ক্যাচ ইট

সুপ্রভাত রায়

ছবি- তৌসিফ হক


রামকৃষ্ণ রোড ধরে সোজা হাঁটলে যেখানটা শ্রীনিকেতন রোডে গিয়ে উঠছে,তার ঠিক আগে। মানে রামকৃষ্ণ মন্দিরের পাঁচিলটা যেখানে শেষ হচ্ছে তার গায়েগায়েই। একটা ডাস্টবিন ছিল। ঢালাই করা ডাস্টবিন। তখন ওইরকম ডাস্টবিনও অত দেখতে পাওয়া যেত না। নামীদামী পাড়া আর কয়েকটা বিশেষ বিশেষ জায়গায় রাখা থাকত। নতুন এলে তাকিয়েতাকিয়ে দেখতাম তার গায়ে ঢেলে দেওয়া ঢালাই এর রঙ। কিন্তু ওই ডাস্টবিনে একমাত্র যে জিনিসটা ফেলা হত, প্রাইমারী স্কুল যাওয়ার পথে বাঁদিকে তাকিয়ে জুলজুল করে দেখতাম। ইস... একটা যদি পেতাম। মা জানত আমার ওই লোভের কথা। একদিন উত্তেজনায় বলে ফেলেছিলাম। মায়ের কঠোর নিষেধ ছিল, একদম যেন হাত না দিই। বিষ। বিশ্বাস করতাম বিষ। হাত দিলেই মা জানতে পেরে যাবে। তাই তাকিয়ে তাকিয়ে পেরিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। কি সেই ফেলে দেওয়া জিনিস যার প্রতি এত লোভ ছিল আমার ? কিছু না, ডিসপোজাল সিরিঞ্জ। তখন মার্কেটে সবে সবে এসেছে। অবাক হয়ে যেতাম। কি করে এত নতুন সিরিঞ্জ মানুষে ফেলে দেয়। যেখানে আমার একটাও নেই। আমার কোনও ডাক্তারকাকু ছিল না। তাই বহু ব্যবহৃত কাচের সিরিঞ্জ হাত দিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আর ওদিকে ডাস্টবিন থেকে একটা কুড়িয়ে নেওয়ার সাহস। খুব ইচ্ছে করত হাতে পেতে। ওটা দিয়ে চিরিকচিরিক করে গাছের শরীরে জল দিতে।
রামকৃষ্ণ রোডটা যেখানে শেষ হচ্ছে তার ডান দিকেই। প্রদীপ মুখার্জীর ডাক্তারখানা। শিশু চিকিৎসক। তাই বড়রা তখনও কাচের সিরিঞ্জ এ চালিয়ে নিলেও শিশুদের জন্য ডিসপোজাল সিরিঞ্জ এসে গেছে। আমি জাস্ট ভেবেই পেতাম না, এত টুকটুকে সাদা শরীরে নীল মেরুদণ্ড নিয়ে নতুন দেখতে রয়েছে তাও একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়ার কি আছে ! আমাকে দিয়ে দিলেই তো পারে। মাঝেমাঝে সাফ হয়ে যেত ওই নতুন ডাস্টবিন, তা দেখে আরো আরো রাগ হত । ওই ডাস্টবিনটাতে যেহেতু অন্য কিছু ফেলা হত না, তাই তারাকাঠির মতো সেজে থাকত তারা শুয়েশুয়ে। তারপর শিখলাম ইহারে কয় ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’। এই নামের পেন আসার আগে এ এক অন্য কুড়োতে না পারার পেইন এর গপ্পো। ‘ইউজ’ শব্দটাও তখন আলোর উল্টোদিকে বসবাস করা না চিনতে পারা রঙ, আমাদের মুখে। বেঙ্গলি মিডিয়ামের জন্মগত ছাত্র হলে যা হয় আর কী। কিন্তু ‘থ্রো’ হত। ক্রিকেট, ক্রিংক্রিং ঢুকে গেছে যে ভিতরে। কিন্তু সেই সমস্ত থ্রো’ই কোনও না কোনও কাজে লাগত । ‘থ্রো’ চিনি, ‘ইউজ’ চিনি কম।
আর এখন গিয়ে সবার মধ্যে দেখেছি ‘ইউজ’ টা এত বেশি কাজ করে যে ‘থ্রো’ টা মৃত গতিশক্তির লাশের পাশে ঠাই দাঁড়িয়ে রাত জাগে।

আপনার মতামত জানান