জানলা/অন্বেষা বসু

প্রথম পর্ব

অলংকরণ- তৌসিফ হক


ঘরখানা ভারী পছন্দ হয়েছে লাবণ্যর! মেহগনি কাঠের পুরনো আমলের খাট-পালঙ্ক, আলমারি-দেরাজ উঁচু উঁচু মোটা গরাদের জানলা, প্রকাণ্ড দরজা, মাথার ওপর অনেকটা উঁচুতে ঘটাং ঘটাং শব্দ করে ঘুরে চলা ক্রম্পটন গ্রিভস এর ইয়া বড় পাখা আর পশ্চিমে এক ফালি ঝুলবারান্দা। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে লাবণ্য। আর বুক ভরে ঘ্রাণ নেয় ও। আভিজাত্যের ঘ্রাণ, প্রাচীনের ঘ্রাণ! পুরনো আসবাবের ওপর নতুন বার্নিশের গন্ধ মিশে যায় সদ্যভেজা মাটির গন্ধে। জানলার লোহার গরাদ দুটো ছোট্ট মুঠোয় ধরতে পারেনা ও নাক ঠেকিয়ে দেয় ওখানে, সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়েছে কাল, লোহার গরাদ থেকে জং এর গন্ধ উঠে আসে। ভীষণ ঘুম পায় ওর। কাল সারারাত ঘুমোতে পারেনি ও। রাতের কথা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে ওর। হাত পা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে যায় হঠাৎ! গলা শুকিয়ে কাঠ! কিন্তু, জল খাবে বলে পা বাড়াতেই পা দুটো ক্রমে অবশ হয়ে আসে। চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ে ও! একটা অজানা ভয় ছড়িয়ে যায় ওর সর্বাঙ্গে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মনে হয় নিজেকে ওর। আর ঠিক তখনি ঝনঝন করে বেজে ওঠে মোবাইলটা! সম্বিৎ ফিরতে ফোনটা ছুটে ধরতে গিয়ে সদ্য পরতে শেখা শাড়িতে পা জড়িয়ে পড়ে যায় লাবণ্য!

“কই দেখি, কোথায় লেগেছে?”
“লাগেনি তেমন। আমি আরনিকা খেয়েছি।“
“তাতে কি ব্যথা কমেছে? কেমন পা টেনে টেনে হাঁটছ! দেখি কোথায় লেগেছে?”
“বললাম তো লাগেনি। অল্প ব্যথা আছে। ঠিক হয়ে যাবে।“
“কী হয়েছে? অভিমান হয়েছে?”—বলতে বলতে লাবণ্যকে কাছে টানে নির্বাণ। দু হাতের বেড়ে বেঁধে ফেলে ওকে। নির্বাণ দুচোখ ভরে দেখে ওর নবঢ়াকে। ছোট্ট এক চিলতে চড়ুই পাখির মত মেয়ে লাবণ্য। কৃশাঙ্গী, শ্যামবর্ণা, শান্ত, নম্র স্বভাবের এই মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল নির্বাণের। ওদের নেগোশিয়েশান ম্যারেজ। শহরতলির মেয়ে লাবণ্য। চমৎকার গানের গলা! পড়াশুনায় মন নেই তেমন। তাই ডিগ্রি ক্লাসের পড়াশুনা শেষ হতে না হতেই বাবা মা বিয়ে দিয়ে দেন ওর। ছোট্ট একরত্তি মেয়ে লাবণ্য। নির্বাণের চেয়ে প্রায় বছর ছয়েকের ছোট এই মেয়েটিকে বড় ভালোবেসে ফেলেছে ও। সদ্য বিয়ে হয়েছে ওদের। বিয়ের আগে অবিশ্যি মাস দুয়েকের দেখাশোনা হয়েছে। কিন্তু মেয়ে বড় লাজুক। লাজুক আর অভিমানী। আর কী ভীষণ ছেলেমানুষ! মাঝে মাঝে নিজেকে কেমন বৃদ্ধ লাগে ওর কাছে। কেমন মনে হয় লাবণ্য ঠিক খুলতে পারছে না নিজেকে ওর কাছে। মেলতে পারছে না। সহজ হতে পারছে না। ও চেষ্টা করে সহজ করে দিতে সবটা। কিন্তু বোঝে সময় লাগবে। বেশ কিছুটা সময় লাগবে। তবু কাছে টানে ওকে। আদরে আদরে ঢেকে দিতে চায় ওর ছোট্ট শরীরটাকে। কিন্তু আদরের নীচে একটা আড়ষ্ট হতে থাকা শরীরকে অনুভব করে আর চমকে ওঠে ও। এত অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা!
