গোলমেলে ইউজ & সন্দেহবাতিক থ্রো

ইন্দ্রনীল বক্সী



এমনি এলেবেলে চিন্তা-টিন্তা করে কদিন বেশ কাটাচ্ছিলাম , লেখালিখির কুটোটাও নাড়ছিনা ,ভাবখানা এমন – “বেশ করবো লিখবনা ! আমার মর্জি !”কিন্তু আসল কেস হচ্চে মাঝে মাঝে কেমন সব জানি ফাঁকা হয়ে যায় ! একদম বেবাক বোকা হয়ে ,কি লিখবো –তাই ছাই ভেবে পাইনা । এব্যাপারে শুনেছি বিরাট কোহলী আর অধম ইন্দ্রনীল , যেই হও, ব্যামোটা একই ...
যাইহোক লেখা ছেড়ে দিয়েছি নাকি খোঁজ নিতে অভিক ইনবক্স করলো , আমি বললাম কেমন‘ঝিম’ মেরে আছি ..... এবং ইত্যাদি । তা কিছুক্ষণ পরে শ্রী অভিক সম্পাদক দত্ত দড়াম করে আবার ইনবক্স করলেন দাবী – লিখতে হবে ,বিষয়- ইউজ এন্ড থ্রো ! ...এ আবার কি বিটকেল বিষয়রে বাপু ! তা আজকাল অবশ্য এসব তেমন প্রচলিত বিষয় নয় বিষয়কেই বেছে নিচ্ছে সম্পাদকেরা । পাঠক পটাতে বেশ একটা নতুন কিছুর সন্ধানে । সে নাহয় ভালো কথা এখন দেখি কি করা যায় ,বলে ‘ঈশ্বর’এর নামে নেমে পড়লুম । প্রথমেই এসব এবং সব ব্যাপারেই যিনি এখন আমাদের ‘ঈশ্বর’ ,তাঁর শরণাপন্ন হলাম মানে আমাদের এক অদ্বিতীয় ‘গুগলবাবা’ ।
সন্ধানবাক্সে ‘ইউজ এন্ড থ্রো’ লিখতেই দেখি প্রথামতো বেশ কটা লিংকের ঠিকানা , গুচ্ছের পেনের ছবি ! চোখ আটকে গেলো ‘থ্রো এওয়ে সোসাইটি’ বলে উইকির ঠিকানায় । ওমা ! এতো বিরাট কেলেংকারী ! মূলতঃ বর্তমান পণ্যভোগী সমাজই নাকি এই ‘থ্রো এওয়ে’ সমাজ । বরং বলা ভালো অতিপণ্যভোগী ! এই ছুঁড়েফেলাগ্রস্থ সমাজের নামের পিছনের সূত্র ১৯৫৫এ আমেরিকার ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনে বেরোনো একটি আর্টিকল ‘ থ্রো এওয়ে লিভিং’ । ভেবে দেখার , একচুয়েলি ভেবে দেখারও কিছু নেই , আমরা জানি আমরা প্রতিদিন বাঁচতে বাঁচতে ,ভোগ করতে করতে কতকিছু ছুঁড়ে ছূঁড়ে ফেলছি ! জিনিসপত্র , প্যাকেট-স্যাচেট, খাবার-দাবার ,বর্জ্য-টর্জ এমনকি সম্পর্ক-টম্পর্কও ! এর পরিমাণ কি হতে পারে ! নিউইয়র্ক সিটির জঞ্জালসংগ্রহ বলছে যেখানে ১৯০৫ সালে এর পরিমাণ ছিলো মাথাপিছু ৯২ পাউণ্ড , ২০০৫ এ গিয়ে সেটা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২৪২পাউন্ড ! এসবই মানুষের ব্যাবহার করে ছুঁড়ে ফেলা ঠোঙা বা বস্তু (সম্পর্কের ওজন এখানে ধরা নেই যদিও ) । ২০০৪ এ এরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয় বলছে ৫০% খাবারদাবারই নাকি ছুঁড়ে ফেলা হয় ,খাওয়া হয় না ! বোঝো !
