হরিপদর বেহালখাতা

ঈশানী রায়চৌধুরী


প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে বর্ধমান লোকাল শ্রীরামপুর স্টেশনে ঢুকল | একটু ঝিমুনি এসেছিল স্বপ্নময়ের | আজ শনিবার | অফিস নেই | আয়েস করাই যেত | কিন্তু ওই যে ! এই মাঝবয়স পর্যন্ত কারো কথায় "না" বলতে পারল না সে | মাঝবয়স ? তা তিনের কোঠা তো প্রায় ফুরিয়ে এল | এক সপ্তাহ আগে থেকেই মা গান গেয়ে রেখেছে | শনিবার বর্ধমান | শরিকী ভদ্রাসন , ভাগে কুল্লে দুটো ঘর ; তাতে গুচ্ছের আবর্জনা ডাঁই করে রাখা | তালা ঝোলে সম্বচ্ছর | মাঝে মাঝে গিয়ে তালা খুলে উঁকি দেবারই বা কী আছে কে জানে ! ভাল্লাগে না ! আশ্বিন মাস পড়ব পড়ব করছে | এখনও গুমোট গরম | লোকাল ট্রেন | চলটা ওঠা সীট | ছারপোকার গুষ্টি | পুরনো খবরের কাগজ পেতে বসা | একটু নড়লে চড়লেই খচরমচর করে সরে যাচ্ছে | এর মধ্যে দু'বার লেবু চা আর একপ্রস্থ মিয়োনো ঝালমুড়ি হয়ে গেছে | পাশের হুমদো গুঁফো লোকটা কোথায় নামবে কে জানে ! একটু হাত পা ছড়িয়ে বসার উপায় নেই !

স্বপ্নময়ের এমনিতে ট্রেনে চেপে এদিক ওদিক যেতে মন্দ লাগে না | কিন্তু সে হল নিজের মর্জিমাফিক | তবে আজকের এই ফরমায়েসী হুজুগে কিন্তু একটা ঝক্কি থেকে রেহাই পাওয়া গেছে | শনিবারের বাজারের একফুট লম্বা ফর্দটা শর্মিষ্ঠা সাতসকালে এনে হাজির করেনি | এমনিতে শাশুড়ি বউ যুযুধান প্রতিপক্ষ , কিন্তু শনিবার বাজারের আগে সাদা পতাকা | দুজনে মিলে ফর্দ তৈরী শুরু হয়ে যায় ! আজ অবিশ্যি শর্মিষ্ঠা দয়ার অবতার | যা আছে , ওই দিয়েই সেরে নেবে...কাল তেমন হলে...

উল্টোদিকের জানালার পাশের সীট খালি হল এবার | একটা ক্ষয়াটে চেহারার মাঝবয়েসী লোক হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বসেছে | নুন গোলমরিচ চুল , ইস্ত্রিবিহীন হাফহাতা শার্ট আর ছাইরং প্যান্ট পরে | দেখলেই মনে হয় গায়ে পড়া | এক্ষুনি হাঁড়ির খবর জানতে চাইবে | স্বপ্নময় জানালার বাইরে চোখ রাখল | কিছুতেই লোকটার চোখে চোখ রাখা চলবে না |

-- দাদা , কদ্দূর ? জংশন নাকি ?
স্বপ্নময় পারে না | যত ভাবে এড়িয়ে যাবে ; সৌজন্য নামের পোষা মামদো ভূতটা ঘাড় থেকে নামে না | সে ব্যাজার হতে গিয়েও পারল না |
--ওই আর কী !

