ছিল নেই মাত্র এই...

দীপ্তিপ্রকাশ দে

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়


কে-কাকে ব্যবহার করেছি বলো তো? কে-ই বা কাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি? শরীর বললে শরীর, মন বললে মন। দু'টোর উপরেই আমি বাজি ধরতে রাজি। যদি তুমি অক্ষর চিনিয়ে থাকো, আমি চিনিয়েছি যুক্তাক্ষর। যদি মদ চিনিয়ে থাকো তুমি, আমি চিনিয়েছি নেশা। তুমি ফাগুন চেনালে ধূসর রঙের একটা পৃথিবীতে কৃষ্ণচূড়া-সত্যতার একচ্ছত্র সম্রাট আমি, আমি চিনিয়েছি আগুন। এবং ওই বাইকের দূরন্ত ছুটে যাওয়া...। যদি তুমি রাস্তা চিনিয়ে থাকো, আমি চিনিয়েছি সিগন্যাল, আর কীভাবে কখন কাকে ভেঙে দিয়ে পেরিয়ে যেতে হয় ট্রাফিক আইল্যান্ড।
ধরো এই যে আমার জানালা দিয়ে ধাবাটা দেখা যাচ্ছে। রাতভর একটার পর একটা গাড়ি দাঁড়াচ্ছে ওর সামনে। একটু টিফিন আর বিশ্রাম সেরে যাত্রীদল ঘুমঘুম চোখে আবার উঠে পড়ছে ট্যুরিস্ট বাসে। ওদের কে কাকে ব্যবহার করেছে? ধাবাটা যাত্রীদের? নাকি যাত্রীরাই ধাবার সদ্ব্যবহার সেরে ফিরছে? কিংবা ধরো দেশের বাড়ির সেই ঝিলটা। ফি বছর শীতে যেখানে পরিযায়ী পাখির দল ভিড় জমায়। মরশুম শেষে আবার যে যার নিজের দেশে ফিরে যায়। ওদের কে কাকে ব্যবহার করে বলো তো? কে-ই বা কাকে ছেড়ে চলে যায়? তুমি বলবে পাখিগুলোর ছেড়ে যাওয়ার কথা। আমি বলব উঁহু। মরশুম। আসলে ওই ঝিল আর পাখিদের জীবন থেকে কিছুদিনের জন্য শীতকালীন স্কুলটা মুছে যায়, দরজা বন্ধ হয়ে যায় তার!
আচ্ছা, ওই অনড়-অবস্থানটুকু ভুলে গেলে ঝিলটাও কি ছেড়ে যায় না পাখিদের! শীত শেষ হয়ে গেলে সেতো তখন অন্য কারও, অন্য কোনও ঝিল। মোহভঙ্গের এই বিষাদটুকু নিয়েই তো ফিরে যায় পরিযায়ীর দল। এরপর কী বলবে তুমি? উত্তর নেই তো! জানি এর উত্তর পাওয়া তত সহজ না। সত্যি বলতে আমার কাছেও তো নেই। তবু চারপাশে অভিমানের মেঘ জমছে। অভিমান! হোঃ! সেও কি বোঝে যে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর ছুঁড়ে ফেলা হবে স্বাভিমানে ফিরে এলে!
কী জানো, কোনও সম্পর্কই পেনের রিফিল নয় যে কালি ফুরিয়ে যাওয়ার পর তুমি বা আমি তাকে ফেলে দিতে পারব। যেটা ফেলে দিয়েছি, সেটা হ'ল গিয়ে কিছুদিনের একটা অভ্যাস। শান্ত আর গভীর দু'টো চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস। হাতে হাত রেখে রাস্তা পার হওয়ার অভ্যাস। পপকর্ন হাতে ধরে সিনেমা হলের আচ্ছন্নতায় পাশাপাশি বসে থাকার অভ্যাস। দুপুরের ঝিমিয়ে পড়া ফুটপাথে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাস। কিংবা শরীর! শরীরও তো একটা অভ্যাস মাত্র। সে-অভ্যাস থেকেও বেরিয়ে গেছি আমরা। আইন সেখানে সাপের ফনার মতো ছোবল বসাতে পারে, কিন্তু আত্মা পারবে না। আমি যদি তোমাকে 'ব্যবহার' করে থাকি, তাহলে তুমিও করেছো। একটা যৌথ যাপন থেকে তুমি যদি এতদিন কোনও 'মজা' না লুটে থাকো, কোনও রোমাঞ্চ যদি না-ছুঁয়ে থাকে তোমাকে, কোনও শিহরণ, কোনও উদ্দীপনা, কোনও আনন্দ বেদনা অতৃপ্তি অপমান অসূয়া রাগ দুঃখ ঘৃণা প্রত্যাশা আর আকাঙ্ক্ষা যদি স্পর্শ না-করে থাকে তোমায়, তাহলে তো পুরো ব্যাপারটাই ফানুস ছিল। ফাঁসারই কথা ছিল তার, ফেঁসে গিয়েছে। এরপর আর দাবি থাকে না কোনও! অভিযোগও না।

