উপেন্দ্রকিশোরের সন্দেশ

সুনির্মল বসু
একদিন শ্রাবণ মাসে খুব বৃষ্টি পড়ছে, আমরা খেয়েদেয়ে ছাতা নিয়ে দুপুরে স্কুলে ওয়ানা হচ্ছি এমন সময় বাবা তাঁর বালিশের তলা থেকে চারখানা পত্রিকা আমার হাতে দিলেন।
তাকিয়ে দেখি মলাটে চমৎকার রঙিন ছবি আঁকা—ওপরে বড় বড় করে লেখা ‘সন্দেশ’। নিচে লেখা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সম্পাদিত’।
আরে এযে কল্পনাই করতে পারিনি—সত্যি খাবার সন্দেশ পেলেও যে এত আনন্দ হতো না। সেই বছরই, অর্থাৎ ১৩২০ সালের বৈশাখ থেকেই এই শিশু পত্রিকাটি বার হয়েছে! বাবা আমাকে গ্রাহক করে দিয়েছেন শ্রাবণ মাসে; তাই বৈশাখ থেকে শ্রাবণ পর্যন্ত চারখানা কাগজ আমার নামে এসেছে—আবার শুনলাম প্রতিমাসে আসবে।
স্কুলে পড়াশোনায় মন লাগল না, কখন বাড়ি যাবো আর ‘সন্দেশ’ পড়ব এই চিন্তা।
বাড়ি ফিরে এসে সন্দেশের মধ্যে ডুবে গেলাম। আর এতো অদ্ভুত বইয়ের কথা তো ধারনাই করতে পারিনি, কী সুন্দর ছবি, গল্প, কবিতা, ধাঁধাঁ আমায় যেন এক নতুন রাজ্যে নিয়ে গেল।
প্রতি সংখ্যার প্রথমেই রঙিন ছবি আর ভিতরে গল্পের সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে সব মজার মজার টুকরো ছবি। প্রতি ছবির ভিতরে শিল্পীর নাম U.R লেখা। ইনি যে উপেন্দ্রকিশোর রায় তা আর বুঝতে দেরী হল না—কারণ তাঁর আঁকা ছবি আগে আরও দেখেছি।
এই ‘সন্দেশ’ আমার জীবনে একটা রঙিন আনন্দময় যুগ নিয়ে এল। ...প্রতিমাসের পয়লা তারিখে ডাকের পথ চেয়ে থাকতাম—আমাদের লোক ভোরবেলা (গিরিডির) ডাকঘরে গিয়ে চিঠি নিয়ে আসতো, ‘সন্দেশ’ যদি পয়লা তারিখে তার হাতে না দেখতাম মুখ শুকিয়ে যেত। তার পরদিন আবার আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করতাম, দূর থেকে লক্ষ্য করতাম লোকটার হাতে অন্যান্য চিঠিপত্রের মধ্যে উচু হয়ে আছে সন্দেশের বাদামী মোড়ক—আনন্দে প্রাণ নেচে উঠত।
...আমার ‘সন্দেশ’ দেখে গিরিডির আরও কয়েকটি বন্ধুও ‘সন্দেশ’-এর গ্রাহক হল। একবার লুকিয়ে লুকিয়ে ধাঁধাঁর উত্তর দিলাম—পরের সংখ্যায় দেখি উত্তরের মধ্যে নাম বেরিয়েছে—সুনির্মলচন্ দ্র বসু, প্রভাতচন্দ্র বসু, নিরুপমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
আমার নামের সঙ্গে আমার আরও দুই বন্ধুর নাম দেখে অবাক হয়ে গেলাম... আমরা সবাই আলাদা আলাদা উত্তর পাঠিয়েছিলাম—একজন আরেকজনকে অবাক করে দেব পাঠাই। যদি একবার একটা লেখা ‘সন্দেশ’-এ ছাপা হয় তাহলে আর দেখতে হবে না, গিরিডির বন্ধুবান্ধবেরা এমনকি আত্মীয়স্বজনেরাও একেবারে হাঁ করে থাকবে।
লুকিয়ে লেখা পাঠালাম। মাসের পড় মাস গত হয়—প্রতিমাসেই আকুল আগ্রহে—‘সন্দেশ’ আসে, কত সুন্দর গল্প কবিতার গাদা—কিন্তু হায় কোথায় সেখানে এই শিশু কবির স্থান। ...’সন্দেশ’-এর প্রথম পাতা থেকে মলাটের শেষ পাতা পর্যন্ত আকুল আগ্রহে পড়ি। মনে পড়ে মলাটের শেষ পাতায় গন্ধদ্রব্য বিক্রেতা ‘এইচ বসু’-এর ছবিওলা বিজ্ঞাপন। একজন লোক রুমাল নেড়ে চলেছে, ‘বহুৎ আচ্ছা, দিলখোশ হো গিয়া—’ ...
