Use And Throw

অবিন সেন

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

“পৃথিবীর দেয়ালের পরে
আঁকা বাঁকা অসংখ্য অক্ষরে একবার লিখিয়াছি অন্তরের কথা—
সে সব ব্যর্থতা
আলো আর অন্ধকারে গিয়াছে মুছিয়া!”

অসংখ্য মানুষের ভিড়ে আমাদের বেঁচে থাকা মূলত পরস্পর ব্যবহিত হবার অনুপ্রাসে উপলব্ধ তথা সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং আলো-অন্ধকার যা মূলত সারভাইভ্যাল অফ দ্যা ফিটেস্ট নামক এক প্রাচীন তত্ত্বের দিকে আংশিক অনুভূমিক বা অন্য কিছু বলে আমার মনে থাকে না, অথচ পটললাল আমাকে তা ক্রমাগত মনে করিয়ে দেবার মতো করে ব্যতিব্যস্ত করে। আমরা যে পরস্পরের কাছে ক্রমাগত ব্যবহিত হচ্ছি বা করছি তা করছি আমদের রোজকারের অসুখ বিষুখ নিয়েই এবং তা কোনো অংশে কাব্য বলে আমার বিভ্রম ঘটে। অথবা কাব্য? নয় ? নচেৎ পতাকা বহনের মতো করে আমরা আমৃত্যু মিছিলে হাঁটছি কি কারণে? হ্যাঁ, সেটা মিছিল। এবং আমি নিশ্চিত ব্যবহিত মানুষের কোনো সম্যক ইউনিয়ন নেই। কথাটা কেন উঠল সেটা বালি। আমি ও পটললাল বহুকাল থেকে বন্ধু, এবং আমরা হাঁটছিলাম। বিকেলে। বিকেলের আলো ক্রমশ জীবনানন্দের কবিতার মতো ধূসরতর হয়ে যাচ্ছে। আকাশের বুকপকেটে ধূসর খাম। পটললাল বলল
ফাল্গুনীকে তোর মনে পড়ে?
কোন ফাল্গুনী?
কথাটা বলেই আমার ঘোর লেগে যায়। বলব কি বলব না ভেবে আমার দোনো-মনো লাগে। স্মৃতি এমনই। এমনই বওয়াল-বাজ, আমাকে ক্রমাগত ভড়কি মেরেই যাবে। তবু স্মৃতিকথা বই আমাদের বেঁচে থাকা অর্থহীন এবং আমৃত্যু স্মৃতি আঁকড়ে থেকেই আমাদের কোনো দম ফ্যালার ফুরসৎ থাকতে নেই।

“যে-মুহূর্ত চলে গেছে,--জীবনের সেই দিনগুলি
ফুরায়ে গিয়েছে সব,--একবার আসে তারা ফিরে;”

