মার্গদর্শন ও কিঞ্চিত্‍ খুচরা পাপ

পীযূষ কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

বল্লাম -'প্রভুপাদ, প্রতিদিন নয়া নয়া মতবাদের কথা শুনছি। কিন্তু কোনপথে গেলে মোক্ষলাভ হবে, বুঝতে না পেরে কনফিউশনে ভুগছি। প্রেসার বাড়ছে। কোলোস্টোরল বাড়ছে। কখনো কখনো তো মনে হচ্ছে, ইয়েও বেড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় মার্গদর্শন করান প্রভু, মার্গদর্শন করান।
গুরুদেবের কান লাইনসম্যানের ফ্ল্যাগের মত নড়ে উঠলো, 'কি বল্লি, মাগ? তা সে চিজ দেখতে গেলে আমার সাহায্য কি পেয়োজন, বুঝলুম নে!
জিভ কেটে তাড়াতাড়ি বল্লাম - প্রভু, মার্গ, আই মীন রাস্তা।'
প্রভুপাদ ফরেন লিকারের মত জ্বলে উঠলেন, - ' ওরে ব্যাটা পাঁঠা, বাংলা বলতে কি পোঁদ ফাটে! কতোবার না বলেচি, আমার সামনে ভাষা মাড়াবি নে। তো তোর কানে তো দেখচি জন্মগত হাইড্রোসিল। কিচুতেই কতা কানে যায় না।'
স্রাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করে সবিনয়ে নিবেদন করলাম,- 'ভক্তান্তপ্রাণ, আপনি নির্ধনের ধন। অধমের অপরাধ মার্জনা কররেন। সঙ্গদোষে অধমের শতগুণ'নাশ হয়েছে। এখন এইমতে যদি পাতকীকে ত্যাগ করবেন, তবে প্রাণান্ত ব্যতীত উপায় দেখিনা।
"সে যাকগে ,তোরা বাঙালীরা তো জন্মগত শুয়ার। তোদেরকে রাস্তা দেকালেই কি সে রাস্তায় হাঁটবি? নইলে দ্যাক না, এত ভাল একটা 'ইজম' থাকতে লোকে খালি ওই কমিউনিজম আর ক্যাপিটালিজমের পিচনে ছুটে মচ্চে রে।
আমি না বুঝে কিছুক্ষণ নিরুত্তর রইলাম। শ্রীপাদ
কইলেন - 'বুইতে পারিস নি, তাইত? আহা বালবাচ্চা, তোর দোষ দিইনে। আসলে কি জানিস বাপ , সব ইজমের বড় ইজম হলো 'ইউজ অ্যান্ড থ্রো'ইজম। রাম থেকে আশারাম, বার্বাডোজ থেকে বারবনিতা, লেবার পেইন টু ডট পেন, স্ত্রী থেকে ইস্তিরি সবক্ষেত্রেই এর নানারকম ব্যবহার দেকতে পাবি। অন্য 'ইজমে'র মত ভ্যান্তারা নেই, তাই ফলো করাও সহজ। একটাই ট্যাগলাইন - কাজে ফুরালো? আচ্ছা বেশ, আসুন তাইলে! যেমন সস্তা তেমনি টেকসই। নাহলে আর কমিউনিজম কিংবা ক্যাপিটালিজম , সে যা'ই বলিস, সেগুলো ওই মিত্তিরদের আপেলগাছের মত। কাশ্মীর থেকে মিলিটারি ছেলে গাছ এনে লাগিয়ে দিলো। কি, নাকি হরেন মিত্তির আপেল খেতে ভালোবাসেন! তা কাশ্মীর থেকে গাছ নিয়ে আসতে পারিস, পুরো কাশ্মীর'টাকে তো আর তুলে আনতে পারবি নে রে চাঁদু। ফলে যা হওয়ার তাই হলো ।
এখন মিত্তির'দের মেজোবৌটা পোয়াতি হয়ে আমড়া'র বদলে আপেলের চাটনি খাচ্ছে।'
'প্রভু, যদি একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝাতেন, বড় ভালো হতো।' আমি কিন্তুকিন্তু করে বল্লুম।
'ওরে আমার মাদিমুখো হুতুম রে, ওলে আমার হনোলুলুর লুলুরাম, আমার তালুকদারের শালুকখেকো ভালুক!'
আমাকে কি কেনা মাগ পেইচিস? যেমন করে ফাঁক করতে বলবি, তেমনি করেই ফাঁক করব?'
আমি কিছু না বলে শান্তিবারি'র পাত্র প্রভুপাদের হাতে তুলে দিলাম। প্রভু, এক চুমুক দিয়ে, তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে, বল্লেন - যেমন ধর, রুমাল', তারপর খানিক ভেবে বল্লেন, 'কিংবা ধর, ব্রাত্য বসু। দিব্যি নাটক ফাটক ছেড়ে বক্তিমে মেরে শিক্ষেমন্ত্রী হয়ে গেসলো। কিন্তু বালবাচ্চা তো, নিজের কন্ডমত্ব নিয়ে জ্ঞান ছিল না। এট্টু নড়েচড়ে বসে যে'ই ইয়ে টাচ্ করেচে, ব্যস, ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। এখন দ্যাখ, পর্যটনে গিয়ে কেমন বেড়াল সেজে ল্যাজ নাড়াচ্চে।'
'প্রভু? এই মার্গ কি আধুনিকতার দান, নাকি পুরাকালেও এর প্রচলন ছিল?