এই তো বছর দুই আগে গেছিলাম মাইথন পিকনিক করতে । নৌকায় ভ্রমণ করতে করতে লক্ষ্য করলাম বিশাল জলাধারের পাড় বরাবর একটা সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে । কাছে যেতে দেখলাম হাজার হাজার ব্যাবহার হয়ে যাওয়া থার্মোকলের থালা !...পিকনিক পিকনিক ! আমাদের বন ভোজনের অসভ্যতার স্মৃতি ! এই থার্মোকলের থালা বেরিয়েই বড্ড বাজে ব্যাপার হয়েছে । পাড়ায় কোনো অনুষ্ঠান বাড়ি হয়ে গেলেই দেখবেন পাড়ার ডাস্টবিনে শয়ে শয়ে পড়ে থাকা কারো বিয়ে কিংবা অন্নপ্রাশন কিংবা শ্রাদ্ধ কিংবা বিয়ের জন্মদিন চাটছে একপাল কুকুর , টানতে টানতে এনে ফেলছে মাঝরাস্তায় । আগেও ব্যবস্থা একই ছিলো , শুধু শালপাতা হওয়ায় তা একসময়ে পচে যেত ,দিব্যি মাটি হয়ে যেত – এই যা ।
এই ‘ইউজ এন্ড থ্রো ’ কথাটা সম্ভবত প্রথম শুনি বল পেনের ক্ষেত্রেই । আরও অনেক কিছুই আমরা ব্যাবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দিই ,কিন্তু এটাকে কেমন যেন দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ঐ মাছরাঙার মতো ।
কতকিছুই না বেড়িয়েছে ইউজ করে ছুঁড়ে ফেলার , বরং কি কি ব্যাবহার করে ছুঁড়ে ফেলবোনা –সেটা ভাবতে সময় লাগবে বেশী । এক্ষেত্রে কিছু বাধ্যতা আছে যদি মানেন – যেমন একাডেমিক সার্টিফিকেটস , সংসারে বাবা-মা , ছেলে-মেয়ে , স্বামী-স্ত্রী , ধর্ম পরিচয় ,জাত পরিচয় ,ডান-বাম, ওরা-আমরা ,সম্পত্তি ...কেচ্ছা ,এইসব আরকি । বস্তুগত দিকদিয়ে একদম বিন্দাস আমরা ! ছুঁড়ে ফেলার ভান্ডারে কি নেই ! পেন থেকে শুরু করে মোবাইল , উপগ্রহ থেকে অন্তর্বাস , হ্যাঁ, ডিসপসেবল অন্তর্বাস বাজারজাত হয়েছে আমাদের এই পোড়া ভারতেও । এছাড়াও রয়েছে মহিলাদের রাস্তায় ঘাটে প্রাকৃতিক প্রয়োজনের কথা ও সমস্যার এবং সংক্রমণের কথা মাথায় রেখে তৈরী হয়ে ‘পি-বাডি’ ইউজ এন্ড থ্রো ফানেল ।
আমরা এখন বেশ ঝাড়াহাতপা , প্রয়োজন মতো ব্যাবহার করো এবং ফেলে দাও - আমাদের একটা উন্মুক্ত ও উন্মত্ত জীবন দিয়েছে । বড় শহরে বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে কাউকে স্বামী বানিয়ে বা স্ত্রী বানিয়ে ব্যাবহার করতে পারি , ভিসা পেতেও ,শুধু সময় মতো ছুঁড়ে ফেল্লেই হলো । সমুদ্রতীরে , ঘরের নিভৃতে ভালোবাসাবাসি করে কয়েক আউন্স তরল ভালোবাসা ল্যাটেক্সে গিঁট মেরে ফেলে দিতে পারি সৈকতে,বা বাড়ির জানালা দিয়ে রাস্তায় , এই নিয়ে আমার ভাইয়ের মতো বন্ধু শৌভিক বন্ধোপাধ্যায় একটা আস্ত গল্পই লিখে ফেলেছে । রাস্তায় ঘাটে ব্যাবহৃত স্যনেটারি ন্যাপকিন গড়াগড়ি খাচ্ছে , “কি করবো ! আমিতো কাজের মেয়েকে বলেছিলাম ডাস্টবিনেই ফেলতে ,...তাহলে নিশ্চয়ই কুকুরে...!”...ঠিক , এর পিছনে কুকুরদের মার্জিত রুচির অভাবই দায়ী ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এইযে তখন থেকে একমুখি বস্তুবাদী কথাবার্তা কয়ে চলেচি ! এর বাইরেও কি এই ‘ব্যাবহার আর ছুঁড়ে ফেলা’ নেই ? আছে, গুচ্ছের আছে । এই তো সেই কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া আম্রপালী , যাকে একদিন লিচ্ছবীরা ‘জনপদকল্যানী’ করে রাজার সমান প্রাসাদ ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে নগর বৈশালীতে রাখলো । ধনীরা প্রচুর ধনের বিনিময় দিনেরপর দিন তাকে ভোগ করলো ,তার আশ্চর্য রূপের আগুন পোহালো , তারপর ? তারপর একদিন ছুঁড়ে ফেলে দিলো । বসন্তসেনারও কোনো রিটায়ারমেন্ট স্কীম ছিলো কিনা জানা যায় না । আম্রপালী বা বসন্তসেনার মতো ইতিহাসের গল্প হয়ে ওঠেনি হয়তো , কিন্তু কত কত কাহিনী আছে এরকমই প্রতি শহরে প্রতি জনপদে , আমাদেরই আশেপাশে ! আরে বাবা এইযে ‘সহবাস আইন’ নামে একটা যন্তর হয়েছে , এওকি তাই নয় ! বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ‘ব্যাবহার’ করে তারপর ‘ছুঁড়ে’ যাতে ফেলতে নাপারে তার লেগেই । এখন প্রতিশ্রুতি আর প্রতিশ্রুতর হাসিরগল্প আজকের দিনে কোনদিকে গড়াবে সে অন্য তক্কো ।
আবার রাজনীতিতেও চলছে গণতন্ত্রের ঘাড়ে চেপে শাসন হাতিয়ে ,তাকেই বুড়ো আঙুল দেখানোর রেওয়াজ ,ওই ‘ইউজ এন্ড থ্রো’ ফর্মুলাতেই !