অর্থাৎ স্মৃতির সৎকার বিষয়ক সে ক্রিয়া কর্ম, তার আকাঙ্ক্ষায় আমাদের জেগে থাকা।
২০১০ সাল। তারিখ আমার মনে নেই। ধরা যাক তনুকাকে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আমি আবার কফি-হাউসে ফিরে গিয়েছি। দৈবাৎ কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। এই অপেক্ষা।
ফাল্গুনী আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। প্রথমটায় চিনতে পারিনি। তারপর সে’ই আমার দিকে ফিরে তাকাল এবং আমার কোনো কথার অপেক্ষা না করে সে আমার সামনের চেয়ারটি টেনে নিয়ে বসল।
কি রে বাঞ্চত, কেমন আছিস?
তার গলা ঘষা ঘষা, ক্রমাগত হাপরের শ্বাস ছাড়ার মতো।
আমি চমকে উঠে বললাম
ফাল্গুনী ?
চিনতে পেরেছিস..বাঁ...!!
তা কবিতা টবিতা লিখছিস?
ফাল্গুনী বেশ মজলিস করে, গা হাত দুলিয়ে হাসল...তার হাসিটা, যেন তার বুকের ভিতর থেকে আসছিল। সে বলল
দুর..বোকাচো....!! সে সব কবে ছেড়ে দিয়েছি।
ফাল্গুনী যে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে তা আমি জানতুম। তবু একটা ঢ্যামনামি আমাকে পেয়ে বসেছিল। আমি জানি এই ঢ্যামনামিটাই আমাদের বেঁচে থাকার চরম ট্রাজেডি। কিংবা এটাই সত্য। ফাল্গুনীর সামনে বসে, যেন আমার তখন মজা লাগছিল। যেন কোনো এক চটকদার খেউর শুনছি। তার রোগা বুক পিস্টনের মতো। উঠছিল। আর নামছিল। সেই পিস্টন পুড়ে ধোঁয়া উঠছিল কিনা তা আমার আজ মনে নেই। তবে ফাল্গুনী অনর্গল বকে যাচ্ছিল আর মুখ-খিস্তি করছিল।
আমরা আড়ালে বলতাম ফাল্গুনী দুর্দান্ত কবিতা লিখত। ধারালো। ডাইনোসরের মাথার মতো তার কবিতার মাথা অনেক উঁচু পর্যন্ত পৌঁছাত। প্রশান্ত, নিখিল ও আরো কয়েকজন ও ফাল্গুনী মিলে একটা পত্রিকা বার করল। আবাদ। পত্রিকার জন্যে প্রচুর খাটল ফাল্গুনী। প্রচুর। কয়েক মাস পর পর প্রকাশ হল পত্রিকাটি। রমরমিয়ে। আবাদ যত ফসল পুষ্ট হল, তত তার চারপাশে অনেকের ভিড় বাড়ল। তারপর ফাল্গুনী একদিন দেখল যে মানুষগুলো এতদিন তাকে নিয়ে “আবাদ” করল, তারা আর তার পাশে নেই। “আবাদ” ও নেই। ফাল্গুনী একা ও নিরস্ত্র। অবিকল নিরস্ত্র থেকে ফাল্গুনী একদিন অন্ধকারের দিকে সরে গেল।
আমরা সবাই অবিকল ফাল্গুনীর মতো নিরস্ত্র ভাবে বেঁচে আছি। ক্রমাগত এক অসুখ থেকে আর এক অসুখের দিকে বিউগল বাজিয়ে চলেছি।
বিকেলবেলা। মাথার পিছনে ধূসর আলো, অপরূপ চালচিত্র রচনা করেছে, পটললাল বাদামের খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে ঘাসের উপর ফেলছে, মৃদু মন্দ হাওয়া তবু পটললালের ফাল্গুনীর কথা মনে পড়ল।
আমি বললাম
মনে পড়ে। কিন্তু হটাৎ তার কথা ?
দূরের ওই ডাস্ট-বীণটা দেখে মনে পড়ল। “ইউজ মি”।
আমি মাথা নাড়লাম।বললাম
পটললাল, আমাদের ভিতরে দুটি মানুষ বসবাস করে। একটা আমি। আর একটা আমাকে। আমি আর আমাকে মিলেই সমবেত সঙ্গীত। এক জীবন। ফাল্গুনীকে ছুঁড়ে ফেলে না দেওয়া ছাড়া ওদের তো আর কোনো উপায় ছিল না! ওদের পাণ্ডা ছিল নিখিল। সে ছিল হিরো। ছিল পৌরুষ!(?) আর ফাল্গুনীর? কি ছিল ? পায়রার বুকের মতো নরম বুক। হৃদয়। আর অসুখ। সে অসুখ, প্লেগ, যক্ষ্মা, সিফিলিস, এইডস না। তা ছিল তার স্বাভাবিক উন্মাদনা..তার নরম হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দনে অবিরত পিস্টনের মতো সাধনা—সৃষ্টি। এমন অসুস্থ মানুষকে হিরো মানায় না বস।তাহলে যে সিনেমাটাই মাটি! নিখিল এটা বুঝেছিল। আমরা সবাই বুঝেছিলাম। কিন্তু ফাল্গুনী বোঝেনি। আর না বুঝলে যা হয়, যেমনটা হয়। তেমনটাই হয়েছে। আমরা উপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাই হা হা হি হি করেছে আর দেখেছি ফাল্গুনী ক্রমাগত সিঁড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে কিন্তু সেই অন্তহীন সিঁড়ি সে ভাঙতে পারছে না, অন্ধকারের একটা লোমশ হাত তার কাঁধ চেপে ধরেছে। আমরা হাততালি দিয়েছি। আমরা জানি, ব্যবহিত মানুষের যেমন কোনো ইউনিয়ন নেই কোনো সামাজিক সংস্কৃতি নেই তেমনি উম্নাদনা, পাগলামি, সারল্য বিষয়ক ব্যাধির কোনো সামাজিক পটভূমি নেই, ইউনিয়ন নেই। এরা তাই একা ও একক। এদের কোনো মিছিল নেই। মিছিল-হীন মানুষের কোনো সমবেত সঙ্গীত নেই।


“পৃথিবীতে; এই ক্লেশ ইহাদেরো বুকের ভিতর;
ইহাদেরও;অজস্র গভীর রঙ পালকের পর
তবে কেন? কেন এ সোনালি চোখ খুঁজেছিল জ্যোৎস্নার সাগর?
আবার খুঁজিতে গেল কেন দূর সৃষ্ট চরাচর”।

তবু এই সব বিক্ষিপ্ত অসুখ-আলো-অন্ধকার পেরিয়ে স্বপ্ন আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে। এবং এগিয়ে চলা আছে। এ সব ঐতিহাসিকভাবে সত্য।
হয়ত ফাল্গুনী আবার কবিতা লিখছে। কিংবা লিখবে একদিন......

আপনার মতামত জানান