নির্বাণের আশ্লেষে দমবন্ধ হয়ে আসে লাবণ্যর। ডিওর গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। কোনরকমে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে ওঠে “কী বিচ্ছিরি ডিও! গন্ধটা একদম ভালো না।“ ওকে ছেড়ে দিয়ে হেসে ফেলে নির্বাণ। বলে, “আচ্ছা বেশ, কাল থেকে আর মাখব না এটা। তোমার যেটা ভালো লাগে বোলো, সেটাই মাখব।“ লাবণ্য অল্প হাসে। তারপর বলে, “তোমার জন্য চা করে আনি। তুমি স্নান করে এসো।“ ওর বড় বড় উজ্জ্বল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত সময় নেয় ও। তারপর আস্তে করে বলে, “হ্যাঁ, যাই।“
খোলা জানলা দিয়ে একটা ভেজা বাতাস ঢুকে পড়ছে ঘরে। তার সাথে মিশে যাচ্ছে গন্ধরাজ ফুলের ঘুমপাড়ানি ঘ্রাণ। মাথাটা ধরেছে ভীষণ। একটা সিগারেট ধরায় নির্বাণ। বড় করে একটা টান দিতে দিতে ভাবে সত্যিই কি কাল একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল? নইলে ওরম করে কাঁদল কেন মেয়েটা? সারারাত ঘুমল না কেন? নিজের ওপর অসম্ভব রাগ হয় ওর। রাগ হয় নিজের পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির টানটান সুঠাম পুরুষ শরীরটার প্রতি! হঠাৎ ভীষণ কান্না পায় ওর। মৃত মায়ের মুখটা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে ছোটবেলার সেই রাতগুলোর কথা। কত রাতে বাবা মায়ের ঝগড়া শুনে ঘুম ভেঙে গেছে ওর। কাঠ হয়ে শুয়ে থেকেছে ও। আর শক্ত করে বুজে রেখেছে চোখ। কারণ চোখ খুললেই যে উপচে পড়বে জল! ওই নোংরা কথাগুলো যাতে কানে না ঢোকে, বালিশ চেপে ধরে রাখত কানের ওপর। তাও সব কিছু ছাপিয়ে কানে ভেসে আসত একটা গোঙানির আওয়াজ, একটা কান্নার শব্দ। মায়ের কান্না। খুব ইচ্ছে করত মাকে জড়িয়ে ধরতে তখন। পারত না। ভয়ে। একভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ত! ঘুম ভাঙত সকালে, কপালে মায়ের হাতের নরম স্পর্শে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখত সব কিছুই আবার আগের মত। সুন্দর। উজ্জ্বল। ও দুচোখ ভরে দেখত মাকে। বড় টিপ পরলে কী সুন্দর দেখায় মাকে! প্রতিমার মত মায়ের মুখখানি। রোদ্দুরমাখা বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে আগের রাতের ঘটনাগুলো দুঃস্বপ্ন মনে হত ওর। মনে হত সব মিথ্যে! এই সকালটাই সত্যি। মা কত খুশি! মা কত হাসছে! রাতের ঘটনা সত্যি হতে পারেই না _ সাতদিনের জ্বরে মারা গিয়েছিলেন মা। ডাক্তার সন্দেহ করেছিলেন টাইফয়েড। কিন্তু, ঠিকমত চিকিৎসা হল না মায়ের। ডাক্তার যা যা টেস্ট করাতে বলেছিলেন, একটাও করান হয়নি। মা জেদ করেই করাতে দেননি। হোমিওপ্যাথির ওপর ভরসা করে পড়েছিলেন। জ্বর সারেনি। সাতদিনের মাথায় মারা গেলেন মা। পারলৌকিক ক্রিয়া অবশ্য বেশ ঘটা করেই হয়েছিল। এত বড় অভিজাত বংশের বৌ মরেছে বলে কথা! উফ অসহ্য যন্ত্রণা! সিগারেটটা ফেলে দিয়ে মাথার রগ দুটো চেপে ধরে বিছানায় বসে পড়ে নির্বাণ।