আর ভিতরে? সে তো অনির্বচনীয় অমৃতের পরিবেশন ও পরিবেশ। কত নাম করব, অবনীন্দ্রনাথ, প্রিয়ংবদা দেবী, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, কুলদারঞ্জন রায়, সুখলতা রাও—আরও কত নাম... একজন প্রতিমাসে লিখতেন ‘বনের খবর’ ছদ্মনাম দিয়ে ... তাতে থাকতো U.R এর ছবি। কী ভালোই লাগতো।...
‘সন্দেশ’-এর আরেকটি প্রবল আকর্ষণ ছিল। কে একজন বেনামে ‘সন্দেশ’-এ মজার মজার গল্প-কবিতা লিখতেন। এতো সুন্দর কবিতা যে কার আমরা বুঝতে পারতাম না। পাগলা দাশু... প্রভৃতি অদ্ভুত সুন্দর গল্প আর বোম্বাগড়ের রাজা ... রামগরুড়ের ছানা প্রভৃতি সচিত্র কবিতাগুলি যে কার মাথা থেকে বার হচ্ছে আমরা বন্ধুরা অনেক আলোচনা করেও তা স্থির করতে পারতাম না।
... কে একজন বলল, রবিঠাকুর ওইসব গল্প কবিতা লেখেন আমি জানি। কেউ বলল U.R নামে ওই আর্টিস্টেরই ওইসব লেখা—সমস্যার আর সমাধান হয় না।
এমন সময় শোনা গেল U.R অর্থাৎ ‘সন্দেশ’-সম্পাদক উপেন্দ্রবাবু কিছুদিনের জন্য গিরিডি বেড়াতে আসছেন ... একদিন উপেন্দ্রবাবু এলেন বারগণ্ডা অঞ্চলে ‘হোম ভিলা’তে (অমলচন্দ্র হোমের বাড়ি)। তাঁর দাড়িওয়ালা সুন্দর চেহারা দেখে আমরা ধন্য হলাম।...
সন্ধ্যেবেলা তিনি বাড়ির বারান্দায় বেহালা বাজাতেন—রাস্তার থেকেই সেই বাজনা শুনতাম।...
একদিন দেখলাম উপেন্দ্রবাবু বিকালে বেড়িয়ে বাড়ি ফিরবেন। আমাদের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি দেখা! আর যায় কোথায়! সমস্ত স্নায়বিক দৌর্বল্য ঝেড়ে ফেলে আমরা তাঁকে নমস্কার করলাম, আর সোজা প্রশ্ন করে বসলাম—‘সন্দেশের ওইসব মজার মজার গল্প-কবিতা কার লেখা?’
উপেন্দ্রবাবু কালো কুচকুচে দাড়ি নেড়ে বললেন, ‘তা বলব কেন বাপু।’
... আমাদের বন্ধু মূলু (প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়) আমাদের সমস্ত রহস্যের উদ্‌ঘাটন করল। সে বলল, ‘এইসব লেখা তাতাদার। তাতাদা হচ্ছেন উপেন্দ্রবাবুর বড়ো ছেলে সুকুমার রায়।
এইবার সব যেন পরিষ্কার হয়ে গেল। ওইসব লেখার মধ্যে মজার মজার ছবি থাকতো, তাতে সই থাকত—S. Ray ; এইবার বুঝলাম ছবিগুলি সুকুমার বাবুর আঁকা।
... উপেন্দ্রবাবু ... গ্রহ-নক্ষত্র সম্বন্ধে একটা বক্তৃতা দেবেন ... আকাশের দিকে আঙুল তুলে আমাদের কাছে গ্রহ-নক্ষত্রের পরিচয় দিতে লাগলেন। ভারি সরস বক্তৃতা। কোনটি কালপুরুষ, কোনটি সপ্তর্ষিমণ্ডল এইসব আমাদের চিনিয়ে দিলেন...