দিস্তা দিস্তা খবরের কাগজ রোজ আছড়ে পড়ছে আমাদের ঘরে ঘরে , আমরা রোজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছি ,বিজ্ঞাপন চাখছি । ব্যাস , দিন ফুরোলেই কাগজ রদ্দি ! পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা নানান রাজনীতির রং-ঢং , চুক্তির চকমকি , বহুতল আগুনের উত্তাপ , ধর্ষনের ঘৃণা , খেলার মহাবিক্রমের জয় –পরাজয় , সাহিত্য, গবেষণা ,খুব জরুরী প্রবন্ধ স্রেফ রদ্দি ! আমাদের মগজ থেকেও বেমালুম ইরেজ হয়ে যাচ্ছে তুমুল ডেটা ! থরে থরে সাজিয়ে সিঁড়ির তলায় জায়গা করে দিচ্ছি সুসম্পাদিত দেশ-কাল-সমাজের ঘটনাবহুল একটা দিনের দিনপঞ্জি কিলোদরে ! ...পরবর্তী রদ্দিওয়ালার আসার অপেক্ষায় ।
কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে না ? কোথায় থার্মোকলের থালা থেকে পি-বাডি! আম্রপালী থেকে রদ্দি খবরের কাগজ ! সত্যিই ! আমিকি ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে লিখতে বসেছি নাকি ? নাকি পরিবেশ দূষণ নিয়ে ! আমারও কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে !...
কিন্তু এই সব ক্ষেত্রেই দুটো জিনিস কিন্তু কমন – ব্যাবহার এবং ছুঁড়ে ফেলা । সে ব্যাবহারিক , শারীরিক , মানসিক –যেভাবেই হোক । এটাই আমাদের অভ্যাস ,ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে ঢুকে পড়ছি আর একটা অভ্যাসে , অন্য একটা বিশ্বাসে । ব্যবহারযোগ্য যাকিছু , নিমেষে ব্যাবহার করছি তার থেকেও ক্ষিপ্রতায় ছুঁড়ে ফেলছি তার আধেয়হীন আধার । আমাদের শরীর পুরানো কোষকে বাতিল করবে , নতুন কোষ গড়ে তুলবে , আমরা এক অমূল্য মানব সম্পদকে ব্যাবহার করবো , ব্যাবহার করবো এবং একদিন ‘সিনিয়র সিটিজেন’ নাম দিয়ে বাতিল করবো , অনেক স্মৃতি জড়ানো বাল্য প্রেমকে বাতিল করে প্রেমান্তরে যাবো , বাড়ির প্রাচীন পলেস্তারা খসিয়ে নতুন পুট্টি লাগাবো ঝলমলে রঙ সহ ... ছেলেমেয়েরা ক্রমে শৈশব বাতিল করে বড় হয়ে যাবে দুম করে...এসবই কি ব্যাবহার এবং ছুঁড়ে ফেলা নয় ! এই ‘ছুঁড়ে ফেলা’ শব্দবন্ধটি হাল্কা রূঢ় শোনালেও আমাদের রোজের যাপনে এতো থেকেই যাবে । নিজেদের বাতিলের স্তুপে চড়তে চড়তে মাঝে মাঝে শুধু স্তুপ খুঁড়ে খুঁড়ে হঠাৎ করে মায়ের আলমারিতে রয়ে যাওয়া ছোটবেলার জামা , খুঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারে বাল্যপ্রেমের স্মৃতি , এখন কংক্রীটচাপা কুমীরডাঙার মাঠ ...। ছুঁড়ে ফেলাতেও আমরা নিয়ে নিচ্ছি কিছুটা আত্মহংকারের আরাম । তাই এই ব্যাবহার ও ছুঁড়ে ফেলা চলবে ও চলছে ।
আরাম নিতে নিতে ভাবি আমার এ লেখা সম্পাদক ব্যাবহার করে আমাকেই ছুঁড়ে মারবে নাতো! অথবা...পাঠক কি প্রথমে ‘থ্রো’ করে তারপর ‘ইউজ’ করবে ! ...কি জানি !

আপনার মতামত জানান