হুাইওয়ে/জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

শেষ পর্ব


বৃষ্টির ছিটেগুলো সত্যিই সেভাবে গায়ে লাগছে না। একটানা ড্রাইভ করার পর বাইরের খোলা হাওয়াতে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ লাগল পার্থর। গাড়ির কাঁচ নামানোর জন্য সর্বানীর ওপর রাগ দেখিয়ে, নিজে এই নিঝুম রাতে হাইওয়ের ধারে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ভিজছে, ভেবে নিজের মনেই হেসে ফেলল পার্থ। দুবাই থেকে কেনা লাইটারটা পকেট থেকে বার করে সিগারেটটা ধরাল। অন্ধকার হাইওয়েতে শুধু ওদের গাড়ির হেডলাইটের আলো আর ওর মুখে সিগারেটের লালচে আগুন। উইন্ড স্ক্রিনের ওয়াইপারটা বন্ধ করা, টিপ টিপ করে পরা জলের ফোঁটায় একদম ঢেকে গেছে সামনের কাঁচটা। গাড়ির ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না পার্থ, কিন্তু বুঝতে পারছে, সামনের সিটটা হেলিয়ে দিয়েছে সর্বানী, হয়ত চোখ বুঁজিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে। সর্বানীর মন আর শরীর দু’টোই বেশ কয়েক বছর হ’ল ঝিমিয়ে পড়েছে। খাওয়ার টেবিলে ঝিমিয়ে পড়া মনটা আর রাতের বিছানায় ঝিমিয়ে পড়া শরীরটা পার্থকে যেন মানসিক ভাবে আরও ক্লান্ত করে দিতো। সর্বানীকে সে নতুন দেখছে না, ছ’বছর অনেকটা সময়। প্রথমদিকে সম্পর্কের মধ্যে একটা উষ্ণতা ছিল। সব রকম পারিপার্শ্বিক দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে সর্বানী ছিল ওয়েসিসের মত। যার কাছে বার বার ফিরে আসা যায় আকণ্ঠ তৃষ্ণা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য।

অন্য বন্ধু আর সহকর্মীদের মত ফ্যামিলি-প্ল্যানিং নিয়ে কোনওদিন মাথা-ঘামাতো না পার্থ। কেরিয়ার-গ্রোথ নিয়ে একটা অ্যাম্বিশন ছিল, কিন্তু তার জন্য নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনকে বঞ্চিত করার এতটুকু ইচ্ছে ওর ছিল না। এমন কি তাদের মাঝে প্রথম সন্তান আসার সময়টাকেও পিছিয়ে দিতে চায়নি। বরং দিনরাত ভাবত কত তাড়াতাড়ি একটা নতুন ছোট্ট মুখ ওদের মাঝখানে আসবে, হামা দিয়ে বেড়াবে ওদের সাজানো ফ্ল্যাটের এঘর-ওঘর। অথচ পার্থর স্বপ্নের ওয়েসিসটাই কেমন ধীরে ধীরে বালির স্তূপে চাপা পড়ে গেল। হঠাৎ করেই যেন সর্বানীর মনের মধ্যে একটা অবসাদ ফিরে ফিরে আসত। পার্থকে পাগল করে দেওয়া শরীরটা যেন বার বার চরম মুহুর্তে কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ত। হয়ত তার চোখে ফুটে ওঠা তৎকালীন একটা অনীহা পার্থ দেখেও দেখেনি। একসময় পর পর দু’টো পিরিয়ড মিস হ’ল সর্বানীর। তলপেটে ব্যাথা নিয়ে গাইনিকোলজিস্টের কাছে ছুটে গেছিল। তারপর এক বছর ধরে অ্যাপয়েণ্টমেণ্টের পর অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট... এক স্পেশ্যালিস্টের থেকে আর এক স্পেশ্যালিস্ট। কিন্তু কেউই আশার আলো দেখাতে পারেনি। সেই শুরু, অবসন্নতার তাপে পার্থর ওয়েসিসটা তিলে তিলে কেমন শুকিয়ে গেল। সেই সর্বানীকে পার্থ আর খুঁজে পায়নি। চিনতে অসুবিধে হয় এতদিনের চেনা মানুষটাকে... আর নিজেকেও।