স্থানীয় সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে রবিবার বিকেলে ছেলে-মেয়েদের জন্য নীতি-বিদ্যালয় খোলা হয়েছিল।
এখানে উপেন্দ্রবাবু আসতেন, বেহালা বাজাতেন, আর নীতিমূলক গল্প করতেন... বেহালা বাজিয়ে ছেলে-মেয়েদের গান শেখাতেন—
... একদিন ‘সন্দেশ’-এর প্রথম পাতায় কতগুলি বুনোফুলের রঙিন ছবি বেরুল। নীচে লেখা—‘এই ফুলগুলি অনেকগুণ বড় করে আঁকা হয়েছে।’
ছবি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। সত্যি বুনোফুল কি দেখতে এত সুন্দর! লাল, নীল, সবুজ, হলদে, বেগুনি কতরকম রঙ তাদের! কি সুন্দর এঁকেছেন উপেন্দ্রবাবু।
সেই দিনই বিকালে চললাম শালের জঙ্গলে বুনো ফুলদের সন্ধানে।
ছোট ছোট বুনো ঘেসো ফুল অনেক দেখলাম আর ছিঁড়ে বাড়িতে নিয়ে এলাম। ‘সন্দেশ’-এর সঙ্গে মিলাতে লাগলাম, ছবির সঙ্গে কোন কোন ফুল মেলে।
দেখলাম আসল ফুলের চেয়ে ছবির ফুলগুলি দেখতে অনেক ভালো।
উপেন্দ্রবাবুর ভাই কুলদারঞ্জন রায় গিরিডিতে এলেন। তিনি খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন, মাছ ধরতে ওস্তাদ—আবার ছবি আঁকতে, গল্প লেখাতেও খুব পটু।
বাবার সঙ্গে তাঁর খুব ভাব ছিল। ‘সন্দেশ’-এ সে সময়ে তাঁর লেখা গল্প বের হচ্ছিল ‘ঝানু চোর চানু’। লেখাতে তাঁর কোনো নাম থাকতো না, কিন্তু পরে জেনেছিলাম ওটা কুলদাবাবুর লেখা।
... একবার সন্দেশে একটা কবিতা বার হল—‘ইলশে গুড়ি’, লেখক সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আর তাঁর সঙ্গে পাতা জোড়া এক রঙা ছবি উপেন্দ্রবাবুর আঁকা। এত সুন্দর কবিতা আগে আর পড়েছি বলে মনে হয় না—
‘ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
ইলিশ মাছের ডিম,
ইলশে গুঁড়ি ফুলের কুঁড়ি
রোদ্দুরে রিমঝিম।’
উপেন্দ্রবাবু কলকাতায় চলে গেলেন। ...’হোমভিলা’র জানলার আশেপাশে ঘুরে উপেন্দ্রবাবুর আঁকা বাতিল করা ছবির ... একটুকরো রঙ করা কাগজ কুড়িয়ে পেলাম। ... মহা আনন্দে এক অমূল্য সম্পদের মতো সেই টুকরোটাকে বাড়ি নিয়ে আমার ঘরে টাঙিয়ে রাখলাম।...
প্রতিবছর ‘সন্দেশ’-এর প্রচ্ছদপটে নতুন নতুন ছবি দেখি।
একটা ময়রা বুড়ো সন্দেশ বেচছে, দোকানের কাছে দলে দলে ছেলে-মেয়ে জুটেছে। আরেক বছরের মলাটে দেখি একটি ছেলে আর মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মুখে সন্দেশ ভরতি, গালগুলি ফুলে আছে, সামনে সন্দেশের থালা। কী সুন্দর, কী সুন্দর। ঠিক আমাদের মনের মতো জিনিস আমরা পাচ্ছি।
... এই ‘সন্দেশ’-ই আমার চোখ ফোটালো, আমাকে সাহিত্যের প্রেরণা দিল, নতুন পথের সন্ধান দিল।...