মেয়েটাকে রোজ দেখে লাবণ্য। কাপড় তোলবার নাম করে বিকেলে বেশ কিছুক্ষণ ছাদে ঘুরে নেয় মেয়েটা। দেখে মনে হয় স্কুলে পড়ে। বিকেলে এই সময় বেশ একটা হাওয়া দেয়। মেয়েটা কাপড় তুলে, গুছিয়ে ভাঁজ করে আস্তে আস্তে ছাদের আলসেতে মেলে দেয়। তারপর একা একা ঘুরে বেড়ায় ছাদে। কখনো আপনমনে গান গায়। কখনো বা চিরুনি দিয়ে চেপে চেপে আঁচড়ে নেয় ঘন, কালো মেঘলা চুল। শক্ত করে বিনুনি বেঁধে নেয়। আবার কখনো খোঁপা খুলে দেয়। পিঠময় ছড়িয়ে যায় কালো চুল। আনমনা চোখে মেখে নেয় আকাশ। বাড়ন্ত শরীরে লুটিয়ে পড়ে পূবের হাওয়া। ভীষণ ভাললাগে লাবণ্যর। জানলার গরাদ দুটো ধরে নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখে পাশের বাড়ির ছাদের মেয়েটাকে। আবছায়া ঘরে গুমোট লাগে ওর। গলার কাছটা ব্যথা করে ওঠে। মেয়েটার দেখাদেখি ও নিজের চুল খুলে দেয়। আঙুল চালিয়ে দেয় চুলের মধ্যে। ঘামে ভেজা চুল জড়িয়ে যায় আঙুলে। আস্তে আস্তে চুল, মাথা ছাড়িয়ে হাত নিয়ে যায় ঘাড়ের কাছে। আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেয় নিজের ঘাড়ে। বড় ভাললাগে ওর। তারপর পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে যতখানি হাত নামে নিয়ে যায় কী আরাম! ধীর পায়ে অন্ধকার নেমে আসে শহরে। মেয়েটি কখন চলে গেছে। ছাদ ফাঁকা। লাবণ্যর মনখারাপ হয়ে যায়। মার কথা মনে পড়ে ভীষণ। ঘরের আলো জ্বালায় না, হাতড়ে হাতড়ে মোবাইল টা খুঁজে নিয়ে ফোন করে মাকে।
“কেমন আছ মা?”
“ভালো আছি রে। তুই কেমন আছিস? জামাই ভালো আছে তো?”
“হ্যাঁ মা, ভালো আছি আমি। ও-ও ভালোই আছে।“
“কাজকম্ম করছিস? নাকি, দিনরাত শুয়েবসে কাটিয়ে দিচ্ছিস? অবশ্য, কাজের লোক রয়েছে, রান্নার লোক রয়েছে, তোর আর কাজ করার দরকার কী? আমার মত তো আর একার সংসার নয়!”
মায়ের কথায় মনটা কেমন খারাপ হয়ে যায়। তাও জোর করে হাসে। বলে, “হ্যাঁ গো, এখানে আমায় কোনও কাজ করতে হয় না। আমি নিজের মতই থাকি। মাঝে মাঝে এটা ওটা করি। তুমি কী করছ গো এখন?”
“আমি এবার সন্ধ্যে দিতে যাব রে। তোর ভাই তো এখনো ফেরেনি কলেজ থেকে। ও ফিরলে একটু লুচি-আলুচচ্চড়ি করে দেব। সারাদিন বেচারির কিচ্ছু খাওয়া হয়না রে ঠিক করে।“
“ভাই কেমন আছে মা?”