হাতের জ্বলন্ত সিগারেট টা কখন শেষ হয়ে এসছে খেয়াল করেনি। আঙুলে ছ্যাঁকা লাগতেই চমকে উঠে সিগারেটটা হাত থেকে ফেলে দিলো পার্থ। ভিজে রাস্তায় পড়েই ঝপ করে আগুনটা নিভে গেল শেষবারের ধোঁয়া ছেড়ে। ডান হাতের মাঝের আঙুলটা অল্প জ্বালা করছে। হয়ত অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল বলেই খেয়াল করেনি, আগুনের তাতে আঙুলের ফাঁকে চামড়ার খানিকটা ঝলসে গেছে। বৃষ্টির তোরটাও আবার বেড়েছে। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই। গাড়ির ভেতর ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো পার্থ। সর্বানীর চোখ তখনও বন্ধ, সিট পুশ-ব্যাক করা... হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে। জানলার কাঁচটা তখনও নামানো, বৃষ্টির ছাট এসে ওর ধীরে ধীরে ওঠা-নামা করা বুকের ওপর, কামিজে ছিট ছিট দাগ এঁকে দিয়েছে। নিজের দিকের জানলার কাঁচ তুলে, উলটো দিকের জানলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো পার্থ। কাঁচটা এবার তুলে দিতে হবে। তারপর এসি অন করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম... তারপর আবার অনেকটা পথ। সিটে বসে হাত পৌঁছল না, সর্বানীর দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে জানলার কাঁচ তুলতে হ’ল। শরীরের খুব কাছাকাছি আর একটা শরীরের অস্তিত্ব টের পেল সর্বানী, কিন্তু চোখ খুলল না। একই ভাবে চোখ বন্ধ রেখে শুধু চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে?”
- “কিছু না... কাঁচটা তুলে দিলাম।”
- “কেন?”
- “বৃষ্টির জল ভেতরে আসছে... বেড়েছে আবার।”
- “ও”
- “ও মানে? কাঁচটা তো তুলে দিতে হয়... গায়ে জল লাগছে, টের পাওনি?”
- “নাহ্‌... পাইনি। কিছুই টের পাইনি আমি।”
কোনও উত্তর দিলো না পার্থ, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের সিটটাও পেছন দিকে অল্প এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

নম্রতা’র সঙ্গে পার্থ’র সম্পর্কের কথা সর্বানী জানত। কিন্তু সেই সম্পর্কের গভীরতাটা বুঝতে পেরেছিল অনেক পরে। নম্রতা কাপ্‌সে, অফিসের সহকর্মী। অফিসের পার্টি, সোশ্যাল গেট-টুগেদার অনেকবার দেখা হয়েছে। পার্থই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ভীষণ প্রাণবন্ত মেয়ে, একদম যাকে বলে হট অ্যান্ড হ্যাপেনিং। প্রথম যেদিন পার্টিতে দেখা, সেদিন জিন্স আর উজ্জ্বল নীল রঙের টপে ঝলমল করা মেয়েটাকে দেখে সর্বানী বুঝতেই পারেনি যে সে ওর থেকে বড়, আর বিবাহিত। পার্থ যখন একজন মাঝবয়সী লোককে দেখিয়ে বলল, ‘হি ইজ মিস্টার কাপ্‌সে... নম্রতা’স্‌ হাজ্‌ব্যাণ্ড”। চমকে উঠেছিল সর্বানী। কিন্তু সে চমকও নতুন কিছু না। কলকাতার শহরতলী থেকে আসা মেয়ে, মুম্বাইয়ের মত জোরালো শহরে এসে শুধু চমকই দেখেছে একের পর এক। কাজেই এই শহরে নম্রতার মত মেয়ের এমন ভারিক্কী বর হওয়া অসম্ভব কিছু না। ভদ্রলোক সর্বানীকে প্রথম সাক্ষাতেই ড্রিঙ্কস অফার করেছিল। কেমন যেন একটা ঘোলাটে চোখ।

