ব্যবহারের মালভূমি, ছুঁড়ে ফেলার খাদ

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


-এটা কি? (বুকে লাগানো একটি পদক কে উদ্দেশ্য করে)
- আমাদের মহারাজের কৃপায় একটা জায়গির ভোগ করি... এটা তারই প্রতীক।
- রাজ অনুগ্রহের যোগ্যতা তোমার নেই। (টান মেরে সেই পদক ছিঁড়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলা)

ঝিন্দের বন্দী ছবির একটি বিশেষ দৃশ্যে, রাজারূপী গৌরী শংকর আর ময়ূরবাহনের মাঝে সংলাপের একটা ছোট্ট অংশ।

তারপর? ময়ূরবাহনের নীরব প্রত্যাবর্তন... কিন্তু শুধু কি তাই? নীরবেই সেই মাটিতে পড়ে থাকা পদকটা তুলে রাজার প্রহরীকে বকশিস দিয়ে চলে গেল ময়ূরবাহন।

ঝিন্দের বন্দীর প্লটটাই কিন্তু বহুমুখী... কেবল একজন অপহৃত রাজার পরিবর্তে একইরকম দেখতে একজনকে বসিয়ে, ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে যাওয়া নয়... এর বাইরেও এক এক কোণ থেকে দেখলে ব্যবহার আর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ দিকগুলো ঠিক চোখে পড়বে। এক জায়গায় ঝিন্দের আসল উত্তরাধিকার বন্দী, ঝিন্দের দেওয়ান সেই সর্দার গৌরীশংকর নিয়ে এলেও মনে মনে সেই আসল উত্তরাধিকারেরই অনুগত, এবং সিংহাসনে তাকেই বসাবেন সম্ভব হ'লে। তখন এই বিকল্প রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ আর সৌজন্যতার বেশি আর কিছু থাকবে না। এমন কি গৌরীশংকর ঝারোয়ার রাজকুমারীর আতিথ্য রক্ষা করতে গেলেও ফোঁস করে উঠছে সেই সর্দার, বুঝিয়ে দিচ্ছে - "সামলে চলো, ভুলে যেও না তুমি বাইরের লোক।" যার ফলশ্রুতি গৌরীশংকর সেই বেপরোয়া উক্তি "ভুলে যেও না সর্দার... আমি ঝিন্দের বন্দী নই, ঝিন্দের রাজা!" কারণ সেও জানত, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সে ভীষণ ভাবে ব্যবহৃতই, এবং পরিণতি যাই হোক, তাকেই শূন্য হাতে ফিরতে হবে। আর ঝারোয়ার সেই রাজকুমারী কস্তুরী বাই, জানানো না হ'লে তো উনি টেরই পেতেন না, কি ভাবে উনি ব্যবহৃত হয়ে গেছেন এই দাবার ছকে! সব শেষে সেই প্রতিনায়ক ময়ূরবাহন... যদি রাজার অনুগত না হ'ত, তা হ'লেও কি করে জুটত তার কপালে সেই অনুগ্রহের জায়গির? হয়ত শুধু সে নয়, তার পূর্বপুরুষও একইভাবে রাজার অনুগত থেকেছিল (যা গল্পের কোথাও স্পষ্ট নয়, তবে বোঝা যায়)... হঠাৎ করেই একটা প্রজন্মে এসে, একজন রাজার বিরুদ্ধ-আচরণ করে সে খল চরিত্র। সে বা তার বংশের এই শয়তানীই যখন রাজার পক্ষে, তখন সে অনুগ্রহের পাত্র... না হ'লে সেই পদক ওই ভাবে উপড়ে নেওয়া হবে, লুটোবে ধুলোয়! তার বুক থেকে পদক ছিঁড়ে নেওয়াটা ছবিতে হাইলাইটেড এবং গ্লোরিফায়েড... কিন্তু ওই দ্বাররক্ষীকে মেডেলটা বকশিস দিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত কিন্তু আর সেইভাবে হাইলাইটেড নয়... কোথাও কোনোদিন সেই দৃশ্যের প্রতি কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় না। লোকে বলে ‘অক্ষমের আস্ফালন”।

