কাটাকুটি

নীতা মণ্ডল


(১)
ক্লাস ছেড়ে রেগে বেরিয়ে এসেছে অনির্বাণদীপ রায়, সংক্ষেপে এডি। সোজা প্রিন্সিপ্যালের অফিসে। প্রিন্সিপ্যালের সামনে বসে আছে পবন সরমা ও রমেশ রাঠি। প্রিন্সিপ্যাল দীপক সেনের ডানহাত এবং বামহাত। ‘পোষাগুণ্ডা’ ও বলে কেউ কেউ। এডি ঢুকেই উত্তেজিত স্বরে বলে, ‘আমার কিছু কথা আছে, স্যার।’ ইঙ্গিত, কথাগুলো ও আলাদা বলবে। দীপক বরাবরের মতই অবিচলিত। ধীরস্থির ভাবে বলেন, ‘বল না, সবার সামনেই বল। এখানে সবকিছু ট্রান্সপারেন্ট, কোনও লুকোচুরি নেই।’
টাইম, স্টুডেন্ট, টিচার, নন-টিচিং আর সর্বোপড়ি মালিককে ম্যানেজ করতে সারাদিন কাটে দীপকের। তখন নিজেকে মনে হয় ম্যানেজার। আবার কখনও এই হিমশীতল কক্ষের অর্ধেক শরীর ডুবে যাওয়া চেয়ারে বসে মনে হয় কোনও অভিজাত প্রেক্ষাগৃহের দর্শকের আসনে বসে তিনি নাটক দেখছেন।
হঠাৎই দীপকের মনে পড়ে যায়, শুরুর দিকের কথা। দুচোখে ভাল শিক্ষক হবার স্বপ্ন। সেবার ফার্স্ট ইয়ারে টানা দুঘন্টা কিডনির ফাংশন বুঝিয়ে প্রশ্ন করতে বলায় মাত্র দুচারজনই আগ্রহ দেখিয়েছিল। সবাই বুঝেছে কিনা দেখতে পেছন থেকে একজনকে উনি শুধিয়েছিলেন, ‘বল, কিডনির কি ফাংশন?’
‘ফিল্টার করা।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল ছেলেটি।
‘ব্যাস, এইটুকু? আরেকটু বড় করে বুঝিয়ে বল।’
‘ইউরিন ফর্ম করা।’
‘তারপর কি হয়? ইউরিন কোথায় যায়?’ দীপকের গলায় বিরক্তির লেশমাত্র ছিল না।
‘গল ব্লাডারে।’ ছেলেটির বোধ হয় একবাক্যে উত্তর দেওয়া অভ্যাস।
ছাত্রের ইউরিনারি ব্লাডার আর গলব্লাডার গুলিয়ে গেছে বুঝতে পেরে দীপক হেসে বলেছিলেন, ‘শেষে কি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে?’
শুনে দীপকের সঙ্গে সারা ক্লাস হেসে উঠেছিল। সেদিনই বিকেলবেলা দীপককে ডেকে প্রিন্সিপ্যাল বলেছিলেন, ‘ছাত্রছাত্রীরা আমাদের সন্তানসম। ওদের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলা উচিৎ নয়।’
‘কই, সে রকম তো কিছু বলি নি। টিচার হয়ে ছাত্রদের মনে আঘাত দিয়ে কি পাব আমি?’ নিজের কাজে শতকরা একশভাগ আত্মবিশ্বাসী দীপক অবাক হয়ে বলেছিলেন।
‘উনি সবার সামনে ছাত্রদের ব্যঙ্গ করেন, অপমান করেন সুযোগ পেলেই।’ ছাত্ররা প্রিন্সিপ্যালের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিল দীপকের নামে। এসব থেকে দীপক সারাজীবন অনেক শিখেছেন।
এখন প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে দীপক অন্যদের বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর। তাই পাঁকাল মাছের মত থাকবে। মালিক বা ছাত্র কোনোদিক থেকে কারোর নামে যেন কোনও অভিযোগ না আসে।’