এই ভালো | বলা হল ; আবার হলও না | হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া |
-- দাদা কি কলকাতা থেকে ?
-- হুঁ
এক কথায় জবাব দাও | এ খেলাটা মন্দ নয় !
--আমি বুঝলেন শ্রীরামপুরে থাকি | তবে কলকাতা যাই | ডেইলি | একটা প্রাইভেট ফার্মে আছি | আপনি ?
-- সরকারী |
-- বা: , বেড়ে বুদ্ধির কাজ করেছেন মশাই | রাতগুলো নিশ্চিন্তির ঘুম ঘুমোতে পারেন | আমার তো চিন্তায় চিন্তায়.. এই বুঝি টার্গেট রীচ করতে পারলাম না | কোম্পানি ঘাড়ধাক্কা দিল ! এই দেখুন , দাদার নামটাই জানা হয়নি |

স্বপ্নময়ের চিরতা গেলা মুখ |
-- হরিপদ |
-- হরিপদ ? তা বেশ বেশ ..বামুন ?
-- চক্রবর্তী |
-- কী কাণ্ড ! আরে আমিও তো তাই ! চক্কোত্তি | তবে আদতে মুখুজ্যে |

যা: ! মুখ ফসকে হরিপদ নামটা বেরিয়ে গেল | আসলে এক্কেবারে খেজুর করতে ইচ্ছে করছে না স্বপ্নময়ের | একে তো নিজের জন্য সময় পাওয়া যায় না | ফাঁকফোকর দিয়ে চুরি করা যেটুকু... তবু যাও বা নিরিবিলিতে একটু সময় পেল আজ... এই লোকটা...উফফ ...স্বপ্নময়ের অসহ্য লাগছিল |

-- তা দাদা কি বিয়ে থা করেছেন ?
-- না :

স্বপ্নময়ের বুকটা একটু কেঁপে উঠল | কেমন আলটপকা বেরিয়ে গেল মিথ্যে কথাটা ! শর্মিষ্ঠা..যতই খিটখিট করুক..দশ বছরের দাম্পত্য | তাতান...ছয় পুরেছে গত মাসে ....

--বেঁচে গেছেন মশাই | তা বাড়িতে আর কে কে ?
"আচ্ছা বদ তো লোকটা ! আমি কি ওর গুষ্টিগোত্তরের খবর জানতে গেছি ?” এবার স্বপ্নময়ের একটু একটু রাগ হচ্ছিল |

--আপাতত বাড়ি ফাঁকা | বাবা মা দিদির বাড়ি | বেড়াতে | দিল্লিতে |

আবার একটা মিথ্যে কথা ! বাবা মারা গেছে পাঁচ বছর | মা বহাল তবিয়তে লাঠি ঘোরাচ্ছে স্বপ্নময়ের মাথার ওপর | অবিশ্যি মা আর কতটুকু ? শর্মিষ্ঠা একাই একশ' | দিদি, বোন , ভাই..কস্মিনকালে কেউ নেই স্বপ্নময়ের | এক ছেলে হবার শতেক জ্বালা |

-- তবে তো ঝাড়া হাত পা মশাই | আমি তো জেরবার হয়ে গেলাম | এই যাচ্ছি বর্ধমানে | মায়ের হাঁটুতে বাত | কে নাকি স্বপ্নাদ্য মাদুলি দেয় | এদিকে ছেলেটার জ্বর | বাড়ল কিনা কে জানে ! আচ্ছা, আজকাল প্যারাসিটামলে তেমন কাজ হচ্ছে না কেন বলুন তো ? গিন্নির ওপর বড্ড চাপ পড়েছে, বুঝলেন ! সুযোগ বুঝে কাজের মেয়েটাও ডুব...কোন দিকটা যে সামলাই !

কথায় কথায় বেশ ক'টা স্টেশন পেরিয়ে গেছে | ভিড়টা খানিক হালকা | স্বপ্নময়ের হাতে দু'প্যাকেট বাদাম |

-- এই নিন |
-- আরে, আপনি আবার.. বলছিলাম কি , মানে যদি কিছু মনে না করেন...
-- বলুন না !

আবার সেই সৌজন্যবোধ !

-- ইয়ে , আমার মাসতুতো শালী , বুঝলেন.. স্বঘর | গ্র্যাজুয়েট , দেখতে শুনতে ভালো, কাজকম্ম জানে | মানে আপনি যদি...

