সখী, ব্যবহার কারে কয়?

শুভদীপ দত্ত চৌধুরী


সখী, ব্যবহার কারে কয়? ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ ধারণাটির সাথে বাঙালীর পরিচয় হয় সম্ভবত ভীড় লোকাল ট্রেনে। প্রায় গায়ের উপর উঠে আসা হকারদের বিক্রি করা ১০টাকায় ১০টা পেন, সাথে আরও ২টো ফ্রী বা নিজের কান নিজেই খোঁচান মার্কা বাডস্ সবই এই গোত্রের সুসন্তান। বাড়ির শাশুড়ি থেকে বৌমা, বোন থেকে ৫বছরের ধুরন্ধর মেয়েটি—তারা অবশ্য সন্ধেবেলার ডেলি সোপে আগেই শুনে ফেলতে পারে সুন্দরী অথচ ন্যাকা নায়িকা টল ডার্ক কিন্তু হ্যান্ডসাম নয় এমন নায়ক-কে বলছে—“তুমি আমাকে ইউজ করলে সন্দীপন, আই হেট ইউ।” আর অমনি হেঁটমুণ্ড হয়ে নায়কের ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া।(সলিল বাবু এরচেয়ে চোখা ডায়ালগ লেখেন। আহা, চৌধুরী না, এন. কে. সলিল!)। রবীন্দ্রনাথও কম যান না মোটেই। ‘শেষের কবিতা’-তে তিনি এক্কেবারে শেষে এসে অমিত’র মুখে যা একখানা ডায়ালগ দিয়েছেন, তাতেই কিছু কামুক চরিত্রের আঁতেল লোক ক’রে খাচ্ছে। ব্যাটা অমিত বলে কী—“কেতকীর সাথে আমার সম্বন্ধ ভালবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল—প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের সঙ্গে আমার যে ভালবাসা সে রইল দিঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।” এহ্! শখ মন্দ নয়! যাই হোক, বিজ্ঞানসম্মত ভাবেই এই ব্যবহার দুই প্রকার। ১। প্রত্যক্ষ ব্যবহার : যে ব্যবহার শুরুতে মোলায়েম শেষে অতীব নিষ্ঠুর। এই ব্যবহার দেবদাস ম্যানুফ্যাকচার করে পাইকারি রেটে। উদাহরণ চাই? লক্ষ লক্ষ ঘুরে বেড়াচ্ছে মশাই। পায়েল বাংলা অনার্স ফার্স্ট ইয়ার। অভ্র সেকেন্ড ইয়ার। ভাল ছাত্র। ব্যাস! হয়ে গেল। পায়েল খুনখারাপি মেয়ে, অভ্র-কে পটিয়ে নিল, কে.এফ.সি তেও খেল, মাথাটাও খেল। নোট্‌স ঝেড়ে গাঁতিয়ে পড়ে দিল মেয়ে। পাশ করে ছেলেকে ঝেড়ে ফেলল। ছেলে দেবদাস, মেয়ে জীবনানন্দ দাশের উপর স্কলার। লাভের মধ্যে খালাসিটোলায় খদ্দের বাড়ল। ২। পরোক্ষ ব্যবহার : যে ব্যবহার শুরু থেকেই খরচের খাতায়। বিশেষ ঝামেলা নেই। অন্তত ব্যবহৃত বস্তুর আলাদা কোনও দুঃখবোধ আছে কিনা তা নিয়ে পাগল আর কবি ছাড়া কেউ মাথা ঘামায় না। যেমন ধরা যাক, ফুলশয্যার ফুলগুলি—তাদের কী আর শখ আহ্লাদ থাকতে নেই? কিন্তু উপায় নেই, বেচারারা এক রাতের বাদশা। বড়দের সিনেমা দেখে, কিন্তু আরেকটু ইচ্ছে করার আগেই ডেকরেটারওয়ালা তাদের খুলে নেয় পরদিন সকালে। আবার যে নবদম্পতি ওই রাতেও কুম্ভকর্ণসুলভ আচরণ করে, তাদের খাটের ফুলগুলি ভিক্টোরিয়ার ভয়্যারদের মতো অপেক্ষা করেও কিছু পায় না। ফুলগুলি ডাহা ‘ফুল’ ব’নে যায়! এছাড়াও কত ডিবে-কৌটো, বোতল, চায়ের ভাঁড়, সিগারেটের টুকরো, শ্যাম্পুর পাতা, পুরনো প্রেমপত্র, ইউসড্ কন্ডোম, ছেঁড়া জামা-কাপড়-জুতো, হাতি-ঘোড়া, ছাতার মাথা আমরা ব্যবহার করি ও ফেলে দি’, তার ইয়ত্তা নেই। ওদের জন্য মনখারাপ করে না? মজার ব্যাপার আবার ভোটের সময় আমরাই ইউসড্ অ্যান্ড থ্রো আইটেম। ভোট হল বিভাজিকা, তার আগে ব্যবহার, পরে ছুঁড়ে ফেলা। ইদানীং সাজানো ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বোঝা গেল, মেয়েদের গোপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও আসলে ইউস্ করে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলার। আমরা কত অনায়াসে আমাদের শিক্ষা- ঐতিহ্য- সংস্কৃতি প্রয়োজনে ব্যবহার করে, প্রয়োজন শেষে হাত ধুয়ে নিতে পারি তাও বোধগম্য হচ্ছে ক্রমশ। সবাই কোনও না কোনও ভাবে কাউকে ব্যবহার করছে এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। ইয়ে দুনিয়া গোল হ্যায় ভাইসাব! কিন্তু যা দিকে সময়ে ব্যবহার করলাম, একদম শেষ অব্দি কী তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা যায়না? তার চেয়ে ‘ছুঁড়ে ফেলা’ ধারণাটাকেই ছুঁড়ে ফেলা যাক!

আপনার মতামত জানান