জানলা/অন্বেষা বসু

শেষ পর্ব


অন্ধকারে খেয়ালই করেনি ধীর পায়ে লাবণ্য এসে দাঁড়িয়েছে জানলার কাছে। “কার ফোন ছিল?”
“অনসূয়ার। তোমার গা ধোয়া হল?” লাবণ্যর দিকে তাকাল নির্বাণ। একটানা অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকতে থাকতে চোখ সয়ে গেছে নির্বাণের। জানলার দিকে মুখ করে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল লাবণ্য। অন্ধকারে ওর শরীরটা অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল। নির্বাণের মনে হল, লাবণ্য যেন আর আগের মত আর কৃশাঙ্গী নেই। শরীরে একটা লাবণ্যের ঢল নেমেছে। এই বৃষ্টিতে, ভেজা হাওয়ার ঝাপটায়, গন্ধরাজ ফুলের মাতাল করা গন্ধে নির্বাণের ভীষণ ইচ্ছে হল লাবণ্যর সদ্যস্নাত শরীরটাকে তীব্র আশ্লেষে জড়িয়ে ধরতে। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে জানলার কাছে চলে এল নির্বাণ। লাবণ্য জানলার সাথে গা লেপটে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাছে যেতেই ওর গায়ের গন্ধ পেল নির্বাণ। কোনও মেয়েলি সাবান আর একটা বুনো গন্ধ মিলেমিশে রয়েছে ওর শরীরে। আদর করে কাছে টানল ওকে নির্বাণ। “আজ তো আর কারেন্ট আসবে বলে মনে হয় না। বাজ পড়ল, আর সাথে সাথেই সব অন্ধকার! বড় রকমের কিছু একটা ঘটেছে মনে হচ্ছে।“ বলতে বলতেই লাবণ্যর ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে দিল নির্বাণ। আর প্রত্যেকবারের মতই, ও ফিল করল ধীরে ধীরে লাবণ্য গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। শক্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। শীতল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তেমন আমল দিল না সেগুলোকে। আস্তে আস্তে আরও ঘনিষ্ঠ হল ও। কিন্তু আদরের মুহূর্তে ওর আঙুল ছুঁয়ে ফেলে লাবণ্যর ভিজে গাল। আর থেমে যায়। দুহাতে সযত্নে ওর চোখ মুছিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে ফেলে, “লাবণ্য, আমি কি কোনও অন্যায় করছি? তুমি রোজ এভাবে কাঁদো কেন? আমায় কি তোমার পছন্দ নয়? তুমি কি আর কাউকে? কী হয়েছে বল আমায়? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বল?”
নির্বাণের চওড়া বুকের মধ্যে আছড়ে পরে লাবণ্য। বাচ্ছা মেয়ের মত কাঁদতে থাকে ও। আতিপাতি করে একটা আশ্রয় খুঁজতে চায় বুঝি! নির্বাণ সযত্নে ওর আঁচল ঠিক করে দেয়, সস্নেহে ওর খোলা চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলে, “শান্ত হও। প্লীজ এভাবে কেঁদো না। আমি আছি তো। কী হয়েছে বল?”
“আমায় তুমি ছেড়ে দাও প্লীজ। আমি এভাবে পারছি না। আমি তোমাকেও শান্তি দিতে পারছি না। নিজেও শান্তি পাচ্ছি না। আমি জানি তুমি ভালোবাসো না আমায়। আমি তোমার মত এত পড়াশুনা শিখিনি। আমি মুখ্যুসুখ্যু মেয়ে। আমি অনসূয়াদির মত সুন্দরী নই। আমায় দেখতে খারাপ। কালো। আমায় তুমি দয়া করে বিয়ে করেছ। আমি যোগ্য নই তোমার। অনসূয়াদিই তোমার যোগ্য। আমি নই! আমায় ছেড়ে দাও তুমি। প্লীজ!“ দামাল কান্নার মাঝে অস্ফুটে কথাগুলো বলে গেল লাবণ্য। নির্বাণ হতবাকের মত চেয়ে রইল ওর ফোলা ফোলা চোখ দুটোর দিকে। আস্তে আস্তে ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল, “এসব কী বলছ তুমি? এসব কে বলেছে তোমাকে? আর অনসূয়া আমার বন্ধু! কী সব যাতা বলছ তুমি? আর তোমায় দয়ার প্রশ্ন কোত্থেকে আসছে? তোমায় আমি ভালোবাসি লাবণ্য। তুমি আমার স্ত্রী! তোমায় সম্মান করি আমি। কেন নিজেকে ছোট করছ এভাবে?”