ওহো, বিষয়টা পরিষ্কার করে নিই। কেননা তুমি তো আবার এ লেখাটাও পোস্টমর্টেমের টেবিলে ফেলবে। আসলে যে-ওয়েবজিন এটা প্রকাশ করতে চাইল, তারাই বেঁধে দিল বিষয়টা। ইউজ অ্যান্ড থ্রো। লিখতে গিয়ে প্রথম মনে পড়ল তোমাকে, তোমাকেই! শেষবারের ওই শূন্য দৃষ্টি, রেড অ্যালার্ট জারি করে দেওয়া শরীর আর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বলা ওই কাটা কাটা কথাগুলো... "এভাবে ব্যবহার করলে আমায়!" ফিরে এসে কী লিখেছিলাম জানো? লিখেছিলাম - সে আমায় হাত নাড়ছে/ লম্বা স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে ট্রেন/ আর আমি/ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সব বদরক্ত বের করে নতুন লেখার মুখে ঢেলে দিচ্ছি...
হ্যাঁ। সত্যিই যদি তোমায় ব্যবহার করে থাকি কোথাও, কখনো... তাহলে এই অপরাধ্নামাগুলোয়। নিজেকেই লেখা কিছু চিঠিতে, কবিতায়, ছড়ানো ছেটানো দিনপঞ্জী আর মনখারাপের গদ্যগুলোয়। তোমার ওই অনর্থক তাকিয়ে থাকা, কথা বলা, হেঁটে চলার নিজস্ব ছন্দ, চোখের তারায় লুকিয়ে রাখা ব্যথা, আর ওই অসতর্ক মুহূর্তগুলোর শ্বাসপ্রশ্বাস, সব... সব-ই আমি মুঠোর মধ্যে চেপে রেখে দিয়েছি। পুরনো লেখাগুলোর সামনে বসলে আঁৎকে উঠি মাঝেমধ্যে। কত শব্দ আর স্পেসের মাঝে লুকিয়ে রেখেছি তোমায়! কত কত মুহূর্ত দমবন্ধ করে বসে আছে লেখাগুলোর দাঁড়ি-কমার ফাঁকে। এক স্তবক থেকে অন্য স্তবকে যেতে গেলে কতবার মনে হয়, নির্জন দুপুরে বুঝি ব্যস্ত হাইওয়ে পার হচ্ছি আমি, আর তুমি শক্ত করে ধরে আছো আমার হাত। জায়গায় জায়গায় বানান ভুল। ওগুলো আসলে তাড়াহুড়োয় তোমার ইনবক্সে পাঠানো ছোট ছোট সত্যি-গল্পের মুখবন্ধ।

আচ্ছা, কোন পারফিউম ব্যবহার কর এখন? কোন কোম্পানির মাসকারা লাগাও চোখে? নেলপালিশ কি এখনও এল-এইট্টিনের? আর কোল্ডক্রিম? এখনও নেভিয়াতেই মজে আছো বুঝি? আমি আমার সমস্ত ভালোলাগা পালটে নিয়েছি। ফার্স্ট লাভের ওই তুমি-তুমি গন্ধটা সহ্য হচ্ছিল না মোটেই। জিলেটের শেভিং ক্রিম ব্যবহার করতে গেলে মনে হতো তোমার কান্নাই বুঝি গালে ঘসছি। তাই বদলে নিয়েছি ওটাও। তুমিও সব বদলে নিও। যেভাবে এই শহরে ঋতু বদল হয়, যেভাবে পুরনো বাতিস্তম্ভ সরিয়ে জায়গা করে নেয় নতুন ত্রিফলা, যেভাবে ১২টা-৩টের নুন শোয়ে ফি শুক্রবার সিনেমা বদলে যায়, সেভাবেই সরিয়ে দিও পুরনো যা-কিছু। এটুকু না পারলে তুমি বাঁচতে পারবে না! ব্যবহারের পর পুরনো হয়ে গেলে আবার ফেলে দিও সব। কেননা ব্যবহার আর ছুঁড়ে ফেলার মধ্যে কোনও পাপ নেই। পাপ সেখানেই। যদি তুমি ফেলে কোনওকিছুর জন্য মনখারাপ না করো কখনো। যদি তুমি একলা কাটানো দুপুরগুলোতে একবারও স্মৃতির কাছে নতজানু না হও। যদি তুমি মধ্যরাতে ফসিল হয়ে যাওয়া কোনও ভালোবাসার গন্ধ পেয়ে জেগে না ওঠো কোনওদিন!
তুমি মিথে। আমিও মিথ্যে। কিন্তু, যে-মুহূর্তগুলো এতদিন ভরিয়ে রাখল আমাদের, বিশ্বাস চেনাল, আবেগ চেনাল, হাতের মুদ্রা চেনাল, বেঁচে থাকার গন্ধ চেনাল, শব্দ চেনাল, নীরবতা চেনাল, রাস্তা চেনাল, খাদ চেনাল, তারা তো কেউ মিথ্যে নয়। তাদের আসা আছে। কিন্তু চলে যাওয়া নেই, যতক্ষণ না ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা বিষণ্ণ একটা আগুনের মধ্যে নিভে যাচ্ছি আমরা!

আপনার মতামত জানান