ভাঙা গড়া

রানা আলম

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়


ট্রেনে করে স্কুল যাচ্ছিলাম।ফাঁকা ট্রেন,বাইরে মেঘলা আকাশ।দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম।আমার এক পরিচিত হকার,কালী’র সাথে দেখা হল।কালী ওমরপুর বাস স্ট্যান্ডে পেয়ারা বিক্রি করে।বাড়ি জিয়াগঞ্জের দিকে।যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোর বাড়ি কোথায়?’ কালী মুখের ঘাম মুছে একগাল হেসে উত্তর দেবে, ‘আমাদের বাড়ি ছেলো ওপারে।বাড়িঘর,বাগান,সব ফেলি এইছি গো’। কালী’রা এদেশে এসেছে বছর দশেক।ষোল বছর বয়সে যে দেশ ছেড়ে এসেছে,তার স্মৃতি টাটকা থাকাই সম্ভব।কালী’র বাবাও ফেরি করতেন,আপাতত শয্যাশয়ী।কালী’রা কোন একটা ঝুপড়িতে থাকে।সে ঝুপড়ি দু-একবার প্রশাসন রাস্তা চওড়া করার নামে ভেঙ্গেছে। প্রত্যেকবার ঝুপড়ি ভাঙ্গে,আর কালীরা আরো খানিক সরে ঝুপড়ি বাঁধে।রাস্তা যত চওড়া হয়,কালী’দের ঘর তত সংকুচিত হয়। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘হ্যাঁরে,তোরা নেতাদের বলিস না ক্যানো?’ কালী অসম্ভব সাদা দাঁত বের করে হেসেছিল,যেন এর থেকে মজার রসিকতা ও আর শোনেনি ।তারপর বলেছিল, ‘কি যে বকো মাস্টার দা।পাল বাবুর লেগে ভোটে খাটি।টাকা দ্যায়।আর ভোট শেষ হলি চিনতি পারেনা গো’। ট্রেনের রুটে থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট টা পড়ে,সেটা ছাড়িয়ে খানিক এগিয়ে খাস জমির উপর কতগুলো ত্রিপল আর কুটোকাটা দিয়ে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরী হয়েছে,গোটা কয়েক বাচ্চা উদোম গায়ে খেলা করছে। তাদের দিকে আঙ্গুল তুলে কালী বললো, ‘দ্যাহেন মাস্টার’দা,এ্যদেরো ঘর নাই গো,পিঁপড়ার মত বেঁচি আছে।এই ঝুপড়ি কদিন বাদে আবার ভাঙ্গবে,আবার ফাঁকা জাগা খ্যুঁজে ঘর বসাবে,আবার সরকারের লোক ভেঙ্গি দিবে,গরীব কে কেউ দ্যাহেনা গো’। কালী’র কথার উত্তর আমার কাছে ছিল না।তাই চুপ করে রইলাম।আমরা উন্নয়ন বলতে কি বুঝি তা নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে।
আমার স্কুলে পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট থেকে একখানা আর্সেনিকমুক্ত কল বসিয়ে দিয়েছে।সেদিন স্কুলে টিফিনে ছেলেরা এসে খবর দিল যে কলের পাইপ,যেটা ফিল্টারের সাথে লাগানো আছে,তা লিক করে জল বেরোচ্ছে।গিয়ে দেখলাম জল বেরিয়ে মাটিতে পড়ছে।কিছুটা মাটি উচু হয়েছিল,সেটা ধ্বসে যাচ্ছে ক্রমশঃ।
আচমকা চোখ পড়লো,ধ্বসে যাওয়া মাটির পাশ দিয়ে সার দিয়ে বেরিয়ে আসছে একদল পিঁপড়ে,কিছু পিঁপড়ে জলে ভাসছে,বাকিরা নতুন আস্তানার খোঁজে রওনা দিয়েছে।

আপনার মতামত জানান