“জানিনা আমি। আমি কিচ্ছু জানিনা। আমি খুব খারাপ। সারাজীবন ধরে কতগুলো খারাপ অভিজ্ঞতা বয়ে বেরাচ্ছি আমি। আমার কপালটাই খারাপ। তোমার মত একটা মানুষকে বিয়ে করেও সুখি হতে পারছি না আমি। তোমাকেও সুখ দিতে পারছি না। বাবা-মায়েরও গলগ্রহ আমি। মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার। শুধু আপসোস হয়, পড়াশোনাটা মন দিয়ে করলাম না। একটা চাকরি থাকলে আমি চলেই যেতাম বিশ্বাস কর। কিন্তু, সে সুযোগও তো আমার নেই।“
“কেন এসব বলছ তুমি লাবণ্য? কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? কীসের যন্ত্রণা আমায় বল? সবটা একবার বলে ফেলে দেখ, অনেকটা ভালো লাগবে তোমার।“
“আমি সেসব বলতে পারব না তোমায়। খুব খারাপ, খুব লজ্জার, খুব, খুব নোংরা কথা সেসব।“
“যে নোংরা ঘটনা গুলো তুমি নিজে সহ্য করেছ। এতদিন ধরে বুকে বয়ে বেরিয়েছ। তার তুলনায় সেগুলো বলে ফেলা অনেক সহজ হবে বিশ্বাস কর। বল আমাকে। কীসের এত কষ্ট তোমার? কে তোমায় কষ্ট দিয়েছে এত? বল। বল আমাকে। আমি তো তোমার বন্ধু। বলে ফেল সবটা। প্লীজ!“
ধীরে ধীরে শান্ত হয় লাবণ্য। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নেয়। চুলটা শক্ত করে খোঁপা করে নেয়! তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। তারপর আস্তে আস্তে বলতে শুরু করে। “আমার যখন বছর তিনেক বয়স, তখন আমার ভাই হয়। আমি ছোট থেকেই খুব শান্ত, বাধ্য ছিলাম। বিশেষ দস্যি ছিলাম না। তখন আমায় সদ্য নার্সারিতে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। নতুন স্কুল। নতুন মুখ। কিন্তু কেউ আমার বন্ধু হয়না। আমার স্কুলে যেতেও ইচ্ছে করত না। আমার ভীষণ ভয় করত দিদিমণিদের, স্যারদের। স্কুলের গেট পেরলেই তারস্বরে চীৎকার করে কাঁদতাম। বাবা আমায় স্কুলে দিতে যেতেন। আমার কান্না শুনেও কোনদিন পিছন ফিরে তাকাতেন না। আমায় স্কুলে পৌঁছে দিয়েই ট্রেন ধরতে ছুটতেন উনি। আমি হাপুস নয়নে কেঁদে যেতাম। বাবা ফিরেও তাকাতেন না।
ভাই যখন হল, তখন ভাবলাম এই বুঝি আমার খেলার নতুন সঙ্গী। আমার খেলনাবাড়ির জ্যান্ত পুতুল। আসলে পুতুলটা যে আমিই ছিলাম সেটা বুঝিনি আগে। বুঝলাম, যখন জানতে পারলাম, আমি আসলে মেয়ে বলেই কেউ ভালবাসে না আমায়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাই ভাইয়ের কদর বেশি। সেই তিন বছর থেকেই বড় হয়ে যেতে হল আমায়। একা হয়ে যেতে হল। একা একা খেলতাম, একা একাই ঘুরে বেড়াতাম আমাদের মস্ত উঠোনে। না, তার বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল আমার।
