ব্যবহার পরবর্তী অধ্যায়

বংপেন

ফটো বিক্রমাদিত্য গুহ রায়



- বাবা সত্যেন, একটু আমার কেসটা...
- মধুময়বাবু, শুনুন। আপনি না হয় রিটায়ার করেছেন- ঝাড়া হাত পা। কিন্তু আমাদের তো আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ালে চলে না। অফিসে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করতে হচ্ছে...আপনি যদি দুদিন অন্তর এসে এমন ঘ্যানঘ্যান করেন, তাহলেই তো মুশকিল...
- আসলে বাবা, আমার পেনসনের টাকাটা গত দু মাস ব্যাঙ্কে আসেনি...
- শুনুন, কোম্পানি থেকে হাজার গণ্ডা পেমেন্ট রোজ ব্যাঙ্কে যাচ্ছে। দু একটা শালটিং কেস থাকেই। আজ গণ্ডগোল কাল ম্যানেজ। কাল না হলে পরশু। কিন্তু আপনি মাইরি এমন হুজ্জুতি করছেন যেন আপনার কাছা খুলে গেছে। দু মাস না হয়ে পেনসন পাননি। পেয়ে যাবেন। কোম্পানি কি আপনার টাকা মেরে দেবে নাকি ? আর আপনার ছেলে তো বড় অফিসার। এত গলা শুকনো কেন আপনার মশাই ?
- এই কোম্পানিতে ঊনচল্লিশ বছর কাজ করেছি বাবা। সিক্সটি সেভেনে যখন জয়েন করি তখন এই নয় তলা বাড়ি ছিল না। দু কামরার ছোট্ট সওদাগরী আপিস ছিল। ঘাম, রক্ত সমস্তই দিয়েছি। আমি হুজ্জুতি করতে আসিনি।
- আলবাত করছেন হুজ্জুতি। বড় সায়েবের কানে লাগাননি আপনার পেনশনের কথা ? যতসব। এবার আসুন দেখি। আপনার মত চিজ কত দেখলাম।
- সত্যেন, তোমায় আমি হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছি...আর তুমি...
- বাদ দিন মশাই, ধান্দা ছাড়া কেউ কিছু করে না। আসুন দেখি এবারে মধুময়বাবু। অনেক কাজ রয়েছে।
**
- স্যার আপনি ডেকেছিলেন...
- উম ? হুম। ইয়ে চন্দন। তোমায় একটা কথা বলার ছিল। বালাসোরে আমাদের নতুন ফ্যাক্টরির কমিশনিং আগামী মাসে।
- আচ্ছা।
- সে ফ্যাক্টরি তোমাকেই সামলাতে হবে। এ মাসের শেষেই প্ল্যান করে নাও। কোয়ার্টার আর সমস্ত ব্যবস্থা আমরাই...
- ট্র্যান্সফার ? বদলী করে দিচ্ছেন আমায় ?
- ইট্‌স অ্যান অপরচুনিটি চন্দন। সে ভাবে দেখ।
- প্রমোশন দিয়ে পাঠাচ্ছেন কি ?
- না মানে। একজনকেই প্রমোট করা যেত। দিব্যেন্দুকেই...
- কলকাতার প্রোজেক্টের জন্যে গত দু বছর মুখে রক্ত তুলে খেটেছি...সেই প্রোজেক্ট আজ যখন দাঁড়িয়ে গেছে...তখন আমায় ট্র্যান্সফার করে দিচ্ছেন? তাও উইদাউট প্রোমোশন? আর দিব্যেন্দু চালাবে কলকাতার ফ্যাক্টরি ? কি করেছে ও গত দু বছর? বরং স্ক্র্যাপের ব্যাপারে আন্ডার দ্য টেব্‌ল কম গোলমাল করেনি...
- তোমার কাছে ঠিক ভুলের হিসেব শুনতে চাইনি। ম্যানেজমেন্ট এটাই চায়...
- না কি আপনি চান ? দিব্যেন্দুকে আপনি কিসের ইন্টারেস্টে বাঁচিয়ে চলেছেন তা কি আমি জানি না ভেবেছেন ?
- হোয়াট ডু ইউ মিন ?
- স্ক্র্যাপের প্রত্যেক কনসাইনমেন্টে শর্মার থেকে দিব্যেন্দু যে সাড়ে সাত পারসেন্ট খেত, তা যে আধাআধি ভাগ হত সে খবর জেনে যাওয়াটাই বোধ হয় আমার কাল হল স্যার।
- ননসেন্স। তোমার সাথে আমি আর কথা বাড়াতে চাই না।
- স্যার কলকাতার এই প্রোজেক্টকে আমি খাদের কিনারা থেকে তুলে এনেছি। দিন রাত এক করে।
- ওয়েল। তুমি নয়। আমি আর আমার টিম করেছি। দ্যাট্‌স ইট। আর যদি বাড়াবাড়ি কর, তবে বড় ক্ষতি হতে পারে তোমার চন্দন। এটা থ্রেট নয়, অ্যাডভাইস। এবার এসো। বদলীর চিঠি আজ বিকেলের মধ্যে পেয়ে যাবে।

**
- হ্যাঁ রে, তোর নাকি বদলী হয়ে যাচ্ছে ? বৌমা বললে...
- বালাসোর...পরের মাস থেকে
- প্রোমোশন?
- নাঃ, এবারেও হল না
- তোর খুব মন খারাপ তাই না রে?
- না না, এটা একটা অপরচুনিটি বলতে পারো। নতুন প্রোজেক্ট। কত কিছু করার সুযোগ।
- প্রমোশনটার জন্যে?
- ও এক বছর এদিক ওদিক হতেই পারে বাবা। সামনের বছর নিশ্চিত। বস নিজে আমায় বলেছে, আসছে বছর হবেই। ম্যানেজমেন্টের বেশ নেক নজরেই আছি। চিন্তা করো না।
- না না। চিন্তা করছি না। তুই আমার ছেলে। আমি জানি তুই অনেস্ট। সিনসিয়ার। তোর ভালো না হলে যে সমস্ত প্রবাদ বাক্য মিথ্যে হয়ে যাবে।
- তা বাবা, তোমার পেনসনের কি হল ? আজ যে অফিসে গেলে, তোমার পুরনো ওই চেলা কি বললে...কি যেন নাম...ওই সত্যেনবাবু...
- কে সত্যেন ? ছেলেটা আমায় এখনও বেশ ইয়ে করে রে...সে খুব লজ্জিত আমার পেনসনের প্রবলেমটা ইমিডীয়েটলি সল্ভ করতে পারলে না বলে... তবে খুব চেষ্টা করছে...ইন ফ্যাক্ট আমায় সে জোর দিয়ে বলেছে যে প্রয়োজনে উপর মহলে সে নিজে গিয়ে কথা বলে আমার পেনশনের প্রবলেম সামনের মাসের মধ্যেই মিটিয়ে ফেলবে।
- না না। চিন্তা কিসের বল বাবা। তুমি যেভাবে প্রাণ উজাড় করে কাজ করেছ এত বছর। অফিসের লোক তোমার মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালবাসবে এটাই তো স্বাভাবিক। তোমার অসুবিধেয় তো তারা ঝাঁপিয়ে পড়বেই বল।
- তোকে আজকাল বড় ক্লান্ত লাগে রে চন্দন। খুব খাটাখাটনি যাচ্ছে না রে।
- ওই আর কি বাবা। মায়ের কথা খুব মনে পড়ে আজকাল।
- আমারও পড়ে জানিস, আমারও মায়ের কথা মনে পড়ে। যখনই মনটা খারাপ হয়, তখনই মায়ের কথা একটু মনে করে নি ইন ফ্যাক্ট। মন বেশ ভালো হয়ে যায়। মন ভালো হলেই আবার অন্য সব চিন্তার দিকে চলে যায় মন। পেনসন। বাড়ির রিপেয়ার। সুগার লেভেল। হেঃ।
- আরেব্বাস। আমারও তো তাই। মা’র কথা মনে করলেই মন ভালো। আর মন ভালো হলেই প্রোজেক্ট, প্রোমোশন বা সংসারের কথা মনের মধ্যে ওয়াপস।
- মায়ের গায়ের গন্ধের মতই, মায়ের স্মৃতিটুকুতেও কেমন ম্যাজিক আছে তাই না রে ?
- ঠিক বলেছ বাবা। আর আমরা নিজেদের মায়ের স্মৃতি কেমন স্বার্থপরের মত ব্যবহার করি বল। মন খারাপ হলেই মায়ের কথা ভাবি – তার স্মৃতি ইউজ করি। মন ভালো হয়ে গেলেই থ্রো করে দিই। ইউজ অ্যান্ড থ্রো। হেঃ হেঃ।
- ঠিক বলেছিস। হ্যাঁ রে, তুই কি এই মুহূর্তে মায়ের কথা মনে করেছিস ?
- হুম। ওই আর কি। আর তুমি বাবা ?
- ইয়েস। মায়ের কথা মনে করছি। ইউজ করছি মায়ের স্মৃতি। আপাতত।

আপনার মতামত জানান