আত্মমগ্ন ভাব কাটিয়ে দীপক এডির দিকে মন দিলেন। নিধি ওর ক্লাসে কিছুই শুনছিল না। ওকে ল্যাপটপে ফেসবুক করতে দেখে এডি বেরিয়ে যেতে বলেছে। নিধি যাবে না। ‘তুমি না গেলে আমি যাব। বল, কে যাবে, তুমি না আমি?’ এডির এই প্রশ্নে নিধি স্মার্টলি উত্তর দিয়েছে, ‘তাহলে আপনিই যান।’
(২)
দুমাস আগের কথা। নতুন শিক্ষাবর্ষে ক্লাস শুরু হবার আগেআগে চেয়ারম্যান মিটিং ডেকেছিলেন। কি করে পরেরবার আরও ভালো করা যায়! ভালো করার অলিখিত অর্থ কলেজে নতুন কি হচ্ছে যা ছাত্রদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের আকারে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া যাতে পরের বার ভর্তিসংখ্যা বাড়ে। এডি বলেছিল, ‘ক্লাসে ল্যাপটপ অ্যালাউ করা হোক আর পুরো ক্যাম্পাস ওয়াই-ফাই করা হোক।’
‘তাতে লাভ?’ চেয়ারম্যানের প্রশ্নের উত্তরে এডি গুছিয়ে একটা লেকচার দিয়েছিল, ‘এটা টেকনোলজির যুগ, বিষয়টাও টেকনিক্যাল। এখন শুধু ব্ল্যাকবোর্ড আর চকে চলে না। ধরুন, আমি পড়াচ্ছি সেল মেমব্রেন, প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন । মনে হতে পারে স্যান্ডউইচ, দুটো প্রোটিন লেয়ারের মাঝে একটা লিপিড লেয়ার। কিন্তু যদি একটা থ্রি-ডি ছবি দিই, তাতে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। বোঝা যাবে, কিভাবে থাকে প্রোটিন চ্যানেল বা কিছু প্রোটিন কিরকম লিপিডের উপরের নৌকার মত ভেসে থাকে, অথবা কি করে একটা লিপিড মলিকিউল অন্যটার উপর দিয়ে পিছলে যায়। এসব কি বোর্ডে এঁকে বোঝানো যায়? তাছাড়া স্কুলেও এখন স্মার্ট ক্লাস চালু হয়ে গেছে, আর কলেজে হবে না?’
তারপরই ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট চালু হয়েছিল ক্লাসে। তারই ফলশ্রুতি আজকে এডির ক্লাসে ঝামেলা।
সব শুনে রমেশ বলল, ‘আপনি কি জানেন মেয়েটি চেয়ারম্যানের নাতনি?’
‘সো হোয়াট?’ এডি বেশ জোরেই শুধোল।
‘বুঝতে পারছেন না নিধির তো প্রেস্টিজ পাংচার। দাদু শুনলে কি হবে জানেন?’ রমেশ পাল্টা শুধোয়।
কথার ফাঁকেই দুবার কল রিজেক্ট করলেন দীপক। আবার রিং হতেই পবন শুধোয়, ‘কে বিরক্ত করছে?’
দীপক বললেন, ‘গরিমা। গতসপ্তাহে প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষায় নিধিকে আটকে দিয়েছিল। চেয়ারম্যানস্যার খুব বিরক্ত। নাতনি বাড়ি গিয়ে কান্নাকাটি করেছে। গরিমাকে রিটেন ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে।’
রমেশ বলে, ‘তারপর থেকে তো ম্যাডাম কলেজে আসে নি। কি করবেন ভাবছেন?’