সত্যেন্দ্রনাথের নতুন ছন্দের কবিতা ‘সন্দেশ’-এ পড়লাম-
‘ঝড় কষিয়ে ধায় ঢুঁসিয়ে,
ফোঁস ফুঁসিয়ে খুব হুঁশিয়ার।’
প্রায় প্রত্যেক মাসে সুকুমার রায়ের বেনামি সচিত্র কবিতা বেরুত। আমরা ঠিক বুঝতে পারতাম লেখাটি কার। ‘খাই খাই’ পড়ে নেচে উঠি—
‘জল খায়, ফল খায়, খায় যত পানীয়
জ্যাঠা ছেলে বিড়ি খায়, কান ধরে টানিও।
টোল খায় ঘটি বাটি, দোল খায় খোকারা,
ঘাবড়িয়ে ঘোল খায় পদে পদে বোকারা।’

...সন্দেশ প্রতিমাসেই আসছে। কত পৌরাণিক গল্প, জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা, আবিষ্কারের কাহিনী, জীবন চরিত আমরা পাচ্ছি ‘সন্দেশ’-এর মাধ্যমে। মনে পড়ে ‘হিমের দেশ’ নামে একটি মেরু আবিষ্কারের কাহিনী আমরা এতো আগ্রহের সাথে পড়েছি। ক্যাপ্টেন স্কট, ন্যানসেন, ফ্র্যাঙ্কলিন প্রভৃতি দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের কথা পড়ে অবাক হয়ে যাচ্ছি। দুর্গম দেশ আবিষ্কার করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের প্রাণকে তুচ্ছ করতেন, কত কষ্ট সহ্য করেছেন, আবার কেউ কেউ মৃত্যু বরণ করেছেন। সেই কাহিনীর সঙ্গে উপেন্দ্রবাবুর হাতে আঁকা ছবি, তাই বা কত সুন্দর।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সারা ভারতে কাগজের টান পড়ে যায়, তাতে ‘সন্দেশ’এর কিছু রূপের পরিবর্তন হয়, কিন্তু গুনের তারতম্য হয়না। মসৃণ চকচকে কাগজের বদলে আমরা কিছু মোটা কাগজ পেতে লাগলাম, কিন্তু ভিতরের রসদ ঠিকই থাকতে লাগল।
একবার একটি রঙিন ছবি বার হল, একদল সৈন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে ঊর্ধ্বশ্বাসে—তার নীচে কবিতা—
‘না মানে কামান না চাহে পিছু—
কে বাঁচে, কে মরে দেখে না কিছু।’

...সুকুমার রায়ের আঁকা তখনকার যুদ্ধে ব্যবহৃত কয়েকটি অস্ত্রের ছবি দেখলাম ‘সন্দেশ’-এর পাতায়। কত রকম বন্দুক, কামান প্রভৃতির ছবি তিনি এঁকেছেন।
অবশ্য আধুনিক যুগে ওসব অস্ত্র অতি সেকেলে বলেই মনে হবে। কিন্তু তখন ওসব অস্ত্রের কথা পড়ে আমার তাক লেগে যেত। মোট কথা আমার জীবনে ‘সন্দেশ’ যে কতখানি স্থান জুড়ে বসে আছে তা আর বলার নয়।
এধরণের সর্বাঙ্গসুন্দর শিশু-পত্রিকা আজও আমার চোখে পড়ল না।
...১৯১৬ সালে গিরিডি হাই স্কুলের ফোর্থ ক্লাসে (বর্তমানে ক্লাস সেভেন) ভর্তি হলাম। ...হিমাংশুবাবু স্কুল থেকে একটি হাতের লেখা পত্রিকা বার করে ক্লাসের ছেলেদের তাতে লিখতে বললেন। আমি তখন আমার পরে বিখ্যাত কবিতাটি লিখে তাঁর কাছে দিই—
‘ক্রি ক্রিং—ক্রি ক্রিং সবে সরে যাওনা,
চড়িতেছি সাইকেল দেখিতে কি পাওনা?
ঘাড়ে যদি পড়ে তবে প্রাণ হবে অন্ত
পথ মাঝে রবে পড়ে ছিরকুটি দন্ত।
............................................................ ............
বলিয়া গেছেন তাই মহাকবি মাইকেল—
যেওনা যেওনা সেথা যেথা চলে সাইকেল।’

কবিতাটি দেখে হিমাংশুবাবু গম্ভীর হয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন—‘কোন বই থেকে টুকেছ? ‘সন্দেশ’ থেকে?’
বিজয় মুখার্জি নামে আমার এক বন্ধু আমাকে সমর্থন করে দাঁড়িয়ে উঠে নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বলল—
‘From his fertile brain Sir’
...‘সন্দেশ’-এ একটি মজার রঙিন ছবি বেরিয়েছিল, একজনের প্রকাণ্ড নাকে একটা মাছি এসে বসেছে—হাতে তার ‘সন্দেশ’ পত্রিকা, নীচে লেখা—
‘সন্দেশের গন্ধ বুঝে দৌড়ে এল মাছি—
কেন ভন্‌ ভন্‌ হাড় জ্বালাতন! ছেড়ে দাও না বাঁচি।’
...একদিন অজিত এসে বলল ‘আয় আমরা একটা হাতের লেখা কাগজ বার করি।’
‘কী নাম দিবি?’ আমি প্রশ্ন করলাম।
অজিত বলল, ‘বাবা নাম ঠিক করে দিয়েছেন... অবকাশরঞ্জন’...