অবিশ্যি এমন ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য আর চিত্রনাট্য তো চলচ্চিত্রে কতই দেখা যায়। তবে এই বিশেষ ছায়াছবির এই বিশেষ অংশটা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে, যখনই ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ প্রবাদটা শুনি। একই সঙ্গে এই দৃশ্যে একজন কে দেখি পাশে দাঁড়িয়ে, সে ব্যবহার করছে একজনকে, এবং জানে তার কাজ ফুরোলেই ছুঁড়ে ফেলে দেবে (হয়ত রাজকীয় ভাবেই, কিন্তু ছুঁড়েই ফেলবে এটা নিশ্চিত); আর একজন নিজে ব্যবহৃত হচ্ছে, এবং অন্য একজন ব্যবহৃত মানুষের সামনে আপ্রাণ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে - সে কারও ব্যবহৃত হাতের পুতুল নয় তার নিজের একটা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব আছে। আর একজন তার সমস্ত ভাল মন্দ নিয়েই আজন্ম রাজবংশের ব্যবহৃত সামন্ত, রাজকুমার উদয় তাকে আগেও ব্যবহার করেছে, পরেও করবে… আর তার আনুগত্যর পরীক্ষা নিচ্ছে এমন একজন যে ঝিন্দের কেউ নয়। আর এই সব কিছুর মাঝেই ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রতীক হয়ে রয়ে গেলো ওই পদক… কারও সম্মানের বস্তু তার বুক থেকে মাটির ধুলোয়, তারপর কারও হাতে ঠুনকো বকশিস… ইউজ্‌ অ্যান্ড থ্রো-এর এমন পার্সোনিফিকেশন এত স্বল্প পরিসরেও এত নিখুঁত ভাবে আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

আসলে এই যে ‘ব্যবহার’-এর মালভূমি, এবং ‘ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া’-র খাদ; এই দুইয়ের অবস্থান এবং অস্তিত্বই একে অপরের পরিপূরক... এই ব্যবহারের মালভূমি এমনই এক স্থান, যেখান থেকে কাউকে না কাউকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার গোপন ষড়যন্ত্র চব্বিশ ঘণ্টা চলতেই থাকে। যে ব্যবহারযোগ্য নয়, তার সেই উচ্চতায় কোনও স্থান নেই। হয় তাকে নিজেকেই নেমে এসে অন্য কোনও প্রান্তর খুঁজে নিতে হবে (যেখানে হয়ত গুরুত্বহীনতা আছে, আর বেশ খানিকটা আপোষ নিজের সঙ্গেই) না হ’লে অপেক্ষা করতে হবে সেই চরম মুহূর্তে যখন সে শূন্যে ভাসবে, নিজেও শূন্য হয়... নিঃশেষিত জ্বালানীর পাত্রর মত মাধ্যাকর্ষণের টানে সেই খাদের গভীরে... আরও গভীরে পড়ার জন্য। অবশ্য হতাশাগ্রস্ততারও একটা শেষ থাকা দরকার, নশ্বর আর সব কিছুর মত, ওই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার পর যে পতন, তারও একটা শেষ আছে। আর ওই পতনের মাঝেও যে একটা অন্তর্দশনের অবকাশ, সেটা কেবল সেই অনুভব করে যে নিজের পড়েছে... সটান নিচে আছাড় খেয়ে, কিংবা ধাপে ধাপে ঠোকা খেতে খেতে, কিংবা গড়াতে গড়াতে। ব্যবহার হতে হতে ক্ষয়ে প্রাপ্ত ওই জ্বালানীর খোলটার বিনির্মাণ হওয়াটা খুব দরকার, সেই অবকাশ সেই সুযোগ টাই এনে দেয়... পড়তে পড়তে ভেঙে যাও, ক্ষতি নেই... যেখান থেকে শুরু করবে, সেখানে এর থেকে অন্যরকম কিছু নির্মাণ কর, যা চাইলেই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায় না। দেখে শেখা, ঠেকে শেখা বাইরেও সে এক শেখা... পড়তে পড়তে শেখা। বাঙলা ভাষায় এই ‘পড়া’ শব্দটাও কিন্তু বেশ মজার... তাই না?