চাকনার প্যাকেটের নিভৃত হতে একটা চানাচুর দানা'কে সন্তর্পনে তুলে নিয়ে প্রভু বল্লেন - 'ছিল বৈকি, এইত স্বয়ং ব্যসদেব তোদের মহাভারতে এই ইউজ অ্যান্ড থ্রো'র কত উদাহরণ দিয়ে গিয়েচেন। এই ধর, দ্রোনাচার্য। সারাজীবন রমাকান্ত আচরেকরের মত অর্জুনের নাম ভাঙিয়ে খেলেন। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের সময় পেনশনের লোভে স্যাট করে কৌরবদের পক্ষে চলে গেলেন। দ্রৌপদী সখা সখা করে কৃষ্ণ'টাকে দিয়ে কি না করালো, বলতো? আসলে ও ধড়িবাজ মেয়ে, ঠিক বুঝে গেসলো, সখা'র এট্টু আলুর দোষ আছে। সেটাকেই সারাজীবন এক্সপ্লয়েট কল্লো। অথচ অন্য সময় সেই পাঁচজনের সঙ্গেই …
'মহারাজ, কুন্তীও কি …'
'না, কুন্তীর ব্যাপারটা অন্য। ও তো প্রথমেই কর্ণকে থ্রো করে দিয়েচিল। পরে যখন দেকলো, মালটা কাজে লাগবে, তখন আবার ইউজ করে নিলো। এ ঘটনা এখনো আকছার ঘটছে, বাওয়া। কেবল ঘটা করে আমরা এখন একে রি-সাইক্লিং বলে ডাকি, এই যা।
'কিন্তু প্রভু, সবই যদি ব্যবহার করিয়া ফেলিয়া দেওয়া হয়, তাহলে তো ঐতিহ্য …
'আরে রাখ তোর ঐতিহ্য! জল দে, জল। বড্ড র ঢালছিস। একে তো ছিনাল মাগী, তার আবার দু পায়ে আলতা! থু থু থু।' প্রভুপাদ থুতকুড়ি ছিটালেন। কিন্তু সেটা সমাজসংসারের প্রতি তীব্র বৈরাগ্যে, নাকি মুখের মধ্যে আরশোলা প্রভৃতি তুচ্ছাতিতুচ্ছ কীট পতংগের অবৈধ অনুপ্রবেশে'র দরুন, বোঝা গেল না।
'ঐতিহ্য হলো কন্ডমের মত। একবার লাগালি, তারপরেই গন্ ফট্, এককালে 'হোয়াট বেঙ্গল থিংস টু ডেই, ইন্ডিয়া থিংস টুমরো' খুব শুনেছি। আমরা শুনতেই থাকলাম। সারা ইন্ডিয়া 'ইউজ অ্যাণ্ড থ্রো'ইজম শিখে চড়চড় করে এগিয়ে গেল। আর আমরা ন্যাশনাল ইন্টেগরিটি ধরব, না জাত বাঁচাতে নাইট হয়ে শারুক্ষানের ইয়ে ধরব ভাবতে ভাবতেই কেলিয়ে যাচ্ছি।
একসময় নিজেদের একই সাথে বাঙলীও ভাবতুম, আবার ভারতীয়ও। এখন দ্যাখ, এপাশে বাকি ভারতীয়রা আমাদের বাঙাল বলে খিস্তোচ্ছে। আর ওপাশের বাঙালীরা বলছে মালাউন।
সবই এই 'ইউজ অ্যান্ড থ্রো'ইজমের মহিমা, বুইলি?
আরে বাওয়া, ভগবান বলিস আর সময়ই বলিস, কোন এক বিদগ্ধ ঢ্যামনা বসেবসে ক্যালেন্ডারের পুরনো পাতাগুলোকে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্চে, সেটা তো বুঝিস, নাকি?
এই দ্যাক না, একদিন কৃষির টুপি ছিল সবচে প্রিয়। কদিন মাথায় থাকল। লোকে ভাবল - মহা সুরমা। ইউজ হলো, থ্রো'ও হলো। তাপ্পর এলো শিল্পায়ন। সে নিয়েও যথেষ্ট নাচোনকোঁদন চল্লো। আর একন দ্যাখ, বাঙালী কালচারের ধুতির নিচে বাবাজীর ঘন্টার মত একদিকে ঝুলছে দার্জিলিং, অন্যদিকে জয় অম্বেমাতা, জগদম্বে মাতার প্রভাতীভজন। ঐতিহ্য, মাই ফুটটটট!
