। সুন্দরী নার্স তার জন্য একগোছা বুনোফুল এনে সাইড টেবিলে রাখেনি কোনওদিন। সব যুক্তি-তক্কো ও গপ্পোর শুরুতে সেই শম্ভূর নৃত্য, এলোমেলো এক তাণ্ডব ফুটে ওঠে ক্যানভাসে। প্রবল হাসি, প্রবল ঠাট্টা নিয়ে আলমোড়া ভাঙ্গে হট্টগোল। প্রবলের থেকে বড় কোন শব্দ নেই যার বিপরীতার্থক পিনপতন। শীতলতা কুন্ঠিত একরাশ কুয়াশায় বলছেন একটু দাড়া আসছি। সবকিছু ভেসে ভেসে উঠছে। মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ভঙ্গুর লতা, হাসপাতালের জানালা থেকে সোঁ সোঁ শব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর কালো মেঘ। অথচ মৃত্যু ঠিক আর সাত মাস দূরে।

ড গোসে’শ গার্ডেন, ১৮৯০। আসলে সে ছিল এক ডাক্তারখানার গল্প। অপেক্ষা করতে করতে রোগী যেভাবে ভাবতে চান, রোগ-ব্যাধি ও সমবেত আর্তনাদ। মৃত্যুর ঠিক ছয় মাস আগে আবিষ্কার করলেন এমন এক ডাক্তারকে যার বাগান অতি ভয়ঙ্কর। ফুলের হারিয়েছে ঘাসের ভিড়ে। কাঁটাওয়ালা বড় বড় গাছ সূঁচ ফোটাচ্ছে চেতনায়। উপরে ওঠার জন্য গাছেরা লেলিহান শিখায় সমদ্যত। ফুলেরা খসে পড়েছে গাছ থেকে, কুন্তলচ্যুত, শকুন্তলা হতবাক। কপালকুন্ডলা পথ হারিয়েছে ঘন জঙ্গলে, ভ্রু পল্লবটির আর ডাক দেওয়ার অধিকার নেই। গাছ-গাছড়া এম্বিধ ওষুধ চমৎকার সাহিত্যকর্মের মত জীবনদায়ী কিন্তু তা উপলক্ষ্য মাত্র। রেখাগুলি এখন ছুরিকাঘাতের থেকে তীক্ষ্ণ। জীবনের ব্যবহার রেকর্ড করে রাখছেন ছোট্ট একরত্তি স্পুলে। নতুন কিছু লেখার অভিপ্রায়ে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন গ্যালিলিওর হত্যাকারীদের। রক্ত রঞ্জিত সফদর হাসমি একমুঠো যবের গুচ্ছ চেপে ধরছেন মুঠোয়, হুমাহুন আজাদ ফুল ছাপ বিছানার চাদর। আবেলভাইদের পরে কেটে গেল অনেক বছর, বাড়তি অনেক ধর্ম আলোচনা ও কোর্টের দস্তাবেজ। এখন পড়তি রোদে বেলা শেষের গান। জীবনানন্দ দোয়েলের শিস খুঁজে পাচ্ছেন ট্রামের তারের ছড়ের ঘর্ষণে। ইরেজ ভিন্ন ঠাঁই নাই সেই স্পুলে। অবিরত ঘষাঘষিতে তার কেবলই বয়স বেড়েছে। ছিঁড়তে আর ছয় মাস।