ভাই তখন সবে আট-ন’মাসের। আমার চার বছরের জন্মদিন। আমার জন্মদিন তেমন ঘটা করে কোনদিনই হত না। ওই, মাসিরা আসতো। মা ভালোমন্দ রান্না করত। পায়েসটা যদিও হত না। মেয়েদের জন্মদিনে নাকি পায়েস করতে নেই! ভাই কে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম আমি। মা, মাসিদের সাথে গল্প করছিল। আমি বরাবরই একটু রুগ্ন। আর ভাই ছোটবেলায় বেশ গোলগাল ছিল। আমি কোলে নিয়ে সামলাতে পারিনি। আচমকা হাত থেকে পড়ে যায় ভাই! তারপরের কথা গুলো ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার! আমার পিঠের ওই দাগগুলো বোধহয় আর কোনদিন মেলাবে না। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। শাসন বাড়ছে, আদর কমছে। একটার পর একটা শিকলে বেঁধে ফেলা হচ্ছে আমার শৈশবকে। না, সেসব বোঝার বয়স হয়নি তখনও। শুধু ভয়ঙ্কর মনখারাপ হত আমার, যখন তখন!
তারপর, আরেকটু বড় হলাম যখন, বুঝতে পারলাম, আমার পড়াশোনা হবে না। ভালোই লাগত না পড়তে। অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল সব গুলিয়ে যেত আমার। আমি গান ভালবাসতাম। না, শিখিনি কোথাও, বলা ভালো, শেখান হয়নি। সারাদিন রেডিও শুনতাম আমি। ক্যাসেট শুনতাম। শুনে শুনে গাইতাম। আপনমনে। আর আমার লিখতে ভাললাগত। নিজের খেয়ালে লিখতাম! যা খুশি! যা মনে আসতো লিখতাম! কেউ দেখত না। কেই বা দেখবে? আমার দিকে তাকানোর সময় ছিল নাকি কারো? শুধু ছোটমাসি গল্প করত আমার সাথে। পড়াত মাঝেমাঝে। গান শুনতে চাইত। আমার ওই ছেলেমানুষি লেখা টেনে নিয়ে দেখত আর খিলখিল করে হাসত। মাঝেমাঝে বেশ মন দিয়ে পড়ত। আর বলত, মন দিয়ে লেখ, তোর হবে। তাই কিছু লিখলেই ছোটমাসিকে দেখাতাম।
ছোটমাসির তখন কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে সবে। আমাদের বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসেছে। এক সপ্তাহ থাকবে। আমি তখন ক্লাস এইট। দুপুরে অঙ্ক করতে বসেছি, কিন্তু একটা অঙ্কও মিলছে না। এদিকে সামনে পরীক্ষা। ভাবলাম একটা কবিতা লিখি। দুম করে কি একটা লিখেও ফেললাম। ভাবলাম মাসিকে দেখাই। অঙ্কগুলোও দেখিয়ে নিই। মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি মাসি নেই। এদিক ওদিক খুঁজে কোথাও পেলাম না মাসিকে। তারপর কি মনে হল, বাবার ঘরের সামনে এসে দেখি দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে। কেমন একটা চাপা কৌতূহল হল। কারণ, বাবা দরজা বন্ধ করে কখনো ঘুমোয় না। আমি দেখলাম একটা জানলা অল্প ফাঁক। আস্তে আস্তে জানলা দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম ঘরের মধ্যে জমাট বাঁধা অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে জানলাটা খুলে দিলাম। তারপর দেখে ফেললাম ভয়ঙ্কর একটা