“তুই নিজেই ওকে ফোন কর না! খুশি হবে ও। কালই বলছিল, দিদি শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ভুলেই গেছে আমাদের।“
গলার কাছের দলা পাকানো কষ্টটা এবার চোখ ছাপিয়ে নেমে আসে। কোনোমতে বলে, “ওরও তো একটা মোবাইল আছে মা। ফোন তো ও-ও করতে পারে। ভুলে আমি যাইনি তোমাদের, বরং তোমরাই ভুলে গেছ আমাকে। বিয়ের পর একদিন মাত্র খবর নিয়েছিলে আমার। এছাড়া প্রতিবার আমিই ফোন করি। আমার জন্য কি একটুও মনকেমন করে না মা তোমার? জানতে ইচ্ছে করে না আমি কেমন আছি? বাবা, ভাইএর কথা ছেড়েই দিলাম, তুমিও তো খোঁজ নিতে পারো আমার। চাইলেই পারো। ভাই তো তোমার চোখের সামনে আছে, তাও তুমি ওর খাওয়া নিয়ে এত ভাবো, একবারও জানতে চাইলে না তো আমার ঠিকমত খাওয়া দাওয়া হচ্ছে কিনা! ভুলে কে গেছে, আমি না তোমরা?”
“এত বড় মেয়ে হয়েছিস লজ্জা করে না এসব বলতে? তোর অত বড় ঘরে বিয়ে দেওয়া হয়েছে তার জন্য কত খরচ হয়েছে জানিস? অনেক ভাগ্য করে অমন বর পেয়েছিস! তোর কী আছে? না আছে রূপ, না কোনও গুণ! অত বড়লোকের বাড়িতে বিয়ে দেওয়া হয়েছে খাওয়া-পরার সমস্যা কেন হবে? আর বিয়ে হয়ে গেছে এখনো নিজের ছোট ভাইকে এত হিংসে? তুই কোনদিন সুখি হবি না দেখিস! যাকগে আমার দেরি হচ্ছে। রাখছি এখন।“
মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়েও পারল না লাবণ্য। শুধু কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ল বিছানায়। অসহায়ের মত, পাগলিনীর মত কাঁদতে লাগল ও।

বাবার শরীরটা হঠাৎ বেশি খারাপ হওয়ায় জলপাইগুড়ির টিকিটটা ক্যান্সেল করতে হল নির্বাণকে। বিয়ের পর লাবণ্যকে নিয়ে কোথাও যাওয়া হয়নি। জলপাইগুড়িতে নির্বাণের খুব কাছের বান্ধবী অনসূয়ার বাড়ি। অনসূয়া নির্বাণের ইউনিভার্সিটির বন্ধু। অসম্ভব স্বাধীনচেতা, স্মার্ট, বুদ্ধিমতী মেয়ে অনসূয়া। কিন্তু একটু খ্যাপাটে। ভয়ঙ্কর সুন্দরী কিন্তু ভীষণ অগোছালো, এলোমেলো। ও নিজেই যেন কোনও এক এলো হাওয়া। নির্বাণ ভীষণ ভালবাসে অনসূয়াকে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ হবার পর ওরা দুজনেই দুটো স্কুল জয়েন করে। খুব অল্পদিনের মধ্যেই নির্বাণ ভালোবেসে ফেলে নিজের স্কুলকে, নিজের কাজকে, আপন করে নেয় ছাত্রছাত্রীদের। আর অনসূয়া কিছুদিন কাজ করার পর রিয়েলাইজ করে, গতে বাঁধা, সিলেবাস কেন্দ্রিক পড়াশোনায় ও টিকতে পারবে না। যে সিস্টেমটা থেকে বেরনোর জন্য এতদিন হাঁসফাঁস করছিল, আবার সেখানেই ফিরে যাওয়া? ইম্পসিবল! তাই, চাকরি বাকরি ছেড়ে প্রেম করে বসল! বেশ কিছুদিন প্রেম চলার পর লক্ষ্মী মেয়ের মত বিয়ে থা করে জমিয়ে সংসার করছে! অনসূয়ার বর অমিত জলপাইগুড়ির একটা কলেজের প্রোফেসার। চমৎকার মানুষ। বহুদিন ধরেই নির্বাণকে ওদের ওখানে যেতে বলছে ওরা। কিন্তু স্কুলে ছুটি নিয়ে সময় সুযোগ করে আর যাওয়া হয়নি। ওদের বিয়ের সময় সেই যে গেছিল সব বন্ধুরা মিলে, পরে আর যাওয়াই হল না। নির্বাণের বিয়ের পর তাই অনসূয়া বলেছিল, “বৌ কে নিয়ে চলে আয়। হানিমুনের জন্য এর চে’ রোম্যান্টিক জায়গা আর পাবি না। খিক খিক!” তাতে নির্বাণ বলেছিল, “পাগল! তোর ওখানে যাব হানিমুনে? তুই তো আওয়াজ দিয়েই আমাদের রোম্যান্সের বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দিবি! রেহাই দে মা, আমি যাচ্ছি না!