‘আমার ‘সূর্যমুখী’ সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন, ক্যোস্ত-এর অসামান্য হলিহক আর হলুদ আইরিসগুচ্ছ, বা ধরো, জাঁনিন-এর চমৎকার পিওনি সম্পর্কে তা বলবেন কেন? আমার মতো তুমিও জানো যে এ জাতীয় প্রশংসার সব সময়ে একটা উলটো পিঠও আছে। তবু আমি খুশি, লেখাটার জন্য খুব কৃতজ্ঞ, বা গীতিনাট্যের ঢঙে বলা যায় যে ‘বুকের গভীরে নন্দিত’, যেহেতু মাঝে মাঝে এরও দরকার আছে। (থিওকে লেখা, স্যাঁ রেমি, ২ফেব্রুয়ারি, ১৮৯০)’ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন গোনাগুনতির সংসারে। ঠোঁট-মুখ তিতো হয়ে আছে সমালোচকদের কথায়। কাগজ কেটে কেটে ভাই পাঠায়, সেইগুলি এতদিন বাড়ির ঠিকানায় এসে পড়েছিল। সময় পাওয়া গেল উলটে দেখাত। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে ছবি আঁকলেন, এক ক্লাউন সদৃশ ফুলের তোড়ার। স্টিল লাইফ উইথ কারনেশনস, ১৮৯০। কাঁচের টেবিলে মৃত্যুর ছায়ায় ভিনসেন্ট স্বয়ং বুঝি ম্লান হাসছেন। অথচ পটে উল্লাস কম নেই। উল্লাসকর খেয়াল ধরেছেন। ঈশান কোণে মেঘ জন্মায়। নৈঋতে মুখ ফিরিয়ে নেয় হাওয়া মোরগ। মৃত্যু নিয়ে সাহিত্য করতে যেভাবে লেখা হয় অবান্তর।

‘লেখাটা পড়ে আমি যেন আমার ছবিগুলো নতুন করে দেখলাম, আসল ছবিগুলো যা, তার চাইতে মনে হল ঢের ভালো, বেশি সমৃদ্ধ, আর অনেক বেশি অর্থময়। আপনি যা লিখেছেন, আমার চেয়ে তা অন্যদের ক্ষেত্রেই বেশি প্রাসঙ্গিক, পরে ভাবতে গিয়ে একথা মনে হওয়ায় অবশ্য একটু অস্বস্তি লাগছে। অন্তিচেল্লি-র কথাই ধরুন না কেন, আপনি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘যতদূর আমি জানি, তিনিই হলেন একমাত্র আঁকিয়ে যিনি এই তীব্রতা নিয়ে বস্তুর ধাতব, রত্নসদৃশ, গুণসমৃদ্ধ বর্ণবিস্তার অনুভব করতে পারেন’। দয়া করে আমার ভাইয়ের কাছে গিয়ে অন্তিচেল্লির একটা পুষ্পগুচ্ছের ছবি যদি দ্যাখেন, ফরগেট-মি-নট-এর নীল-সাদা-কমলার গুচ্ছ, তা হলেই বুঝতে পারবেন আমি ঠিক কী বলতে চাইছি।(ভিনসেন্ট, আলব্যের অ্যা্রিয়েরকে লেখা চিঠি স্যাঁ রেমি, ১০-১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৯০)’ সমালোচককে চিঠি লিখছেন ভিনসেন্ট। অর্থময়তার উদ্ভাস তাকে স্পর্শ করে। গ্রাস নয়। তাকেও পাঠাচ্ছেন নতুন ছবি উপহার সরূপ। ভাই থিও তখন একজন উঠতি সংগ্রাহক, দাদাই তাকে পরামর্শ দেয়। সে সাধ্যমত কিনে রাখে ছবি। প্যারিস আর স্যাঁ রেমির মধ্যে এক অনন্ত বাগান রচনা করে ফেলছেন দুজনে। পাপড়ি সাজিয়ে যেমন যৌবন পায় ফুল। পয়ার ছন্দের মত পুরানো সংগ্রহ স্মৃতি। চিলেকোঠার মত গোপন চুম্বনে সিক্ত। দ্ব্যর্থহীন অনুরাগে ব্যঞ্জনবর্ণ খুলে পড়ছে ট্রয়ের ঘোড়া থেকে অভিরামের সীতাও খুলে ফেলেছিল লক্ষীবাবুদের তৈরি আসল সব গয়না। ঘোড়ায় চড়ে রাজকুমারেরা এখন গল্পের সওদাগর, নীল ও কমলা এসে গেছে ঠাকুমার ঝুলি ঝেড়ে। বাণিজ্যের জঙ্গলে আগাছায় হারিয়েছে দুই ভায়ের সাধের বাগান। ফরগেট মি নট বলতে বলতে রাতের ট্রেন ধরে শহরতলি থেকে ফুলেরা জড়ো হচ্ছে জগন্নাথ ঘাটে যাদের অনেকেই সহযাত্রী হবে পরদিন কেওড়াতলাগামী ধাবমান স্বর্গরথের। নতুবা পরিণীতাই পরিণতি, হাতে রইল বিধুবিনোদ চোপড়া।