দৃশ্য! রাগে, অপমানে, ভয়ে, যন্ত্রণায় আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল। কিন্তু আমি নড়তে পারলাম না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। জোরে চোখ বুজে ফেললাম। মনে হল মাথায় সহস্র হাতুড়ির আঘাত পড়তে লাগল। কী নোংরা! কী অসম্ভব নোংরা! নিজের বাবাকে দেখলাম নিজের মাসির সাথে আমার সমস্ত জগতটা অন্ধকার হয়ে গেলো এক মুহূর্তে। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে যেতে দেওয়াল ধরে টাল সামলে নিলাম। তারপর বাথরুমে গিয়ে কতক্ষন বমি করেছিলাম মনে নেই। শুধু মনে আছে সেদিন রাতে ধুম জ্বর এলো। ডাক্তার বললেন অসম্ভব অ্যাংজাইটি থেকে জ্বর এসেছে। সবাই ভাবল সামনেই পরীক্ষা, সেই ভয়ে জ্বর এসেছে। আমি কাউকে কিচ্ছু বলতে পারলাম না। বাবার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। মাসিকে দেখলেই মায়ের জন্য কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছিল আমার। কিন্তু বলতে পারিনি, কোনদিন বলতে পারিনি আমি। কাউকেই। রাতের পর রাত আমার ঘুম আসতো না। নিজের অজান্তেই চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত অকারণে।
সেদিনের পর থেকে ধীরে ধীরে আমার জীবনটা বদলে গেল। বাবার সাথে আর কথা বলতাম না আমি। মায়ের সাথেও একটা দুরত্ব তৈরি হয়ে গেল। আমার কোনও বন্ধুও ছিল না। আসলে আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারতাম না। কারো সাথে খোলা মনে মিশতে পারতাম না। তবু কোন ফাঁকে আমার এই অপ্রয়োজনীয় জীবনটায় প্রেম এলো। হয়ত বা, বয়েসের ধর্মে। পাগলের মত ভালোবেসে ফেললাম একজনকে। কলেজের এক সিনিয়র দাদাকে। হিরণ্ময়দা। আমাদের কলেজের ছাত্র সংগঠনের সেই সময়ের জিএস। অসম্ভব ব্যক্তিত্ব। অসম্ভব পড়াশোনা। কিন্তু মাটির মানুষ। শান্ত, সৌম্য। কলেজ ফেস্টে আমার গান শুনে ভাললেগেছিল ওর। সেই থেকেই আলাপ। ক্রমে বন্ধুত্ব। প্রেম। ভালবেসেছিলাম ওকে। ভীষণ। তারপর যা হয়, নিয়মিত দেখাশোনা। কাছে আসা। ভীষণ, ভীষণ কাছে আসা। আদরের বন্যায় ভেসে যাওয়া। আর সত্যি সত্যি ভেসেই গেলাম। সেও এক জন্মদিন। সেদিন আমাদের একসাথে কলকাতার রাস্তায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত ধরে হেঁটে যাবার কথা ছিল। ও আমায় শাড়ি পরতে বলেছিল, বলেছিল খোলা চুলে, বড় টিপ পরে আসতে। কত প্ল্যান করেছিলাম আমরা। কত কী করব! আমার অবশ্য আরও একটা প্ল্যান ছিল, ওকে বলিনি সেটা। ভেবেছিলাম ওর বাড়িতে গিয়ে চমকে দেব ওকে। কিন্তু চমকটা আসলে আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। বাড়ি গিয়ে দেখলাম পরমা সুন্দরী এক নারী ওর বিছানায়, ওর বক্ষলগ্না! তারপর থেকে প্রতি মুহূর্তে মনে হত আমার জীবনের সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন আমার জন্মদিন। ওইদিনের পর আমি আর কোনদিন গান গাইনি।“
