প্রকল্পঃ Use n throw

সরোজ দরবার

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

Go as you like - কথাটা কেন কে জানে ঠিকঠাক বুঝতে পারতাম না। মনে হত গোয়ায় জুলাই উইক বলছে। সেরকমই প্রথম যখন Use n throw কথাটা চালু হল, সেটাকেও ভালো বুঝতে পারিনি। অন্যের মুখে শুনে মনে হত ইউ- জ্যান্থ্রো। কীরকম একটা ‘সেই সাপ জ্যান্ত’ টাইপ ব্যাপার। তা এহেন বিষাক্ত জিনিসকে যদি জ্যান্ত সাপের মতো শুনতে লাগে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর বিষয়টাও না বুঝতে পারারই কথা। কেননা নিজের নিয়তি কে আর প্রথম ধাক্কায় বুঝতে পারে।
ব্যবহার এবং ছুঁড়ে ফেলার প্রথম দীক্ষাটি দিল একটি কলম প্রস্তুতকারক সংস্থা। অল্প দাম। লাল-কালো- সবুজ- গোলাপী- ম্যাজেন্টা- স্কাই ব্লু হরেক রঙয়ের কারবার তার। এবং প্রত্যেকটিই আলাদা। টপাটপ কেনা শুরু হল। নীল আর কালোটাই বেশি ফুরোত। শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চের উপর রেখে ক্যারামের গুটির মতো এক টোকা। সাঁ করে জানলা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যেত ক’দিনের নিত্যসঙ্গী। সেই শুরু। তখনও নিউটনের তৃতীয় সূত্র সিলেবাসে ঢোকেনি। ফলে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সমান হিসেবে জ্ঞানচক্ষু বিকশিত হয়নি। হলে অন্তত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অমন বেয়াড়াপনা করতাম না।
কিন্তু কর্মফল তো খন্ডানোর উপায় নেই। একদিন ওই সাঁ করে ছুটে যাওয়া কলম গিয়ে প্রণত হল ঠিক অঙ্কের স্যারের পালিশ করা বুটযুগলের সমীপে। অজ্ঞাতবাসকালে অর্জুন যেরকম তীর ছুঁড়ে গুরুজনদের প্রণাম জানিয়েছিলেন, তারই আধুনিক সংস্করণ হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু এক্ষেত্রে গুরুদেব মোটেও প্রীত হলেন না। ফলত মহাভারত অশুদ্ধ হল। বেদম বকাঝকার শেষে ঘাড়ে এসে চাপল কেশব নাগের একদফা। সেদিনই বোঝা উচিত ছিল কোন নাগ বেশি বিষাক্ত। কিন্তু কী যাতনা বিষে, বুঝিবে কি সে, ইউজ হয়ে যে না থ্রো হয়েছে শেষে? আজকে মনে হয় প্রকৃতপক্ষে ওই কলম প্রস্তুতকারী সংস্থাটা ছিল দেবদাসের চুনীবাবুর মতো। অবনতির এক সোপান নামিয়ে দিয়ে তিনি কেটে পড়লেন। কলম থাকল কলমের মতো, কিন্তু ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলার অভ্যেস একেবারে শিরায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেল।
এই শিরায় শিরায় অপমানের জ্বালা সইতে সইতেই প্রথম এক বন্ধুর মুখ থেকে কথাটা বেরিয়েছিল- পুরো ইউজড করে ফেলে দিল বুঝলি। সে এক সরস্বতীপুজোর প্রাকলগ্ন। পাকা গোঁফো নবম শ্রেণী, যারা স্কুলের পুজোর দায়িত্বে, তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল যে, মেয়ে স্কুলে চিঠি বিলি করতে যাওয়ার সময়, নরম গোঁফো অষ্টম শ্রেণীর দু’পিস এঁচোড়ে পাকাকেও সঙ্গে নেবে। সেই প্রতিজ্ঞাকারীকে পিতামহ ভীষ্ম ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেনি বন্ধুটি। ফলে চাঁদা তোলা থেকে, দশকর্মা বাজার অনেক কিছু দায়িত্ব নিজে নিয়েছিল। কিন্তু যথাসময়ে দেখা গেল, স্যার আর কাউকে যেতে বারণ করেছেন, এহেন ফরমান ঝুলিয়ে নবম শ্রেণীদের গুটিকয়েক উদ্ধত হারকিউলিস-দু’চাকা উড়ে গেছে সারদা বিদ্যামন্দিরের দিকে। ঠিক তখনই কথাটি বলেছিল বন্ধুটি। আমি বললাম, তোকে তো তার মানে ঠকিয়ে দিল। সে বলল, উঁহু ঠকানো নয়। বাজারে মাছব্যাপারি অবধি তাকে একটা চিংড়ি মাছে ঠকাতে পারেনি আর এরা ঠকাবে! ইউজড করে ফেলে দিল, ছুঁড়ে ফেলে দিল, তুই বুঝবি না।
তা না বোঝারই কথা। যেমন যে কোনও ভাঙা প্রেমই দাবি করতে পারে যে, সে ইউজড হয়েছে। কিন্তু তা নয়। ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম আর তোমায় তা দিলাম, সেখানে মুক্তো পেলে না বলে, ছুঁড়ে ছুঁড়ে তারে ফেলে দিলাম- সে তো একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এর মধ্যে ব্যথা যতই ঘন হোক না কেন, ইউজড হওয়ার প্রশ্ন নেই। ইউজ অ্যান্ড থ্রো এরকম নির্বিষ কালনাগিনী নয়। সোহাগিনীরা বছরখানেক সঙ্গে থাকলে বোঝা যায় এ বস্তুটি আসলে কী, বিশ্বাস না হয় উপন্যাসটি পড়েই দেখুন। কিন্তু নিজের প্রথম প্রেম ভাঙার পর বাজপড়া তালগাছের মতো মুহ্যমান সেই বন্ধুটিই যখন বলেছিল, ইউজড হওয়া আমার ভাগ্যে লেখা, তখন খানিকটা কনফিউজড হয়ে পড়েছিলাম। প্রেমও সে নিজের ইচ্ছায় করেছিল, এবং প্রেমিকাকে খুশির মগডালে চড়াতে যা যা সে করেছিল, তাও স্বেচ্ছায়। পরে সেই না টেকা প্রেমকে ‘ল্যাঙ খাওয়া’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, কিন্তু ইউজড নয়। উলটপুরাণও আছে। কলেজ ফেয়ারওয়েলের একেবারে শেষ লগ্নে ডুকরে কেঁদে উঠে এক বান্ধবী বলেছিল, আমি ইউজড হয়ে গেলাম। বলেছিলাম, এই সময়ে ব্রেক আপ এমন কী আর বড় ঘটনা। ও বলেছিল, আমার গোটা কলেজ লাইফটাকে ও নিজের মতো ব্যবহার করেছে, এখন ও আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। স্মৃতি হিসেবেও এখন এই তিতো কলেজ লাইফকে আমি ব্যবহার করতে পারব না। অথচ জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেব সে উপায়ও আমার হাতে থাকল না। বল, ইউজড হলাম কিনা? উত্তর দিতে পারিনি, তবে এটুকু সেদিন থেকেই বুঝেছি, সমস্ত ইউজড হওয়ার ভিতরেই ল্যাঙ খাওয়া থাকে, কিন্তু সমস্ত ল্যাঙ খাওয়াই ইউজড হওয়া নয়।