মেয়েটা বাড়িতেও এসেছে অনেকবার, পার্থ বা সর্বানীর জন্মদিনে, অথবা অ্যানিভার্সারীতে... অন্য কলিগদের সাথে। যেন চোখে-মুখে কথা বলত। সর্বানীর নামটা ঠিক করে বলতে পারত না, আর বলত “কাম অন! আই ক্যান্‌ট কল ইয়ু ভাবী... ইয়ু আর নট সো ভাবিজী টাইপ!” সর্বানী কেবল হেসে একবার পার্থর দিকে তাকাত, আর একবার নম্রতার দিকে। ডাক্তার দস্তুর যখন ফাইনালি জানিয়ে দিলেন, সারোগেট মাদারের ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, তার পর থেকেই পার্থ কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। বাড়িতে যতক্ষণ থাকত অফিসের ল্যাপটপ নিয়ে, না’হলে অফিসের কনফারেন্স কলে নিজেকে ব্যস্ত রাখত। কেবল মাত্র অফিস গ্যাদারিংগুলোতেই ওকে হা হা করে হাসতে দেখত সর্বানী। আর দেখত তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলা হুইস্কির মাত্রা। সারাদিন ধরে দেখা সেই ঠাণ্ডা মানুষটাকে বিছানায় একই রকম ঠাণ্ডা মনে হ’ত। এত পরিবর্তনের পাশেও যে আর একটা জিনিস সর্বানীর চোখে পড়েছিল, তা হ’ল পার্থর ঘন ঘন বিজনেস ট্যুর। কখনও বলত একা যাচ্ছি, কখনও বলত ডেলিগেট্‌সরা থাকবে... আর কখনও সঙ্গে থাকত নম্রতা। তখনও এই নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়নি, সাজানো ফ্ল্যাটের কোনে পরিত্যক্ত আসবাবের মত মনে হ’ত। তাই আরও বেশি করে হাউসিং-এর পার্টিগুলোতে, অনুষ্ঠানগুলোতে নিজেকে ব্যস্ত রাখত। চারপাশে সব ব্যস্ত লোকজনদের দেখতে দেখতে ব্যস্ত থাকাটা বেশ রপ্ত করে নিয়েছিল সর্বানী। পার্থর প্রচ্ছন্ন উপেক্ষাকেও হেলায় অদেখা করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই দিন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি, যেদিন খবর পেলো নম্রতার একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে... পার্থর সাথে কোয়ালা লাম্পুরে একমাসের বিজ্‌নেস ভিসিটের ঠিক ন’মাস পর। ডিপ্রেশনে রাতের পর রাত ঘুম না হওয়ার জন্য যে ঘুমের ওষুধগুলো খেতে বাধ্য হ’ত, তার সব ক’টা সেদিন স্বেচ্ছায় খেয়ে নিতে চেয়েছিল। একটু সাহস করলে, হয়ত পেরেও যেত। কিন্তু সাহসটাই বেইমানী করে গেল চিরকাল।

পার্থ ভীষণ ভাবে এড়িয়ে যেত সর্বানীকে সেই সময়। চোখে চোখ রেখে কথা বলত না। একবার সরাসরি বলেছিল – “ক’মাস কলকাতায় মা-বাবা’র কাছে থেকে এসো।” সর্বানী কানেই তোলেনি। যেন একটা জেদ চেপে গেছিল, এত কিছুর পরেও, পার্থকে কোনওমতেই আর একজনের হাতে এভাবে দিয়ে যাবে না। অন্তঃস্বত্তা হওয়ার পর নম্রতা আর আসত না ওদের বাড়ি। কেন আসত না, তা তখন বোঝেনি সর্বানী, এখন বোঝে। আর তার মেয়েটিকে কার মত দেখতে তাও সর্বানী দেখেনি। অফিস কলিগরা অনেকে গেছিল ব্লেস্‌ড কাপ্‌সে কাপ্‌ল কে উইশ করতে। আর পার্থ কাপ্‌সে পরিবারের সব থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন, তাকে তো থাকতেই হবে তাদের পাশে। ইচ্ছে থাকলেও কাপ্‌সে পরিবারের সেই নতুন অতিথিকে দেখতে যেতে পারেনি সর্বানী। পার্থ আর নম্রতাকে একসাথে কল্পনা করেই যে অন্তরটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেই পোড়া দৃষ্টি আর ওই ফুটফুটে মেয়েটার ওপর নাই বা পড়ল।

নম্রতার মেয়েটা হওয়ার পরেই, পার্থ আবার আগের মত হাসিখুশি হয়ে গেছিল। আগের মত আর সময় পেলেই হুইস্কির বোতল নিয়ে বসত না। চোখমুখের মধ্যেই একটা ঔজ্জ্বল্য এসে গেছিল। কিন্তু সেই আনন্দ পরিবারমুখী নয়। সর্বানীর প্রতি সে কোনওদিনও দুর্ব্যবহার করেনি। কিন্তু চির ধরে যাওয়া সম্পর্কটায় আর জোড়া লাগানোর কোনো আগ্রহও তার মধ্যে দেখা গেল না। নিয়মিত নম্রতার খোঁজ নিত, সর্বানীর সামনেই ফোন করত ঘনঘন। বার বার জিজ্ঞেস করত, “অ্যান্ড হাউজ দ্য লি’ল প্রিন্সেস?” অফিস থেকে নিয়মিত দেরি করে ফিরত, উইকেণ্ডেও তাকে যেতেই হ’ত নম্রতা আর তার লি’ল প্রিন্সেস কে দেখতে। নিজের অপ্রয়োজনীয়তাটা বেশ বুঝতে পারত সর্বানী। লি’ল প্রিন্সেসের টান এত প্রবল, যে পার্থকে আঁকরে ধরার সেই ইচ্ছেটাও ক্রমে ফিকে হয়ে গেছিল। যেখানে জেতার কোনও পুরস্কার নেই, হারার গ্লানি ষোলো আনা... সেখানে অসম লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আর কারণ থাকে না। হয়ত এই ভাবে আরও কয়েক মাস গেলে, সর্বানী নিজেই পার্থকে বলত কলকাতা ফেরার ফ্লাইট টিকিটের কথা। কিন্তু একেবারেই অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা সব কিছু পালটে দিলো। ঘটনা না বলে দুর্ঘটনা বলাই ভাল। হ্যাঁ, সর্বানীর মা হ’তে না পারাটা যেমন একটা দুর্ঘটনা, একমাসের কোয়ালা লাম্পুরের সফর যেমন একটা দুর্ঘটনা... ঠিক সেরকম এক দুর্ঘটনা। সাতারাতে মিঃ কাপ্‌সের আত্মীয়রা থাকে। মেয়ের ছ’মাস বয়স হ’তে সপরিবারে সেখানে গেছিলেন তিনি। সাতারা থেকে মুম্বাই ফেরার পথে, একটা রোড অ্যাক্সিডেণ্টে সব শেষ। হাইওয়ের ধারে শুধু দুমরোনো-মুচরোনো গাড়িটা, আর দু’টো প্রাণহীন দেহ পাওয়া গেছিল। বর্ষাকালে হাইওয়েতে এমন ব্রেকফেল করে অ্যাক্সিডেণ্ট নতুন কিছু না। তবে গাড়ির অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল ট্রাকের ধাক্কা। পুলিস এসে দেখেছিল গাড়ির পেছন দিকের দরজা খোলা... আর পার্থর লি’ল প্রিন্সেসের ছোট্ট দেহ বা তার কোনও খবর একেবারেই পাওয়া যায়নি।

যেমন ঝড়ের মত নম্রতা তার অনন্ত যৌবন আর মোহিনী রূপ নিয়ে এসেছিল, ঠিক তেমনই ঝড়ের মত সেই অনন্ত যৌবন নিয়ে চলে গেল। দুর্ঘটনার খবর পার্থ জেনেছিল অনেক পড়ে। সনাক্তকরণ থেকে শেষকৃত্য, কিছুতেই কাপ্‌সে পরিবারের ঘনিষ্ট বন্ধু পার্থ চৌধুরী ছিল না, কাপ্‌সে পরিবারের আত্মীয়রাই সব কিছু সম্পন্ন করে। পার্থর চোখে সেই হেরে যাওয়া দৃষ্টিটা সর্বানী সেই প্রথম দেখেছিল, যা সে এতদিন দেখত আয়নার সামনের দাঁড়ালে, তার নিজের চোখে।

- - -

খুব জোরে হর্ণ বাজাতে বাজাতে একটা ট্রাক চলে গেল। হাইওয়েতে এত রাতে সাধারণতঃ এইভাবে হর্ণ বাজায় না। হয়ত বৃষ্টির জন্য রাস্তা খারাপ, কিংবা... কে জানে? চোখ বন্ধ করে স্মৃতির পর্দায় অতীত দেখতে দেখতে হালকা তন্দ্রা যে কখন গভীর ঘুম হয়ে গেছে, বুঝতে পারেনি সর্বানী। ট্রাকের আওয়াজে ঘুমটা কেটে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে পার্থর দিকে তাকিয়ে দেখল, পার্থ এখনও ঘুমোচ্ছে... মুখ টা অল্প হাঁ হয়ে গেছে... ক্লান্তির ঘুম। বহুদিন পর এই ভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে দেখল পার্থকে। নম্রতার অ্যাক্সিডেণ্টের পর থেকে যে ভাবে পার্থ আসেপাশের সব কিছু সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে গেছে, তাকে অস্বাভাবিক ছাড়া আর কিছু বলা চলে না। অফিস, মিটিং আর হুইস্কি... এর বাইরে আর কোনও জগৎ নেই। রাতে বেশির ভাগ সময় ড্রয়িংরুমে কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। যে রাতে বেডরুমে ঘুমোতে আসে, সর্বানী বুঝতে পারে, ঘুমের মধ্যেও মানুষটা নম্রতা আর তার লি’ল প্রিন্সেস কে খুঁজে বেড়ায়।

মোবাইল ফোনটা সারা রাস্তা সাইলেণ্ট করা ছিল। কেউ ফোন করেছিল কিনা দেখার জন্য এখন একবার হাতে নিলো সর্বানী। মিসেস খান্নার ৩টে মিস্‌ড কল। মামাতো বোন রিয়া ২টো এস এম এস করেছে... আর দু’টো আননোন নাম্বার। মোবাইলের ঘড়ি বলছে চারটে বেজে গেছে, একটু পড়েই দিনের আলো ফুটবে। হাইওয়ের পথ এখনও অনেকটা বাকি। পার্থ ঘুম থেকে উঠে ড্রাইভ করতে পারবে না। ঘুম চোখে ওকে হাইওয়েতে ড্রাইভ করতে দেবে না সর্বানী... কিছুতেই না। তাই আরও খানিকটা দেরি হবে। কিন্তু পার্থর ওই নিশ্চিন্ত ঘুমটা ভাঙতে ইচ্ছে করল না। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। সর্বানী আবার একবার গাড়ির পেছন সিটের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। মেয়েটা অকাতরে ঘুমোচ্ছে, ওর থেকে দ্বিগুন মাপের টেডি বিয়ারটা পাশ বালিশের মত জড়িয়ে। পার্থর মত মাজা গায়ের রঙ, আর নম্রতার মত কোঁকড়ানো চুল। বয়স এখনও দু’বছরও হয়েছে বলে মনে হয় না। সর্বানী খুব সাবধানে গাড়ির দরজাটা খুলে পেছনের সিটে গিয়ে বসল, যাতে পার্থর ঘুম না ভেঙে যায়। টেডি বিয়ার আর সেই ঘুমন্ত মেয়েটাকে একসাথে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। মেয়েটা ঘুমের মধ্যে কিছু একটা শব্দ করল। আরও দৃঢ় ভাবে জড়িয়ে ধরল সর্বানী।

- - -

ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহল থেকে, বা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে একাধিকবার চাইল্ড অ্যাডপ্ট করার উপদেশ এসেছে পার্থ আর সর্বানীর কাছে। সর্বানী মেনে নিলেও পার্থ মেনে নেয়নি। সারোগেট মাদারের পরামর্শ তো গ্রাহ্যই করেনি। অথচ সর্বানীর এই বারের অনুরোধটা পার্থও মেনে নিয়েছে। সেই মেনে নেওয়ার অবশ্য কিছু কারণ ছিল। মিসেস খান্নাই ঠিক করে দিয়েছিলেন সব কিছু। সর্বানীর তরফ থেকে একটা স্পেশ্যাল ট্রিট ওনার প্রাপ্য। বেশ কিছুদিন ধরে যোগাযোগ করে, কোলহাপুরের সেই অর্ফ্যানেজে খোঁজ খবর করে, বাচ্চা মেয়েটিকে দেখেই স্থির করা হয়েছিল। আজ পার্থর সাথে একসাথে গিয়ে তাকে নিয়ে আসা হ’ল। বড় মাপের টেডি বিয়ারটাও পার্থই কিনে নিয়ে গেছিল সঙ্গে। পার্থ জানে, এক বছর আগে সাতার থেকে পুনে যাওয়ার পথে, হাইওয়েতে যে মাস ছয়েকের বাচ্চা মেয়েটাকে আহত অবস্থায় পাওয়া গেছিল, এই সে। ঠিক নম্রতার মত কোঁকরানো চুল, সেইরকম চোখ। তার লি’ল প্রিন্সেস। অর্ফ্যানেজের সেই আধিকারিকও বলল, কেউ সঠিক বলতে পারেনি ওই বাচ্চা কাদের। পুলিস থেকে এইখানে দিয়ে গেছিল। তবে কোনও দুর্ঘটনাস্থলের কাছে নয়, পুলিশের প্যাট্রলিং জিপ একে অন্য কোথাও পথের ধারে পড়ে থাকতে দেখে। কাদের মেয়ে জানারও কোনও উপায় ছিল না, আর সেভাবে কেউ খোঁজও করেনি নাকি সেই সময়। পড়েও কেউ নিতে আসেনি। পার্থরা না এলে, হয়ত অন্য কোনও নিঃসন্তান দম্পতি নিয়ে যেত। যদিও তা হয়নি, পার্থরই গাড়িতে করে মুম্বাইয়ে ফিরে যাচ্ছে তার লি’ল প্রিন্সেস। চোখ খুলেই পার্থ দেখল বাইরের আকাশে আলো ফুটেছে... সূর্য উঠতে দেরি এখনও আছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। সিট টা সোজা করতে গিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখল সর্বানী নেই। ব্যস্ত হয়ে পেছন ফিরে দেখল, সর্বানী ঘুমোচ্ছে, তার লি’ল প্রিন্সেস কে জড়িয়ে ধরে। গাড়ির পেছনের সিটে তিনটে পুতুল, আর মুখে একটা ছেলেমানুষি হাসি নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো পার্থ। হাইওয়ের এখনও অনেকটা বাকি, ওদের গন্তব্য এখনও বেশ কিছুটা দূরে। সজাগ হয়ে বসল পার্থ... স্টিয়ারিং টা শক্ত করে ধরে।

সর্বানী এমনিতেই ভীষণ তাড়া দিচ্ছিল, অর্ফ্যানেজ থেকে ফেরার সময়। মেয়েটিকে আনতে, তার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস গাড়ি তে তোলা, তাকে যাওয়ার জন্য তৈরি করা, পার্থ আর সর্বানীকে দেখিয়ে তার মা-বাবা বলে চেনানোর সংস্থার নিয়মরক্ষা... এইসবের মধ্যে অনেকটাই সময় চলে গেছিল। বিকেল বিকেল বেরোতে না পারলে, বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। তাই পার্থও কোনও রকমে সব ফর্ম্যালিটি সেরে বেড়িয়ে পড়েছিল। অর্ফ্যানেজের গেট পেরিয়ে যাবার পর আর পেছন ফিরে দেখেনি। ছোট্ট মেয়েটাকে ওখানে সবাই মিলি বলে ডাকত, মিলি শুধু পেছন ঘুরে হাত নেড়ে কাউকে বাই বাই করছিল। সর্বানীর এই বার বার অস্থির হয়ে ওঠা, আর বাড়ি ফেরার জন্য তাড়া দেওয়ার কারণ পার্থ কতটা বুঝে ছিল কে জানে, তবে সেই অনাথাশ্রমের দুই আধিকারিক ঠিক বুঝেছিল, যারা ওরা চলে যাওয়ার পর একে অপর কে চাপা গলায় বলল –

- হি মুলগি তার সাহা মাহিয়াঁন পুর্বি শাহুওয়াড়ি এরিয়া ছ্যে হসপিটাল মাধ্যে সাপাডলি হতি।
- হো, মাগ?
- আনি তু হাইওয়ে অ্যাক্সিডেণ্ট চি কেস সাঙ্গুন চুনা লাভালাস!
- বিস হাজারাঞ্চ্যে কারারেয়া নোটা... মুলগি পান খুশ, মাডাম পান খুশ, আনি মি পান খুশ!

ওহ! এ ভাষা আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, তাই না? ওরা যা বলল, তার সহজ বাংলা করলে অনেকটা এমন দাঁড়ায় –

- এই বাচ্চাটা তো মাস ছয়েক আগে শাহুওয়াড়ি এরিয়ার হসপিটাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
- হ্যাঁ তো?
- আর তুই অ্যাক্সিডেন্ট কেস্‌ বলে ঢপ মেরে দিলি?
- কড়কড়ে বিশ হাজার টাকা ক্যাশ... বাচ্চা খুশ, ম্যাডাম খুশ, আমিও খুশ!

(সমাপ্ত)

আপনার মতামত জানান