এই অবধি বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল লাবণ্য। নির্বাণ যেন এতক্ষণ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অপলক চেয়েছিল লাবণ্যর দিকে। মনে হচ্ছিল এ যেন ওর শান্ত, নম্র, ছেলেমানুষ, সহজ, সরল, অভিমানী একান্ত আপন ছোট্ট লাবণ্য নয়। এ যেন অন্য কেউ। ওর পাঁচ ফুটের ছোট্ট শরীরটা ছাপিয়ে যেন অনেকটা উঁচুতে উঠে গেছে ওর মাথা। ওই সিলিং ফ্যানটায় গিয়ে ঠেকেছে বুঝি বা। নির্বাণ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে ওর চোখের দিকে। কী আছে সেখানে? সরলতা নাকি সম্মোহন? অশ্রু নাকি আগুন? যন্ত্রণা নাকি বিদ্রোহ? লাবণ্যর চোখে চোখ পড়তেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল নির্বাণ। ওর সত্যি সত্যি ভীষণ ঘেন্না হচ্ছিল। ঘেন্না হচ্ছিল নিজের প্রতি। ওর পুরুষ হয়ে জন্মানো জীবনটার প্রতি। ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলায় বাবা-মার ঝগড়ার কথা, নোংরা, অশ্রাব্য কথাগুলো। ওর মনে পড়ছিল মারা যাবার আগের দিন ওকে জড়িয়ে ধরে মায়ের কান্নার কথা। আরও অনেক অনেক কথা মনে আসছিল ওর। কেন এত বড় বাড়ি থাকা সত্তেও, এত আত্মীয়স্বজন থাকা সত্ত্বেও জেদ করে ও মিশনে পড়তে চলে গিয়েছিল? কেন অসম্ভব ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও, বাবার অগাধ টাকাপয়সা থাকা সত্ত্বেও গবেষণায় না গিয়ে অর্থ উপার্জনে মন দিয়েছিল ও? আর কেনই বা বাবার এতটা শরীর খারাপেও কর্তব্যবোধটুকু ছাড়া আর কোনও টানই অনুভব করে না ও বাবার প্রতি? একটা জোরাল, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করল বুকের মধ্যে। আর কোন ফাঁকে লাবণ্য ওর একেবারে বুকের কাছে চলে এলো, একেবারে ওর বুকের মাঝে। ওর যন্ত্রণায় মিলিত হল অনায়াসে।
ওর কাছে এলো লাবণ্য। নিঃসঙ্কোচে নির্বাণের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলল,
“আমি জানি তোমার ঘেন্না হচ্ছে আমাকে। ভাবছ, আমি মেয়ে হয়ে বাবার নামে এসব বলছি। নিজের স্বামীর কাছে পুরনো প্রেমিকের কথা বলছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, এগুলোই আমার বাস্তব। আমার কোনও শৈশব নেই। আমার কোনও সুস্থ কৈশোর নেই। যৌবনটাও বিষাক্ত। তাও তো কত কিছুই বলিনি তোমায়। বলিনি আট বছর বয়েসে পাশের বাড়ির দাদার দ্বারা একাধিকবার মলেস্টেশানের কথা। তোমায় বলিনি নিজের জেঠতুতো দাদা বিয়ের আগের দিন অবধি আদরের নামে যখন তখন গায়ে হাত দিত। আমি বলিনি বাবাকে ঠিক