তবে অনেকগুলো ইউজড হয়ে থ্রো হয়ে যাওয়া বস্তু কাছাকাছি এসে ভারী চমৎকার কিছু তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে কত ভালো ভালো শিল্পকাজ হয়। সে সবের প্রদর্শনীও হয়। সংসারে বেশীরভাগ সময় আমরা তা সুখী দাম্পত্য বলে চিনি। দম্পতিরা গোঁসা করতে পারেন, কিন্তু ঠেকে শেখার থেকে বড় শেখা যে আর নেই, জীবনের তাবড় শিক্ষাবিদরাও সে কথা স্বীকার করবেন।
স্বীকার করি কিংবা না করি, এই ইউজড হওয়াটা প্রায় জলভাত হয়ে গেছে। আসলে ক্রমশ বুঝতে পারি ইউজড হওয়ার একখানা বড় বৃত্তের মধ্যেই আমি এবং আমরা ঘোরাফেরা করছি। কেউ বলবেন, আসলে যদি এই হয়, তাহলে নকলেটা কি? নকলে এই যে, সেই বৃত্তের মধ্যে বসে আমরা বিনিময়ের অঙ্ক কষি। এই যে হেড অফিসের বড়বাবু লোকটা বেজায় শান্ত এবং তার যে এমন মাথার ব্যারাম সেটাও সবাই জানত। সকলেই যখন জানে, ইউজড হওয়াটাই সিস্টেমের দাবি, তখন বিনিময়ে বেতনের হিসেব মেলাতে থাকে। এই যে আপনার ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ড ইউজ করেই কেউ কেউ সুইস ব্যাঙ্কের দিকে এগোচ্ছেন, সে কি আর আমি- আপনি জানি না? জানি। শুধু মেগা অফারের বিল পিছনের পকেটে ঢোকাতে গিয়ে ভাবি, কোন ফাঁকে ইউজ হয়ে থ্রো হয়ে গেলাম। এতটাই মসৃণ সে পদ্ধতি। প্রতিবার নখের ডগায় কালি মেখে নেওয়ার সময় বুঝতে পারি এই গণতান্ত্রিক অধিকার ইউজড হয়ে আসলে সে কালি চুনসমেত মুখের উপরেই থ্রো হবে। তবু করি। কেননা ওই অভ্যেসের দোষে।

