টোপ

সুস্মিতা মৈত্র

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়


একটা ফর্মাল ইমেলে প্রস্তাবটা পাঠিয়ে দিতে বলে প্রফেসর হাইনস ফোনটা রেখে দিলেন। এবার ধুসর চোখদুটো ছোট করে ভাবতে শুরু করলেন কাজটা কাকে কাকে দিয়ে করাতে হবে। শুধু কাকে দিয়ে করাবেন তাই নয়, কে কোনটা করবে, কতটা করবে, কত দিনের মধ্যে করবে সব কিছুর পাক্কা হিসেব থাকা দরকার। এমনকি মানুষ বুঝে কাকে কিভাবে প্রস্তাবটা দিতে হবে সেটাও উনি ভেবে নিচ্ছেন এখনি।
প্রফেসর হাইনস মানুষটা এইরকমই। যে কাজটা কাল করতে হবে সেই কাজটা আজ করে ফেলার মূলমন্ত্র নিয়েই উনি চলেন। আর সেটা করার জন্য নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনাটাও উনি অনেক আগে থেকেই সেরে রাখেন। সময়ের আগে কাজ সেরে ফেলা আর নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা এই দুয়ের মিশেল তাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে ডিরেক্টর হিসেবে। আর লোকজন দিয়ে কাজ করানোর এক দারুন প্রতিভার কথা না বললেই নয়। ওনার যেকোনো ভাষণ শুনলে শ্রোতারা উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। সোশিয়লজি রিসার্চ সেন্টার হিসেব এই সেন্টারটির বেশ নামডাক আছে গোটা আমেরিকায়। আর সেন্টারের নামের সঙ্গে প্রায় একসঙ্গে উচ্চারিত হয় প্রফেসর হাইনসের নাম। এখন নিজে হাতে আর কোন গবেষণা না করলেও বছরে কতগুলো পেপারে যে উনি কো-অথর তার হিসেব মনে হয় ওনার নিজেরও থাকে না। অন্য অনেক কিছুর মতই এটাও ওনার সেক্রেটারি মিস হল দেখেন। আর তাই মিস হল ছাড়া প্রফেসর হাইনসের একদিনও চলে না।
একটা বই লেখার প্রস্তাব নিয়ে এলিফ্যান্ট প্রকাশনী থেকে ফোন করেছিল। আন্ডার গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সোশিয়লজির ক্লাসিক্যাল থিওরির বই। কিন্তু সময় কোথায়? এতবড় রিসার্চ সেন্টার চালানো কি মুখের কথা? তাতেই তো ওনার বেশিরভাগ সময় চলে যায়। বাকি সময়ের সিংহভাগ দেন চার্চকে। উনি মনে প্রাণে মা মেরীর পূজারী। এছাড়াও আছে ওনার পরিবার। স্ত্রী গ্যাবি, নিজের তিন ছেলে মেয়ে। এছাড়াও আর যে তিনটি ছেলে মেয়েকে উনি দত্তক নিয়েছেন তাদেরকেও সময় দিতে হয়। বই লেখার সময় কই? কিন্তু বইটা থেকে ভাল রয়্যালটি পাবেন, প্রকাশক সেরকমই বললেন। উনি এখনি ঠিক করে ফেললেন রয়্যালটি বাবদ পাওনা টাকাটা ওনার চার্চকেই দান করবেন।
সবকিছু চিন্তা করে প্রফেসর হাইনস হিসেব করে ফেললেন বইটা তিনভাগ করে নিলে সহজে লেখা হয়ে যাবে। দুই ভাগ দুজন ছাত্রকে দিয়ে লেখাবেন। আর একভাগ নিজে লিখবেন। ছোট ছোট করে বিষয় বস্তুগুলো লিখে শেষে কিছু প্রশ্নোত্তরমালা। কিছু ছোট ছোট গবেষণার আইডিয়াও যোগ করবেন। এমন করে লিখতে হবে যেন আন্ডারগ্রাজুয়েট ছেলেমেয়েরা একটা সেমেস্টারে একটা করে প্রোজেক্ট শেষ করতে পারে। এতো বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে উনি নিশ্চিত যে একটু সময় দিলে বইটা লেখা হয়ে যাবে। উনি মনে মনে হিসেব করতে শুরু করলেন কোন দুজন ছাত্র এই কাজের জন্য উপযুক্ত হতে পারে। কিছুক্ষণ ভেবে উনি ফোনটা তুলে মিস হলকে ডাকলেন। কাকে ইমেল করে কি লিখতে হবে উনি বলতে শুরু করলেন।