সত্যি বলতে কি, এই ‘ব্যবহার’ শব্দটার মধ্যেও যে এতটা নঞর্থকতা, ওটাও আমার ভাল লাগে না। ব্যবহার তাকেই করা হয় যে নিজেকে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ দেয়। পরোক্ষে এই ব্যবহার হ’তে হ’তে অনেক সাধারণ কিংবা আজন্ম বঞ্চিত, অবহেলিত মন গুলোর মনে হয় সে গুরুত্ব পাচ্ছে। জীবনে প্রথম হয়ত এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে কোথাও, কারও কাছে। সেই গুরুত্ব পাওয়ার যে প্রাপ্তি-সুখ তাকে চাইলেও অত সহজে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় না। সে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে এই মুহূর্তে সে এত কাছের, এই কাছে থাকাই অপরিহার্য গুরুত্ব-ভ্রম। তখন যদি একটা সচেতনতা এই ব্যবহারের নঞর্থকতাকে হুঁশিয়ারির মত কানে ফিসফিস করে বলে যায়, অথবা আয়নার সামনে একটা বিবেক বলে ‘দেখ কেমন টুথপেস্ট-এর মত টিপে টিপে খালি করে দিচ্ছে’... সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যতার মাঝে একরাশ গুরুত্ব এবং কৃতজ্ঞতার সৌরভ আচ্ছন্ন করে দেয়, কিছু না থাকার থেকেই এই আচ্ছন্নতাই ভালো। করুক ব্যবহার, তার সঙ্গে যে প্রাপ্তি তাই বা কম কি? সে এক অদ্ভুত ‘উইন-উইন’ মুহূর্ত, যে ব্যবহার করছে সেও নিজের মত করে একে একে নিয়ে নিচ্ছে ইচ্ছে মত... আর যে ব্যবহৃত, তাকে কেউ পণ্য বললে তার রীতিমত রাগ হয়, সে তখন এই পরিবর্তে ভেসে আসা প্রাপ্তিগুলো গুছিয়ে রাখছে সব কিছু নিজের ভেবে। আর ঠিক যেই ভাবে বলা হ’ল, ব্যবহার তাকেই করা যায় যে নিজেকে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ দেয়... একটু ক্রিয়াপদে হিজিবিজি হয়ে গেলে সেটাই শুনতে লাগবে – ব্যবহার তাকেই করা যায়, যে নিজে ব্যবহৃত হ’তে চায়। খুব গোলমেলে মনের ভাব, ছুঁড়ে তো ফেলে দিতেও পারো শেষমেশ... কিন্তু এই ভাবে ভাবলে কে কাকে কোথাও ফেলবে আর ফেলছ, সেই চিন্তা করতেই যে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে! আর এই সব কিছুর ঊর্দ্ধে একটা সরল সত্য অস্বীকার করতে পারি না – ব্যবহার তাকেই করা হয় যে ব্যবহারের যোগ্য। দোকানের তাকে সাজানো সব থেকে উৎকৃষ্ট পদার্থের জন্য দাবীদারও বেশি থাকবে। তাকে ব্যবহারও করা হবে বেশি, সে তার যোগ্যতার কারণেই। এইবার ব্যক্তি বিশেষ যদি সেই একই ভাবে সাজানো উৎকৃষ্ট পদার্থের মত হয়ে যায় (সে সচেতন ভাবে হোক বা পরিস্থিতির চাপে) তাহ’লে তার ব্যবহারিক গুণের গুণগ্রাহীরা তার সদব্যবহার করতে উতলা হবে বই কি! তার অজান্তেই সে বিক্রীত, অন্যের কেউ... অন্যের ব্যবহারের সামগ্রী। খুব খুব খারাপ লাগতে পারে এই অনুভূতি... কিন্তু একবার যদি হিসেব হয়ে যায়, মূল্যের বিনিময় হয় যায়, হাত বদল হয়ে যায়... তারপর ব্যবহারের সামগ্রীর সঙ্গে আর কোনও তফাৎ থাকে না। ওই অপ্রিয় ঘটনাগুলো ঘটতে না দেওয়াও একটা লড়াই। শরীর তো তবু নিজের রইল সব চিহ্ন নিয়ে, মনের দাগগুলো নিয়েও অন্য কারও মাথা ব্যথা থাকবে না, কিন্তু সামগ্রী হয়ে যাওয়া বিবেকের ভার বহন করা যে সব থেকে দুঃসাধ্য, অন্য কেউ যদি ছুঁড়ে নাও ফেলে, নিজেই যে নিজের বিনির্মাণ করে যেতে হবে সেই বিবেকের দংশন থেকে রক্ষা করতে!

আর যে ব্যবহার করে, সেই কর্তা। যে ব্যবহৃত হচ্ছে সে যতই বড় বড় কথা বলুক, ভোগবাদ এবং বস্তুবাদ দাপিয়ে বেড়ানো এই প্রজন্মে যে ব্যবহার করছে তার কথাই শেষ কথা। মন হোক, প্রতিভা হোক, কিংবা আস্তমানুষটাই হোক... ওই কর্তার হাতের পুতুল হ’তে খুব বেশি দেরি হয় না, যদি একবার ওই সামগ্রী রূপে রূপান্তরটা হয়ে যায়। সেই চাইলেই ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে। এটা তোমায় জানতেও হবে, আর ইচ্ছে না থাকলেও... মানতেও হবে। বাজারে মানুষ এই স্বল্পসময়ে অল্প ব্যয়ে পুরো লাভ তুলে নেওয়ার জন্যই ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ সামগ্রীর আমদানি করেছে। ব্যবহার হয়ে গেছে... ফেলে দাও... ব্যস! ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া নিয়ে কথা, কোথাও পড়ল, কার মাথায় পড়ল... তারপর কি হ’ল সে ভেবে কোনও মাথা ব্যথা নেই। তোমার ওর থেকে যা পাওয়ার ছিলো পেয়ে গেছো, এখন ফেলে দিলেই হ’ল। বাজারে খরচ কর, আরও ভালো জিনিস পেয়ে যাবে... যেখান থেকে আর পাওয়ার কোনও আসা নেই, বা উপায় নেই; সেটাকে নিয়ে আর মাথাব্যথা বাড়ানোর কোনও দরকার নেই! তো কর্তার যেই মুহূর্তে মাথা ব্যথা শুরু হবে, তখন থেকেই সে ছুঁড়ে ফেলার চিন্তা করবে। খুব সহজ চিন্তা, এই মাথা ব্যথা দিনের পর দিন টেনে কি হবে? এর থেকে তো আরও ভাল কিছু একটা চেষ্টা করলেই পাওয়া যেতে পারে... উঠাকে ফেক দো! মজার কথা এই ‘ইউজ অ্যাণ্ড থ্রো’-এর প্রয়োগ এমন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যে ক্রমে তা ব্যবসায়িক নিতি থেকে প্রবাদ, এবং প্রবাদ থেকে দর্শনের স্তরে উঠে গেছে। ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে আমরা সবাই যেন ভুলে গেছি, যে একটা সময়ে স্বল্প মূল্যবান কোনও সামগ্রীও জোগাড় করতে কত কষ্ট হত, যতই ত্রুটি থাকুক আমরা মানিয়ে নিয়ে ব্যবহার করতাম, মানিয়ে নিয়েই তাকে সঙ্গে রাখতে শিখে যেতাম... চেষ্টা করতাম তাকে মেরামত করে নিয়ে আগের মত ব্যবহার করতে (যদি ব্যবহারও হয়, তবু)। এখন সেই মেরামতের অবকাশ টুকু নেই; যা আর কোনও কাজের না... তাকে চোখের সামনে থেকে দূর করে দাও! নয়া চিজ্‌ লাও! আর আমাদের সচেতনতাও এমন বিচিত্র, অনেক ক্ষেত্রে একটা মুহূর্তে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি... ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আগে, নিজের সেইখান থেকে সরে যাওয়া অনেক বেশি সম্মানের। ব্যবহারের মালভূমিকে থেকে নেমে নিজের তৃণভূমি খুঁজে নেওয়ার সময় এসেছে... তাতে দু’দিকেই রক্তক্ষয় রোধ করা যায়।