কতটা ঘেন্না করি আমি। বলিনি তোমায় মায়ের চোখে আমার আর ভাইয়ের ফারাক কতটা। বলিনি তোমায় আমার ভাই, আমার একমাত্র ছোট ভাই কথায় কথায় আমায় কতটা ছোট করে, অপমান করে। আরও অনেক অনেক কিছু বলিনি। তোমরা কিসব বল না? জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশান, পেট্রিয়ারকি হেন তেন। আমি আমার জীবন দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি এটা। হিরন্ময়দা আমায় প্রতারণা করার পর আমি আত্মহত্যার পথই বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু, আস্তে আস্তে আমার মনে হল কেন মরব আমি? ওই নোংরা লোকটার জন্য? এই নোংরা দুনিয়াটার ভয়ে পালিয়ে যাব আমি? সেই ক্লাস এইট থেকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইই তো করছি। বেঁচে থাকাও তো একটা লড়াই! আরও একটু করি! আরও কতটা দুঃখ আমার জন্য তোলা আছে দেখে যাই! সম্ভোগ যে জন্মের কারণ, সেই জন্ম তো পুণ্যের হয় না। বাবামায়ের পাপের অংশীদার আমিও। কাজেই প্রায়শ্চিত্ত তো করতেই হবে।
জানো, তুমি দেখার আগে আমায় আরও দুজন দেখেছিলেন। আমাকে পছন্দ হয়নি তাদের। কিন্তু, তুমি আমার দিকে একবার তাকাতেই তোমার চোখে মুগ্ধতা দেখেছিলাম আমি। ভাললেগেছিল আমার। আর তাই, শুধু ওই নরক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নয়, সত্যি সত্যি আমিও তোমায়_ কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারিনি কখনো। আমার খুব কষ্ট হত জানো, যখন বুঝতাম যে তুমি আমায় ছেলেমানুষ ভাবো, অভিমানী ভাবো। ভাবো আমি লজ্জার কারণেই এরকম আচরণ করছি। আসলে আমি ছেলেমানুষ নই গো। আমি সেই তিন বছর বয়স থেকেই বড় হতে শিখেছি। আর অভিমান করা কি আর আমার মত মেয়েকে সাজে? আমার ভীষণ হিংসে হয় জানো? হিংসে হয় আমাদের পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটাকে। যে রোজ বিকেলে ছাদে ঘুরে বেড়ায় আপনমনে। ওর সহজতাকে হিংসে হয় আমার। আমার হিংসে হয় অনসূয়াদিকে। ওর স্বাধীনচেতা বেঁচে থাকাকে হিংসে হয় আমার। আরও অনেকের প্রতি আমার হিংসে হয় এ পৃথিবীতে। যে মেয়ের মা রোজ রাতে শোবার আগে তাকে চুল বেঁধে দেয়, তাকে হিংসে হয় আমার! যে মেয়ের বাবা পরম যত্নে হাতে ধরে মেয়েকে সাইকেল চালানো শিখিয়ে দেয় তাকে হিংসে হয়। যে মেয়ের ছোট ভাই তার কাছে বায়না করে ফাউন্টেন পেন কিনে দেবার জন্য, আমার হিংসে হয় তাকে। যে মেয়ের প্রেমিক শুধু তার শরীরের জন্য নয়, শুধুমাত্র তার জন্যই তাকে ভালোবাসে, সেই মেয়েকে অসম্ভব হিংসে হয় আমার। এতে যদি আমায় তুমি হিংসুটে বল তো আমি হিংসুটে, যদি বল ছেলেমানুষ, তাহলে আমি ছেলেমানুষ, আর অভিমানী বললে অভিমানী!”