“প্রফেসর হাইনসের মতো মানুষ হয় না। এতোগুলো পিএইচডির স্টুডেন্ট। তাও কি করলে আমাদের কাজটা আরও ভাল হবে, আরও বেশি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে সেটা নিয়ে দিনরাত ভাবেন। পিএইচডি শেষ করে কোনো ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর চাকরি পেতে গেলে পেপার কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা সবসময় মনে করিয়ে দেন। পিএইচডি শেষ হতে এখনো এক বছর বাকি, আমার নাকি বুক চ্যাপ্টার হবে। ভাবলেই ভীষণ ভাল লাগছে।” এলোমেলো চুলগুলো হাতখোঁপা করতে করতে প্রচণ্ড উত্তেজিত রত্নাভা একটানা কথা বলে চলেছে।
জেকব আর রত্নাভা দুজনই আজ প্রফেসর হাইনসের থেকে মেল পেয়েছে বুক চ্যাপ্টার লেখার জন্য। দুজনকেই তিনটে করে চ্যাপ্টার লিখতে হবে। কিভাবে লিখতে হবে তাই নিয়ে বিশদে আলোচনা করার জন্য সময় নির্দিষ্ট করে দেখা করতে ডেকেছিলেন প্রফেসর হাইনস। সেই মিটিং শেষ করে দুজনে মিলে ক্যাফেটেরিয়া গিয়ে একটা করে বার্গার, চিপসের প্যাকেট আর কোল্ড ড্রিংকের গ্লাস নিয়ে বসে কথা বলছে।
“শুধু তাই নয়, উনি তো বললেন আমরা নাকি রয়্যালটিও পাবো। আমি কল্পনা করতে পারছি না। প্রফেসর হাইনসের সঙ্গে বই লিখব আবার রয়্যালটিও পাবো। আমার তো স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছে।” খাওয়া ফেলে জেকব হাতের নখ খেতে খেতে বলল।
“বইটা প্রকাশ হতে হতে আমাদের পিএইচডি শেষ হয়ে যাবে। তারপর হয়তো এখানেই পোস্টডক করার সুযোগটাও হয়ে যাবে। প্রফেসর হাইনস তো সেই রকমই বললেন, তাই না?”
“হ্যাঁ, এখানেই দু/তিন বছরের পোস্টডক হয়ে গেলে কোন ইউনিভার্সিটিতে একটা চাকরি পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।”
“এটাও ভাগ্যের ব্যাপার যে অন্য ইউনিভার্সিটিতে বা গবেষণা কেন্দ্রে পোস্টডক করার জন্য চেষ্টা করতে হবে না। এখানেই হয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ। এখন জান লড়িয়ে চ্যাপ্টারগুলো লিখে ফেলতে হবে। প্রফেসর হাইনস যেরকম খুঁতখুঁতে লোক। কতবার যে লিখতে হবে ভেবে একটু ভয় হচ্ছে আমার।”
“কিন্তু কিছু পেতে গেলে কষ্ট তো করতেই হবে। নিজের গবেষণার কাজ করে সময় হয় না। এরপর আছে থিসিস লেখা। কিন্তু রাত জেগে হলেও এই বই লেখার ব্যাপারটাও করতে হবে।”
“তা তো বটেই। প্রফেসর হাইনস যে সুযোগটা আমাদের দুজনকে দিয়েছেন তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে আমাদের। পিএইচডি শেষ হতে না হতেই বুক চ্যাপ্টার কজনের হয়?”
আশায় চকচক করে দুজনের চোখ। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়।