... কাগজের প্রথম পাতার জন্য একটি কবিতা লিখে অজিতকে দিলাম—
‘অবকাশ রঞ্জন বিপদের ভঞ্জন
রঞ্জিত করে চারিধার
মাভৈঃ মাভৈঃ রব করে নর-নারী সব,
খঞ্জন গাহে অনিবার।’

...অনুপ্রাসের শ্রাদ্ধ করে ছেড়েছিলাম। প্রভঞ্জন, গঞ্জন, অঞ্জন, ব্যঞ্জনা, ঝঞ্জনা প্রভৃতি যত ‘ঞ্জ’-যুক্ত শব্দ জানতাম—তার প্রয়োগ করেছিলাম এই কবিতাতে।
এই কবিতাটি দেখে পণ্ডিতমশাই বলেছিলেন, ‘অর্থহীন কবিতা, ভাবহীন অভিব্যক্তি, ব্যাকরণহীন পঙ্‌ক্তি, আর অতি—অনুপ্রাসযুক্ত অসংগতি।’
যাই হোক কবিতাটি অজিতের পছন্দ হল। সে বলল, ‘রবিবাবুর থেকে ভালো কবিতা হয়েছে রে—রবিবাবুর অনেক কবিতার মানে তো বোঝা যায় না—মানে হয় তো হয়ই না।...’

একদিন সকালে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়ছি, এমনসময় দাদামশাই একখানি ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ হাতে নিয়ে আমার পড়ার ঘরে ঢুকলেন। বললেন, ‘ওরে, তোদের ইউ রায় মারা গেছেন।’
এ কী কথা! এর থেকে মাথায় হঠাৎ একটা বাজ পড়লেও অতটা চমকাতাম না। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অত গুণী লোক ইউ রায় কি মরতে পারেন নাকি! এই তো সেদিন তিনি গিরিডি ঘুরে গেলেন। তাঁর সৌম্য গম্ভীর মূর্তি এখনও চোখে ভাসছে।
মাস্টারমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে ইউ রায়, তোদের কোনো আত্মীয় নাকি?’
মনে মনে ভাবলাম... আমার আত্মীয় কেন? তিনি যে সারা বাংলার, সারা বাঙালি ছেলে মেয়েদের আত্মীয়।
মুখে বললাম, ‘ইউ. রায় ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক।’ মাস্টারমশাই বললেন, ‘সন্দেশ, রসগোল্লা নামে আবার পত্রিকা আছে নাকি?’
মাস্টারমশাইয়ের কথার কোন উত্তর দিলাম না—তাঁর এত অল্প জ্ঞানের পরিধি দেখে স্তম্ভিত হলাম। তিনি গিরিডিতে ওকালতি করেন এবং একজন বিশেষ শিক্ষিত লোক।
ইউ রায়ের মৃত্যুতে আমি বিশেষ বিচলিত হলাম। ‘সন্দেশ’এ তাঁর আর লেখাও পাব না, ছবিও দেখতে পাব না। সব যেন অন্ধকার হয়ে গেল।
...পরের সংখ্যায় ‘সন্দেশ’এর প্রথম পৃষ্ঠায় দাদামশাইয়ের লেখা কবিতা প্রকাশিত হল। ইউ রায়ের জীবনী প্রকাশিত হল। সেই সঙ্গে তাঁর নানা বয়সের ছবি দেখলাম, কখনো বেহালা বাজাচ্ছেন, কখনো ছবি আঁকছেন ইত্যাদি।
এখন থেকে ‘সন্দেশ’-এ U.R এর ছবি কম দেখি, S. R এর ছবি বেশি দেখা যায়।
S. R হচ্ছেন সুকুমার রায়। তাঁর হাতে আঁকা ‘সন্দেশ’-এর রঙিন মলাট দেখলাম—একটা রঙিন পর্দা ছিঁড়ে একটি মেয়ের মুখ বার হয়েছে, মুখটা হাসি হাসি।
আবার দেখলাম একটা বাঘের ছবির মলাট। ভিতরেও তাঁর রঙিন ছবি দেখতে পাই, একটা সেতুর নিচ দিয়ে জলের স্রোত বেগে ছুটে যাচ্ছে—হনুমান সূর্যকে বগলে চাপতে যাচ্ছে—বাঘের সঙ্গে বরাহের যুদ্ধ ইত্যাদি।
প্রতি সংখ্যাতেই ইউ রায়ের অভাব অনুভব করি। তাঁর আঁকা বাল্মীকি, ত্রিপুরবিনাশ, বৃত্রাসুরের হাই, চামুণ্ডা ইত্যাদি মন-মাতানো রঙিন ছবি আর কে আঁকবে!

পুরোনো বানান অপরিবর্তিত।

আপনার মতামত জানান