‘না পোষালে চলে যাক। কয়েকটা সিভি আছে এতে। তুমি ফোন করে দেখ কেউ জয়েন করতে পারবে কিনা!’ বলে একটা ফাইল রমেশের দিকে ঠেলে দেন দীপক। ঠিক তক্ষুনি ভেতরে ঢোকে গরিমা।
এডির উপস্থিতির কথা মনে হয় দীপক ভুলেই গেলেন। মুখে হাসি ঝুলিয়ে দীপক গরিমাকে শুধোলেন কিছু ভেবেছে কিনা। গরিমা সাফ জানিয়ে দিল যে সে ক্ষমা চাইবে না।
দীপকের মুখে বিরক্তির ছাপ পড়ল। ‘তুমি ফেল করাতে গেলে কেন? প্রাক্টিক্যালে কেউ ফেল করে? বাইরে রটবে এখানে প্রাক্টিক্যালেও ফেল করে, এমনকি চেয়ারম্যানের নাতনিও। তুমি তাড়াতাড়ি ডিসাইড কর কি করবে, আমার কাজ আছে।’ বলে ঠেলে দেওয়া ফাইলটা টেনে নিলেন দীপক।
এখানেও নিধি! এডি শুনেছিল মেয়েটি একটাও এক্সপেরিমেন্ট করে নি। দীপক চাপ দিয়ে গরিমাকে দিয়ে নম্বর দেওয়া করিয়েছেন। গরিমা বলল, ‘তাহলে আমি কাজ ছেড়ে দিচ্ছি।’
দীপক বললেন, ‘তোমার ইচ্ছে। ফর্মালিটি শেষ করে একদিন এসে চেক আর সার্টিফিকেট নিয়ে যেও।’
এভাবে কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়! সব দেখেশুনে হতবাক হয়ে উঠে পড়ল এডি।
(৩)
কলেজ ছুটির সময় দীপকের সঙ্গে এডির মুখোমুখি দেখা হয়ে গিয়েছিল। দীপক বলেছিলেন একবার ওর বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে। এডি জানত, সহকর্মীদের সঙ্গে বাড়তি সামাজিকতা দীপকের অপছন্দ, উনি দূরত্ব রেখে চলেন। তাই একটু অবাক হয়েছিল এডি। এক্সপ্রেসওয়ের উপর এই পনের’শ বর্গফুটের ফ্ল্যাটটায় সদ্য এসেছেন দীপকরা। আগে ডেল্টা ব্লকে ভাড়া থাকতেন। এডি দেখছিল বিশাল ডাইনিং কাম ড্রয়িঙের সাজসজ্জায় বেশ রুচির ছাপ। দেওয়াল জোড়া আলমারিতে প্রচুর বাংলা বই। দীপক নিজে বিলাসিতার বিজ্ঞাপন হলেও, বাড়িটা যেন অন্যরকম। দীপকের মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। ছেলেটি বছর ছয়েক। এই মুহূর্তে দীপক বাড়িতে একা। মেয়েকে গানের আর ছেলেকে ক্যারাটের ক্লাসে নিয়ে গেছেন ওদের মা।
এডির চোখ বইএর আলমারিতে আটকে আছে দেখে দীপক বললেন, ‘এসব আমার স্ত্রীর শখের জিনিস। শুধু পড়াটাই শখ। এত পড়াশুনোকে কাজে লাগানোর কোনও উদ্যম নেই।’
এডির অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে দীপক কাজের কথায় আসেন, ‘নিধিকে নিয়ে হয়েছে এক ঝামেলা। তোমাদেরই বা কি দরকার পরের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এত মাথা ঘামানোর বুঝি না। যেজন্য তোমাকে ডেকেছি। তোমার ক্লাসের ঘটনাটা নিয়ে শনিবারে কথা উঠবে। তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মত, তাই বলছি একটা মৌখিক ক্ষমা চেয়ে নিও চেয়ারম্যানের কাছে, মিটে যাবে।’
এডি বলে, ‘আপনি বলছেন, ওরা ভুল করলে শুধরে দেব না? ওরা যদি না বুঝে অন্যায় করে তাহলে শেখানোর চেষ্টাটুকুও না করে এড়িয়ে যাব? তাহলে স্যর, আমাকে অল্টারনেটিভ কিছু ভাবতে হবে।’
দীপক বলে, ‘বিকল্প? কোথায় যাবে? কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব এক। শুধু নোটস দাও আর নম্বর দাও। ছাত্ররা চায় নম্বর, আর মালিক চায় কম খরচে বেশি লাভ। যেখানেই যাও কম্প্রোমাইজ করতেই হবে।’
‘বিনা দোষে ক্ষমা চাওয়াটা কি আপনি নিজে সমর্থন করেন?’ সোজা দীপকের চোখে চোখ রাখে এডি।
ওর দৃষ্টিতে কি ছিল কে জানে, দীপকের গায়ে কাঁটা দেয়। উনি যে সত্যি এসব সমর্থন করেন না এ ছোকড়া জানল কেমন করে? কিন্তু ও ঘাড় কাৎ না করলে চেয়ারম্যান বলবেন, ‘আপনি থাকতেও এরকম কি করে হল?’ এ কথার মানেই দীপকের স্নায়ুতন্ত্রে বাড়তি চাপ। সেক্ষেত্রে কি গরিমার মত এডিকেও ছেঁটে ফেলতে হবে! দীপক ক্লান্ত সুরে বলেন, ‘তুমি বলেই আমি আলাদা করে বল্লাম।’
এডি বলে, ‘আমাকে দয়া করছেন যে!’