আইরিসেস ইন এ ভাজ, উইথ ইয়েলো ব্যাকগ্রাউন্ড, ১৮৯০। যেন একখন্ড হৃৎপিন্ড। চার-পাঁচটি ছুরিতে বিদ্ধ। নিষ্পাপ, কেননা ফুলগুলিতে রোমাঞ্চ এখনও জেগে। এইভাবেই ঘর ছাড়া করে থাকে কালপুরুষ। মৃত্যু প্রশ্নচিহ্ন হয়ে জেগে থাকে ডেসডিমোনার ঠোঁটে। প্রশ্ন প্রশ্ন প্রশ্ন, হাহাকারের মত বিদ্ধ করে তাকে সমুদ্যত। অভিমুন্যের কিস্যু করার নেই। কালক্ষেপ ছাড়া। ‘এ ছাড়া আমি আপনাদের আরও একটা প্রশ্ন করতে চাই। ধরা যাক যে সূর্যমুখীর দুটি ক্যানভাস, যা এখন ভ্যাঁতিস্ত-এ আছে, তাতে রঙের একটা চরিত্র আছে, এবং সেখানে ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রতীকায়িত। ফুলের অন্যান্য অনেক ছবির চেয়ে তা কি খুব আলাদা- আরও দক্ষতার সঙ্গে আঁকা, এবং এখনও যার যথার্থ মূল্যায়ণ হয়নি। (পূর্বোক্ত চিঠি)’ ফুলগুলি কী ভাবে যশ ও আকাঙ্খা নিয়ে ঝরেছিল, তার বিবরণ দিতে দিতে শুকনো রুটি আর ওষুধ চিবুতে চিবুতে ভিনসেন্টের কল্পনারা প্রত্যাশী হয়। সামান্যে কী পাবে তার দেখা। অসমাপ্ত ইতিহাস লেখা, রঙও ফুরিয়ে এসেছে। চিঠি যেন গন্তব্যে পৌঁছায় আরও শ্লথ গতিতে। ‘মনে হয়, আমার সমস্ত ছবিই যে শেষ পর্যন্ত গভীর উদ্বেগ আর যন্ত্রণার ফসল, সে জন্য সকলের কাছে ক্ষমা চাই। যদিও ঐ গ্রাম্য, অমার্জিত সূর্যমূখীর ছবিতে ওরা কৃতজ্ঞতার প্রতীক খুঁজে পেয়েছে।
(বোনকে লেখা চিঠি, স্যাঁ রেমি, ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯০)’