“ কিন্তু, মনে মনে ও স্থির করে ফেলেছিল লাবণ্যকে নিয়ে ওখানেই যাবে। অমিত জলপাইগুড়ির ছেলে হওয়ায় টুরিস্ট স্পট-এর বাইরে গিয়ে আসল জলপাইগুড়ি চেনাতে পারবে ও। নির্বাণ ওর কাছে গল্প শুনেছে, এমন অনেক আনস্পয়েল্ট জায়গা আছে ইন্টিরিয়রে, যেগুলো এক্সপ্লোর না করলে বিশ্বাসই হবে না একটা অদেখা, অজানা ভারত লুকিয়ে রয়েছে ভারতের উত্তরপূর্বে! অতএব, জলপাইগুড়ি যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেয় ও। সব প্রস্তুত ছিল। লাবণ্যটাও কদিন ধরে কত কেনাকাটা করল। কী করবে, কী পরবে এই নিয়ে কত প্ল্যানিং! কী খুশি ছিল মেয়েটা। সবটা আপ্সেট হল বাবার সেকেন্ড অ্যাটাকটার জন্য। এই সময় কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা নির্বাণও জানে, লাবণ্যও বোঝে, তাও যেন মুখভার যেতেই চায় না মেয়ের।
বিকেল থেকেই বেশ ঝোড়ো একটা হাওয়া বইছিল। এবার রীতিমত ঝড় নামলো। কড় কড় করে বাজ পড়ল কাছেই। লাবণ্য কোথায়? গা ধুতে গেছে বোধহয়। একটা বই পড়ছিল নির্বাণ। তিলোত্তমা মজুমদারের বসুধারা। বেশ লাগে ওর ওনার লেখা। দুবার কথাও হয়েছে সামনাসামনি। অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী। সত্তরের দশকের কোলকাতা, সেই সময়ের উত্তাল পরিস্থিতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সবটা কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনে, তারই এক জীবন্ত ছবি এই উপন্যাস। বেশ লাগছে পড়তে। কিন্তু বাজ পড়তেই কারেন্টটি গেলো। ফলে, বইটা মুড়ে একপাশে রেখে কপালে হাত রেখে পিঠ টান করে শুয়ে পড়ল নির্বাণ। একবার মনে হল, বাবা কী করছেন? তারপর মনে হল, এখন তো ঘুমচ্ছেন উনি। তাছাড়া, আয়া রয়েছে। সমস্যা হলে ডাকতো নিশ্চয়ই। হাওয়ার বেগ বাড়তে বাড়তে বৃষ্টিও শুরু হল। অন্ধকার ঘরটা বেশ ভালো লাগছে নির্বাণের। মাথার অনেকটা উঁচুতে সিলিং ফ্যানটা ঝুলছে। সেদিকে স্থির তাকিয়ে রয়েছে নির্বাণ। মনটা বেশ হাল্কা, নির্ভার লাগছে। উপন্যাসটা নিয়ে ভাবছে নির্বাণ। চরিত্রগুলো, ঘটনাগুলো মগজে ধাক্কা দিচ্ছে! ধুত, এখনি যেতে হল কারেন্টটাকে? একটা চরিত্র মনের বড় কাছে চলে এসেছে ওর। দেবোপম। একটা নষ্ট হয়ে যাওয়া শৈশব। একটা প্রেমহীন বেঁচে থাকা! একটা অনন্ত জিজ্ঞাসা! একটা বিকৃত যৌনতা। এবং একটার পর একটা ঘটনা। একটার পর একটা দেখে ফেলা দৃশ্য, ঘৃণা জমা করে দেবোপমের মস্তিষ্কে, ক্লেদ জমা করে ওর অস্তিত্বে! তাই ঠাণ্ডা মাথায় লিখে ফেলে আত্মহননের এপিট্যাফ! দুদিক থেকে ছুটে আসা চলন্ত ট্রেনের মাঝখানে মরণ ব্রিজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটা বিপন্ন যৌবন! কী বীভৎস! আচমকা কেঁপে ওঠে নির্বাণের সমস্ত শরীর। বুকপকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করছে। অনসূয়ার ফোন। শুয়ে শুয়েই ফোনটা রিসিভ করল নির্বাণ।
“হ্যাঁ রে, বল।“
“হুম। কাকু কেমন আছেন রে?”