এডির কটাক্ষকে অগ্রাহ্য করে দীপক বলেন, ‘কারনটা অদ্ভুত। ইন্টারভিউ এর দিন তোমার সংক্ষিপ্ত লেকচারটা শুনে বুঝেছিলাম টিচিং প্রফেশনটাকে তুমি কতটা ভালবাস। ভালোবেসে টিচিঙে এলেও আমি পড়ানোর সুযোগ পাই নি, ভেবেছিলাম অন্তত একজন মনেপ্রানে টিচার থাকুক আমার সঙ্গে।’
‘পড়ালেন না কেন?’ এডি শুধোয়।
দীপক বলেন, ‘আমার যখন এম টেক শেষ হল, তখন বায়োটেকনোলজির রমরমা বাজার। সর্বভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কাউন্সিলের হর্তাকর্তারা মুড়িমুড়কির মত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ খোলার অনুমতি দিয়ে যাচ্ছে দেশ জুড়ে। যাদের পয়সা আছে অথচ অনার্স পড়ার যোগ্য নয়, তারাও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। এদিকে পড়ানোর যথেষ্ট লোক নেই। রাজকোটে একটা কলেজে গেলাম। যা টাকা চাইলাম তাতেই রাজি। থাকা, খাওয়া, গাড়ি সব কলেজ থেকে দেবে। থেকে গেলাম। পার্টটাইমে পিএইচডিও হয়ে গেল চার বছরের মাথায়। আমার পিএইচডি হতেই প্রিন্সিপ্যালকে তাড়িয়ে দিয়ে ওরা আমাকে প্রিন্সিপ্যাল বানিয়ে দিল। লোকটা নাকি কথায় কথায় মালিককে বোকা বানাত সেই অপরাধে। ‘কিন্তু আমার তো অভিজ্ঞতাই নেই!’ বলতে মালিক বলল, ‘আপনাকে ভাবতে হবে না, টাকা দিলেই সব ম্যানেজ হবে।’’
এডির প্রতিক্রিয়া নিয়ে দীপক মাথা ঘামান না। আপন মনেই বলেন, ‘ম্যানেজ করার সেই শুরু। কলেজে ইন্সপেকশন, যথেষ্ট টিচার নেই। যত টাকা চায়ত, দিয়ে নতুন টিচার নিয়ে নিতাম। ওরা ছ’মাস পেছনের তারিখ দিয়ে সই করত। ইন্সপেকশন উৎরে গেলেই ওদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হত।’
‘আপনি তো একবারও প্রতিবাদ করেন নি তাই না?’ আবার সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি এডির।
‘প্রতিবাদ করব কি করে? এসব দেখে তো বোঝাই যেত যে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আমারও এই হাল হবে। তাই আমি বুদ্ধি খাটিয়েছি, চোখকান খোলা রেখেছি। আর সুযোগ পেলে কেটে পড়েছি। এভাবেই রাজকোট থেকে পাটিয়ালা হয়ে এখন এনসিআরে।’ দীপক সাফাই দেন।
এডি বলে, ‘কেউ তো কখনও আপনাকে তাড়িয়ে দেয় নি, তবুও এত ভয় আপনার?’
দীপকের রাগ হল না। বললেন, ‘সংসারী মানুষের অনেক দায়। বাড়ির লোন, গাড়ির লোন, সংসার খরচ, বাচ্চাদের পড়ার খরচ সব সামলাতে হয়। এখন আবার চাকরির আকাল। চারিদিকে পিএইচডিও হচ্ছে মুড়িমুড়কির মত। ডিগ্রী এখন পয়সা দিয়ে কিনতে পাওয়া যায়। হাতে ডিগ্রী মানে সে তোমার আমার সমকক্ষ। মুড়ি মিছরি এক দাম। ঝামেলা করে কি লাভ? তাই ইচ্ছে করেই পবন আর রমেশ দুজন লোকাল ছেলেকে আমি হাতে রেখেছি। সবকিছুতে ওদের কথা বলার অধিকার দিয়েছি। ওরা নিজেদেরকে পাওয়ারফুল ভাবে। আমার লাভ? যেকোনো ঝামেলায় এরাই আমার হয়ে লড়ে।’
এডি ভেবেছিল গরিমার সঙ্গে যা হয়েছে সেকথা তুলে দীপককে এক হাত নেবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে লোকটা কি নেশা করেছে! একবার দুঃখ উজার করে দিচ্ছে, আবার নিজের ভিলেনগিরির গল্প শোনাচ্ছে ফলাও করে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বুঝে বাইকে তেল ভরার অজুহাত দিয়ে বেরিয়ে পড়ল এডি।
(৪)
দীপককে অস্বস্তিতে না ফেলে সেবার এডি নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিল চেয়ারম্যানের কাছে। তারপর তিনটে সেমেস্টার পেরিয়ে গিয়েছে। প্রতিবারেই এডির বিষয়ে রেজাল্ট সবাইকে পেছনে ফেলেছে। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় এখন দীপকের সঙ্গে এডিকেও চেয়ারম্যান ডাকেন। ছাত্রছাত্রীদের গরমের ছুটি চলছে। এদিকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে কলেজে। সামনেই ন্যাশনাল বোর্ড অফ অ্যাক্রিডিয়েসনের ইন্সপেকশন। একবার ফাইভস্টার বা থ্রিস্টার তকমা পেয়ে গেলে সেটাই হবে পরের বারের বিজ্ঞাপন। কম্পিটিশনে এখন টিকে থাকা দায়। গতবার কলেজে সিট খালি ছিল। তাই কিছু কলেজ ফিজ কমিয়েছে। এসবের অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি ছাঁটাই। তাই নতুন ফিকির খুঁজতেই হল। প্রোজেক্ট ফান্ডের কথাটা তখনই চেয়ারম্যানের মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন দীপক। বোঝালেন ফান্ডের টাকাতেই কেমিক্যাল বা যন্ত্রপাতি আসবে। কলেজের খরচ কমে যাবে। এনবিএ’র সার্টিফিকেট থাকলে ফান্ড পেতে সুবিধা হয়।
প্রস্তুতি শেষে দীপক পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বিল্ডিংটা নতুন রং পেয়ে ঝলমল করছে। পুরনো আলো, পাখা বদলে ফেলা হয়েছে। কলেজের ক্যান্টিন আর বাগানও হয়েছে দেখার মত। টিস্যুকালচারের ল্যাব হয়েছে। ভালো লাগলেও বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে দীপকের। অনেক টাকা খরচ হয়েছে এযাবৎ। অনেক বছর গবেষণার সঙ্গে নিজের সরাসরি কোনও যোগ নেই, আত্মবিশ্বাস তলানিতে। ফান্ড না পেলে এত খরচের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। মুহূর্তেই দীপকের মনে হল, এডি নিশ্চয় একটা যুতসই টপিক জোগাড় করে ফেলবে। সারাদিন পড়াশুনো আর ল্যাব নিয়েই তো থাকে। যে কাজই করে একদম নিখুঁত। ভাবতে ভাবতে নিজের চেয়ারে শরীরটা ছেড়ে দিলেন দীপক। কাল ইন্সপেকশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকবে এই উদ্বেগ। ফাইলগুলো শেষবারের মত ক্রসচেক করাবেন ভেবে পিয়নকে দিয়ে এডিকে ডেকে পাঠালেন। পিয়ন জানাল, এডি কলেজে আসে নি।
সঙ্গেসঙ্গে এডির নম্বর টিপলেন দীপক। ফোন বন্ধ। পবন ছুটে গেল এডির ডেরায়। ইমেল খুলে চমকে গেলেন দীপক। ব্যক্তিগত কারনে এডি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। ইমেলটা চেয়ারম্যানকেও সিসি করেছে।
পবন এসে খবর দিল এডির ঘর তালাবন্ধ। গার্ড কাল রাতে ওকে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছে।
‘ইয়ার্কি!’ ম্যানেজার দীপক, প্রিন্সিপ্যাল দীপক মনেমনে অশ্রাব্য গালাগালি দিচ্ছেন এডিকে।
এমন সময় দীপকের ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে অজানা নম্বর। ওপাশে এডি, স্পষ্ট আদেশ এডির গলার স্বরে। ‘আজ শুধু আপনি আমার কথা শুনবেন। সেদিন যেমন আপনার বাড়িতে আমি শুনেছিলাম। আপনি ঠিক ধরেছিলেন, আমি ভালোবেসে পড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু আমাদের অবস্থাটা ভাবুন, আমরা আপনাদের মত টাকা পাই নি। কারন ততদিনে মুড়ি মিছরি এক দাম হয়ে গেছে। আমার এই আইআইটি থেকে পিএইচ ডি করা বা হাই ইম্প্যাক্ট জার্নালে পেপার, এসবের কোনও মুল্য নেই। এমনকি, আপনাদের মত শিক্ষিত মানুষের কাছেও নেই। তাই সেদিনই আপনাকে দেখে ঠিক করেছিলাম, এভাবে মাথা নুইয়ে চাকরি বাঁচানোর আতঙ্কে আমি সারাজীবন কাটাব না। আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। তাই ল্যাবে যেটুকু ফেসিলিটি ছিল ইউজ করে পেপার করেছি আর চারিদিকে চেষ্টা করেছি। সুযোগটা এতদিনে পেলাম। আমি সাউথ কোরিয়ার একটা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করব। ইন্সপেকশনটার পরে গেলেও অসুবিধা ছিল না, কিন্তু আপনার সঙ্গে একটু কাটাকুটি খেলার লোভটা সামলাতে পারলাম না। এই যে নিজেদের কাজ হয়ে গেলে মানুষকে আপনারা কুকুর বেড়ালের মত তাড়িয়ে দেন, একবার অন্তত দেখুন কেমন লাগে উল্টোদিকের মানুষটার! আমি জানি এতে কিছুই আটকাবে না। তবুও এই ছোট্ট প্রতিবাদটুকু আমি করলাম তাদের সবার হয়ে যাদের তাড়িয়ে দেবার সময় একবারও তাদের প্রয়োজনের দিকটা ভাবা হয় না। এতদিন আমার নামে কোনও অভিযোগ না পেয়ে আপনি নিশ্চয় খুশি। আসলে আমি পড়াই নি, শুধু নম্বর দিয়েছি। যার নলেজ নেই সে নম্বর নিয়ে যে কিছু করতে পারবে না তা আমার মত আপনিও জানেন। নিধিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ায় আমার সুনাম সোজা পৌঁছে গেছে মালিকের কানে, আপনাকে তেল দিতে হয় নি...’
পবন দেখছিল, দীপকের ফর্সা মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। এপাশ থেকে হ্যালো ছাড়া আর কোনও শব্দ উচ্চারিত হয় নি। পবন শুধোয়, ‘স্যার, শরীর খারাপ লাগছে নাকি, কার ফোন?’ দীপক হাতের মুদ্রায় ওকে বেরিয়ে যেতে বলেন। সংযোগ বিছিন্ন হয়ে গিয়েছে। দীপক চেষ্টা করেও লাইন পেলেন না।
সামনের চেয়ারদুটো এই মুহূর্তে খালি। দীপকের নিজের ছেলের কথা মনে পড়ল হঠাৎ। ছেলেমেয়েকে পড়ানোর সময় হয় না দীপকের। ওদের দেখাশোনার জন্যে সুজাতা চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল কবেই। দীপক ভাবেন, এরকম একটা সৎ আর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব যদি পায় আমার ছেলেটা!
দীপকের মগ্নতা ভেঙ্গে যায়। বাইরে চেয়ারম্যানের নতুন বিএমডব্লিউ পার্ক করার শব্দ আসছে। একটু পরেই ও ঘরে ডাক পড়বে দীপকের। দীপক ফন্দি আঁটবেন কিভাবে এডির অনুপস্থিতিকে ম্যানেজ করবেন ইন্সপেকশনের দিন। পবন আর রমেশ পাশ থেকে ‘হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার’ করবে। আর দীপকের পরামর্শে মুগ্ধ হবে চেয়ারম্যান। দীপক জানেন এখনও ওকে ছুঁড়ে ফেলার সময় আসে নি।


(গল্পের কোনও চরিত্র বা ঘটনার সঙ্গে বাস্তবে কিছুর মিল থাকলে তা নেহাৎই কাকতালীয়।)

pic courtesy: http://www.staffs.ac.uk/assets/fine_art_1_tcm44-55554.jpg

আপনার মতামত জানান