অভ্যেসের ধ্বজা তুলে নিজেকে যদি ধোয়া তুলসীপাতা বলতে এক গলা গঙ্গাজলে নামি, তবে মা গঙ্গাও ভগীরথকে ডেকে বলতে পারেন, আমাকে তুই আনলি কেন ফিরিয়ে নে। হেলথ ড্রিঙ্কসে ফ্রি পাওয়া ফ্লাইং সসার থ্রো করা ছাড়া যার আর কিছু থ্রো যার ক্ষমতায় কুলোয় না, সেও এই ইউজ-থ্রো খেলায় দিব্যি অংশ নিতে পারে। এবার আর অভ্যাসের দোষে নয় বরং অভ্যাসের গুণেই সে খেলাতে পাকাপোক্ত হয়ে উঠতে পারে। ফলত যে ‘স্নেহসবুজ ঋণ’ নিয়ে এতদিন টিকে আছি তাঁকেই ক্রমশ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি মেদুর নস্ট্যালজিয়ার আস্তাকুঁড়ে। প্রত্যেকটা দিনকে ব্যবহার করেছি আগামী দিনের খাতিরে, তারপর ‘যে দিন ভেসে গেছে’র লেবেল লাগিয়ে তাকে ভাসিয়ে দিয়েছি। যেভাবে গ্রেট বিট্রেয়ালের ইতিহাস বিপ্লবীদের ব্যবহার করে ছুঁড়ে দেয় সন্ত্রাসীর সাফাইয়ে, ছুঁড়ে দেয় সন্ত্রাস শব্দের অর্থ বদলে গেছে জেনেও। যেভাবে ইতিহাসকে ব্যবহার করে কালের পাদানিতে দাঁড়িয়ে থাকে বর্তমান আর তাকে কাটছাঁট করে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বইয়ের পাতায়। বর্তমান নিজেও জানে সে একদিন ব্যবহৃত হয়ে ইতিহাস হয়ে যাবে। আমিও জানি।
দেখতে দেখতে এই ইউজ অ্যান্ড থ্রো একটা প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়। যার ভিতর মাথা গলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আমি। কতটা ইউজড হলাম আর কতটা ইউজ করলাম, তার ব্যালান্স সিট মেলাতে মেলাতেই তৈরি হয় কতটা থ্রো হলাম আর থ্রো করলাম তার হিসেবখাতা। দেখি একবার এর ঘরে ঢ্যারা পড়ছে তো ওর ঘরে টিক মার্ক। একবার এদিকের পাল্লা হেলছে তো একবার ওদিকের। ধর্মের কাঁটা যেন মাথা যেন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বেজায় হাসছে আর বলছে কী অঙ্কটা মিলল?
অঙ্কটা তো সেই তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদর ওঠার অঙ্ক। সেদিনও মেলাতে পারিনি। আজও মেলে না।

আপনার মতামত জানান