“ওই আছে একরকম। আগের চেয়ে বেটার। তবে সেরে উঠতে সময় লাগবে। ডান দিকটা, মানে মোটামুটি কাঁধের পর থেকেই আর সার নেই একেবারে। ফিজিওথেরাপি চলছে। দেখা যাক। “
“ধুর! মনটা এত খারাপ লাগছে না! তোদের আসার সব ঠিক ছিল। আমরাও এখানে কত কী প্ল্যান করে রাখলাম! কিছুই হল না। মাঝখান থেকে কাকু এতটা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।“
“সে আর কী করা যাবে বল? তবে অমিতের ছুটি নেওয়াটা বেকার গেলো।“
“আরে সেটা কিছু না। দেখি আমরা ওদিকে কবে যাই! গেলে ঘুরে আসব তোর বাড়ি। কাকুকে দেখে আসব।“
“হ্যাঁ রে আসিস। আর তোর কী খবর বল? অনেকদিন তো হল, এবার একটা কিছু নামিয়ে ফেল! কদিন আর লিভ-ইন লিভ-ইন গন্ধ মেখে ঘুরবি?”
“মারব টেনে এক চড়! পুরদস্তুর সংসারী রে আমি! লক্ষ্মী পুজোয় সিঁদুর পরে, পায়ে আলতা মেখে তাঁতের শাড়ী পরি রে!”
“ওই একদিনই তো শাড়ি পরিস! অন্য সময় তো হাফ প্যান্ট পরিস!”
“শালা মার খাবি? আর তোর এত শখ তো তুই নামা না! মেঘে মেঘে বেলা তো ভালোই হল। আর তোর বৌ ও তো আমার মত দস্যি নয়। যা বলবি চুপচাপ শুনবে। একেবারে লক্ষ্মী মেয়ের মত, যা বলবি করবে! হি হি!”
“সেটা কি সুযোগ নেওয়া হবে না অনসূয়া? ও সত্যিই খুব ভালো মেয়ে। কিন্তু এখনো অনেক ছোট। ও থাকুক না ওর মতন। ওর যখন ইচ্ছে হবে, তখন হবে সব। আমি কেন আমার ইচ্ছেটা চাপিয়ে দেব বল?”
“এই সিরিয়াস হয়ে গেলি নাকি? আমি মজা করছিলাম রে। তোর বৌ সত্যিই ভালো। ওর সাথে তো আলাপই হল না ঠিক করে।“
“হবে। তুই আয় না এখানে। কতদিন দেখি না তোকে। কতদিন আড্ডা হয়না বলত আমাদের? আমাদের ইউনিভার্সিটির দিনগুলো ভীষণ মনে পড়ে রে। খুব মিস করি দিনগুলোকে। প্লীজ চলে আয় এখানে। সবকটাকে পাকরাও করে জমিয়ে আড্ডা হোক একদিন।“
“হ্যাঁ রে আমিও খুব মিস করি তোদের সব বাঁদরগুলোকে। আর অমিত এত গোবেচারা ভালমানুষ না! ওকে দিয়ে জাস্ট পোষায় না রে!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ! ভালমানুষটাকে পেয়ে পাতি এক্সপ্লয়েট করছিস বুঝতেই পারছি। যাকগে, ওটাকে বগলদাবা করে নিয়ে চলে আয়। খুব আড্ডা হবে।“
“হুম। যাকগে। এখন রাখি রে। একটু বেরব এখন। পরে কথা হবে আবার।“
“হ্যাঁ রে। কথা হবে পরে। ভালো থাকিস। টাটা!”
“টাটা!”
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান