বিষাদ, তোমায় স্থিতি কোথায় দেব?/ মুহূর্তেরা জীবন পেরোচ্ছেই

প্র্রবুদ্ধ ঘোষ


মুহূর্তরা চলে যাচ্ছে। যেমন যায় একের পর এক। সেদিন থেকেই আমার মুহূর্ত চেনা শুরু, যখন প্রাক্‌বালক বিকেলে বড়পিসিকে চুল্লীতে ঢুকতে দেখেছিলাম। একটা গনগনে আঁচ ঝপ করে লেগেছিল। দেখলাম, লাল। সেই এক মুহূর্ত। আমাকে থ বানিয়ে দিয়েছিল, অনর্গল কাঁদিয়েছিল। আমাকে ব্যবহার করে, কান্না নিংড়ে নিয়ে চলে গেছিল। সেই আমার ব্যবহৃত হওয়া শুরু। আমার ঝাপটে পড়া শুরু মৃত্যুবোধে। ঝামরে পড়া বর্ষাহাওয়ার মত আমাকে বহুদিন সেই শোকে রেখে মুহূর্ত চলে গেছিল। মুহূর্ত আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল আনন্দীর বাড়ির সামনে। অমৃতকৈশোর। আনন্দীর সাথে দু’দিন আগে শেষ কথা, তারপর আনত বর্ষায় স্কুলফেরত ওর বাড়ির সামনে। একা সাহস ছিল না ভীতু সে বয়সে। প্রলয় ছিল। বারো মিনিট আঠাশ সেকেণ্ড আমি আর প্রলয়, বৃষ্টিতে। কাকভেজা। পরাজিত আত্মানুকম্পা নিয়ে পেছন ফেরার সেই মুহূর্তে বারান্দায় এসেছিল। একবারও তাকায়নি, আনন্দী ভেতরে চলে গেল আবার। মুহূর্ত আমাকে ব্যবহার করেছে, অবজ্ঞায় হেসে সন্ধ্যার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। ব্যর্থতা-স্বাদ। তারপর আর পাত্তাও দেয়নি, ওমনি চলে গেছে সরলরেখায়।
নিষাদ উদ্যত। তার তীরনিক্ষেপের সে মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল একটি প্রাণ। মিথুনাবদ্ধ জীবন। মুহূর্ত ব্যবহার করল সেই ক্রৌঞ্চকে। রত্নাকর-ঠোঁটে অমোঘ সেই শ্লোক। তারপর সে মহাকাব্যে কোথাও সে ক্রৌঞ্চ নেই, নিষাদ নেই। পরিব্যপ্ত ক্রৌঞ্চীবিষাদ আখ্যান আরম্ভে। মুহূর্ত বলি দেয় এভাবেই। হয়তো। মৌষলপর্ব। ঠিক সেই মুহূর্তে অর্জুন আর তুলতে পারছে না গাণ্ডীব। মুহূর্ত ব্যবহার করছে তাকে, পতন দর্শনে। সহসা অতীত তাকে মনে করিয়েছে যুদ্ধবিলাস, নারীসঙ্গ, বিজেতাসম্মান...সেই মুহূর্ত তার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে সব। প্রস্থানভবিষ্যতভয় জাগিয়ে দিয়ে, সে মুহূর্ত চলে গেছে। সমুদ্র গিলে নিচ্ছে দ্বারকা। অথবা, বিচ্ছেদ? সেও বুঝি মুহূর্তেরই উদগ্র ব্যবহার। আশ্রমবালিকাকে পিছু টেনে রাখা হরিণশাবক নাকি, মুহূর্ত? বিগত হয়ে যাচ্ছে সব। দেখো, এই ছিলে সে অবস্থানে। ঠিক এই মুহূর্তেই তুমি আর সেখানে নেই। আর থাকবে না। তুমি পেয়ে গেছো সূর্যপ্রণয়। জেনে গেছো গভীর সে কৌশল। তাই, ভেলায় শিশুকে ভাসানোর কান্নামুহূর্ত তোমাকে ব্যবহার করছে, ছুঁড়ে দেবে আগামী যুদ্ধদিনে।