প্রফেসর হাইনস আজ এলিফ্যান্ট প্রকাশনী থেকে মেল পেয়েছেন। গত দেড় বছরে এই বইটা নিয়ে অনেকবার অনেক মেল চালাচালি হয়েছে। রয়্যালটি নিয়ে দর কষাকষি হয়েছে। লেখার ধরন পাল্টাতে হয়েছে। বিশেষ করে রত্নাভার ইংরেজি ব্রিটিশ ঘেঁষা। তাই ওকে দিয়ে বারে বারে লেখাতে হয়েছে। জেকবকেও অনেকবার লিখতে হয়েছে। তিনজনের লেখা মোটামুটি একরকম হতে হবে তো! আজই এলিফ্যান্ট প্রকাশনী জানিয়েছে যে প্রফেসর হাইনসের বইটা সামনের মাসেই পাবলিশ করবে ওরা। হ্যাঁ, বইটার লেখক একজনই, প্রফেসর হাইনস।
বুক চ্যাপ্টার হবে, রয়্যালটি পাবে এই আশাতেই জেকব আর রত্নাভা নিজেদের গবেষণার চাপ সামলে বইয়ের তিনটে করে চ্যাপ্টার লিখেছে। সম্পূর্ণ বইটা একা লিখতে হলে দেড় বছরে হত না, অনেক বেশি সময় লেগে যেত। পোস্টডক হিসেবে ওদের নেবেন এই টোপটাও খুব কাজে দিয়েছে। দিনরাত এক করে, খেয়ে না খেয়ে ওরা খেটেছে। যতবার বলেছেন ততবার লিখেছে। চ্যাপ্টারের শেষে প্রশ্নোত্তর অংশের জন্য ওরা কত বই, কত সাইট ঘেঁটেছে সেটা উনি জানেন। একই রকম পরিশ্রম করেছে প্রোজেক্টের আইডিয়ার জন্যও। বইয়ের কারনে রত্নাভার সঙ্গে ওর হাজব্যান্ডের নিয়মিত ফাইটের খবরও ওনার কানে এসেছে।
প্রফেসন হাইনস ভাবেন কম কষ্ট স্বীকার তো করে নি ওরা। তাই বইয়ের কৃতজ্ঞতা স্বীকার অংশে উনি রত্নাভা আর জেকবকে অনেক ধন্যবাদ জানাতে ভোলেন নি। উনি ধার্মিক মানুষ। অকৃতজ্ঞ হতে পারবেন না! বুক চ্যাপ্টার না হলেও ওদের পিএইচডি শেষ হয়েছে।
এবার বইটা ছেপে বেরোবে। তাই আপাতত প্রফেসর হাইনসের কাছে ওদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। প্রফেসর হাইনস ভাবলেন, ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়। আর সুদক্ষ ডিরেক্টর হিসেবে প্রফেসর হাইনস ভালই জানেন কি করে খুব সহজে রত্নাভা আর জেকবকে ছেঁটে ফেলতে হবে। উনি রত্নাভা আর জেকবের পিএইচডি গাইড। ওনার রেফারেন্স ছাড়া ওরা কোথাও কোন চাকরি পাবে না। তাই কিল খেয়ে কিল হজম করা ছাড়া কিছুই করার নেই ওদের। আফসোস একটাই যে ওরা দুজনই খুব ভালো গবেষক। ওদের দিয়ে ভবিষ্যতে অন্য কাজ করানোর সুযোগ আর হবে না। এই নিয়ে প্রফেসর হাইনস অবশ্য বিশেষ চিন্তিত নন। উনি জানেন আবার কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেন। আবার তাদের ব্যবহার করবেন তিনি নিজের সুবিধামত। আত্মতৃপ্তির একটা মৃদু হাসি প্রফেসর হাইনসের ঠোঁটে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। ফোনটা তুলে মিস হলকে ডাকলেন।
পোস্টডক হিসেবে চাকরি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ফান্ড নেই। তাই খুব দুঃখের সঙ্গে উনি এই গবেষণা কেন্দ্র থেকে রত্নাভা আর জেকবকে যেতে দিচ্ছেন। ডক্টর জেকব ফ্লিন্ট আর ডক্টর রত্নাভা কুন্ডুকে ওদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে লেখা মেলটা আজকেই পাঠিয়ে দিতে বললেন প্রফেসর হাইনস।

আপনার মতামত জানান