আবার হাসপাতাল। আবার অসুস্থতা। বেশিরভাগ সময়ই মানা তেল রঙ এইসব ঘাঁটার। এক শুকনো ঘাসের জঙ্গল হয়ে উঠল এক নতুন বসন্তের ছবি। মেডো ইন দ্য গার্ডেন অ্যাট সেন্ট পলস হসপিটাল, ১৮৯০। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই দেখা যায় শিয়াল আর নেকড়ে যেন চরে বেড়াচ্ছে। ছিঁড়ে খেতে চায় ছবিটাই। রোগী ছবি এঁকেছে পথচলতি ডাক্তার-নার্স সবাই ঢু মারেন কিন্তু এ কী! কে যে কী দেখেন তা ভিনসেন্ট বোঝার চেষ্টাও করেন না। বিছানায় শুয়ে বিড়বিড় করেন। অপেক্ষা করেন মা বা ভাই কেউ আসবে। ডাক্তারা কানাকানি করে, রোগটা আসলে তো অন্য যায়গায়! হুকুম অনুযায়ী নার্সেরা ভারী রঙের পর্দা টেনে রাখে জানালার উপর। এই ঘরে আলো না আসাই ভাল। বিশ্রামই একমাত্র ওষুধ। পাখির কুজনে টের পান আরও একটি ভরা বসন্ত এসে গেছে। ‘তা হলে দেখলে তো, বসন্তের সবচেয়ে অনুকূল সময়টা আমি কাজ করতে পারলাম না, কোনও কিছুই তাই ঠিকঠাক চলেনি। কিন্তু এ নিয়ে কী আর করতে পারে লোকে? সমস্ত পরিবর্তনই কিন্তু ভালোর জন্যে হয় না, কিন্তু আমি এখনও মুক্তির অপেক্ষা রাখি। এখানে যা সহ্য করতে হয়, বস্তুত তা সহ্য করা যায় না। শেষ কয়েকদিন দীপ্ত সূর্যের আলোয় হলুদ ডান্ডোলিয়ন – সহ এক বাগানের ছবি আঁকছি। ( মা আর বোনকে লেখা, স্যাঁ রেমি, ৩০শে এপ্রিল, ১৮৯০)’

ফুল ফুটুক আর নাই বা ফুটুক বসন্ত হাসে। আরও কতগুলি ছবিতে আগে সেই শেষের দিনলিপি, ইতিহাসের পালাবদলের অনুজ্ঞা। হায় মর্ডানিটি! হিসেব মত তার আসতে আসতে লেগে যাবে আরো দশটি বছর। মারগেরিত সাশো ইন আ গার্ডেন, ১৮৯০। ব্রাঞ্চেস উইথ আলমন্ড ব্লসম ১৮৯০। অর্চার্ড ইন ব্লসম উইথ ভিউ অব আর্ল, ১৮৮৯। আর সময় নেই বন্ধু। চলন স্থবির হয়ে পড়ছে। ‘ফলন্ত আলমন্ড আঁকার সময়েই অসুস্থ হয়ে পড়ি। যদি কাজ করে যেতে পারতাম, বুঝতে পারতাম কেমন এঁকেছি। এখন সে ঋতু চলে গেছে, খুবই দুর্ভাগা আমি। (থিও কে লেখা, স্যাঁ রেমি, ১০ই এপ্রিল, ১৮৯০)’ । এরপর আরও কয়েকটি চিঠি ক্লোরোফিলের মত- ‘হালকা সবুজ পটভূমিতে গোলাপের একটা ছবি আঁকছি, আর দুটো ক্যানভাসে রয়েছে বেগুনি আইরিসের গুচ্ছ। তার একটা গোলাপি পটভূমিতে, সবুজ-গোলাপি-বেগুনির সমন্বয়ে তার রূপ নরম আর সুরেলা। অন্য বেগুনি গুচ্ছটা (গায়ে লাল থেকে প্রুসিয়ান ব্লু পর্যন্ত যার ব্যাপ্তি) এক আশ্চর্য সাইট্রাস পটভূমি থেকে যেন বেরিয়ে আসছে, আরও নানান হলুদ রং আছে ফুলদানে আর যার উপর তা রয়েছে, সেখানে। ফলত, এ এক বিষম পরিপূরকের খেলা- পরষ্পরের সান্নিধ্যে প্রত্যেকে সেখানে প্রত্যেককে শক্তিশালী করেছে। (থিওকে লেখা, স্যাঁ রেমি, ১১-১২ মে ১৮৯০)’। আর তিন মাস দূরে যমদূত, হাতে আলকাতরার ড্রাম। মুছে দাও দেওয়াল লিখন। স্মৃতি সততই প্রবঞ্চক। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজা অয়দিপাউস শক্তির সঞ্চয়ের জন্য ব্যাকুল। হিরিসিমা, পোখরান ছাই হয়ে গেছে আজ। বেঁচে থাকে শুকনো ক্যানভাসে কতগুলি তাজা ফুল। ২৯ শে জুলাই ১৮৯০ ভিনসেন্ট যখন মারা যান তখন তার বয়স ৩৭ বছর। এখন বুঝি মোদের ফুল ছড়ানোর পালা।