প্রভু 'ফুট' বলে ফুটপাথেই ফুটলেন। রাবীন্দ্রিক ভাষায় 'বিকশিত'হলেন আর কি! সেটাই তার ডেইলি রুটিন।
ফেরার পথে আমি ভাবছিলাম, কে কাকে ইউজ করে?
ঝাঁ চকচকে ডি.পি ওয়ালি মেয়েগুলোকে বাহাত্তুরে যাওয়া বুড়ো কবিকুল, নাকি বুড়োগুলোকে ছুঁড়িরা?
ফেসবুকে নিত্যই দেখি শতসহস্র ইউজ অ্যান্ড থ্রো'র উদাহরণ। কখন শুনছি, কোন বুড়ো হাবড়া কবি নাকি কোন অল্পবয়সী ছুঁড়ির দিকে নেকনজর দিয়েছেন। কবিতা লেখার জন্যে বাংলাদেশ বা উটি, যেখানেই যান না কেন, ইঁদুরধরা কল, হাঁপানির ওষুধ আর কন্ডোম নিতে ভুলছেন না। তারপর প্রয়োজন মিটে গেলে (প্রয়োজন বলতে ওই গা টেপাটেপি, এ বয়সে আর কি'ই বা পারবেন! দাঁতও নেই, ধুতিতে তাঁবু খাটানোর জোরও নেই। মনেমনে যদিও " অরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা" হয়ে আছেন। কিন্তু তাই বলে পুচ্ছ নাচানো তার সাধ্যের বাইরে। দু একবার চেষ্টা করে দেখেছে, ইস্টুপিড, দাঁড়াতেই পারেনা, তার নাচবে কি!) তাদের ফেলে দিচ্ছেন। আবার সেদিন এক বুড়ো'র পোস্টে দেখলুম, ব্যাপারটা উল্টো। ডবকা ছুঁড়িরাই নাকি বুড়োদের ইউজ করছে। তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই ফুলিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে। সেগুলো যখন উড়েউড়ে প্রকাশকদের দোরগোড়ায় এসে পড়ছে, আর প্রকাশকরা সেটাকে ভ্যাম্পায়ারের অন্ডকোষ কল্পনা করে ফটাস করে ফাটিয়ে দিচ্ছেন। তা থেকে যখন পিলপিল করে যখন ফক্সট্রট নাচতে নাচতে গাদাগুচ্ছের কবিতা বের হচ্ছে, তখন তাদের চাল'খানা দেখলে মনে হয়, কোন মোঘল খানসামা যাচ্ছে! কিন্তু বুড়ো'রাও আজকাল ছুঁড়িদের কি কাজে লাগছে? কি জানি, বাবা। কত ক্যাটাগরিই তো দেখি, ব্রুনেট, অ্যামেচার, ওয়েবক্যাম, ফুট ফেটিশ, ইনসেস্ট, ওলড অ্যান্ড ইয়াং।
গুরুদেব ধ্যানস্থ না হলে জিজ্ঞেস করতাম, ই কি রকম গর্ভযন্ত্রণা। কে কাকে ইউজ করছে? কে কাকে থ্রো করছে? মাটির ভাঁড়কে আমি? নাকি আলটিমেটলি মাটির ভাঁড়টাই আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়? আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ডটপেনটা কি আমাকে মনেমনে খিস্তোয়?
একবার ইজাকুলেশন হয়ে গেলে বৌ'ও আমাকে পাত্তা দ্যায় না। দিব্যি পাশ ফিরে শোয়্‍ কন্ডোমটাও কি তেমনই কিছু ভাবে? মশকিউটো কয়েলের প্যাকেটগুলো ? কলকাতা যাওয়ার পথে প্রত্যেকবার যেকটা 'রেল নীরে'র বোতলগুলোকে ফেলে আসি, আলটিমেটলি তারা কোথায় যায়?
একদিন চলন্ত রেলকামরা থেকে একটা বাংলার বোতলকে রেল লাইনে পড়ে চৌচির হয়ে যেতে দেখেছিলাম। সেটা সুইসাইড ছিল না তো?
পলিথিনের প্যাকেট গুলোকে দিনরাত এখানে ওখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। সে কি পরিবেশ দূষণ নাকি ওরা ভিতরে ভিতরে কোন একটা "ছোট্ট" ইস্যু নিয়ে এককাট্টা হচ্ছে। ওই যে সেদিন শুনলাম, পলিপ্যাক মাথায় ভরে খেলতে গিয়ে এক সাত বছরের শিশু দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে। তাহলে কি …
বুঝলাম, পরিবর্তনকে ভয় পাচ্ছি। বদলার ভয়ে ইনসিকিয়র হয়ে পড়ছি। হাত ঘামছে। পা ঘামছে। গেঞ্জি জাঙিয়ার ভিতর থেকে একটা সোঁদা ভয় এসে নাকের মা'মাসির গুষ্টির পিন্ডি চটকে দিচ্ছে।
ঠিক করলাম, সামনের উইকেন্ডেই কোন কার্ডিয়াক স্পেশালিস্টকে হার্টটা একবার দেখিয়ে নিতে হবে।

আপনার মতামত জানান