আজকাল এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর একাধিক পেজ-এর পোস্টেও চোখে পড়ে একটি উদ্ধৃতি – “নিজেকে খবরদার সহজলভ্য করো না... নিজের মূল্য বুঝতে শিখো। তুমি যে অমূল্য সেটি বুঝিয়ে দাও... কমপক্ষে এইটুকু বুঝিয়ে দাও - চাইলেই তোমাকে পাওয়া সহজ নয়” এবং নিচে সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নামটা থাকে। যদি উদ্ধৃতিটিতে কোনও চ্যুতি-বিচ্যুতি থাকে, তাহ’লে হুমায়ুন-ভক্তদের গালাগাল মাথা পেতে নিলাম। কিন্তু ঠিক এই শব্দগুলি এই ভাবেই চোখে পড়ে পোস্টগুলিতে। যতবার দেখি, ততবার দেখি অনেক অনেক ‘বুড়ো আঙুল’ তোলা পছন্দ আর মন্তব্য – “একদম ঠিক বলেছ!” বুঝতে পারি, আমাদের বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের অনেকটাই এমন দীর্ঘশ্বাসে ভরা। জানি না কেন, এই কথাটিও ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ এর ক্ষেত্রে একই রকম প্রাসঙ্গিক মনে হয়। ব্যবহৃত হওয়ার পর যে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, এবং তারপর ওই পতনের মেয়াদ এবং তারপরের বিনির্মাণ... তখন এই ভাবে ‘ঠিক বলেছ’-র আত্মোপলব্ধি ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার থাকে না। আর এই যে সমাজের নানান স্তরে মানুষকে ব্যবহৃত হতে দেখি, কেউ না কেউ ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে চারিদিকে... শুধু প্রত্যাখ্যাত সম্পর্ক নয়... রাজনৈতিক আশ্বাসের পর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, কর্মক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির পর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, ব্যবসায়ে অঙ্গীকারের পর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া... এমন কি একজনের প্রতিভা কিংবা অঙ্গীকারবদ্ধতার পুরোপুরি সুযোগ নিয়ে তার থেকে পুরোপুরি নিজের আখের গুছিয়ে নিয়ে তাকে ‘টাটা’ করে দেওয়া। ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ারও একটা অবশ্যম্ভাবী পরবর্তী দশা থাকে, সেই ব্যক্তির বারংবার সম্মানহানির চেষ্টা, জন-সমক্ষে তাকে বিব্রত করা... সে একেবারে অন্য বিষয়, অন্য দৃষ্টিভঙ্গি। এই ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ সমাজের বাইরে তো আমিও নেই... আমিও কোথাও ব্যবহৃত হচ্ছি, কাউকে না কাউকে ব্যবহার করেছি... আমাকে কেউ ছুঁড়ে ফেললে সেই জাড্যে যে আমিও কাউকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেবো না, তাই বা হলফ করে বলি কি করে? তবু এই পরিচিত উদ্ধৃতির মত বলতে ইচ্ছে হয়... নিজেকে... আরও সকলকে – “নিজেকে খবরদার হালকা পণ্য করো না... নিজের ভার বুঝতে শিখো। তুমি যে অতটাও হালকা নও সেটি বুঝিয়ে দাও... কমপক্ষে এইটুকু বুঝিয়ে দাও - চাইলেই তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া সহজ নয়।” আর হ্যাঁ, ওই একজন তো বলে গেছিলেন ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ (অবশ্যই যাদের মান এবং হুঁশ আছে, তাদের কথা বলা হয়েছে); হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও ওই কথাটা অবিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তাই এই পেশাদার ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ সভ্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়েও আশাবাদী হয়ে ভাবি (হয়ত একটু বাড়াবাড়ি রকমের আশাবাদী) – কোথাও যদি কোনও আপেক্ষিক ভাবে শক্তিশালী হাত ছুঁড়ে ফেলেও দেয়... পতনের সময় কিংবা তার ঠিক পরেই আরও দু’টো শক্তিশালী হাত হয়ত পতনটা আটকানোর জন্য, এবং আবার উঠিয়ে দাঁড় করানোর জন্য এগিয়ে আসে। ওই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার শক্তিটা চেনা যেমন জরুরি, এই এগিয়ে এসে ধরতে আসা হাতটাকে চেনাও তেমন এক প্রাপ্তি... সেই এগিয়ে আসা হাতগুলো থাকেই, না হ’লে সভ্যতা বলে কিছু থাকত না আর।

আপনার মতামত জানান