আমার মুগ্ধতা ভেঙ্গেছিল আলাপ থেকে বিস্তারের সেই সন্ধিক্ষণে। আলাউদ্দিন শুনছিলাম। সেই হেমন্ত্‌মুহূর্ত-আবেশ আলাপের সেই স্পর্শকাতরতা ছেড়ে মুহূর্ত এগিয়ে চলল। আমি বাঁধা পড়ে গেলাম। সেই হেমন্ত্‌মুহূর্ত আমাকে ব্যবহার করে নিল। তারপর...নোলানের ‘দ্য ডার্ক নাঈট’ শেষ দৃশ্যে যখন প্রবল গতিতে ব্যাটম্যান বেরিয়ে গেল, ঝুপ্‌-অন্ধকার। তখন হঠাৎ মনে হল, ‘আর নেই? কেন নেই?’। আমার সমস্ত উত্তেজনা, সব অপলক আশামুহূর্তকে ব্যবহার করে একঝটকায় শেষ করে থেমে গেল ছবিটা। আমাকে ছুঁড়ে ফেলল জোকারহীন, জোকারময় বাস্তবে। অথবা, রবিবার সেই ভরসন্ধ্যে মুহূর্ত! যখন একএকটা মিনিট-সেমিমিনিট চেটে নিই সময়ের থেকে। যখন প্রাণপণ ইলাস্টিকে ধরে রাখতে চাই, বেরিয়ে যাচ্ছে জেনেও সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ মুহূর্তকে সমস্বরে কিংবা একলা জাপটে ধরি! তখন কি মুহূর্তটা ঘাড় ঘুরিয়ে চলে যাওয়া আদুরে বেড়ালের মত হাসে? মুহূর্ত কি স্যাডিস্ট আনন্দ পায় না? কিছুটা উথালপাথাল আমাদের ব্যবহার করেই কালি-ফুরোনো পেনের মতই ভোররাতের দিকে ছুঁড়ে দেয় না? আর একটু পরেই সোমবার...
মুহূর্ত প্রিয়-মুহূর্ত বানিয়ে দেয়। আমাকে বারবার ব্যবহার করে নেয় সেখানে। আমি এখানে থেকেও ছুঁয়ে আসি প্রিয়-মুহূর্তদের। উঠতি বয়সে বাগবাজার, গোলাবাড়ি ঘাটের আড্ডা। বৈদূর্যের ঠাট্টামুহূর্তে হঠাৎই শাল্‌কের দিক থেকে একখণ্ড কালো। মেঘটা ঘন হয়ে আসার সেই মুহূর্ত, বর্শাফলায় ভেঙ্গে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। আহ! সোঁদা, আমাকে এখনো ভেজায়। তারপর মাথা বাঁচানোর দৌড় আর দহনবাস্তবে বাধ্যঅভিযোজন। নেতাই-হত্যার পরে সারারাত কোলকাতা শহরের বিভিন্ন গলিতে, কলেজের সামনে পোস্টার মেরে, রাজপথে সাদারং দিয়ে প্রতিবাদ লিখে ভোরের ট্রেনে যাদবপুর থেকে শিয়ালদা। না-ভোর। প্রথম ট্রেন। সাথে রক্তিমদা। রাতজাগা ক্লান্তস্বর। সেই মুহূর্তে দরজায় দাঁড়িয়ে হাওয়ার ঝলকটা! মনের ভিতরেই বানিয়ে নিয়েছিলামঃ প্রথম ট্রেন আসছে কুয়াশা সরিয়ে/ উত্তাপ ফিরছে/ তোকে হারাবো না আর/ এখন, শাল-মহুয়া ঘিরে থাকা মৃতদেহে স্বপ্ন ফিরে আসছে/ যেমন অনিবার্য বসন্ত ফেরে কুয়শা সরিয়ে/ আয়, ভোর... আমি সে মুহূর্তকে ব্যবহার করেছি। কিন্তু, মুহূর্ত যেভাবে ভুলে যায় আমার কথা। আমাদের কথা। কিছু নয়া পয়সা স্মৃতি ধরিয়ে বলে, ভাগ্‌! তারপর, সরলরেখায় হেঁটে যায়। না-ফেরা ফিরিওলার মত, না-ফেরা ইস্কুলবয়সের মত, না-ফেরা কথার মত। কিন্তু, আমি ভুলিনি সেসব মুহূর্তকে। ব্যবহার করে নিচ্ছি এই লেখায়। ঘেঁটে যাওয়া সুখ ও অ-সুখ থেকে তুলে নিচ্ছি... আর, এই মুহূর্তটাও চলে যাচ্ছে। ব্যবহৃত আমাকে, এই লেখাকে ছেড়ে... যাচ্ছে কোথায়?

আপনার মতামত জানান