ব্যবহারিক উপযোগীতা

অলোকপর্ণা

অলংকরণ- তৌসিফ হক



হাসলে তাকে অবিকল টিকটিকির মত দেখাতো, বন্ধু টিকটিকি। আমরা হাসতাম আড়ালে, আর সে আমাদের জন্য কুলের আচার বাড়ির ফুল নতুন ইরেজার খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসত দেওয়াল বেয়ে বেয়ে। চলে যাওয়ার আগে সেই ইরেজার দিয়েই আমরা ঘষে ঘষে মুছে দিয়ে যেতে ভুলতাম না টিকটিকির মুখ, সে আবছা মুখ নিয়ে দেওয়ালে দেওয়ালে লেগে থেকে আমাদের চলে যাওয়া দেখত শূন্য চোখে।




বৌদিকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ফেরার সময় ট্যাক্সিতে দাদাই সিগারেট ধরালো। ধোঁয়ায় কি না জানিনা, ওর মুখটা আবছা, দেখতে পেলাম না,- হঠাৎ করেই চোখে যে কি একটা পড়ল... আমি রিয়ার ভিউ মিররে বালি খুঁজতে থাকলাম।



বাড়ি ভর্তি হয়ে থাকত অগ্নি জেলে। তিন টাকা, সমুদ্র নীল কালি। সেই কালির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা যেত অবিরামকাল, যদিও আমার প্রিয় ছিল সেলো গ্রিপার, রাবার গ্রিপ, সাত টাকার আভিজাত্যে ভরপুর।
সমুদ্র নীল অগ্নি জেলে ছেয়ে গিয়েছিল মাহল। নীলচে বোরের মত পরীক্ষা হলে, কোচিং ক্লাসে বীরদর্পে এগিয়ে যেত তারা।
যুদ্ধ শেষ, আমাদের পেন্সিল বক্স থেমে গেল কোন মোড়ের মাথায়, পেনগুলো উড়ে চলল ধানসিঁড়িটির তীরে। অগ্নিজেল এখনও পাওয়া যায় শুনেছি, তবে তার সেই সমুদ্র নীল কালি আর নেই। দামও বেড়ে পাঁচ টাকা। ইউস হতে হতে ইউসড্‌ টু আমি পেন ব্যবহার করিনা বহুমাস হয়ে গেছে, সই করতে হলে এর ওর থেকে ধার করি। এরা ওরা কেউই অগ্নি জেল ব্যবহার করে না,- এদের সব রেনল্ড, সেলো, পার্কার,- রাজা, রানি আর বিশপ।


ভেবে দেখেছি বোরে হওয়াটাও বেশ নেশার। কারো কারো হাতে ব্যবহৃত হতে... ব্যবহৃত হতে হতে শেষ হয়ে যেতে বেশ মজাই লাগে, বেশ নেশা লাগে।

-চিয়ার্স!




আজকাল আগুনের সাথে ঘর করি। তার আঁচে জ্বলতে থাকে জোনাকিরা। দিনের বেলা জোনাকির আলো ম্লান হয়ে এলে আগুন আমার কাছে আসে, হাত পা সেঁকে, আবার জোনাকি বনে ফিরে যায়। আমি দূর থেকে আগুন ঘিরে জোনাকিদের নাচ দেখি, জোনাকিদের জ্বলে যেতে দেখি, মুগ্ধ হয়ে দেখি। বুঝি একবার, একটিবার মাত্র ব্যবহার হয়ে যেতে হবে, তারপর যেই আছড়ে পড়া, যে কুরবানি, তাতেই মুক্তি। আমারও জোনাকি হওয়ার ইচ্ছে হয়, জ্বলে জ্বলে পুরে ছাই হয়ে যেতে... কি রোম্যান্টিক সে জ্বলে যাওয়া, কি নিদারুণ স্যাডিস্ট!



বাড়িতে কাজের মাসি না এলে বাবা বাজার থেকে কাগজের পাতা নিয়ে আসত, প্লাস্টিকের গ্লাস। ভিজে ন্যাকড়ায় আমি তাদের মুছে মুছে রাখতাম। ইউস অ্যান্ড থ্রো পাতাদের গায়ে শেষ না হওয়া গল্প লেগে থাকত। চকচকে গায়ে অর্ধেক লেখা সেসব শব্দ- লাইন পড়ার চেষ্টা করতাম।
রান্না হলে আমরা দল বেঁধে খেতে বসতাম, খাওয়া শেষে দলবাঁধা পাতাদের নিয়ে গামলায় জড়ো করা হত। দেড় দিন পর তারা ময়লাকাকুর গাড়ি চেপে কোন দেশে যে পাড়ি দিত...! গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আমি দেখতে পেতাম ইউস অ্যান্ড থ্রো পাতাদেরও গল্প তৈরি হচ্ছে, ময়লাকাকুর পক্ষীরাজে।

আপনার মতামত জানান