জীবন বিদ্যুৎলতা। ক্ষণিকের প্রবাহ। উলুঘাসের জঙ্গল। কাশফুলের দঙ্গলে শিল্পবিপ্লবের জয়গান শুনতে দৌড়াচ্ছে অপু ও দুর্গা। দ্বাদশ অশ্বারোহীর মত একটি থিওর কাছে আসছে, ভাস উইথ টুএলভ সানফ্লাওয়ার, ১৮৮৯, ডাক যোগে যা নাকি উঠেই যাবে একদিন। এমনই হয়ে থাকে বারোমাসে ঋতুর সংলাপ। প্রবল বর্ষণে মাটিতে মিশে যাচ্ছে রজনীগন্ধার ক্ষেত। মেরুদণ্ড সোজাই থাকে না আজকাল। বাসেরাতে গোলাপ এর রঙে ধুলো মিশিয়েছে বারুদের মরিচা। এই অপূর্ব সকালে ডাললেক জুড়ে ফুটেছে গাছে গাছে হারানো মানুষের মুখগুলি। ভিনসেন্টের ভাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সুর্যমুখীর দল। মৃত্যুর সুতো ধরে ডিগবাজি দিতে দিতে সাইকেল চালাচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া সার্কাসের জোকারগুলি, এক সাইকেলে কীভাবে আঁটে এতজন? দোপাটির মত নম্র ভাবে খসে পড়ছে একে একে। ধুরন্ধর পাঠিকা এতক্ষণে ধরে ফেলেছেন, ধুর। প্রস্ফুটিত ফুলগুলিকে মানুষের কৃতকর্ম বলার জন্য এত ভ্যানতারা। ভ্যান গঘ নেহাতই কয়েকটি ফুলের ছবি এঁকে গেলেন, যেই বললেন সুন্দর অমনি সুন্দর হল সে। ফুলগুলি অমরত্ব লোভে জ্বল জ্বল করতে থাকল শোক বিহ্বল আকাশে। ডাক এল, মোমের পাখনায় ভর দিয়ে সূর্য দিতে হবে পাড়ি। এইভাবেই জয়চন্দ্র নুইয়ে ধরেছেন ডালটি, চন্দ্রাবতী তুলতে তুলতে ঠাঁই পাচ্ছেন গীতিকাব্যে। পরিনতিহীন প্রেমগাঁথা কেমনে কি জানি অমর হয় মৈমনসিং গীতিকায় একদিন। এইসব গল্পে আমাদের এই গোনাগুনতি অক্সিজেন-হাই্ড্রোজেন খেলা আর বাইনারি জন্ম বেমানান। দুর্বল শব্দের বেসাতি। অবিরত ফুলের জন্ম হয়। ভুলেরও। ফুল গাছটি লাগিয়েছিলাম ধুলা-মাটি দিয়া রে। ছাইপাশ ঘাটি নতুবা মৃত্যু ভিন্ন আমাদের কোনও গন্তব্য নেই।


*ভিনসেন্টের চিঠির অংশগুলি –এ ভাবেই চলে যেতে চাই/ অনুবাদ- সন্দীপন ভট্টাচার্য/ মনফকিরা থেকে সরাসরি উদ্ধৃত।

আপনার মতামত জানান