এতক্ষণে মুখ তুলে তাকায় নির্বাণ। ভাষা হারিয়ে ফেলে চুপ করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে ওঠে, “আমি তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি না?” নিজের গলার স্বরই নিজের কানে অচেনা ঠেকে ওর। কান্না মেশা একটা স্বর। শব্দগুলো যেন কিছুটা অস্ফুট শোনায়। কিন্তু ওর আর্তিটুকু ছুঁয়ে যায় লাবণ্য কে। কাছে এসে নির্বাণের মাথাটা দুহাতে ধরে বলে, “না না। কষ্ট কেন দেবে তুমি? এভাবে বল না প্লীজ।“
“না লাবণ্য। আমি বোধহয় আদরের নামে শুধু সম্ভোগই করতে চেয়েছি তোমায়। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি সত্যিই তোমাকে ভীষণ_ আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি বিশ্বাস কর। তোমার কষ্ট হত, তুমি মানতে পারতে না। তাও আমি জোর করেছি তোমায়। আমি অত্যন্ত নোংরা। আমি খারাপ। আমি খারাপ। অত্যন্ত খারাপ। আমি” ।
আর থাকতে পারেনা লাবণ্য। নির্বাণের মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলে, “চুপ কর। প্লীজ চুপ কর। তুমি আমায় কোন কষ্ট দাওনি। আসলে আমিই সহজ হতে পারছিলাম না। বার বার আমার মনে পরে যাচ্ছিল আমার নোংরা অতীত। চোখের সামনে ভেসে উঠত কিছু নোংরা দৃশ্য!“
“আমি বুঝতে পারছি লাবণ্য। আমার সময় দেওয়া উচিত ছিল তোমায়। আমি অন্যায় করেছি তোমার সাথে। ভীষণ অন্যায় করেছি।“
“প্লীজ চুপ কর। এরম কর না। তুমি তো আমায় ভালোবেসেই ছুঁতে চেয়েছিলে, তার মধ্যে তো কোনও অন্যায় নেই। আর তুমি বুঝবেই বা কি করে আমার জীবনটা এত জটিল?” বলতে বলতে নির্বাণের মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেয় লাবণ্য। ওর ভীষণ ভাললাগে। নিজের বুকে নির্বাণের মাথার ছোঁয়া ভীষণ ভাললাগে ওর। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একটা সুন্দর গন্ধ পায় ওর চুল থেকে। জিজ্ঞেস করে ফেলে, “আজ শ্যাম্পু করেছিলে?” লাবণ্যর নরম শরীরে নাক ডুবিয়ে দিতে দিতে নির্বাণ জানায়, “হুম। করেছিলাম।“ লাবণ্যর ভীষণ ভাললাগে গন্ধটা। নতুন শ্যাম্পু বোধহয়! আরও কাছে টেনে নেয় ওকে। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নির্বাণকে। নির্বাণ দুচোখ বুজে অনুভব করে লাবণ্যর জেগে ওঠা। এই প্রথম। ভালোলাগায় ছড়িয়ে যায় ওর সর্বাঙ্গে। মনটা ভালো হয়ে যায় হঠাৎই। দুহাতের বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে ও বলে, “লাবণ্য, তুমি আবার লিখবে কথা দাও। আবার গাইবে বল?”
“হ্যাঁ, আমি লিখব। আমায় লিখতেই হবে। আর গানও গাইবো। শুধু তোমার জন্য।“
“হ্যাঁ লাবণ্য। লিখতেই হবে তোমায়। আমার জন্য নয়। তোমার নিজের জন্য। সমস্ত নারীজাতির জন্য লিখবে তুমি। আর গান গাইবে গলা ছেড়ে। মুক্তির গান। শিকল ভাঙার গান। এটা তোমায় পারতেই হবে। পারতেই হবে তোমায়।“
“হ্যাঁ গো। তুমি পাশে থাকলে সব পারব আমি। সব!”
লাবণ্যকে আরও একটু কাছে টেনে নেয় নির্বাণ। তারপর আস্তে করে বলে, “এই, আমাদের কথাগুলো কেমন যেন বাংলা সিরিয়ালের নায়ক নায়িকার মত শোনাচ্ছে না?”
“কী!” নির্বাণের মাথাটা সরিয়ে দিয়ে অভিমানী গলায় বলে ওঠে লাবণ্য! আর ফিক করে হেসে ফেলে নির্বাণ।
“যা তা! ক্লাইম্যাক্সে এসে সব ঘেঁটে দিল!” ঠোঁট ফুলিয়ে বলে লাবণ্য! তারপর দুজনেই প্রাণ খুলে হেসে নেয় খানিক। বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। সোঁদামাটির আঁচলে ঘুমপাড়ানি গান ধরেছে গন্ধরাজ। আর বৃষ্টিস্নাত ঈশানী হাওয়া জানলার জংধরা গরাদে এসে আছড়ে পড়ছে অবিরাম, অবিশ্রান্ত!

১০/০৪/২০১৪
ডানকুনি

আপনার মতামত জানান