সর্বনাশ ! বিয়ে ! স্বপ্নময় শিউরে উঠল | ম্যানেজ দিতে হবে |

-- কী যে বলি আপনাকে , মানে..আমার ওই আর কী ! বাবা মা ফিরলে..এই সামনের মাঘেই | পাড়ারই মেয়ে | অনেক দিনের চেনাজানা |
-- ও : , তবে তো মিটেই গেল |


স্বপ্নময় এতক্ষণে খেলাটার মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে পড়েছে | জানালা দিয়ে ঝিরঝিরে হাওয়া | সে ঝাঁপি খুলে বসল |

--বুঝলেন, দারুণ গান করে |
শর্মিষ্ঠার মুখটা ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল | মুখ খুললে ফাটা কাঁসির আওয়াজ |
-- আপনি তো ভাগ্যবান মশাই !
-- কবিতাও লেখে , জানেন ! লিটল ম্যাগাজিনে বেরোয় টুকটাক |
কবিতা ! শর্মিষ্ঠা কবিতার বই কিনলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলে | পয়সা নষ্ট !

স্বপ্নময় লাজুক লাজুক মুখে হাসল |

-- -- উফ , আপনি তো লটারি জিতেছেন | আমার গিন্নিটি এক্কেবারে ন্যাতাজোবড়া ! দূর দূর ভাল্লাগে না ! খালি চাল-ডাল-কেরোসিন |

সর্বনাশ ! গতকালই শর্মিষ্ঠা বলেছিল গ্যাস বুক করতে | বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে | জানতে পারলে বাবার নাম খগেন করে ছেড়ে দেবে |

-- তা হরিপদবাবু , আপনার বাবা মা কী বলছেন ?
-- ওটা কোনো ব্যাপার নয় ! তিনজনে দারুণ জমে যায় সবসময় ! আমি তখন বাইরের লোক , বুঝলেন !

উফ , স্বপ্ন ! স্বপ্ন !

আচ্ছা, স্বপ্নময় ঠিক কী চেয়েছিল ? এই লোকটার মতো ছাপোষা জীবন ? ছিমছাম শান্তি আর টুকিটাকি অশান্তিতে যেমন করে পাঁচটা মধ্যবিত্ত সংসার বয়ে যায় নিজস্ব নিয়মে ? চাইলেই কি সব হয় নাকি ? সংসারের চেনা মুখগুলো কেমন গিরগিটির মতো রং বদলায় যখন তখন | স্বপ্নময় তাই অসহায় আক্রোশে হিসেব না মেলার দু:খে নিজের হাতের মুঠি খোলে , বন্ধ করে ; খোলে , বন্ধ করে..

সে এখন এই মুহূর্তে খেলায় নেমেছে | রোজই তো নামে মনে মনে | আজ মন ছেড়ে খেলা ট্রেনের কামরায় | সত্যিতে আর মিথ্যে কথায় |

আসলে দুটো স্বপ্নময় | বাড়ির ভেতরের স্বপ্নময় , সংসারী স্বপ্নময় জেরবার হয়ে থাকে সারাক্ষণ | ছেলের ইংরিজি মিডিয়াম ইস্কুলে ভর্তির ফর্ম , মায়ের চশমা, বৌয়ের হাজার বায়নাক্কা | আর বাইরের স্বপ্নময় ? একা হেঁটে যায় আদ্যন্ত উদাসীন সন্ন্যাসীর পায়ে | তার না-দেখা দিদি দিল্লিতে থাকে | তার মৃত বাবা সকালে হেঁকে বলে , " দেখলি বাবু , কাল ইস্টবেঙ্গল ২-১ গোলে জিতল ! ইস , লোডশেডিং না হয়ে গেলে খেলাটা শেষ পর্যন্ত দেখা যেত !" কপালে আধুলির মাপে সিঁদুরের টিপ পরা তার হাসিখুশি মা চায়ের কাপ হাতে ঝুলবারান্দায় | তার ছিপছিপে সুন্দরী প্রেমিকা সেক্টর ফাইভের রাস্তায় এলোমেলো হাঁটতে থাকা স্বপ্নময়ের আঙুল জড়িয়ে বলে, " এই জানো , কাল রাতে লিখলাম...তোমরা যাকে বৃষ্টি ভাবো , আমি বলি মন কেমন .... আর শোনো , কতবার বলেছি , এত সিগারেট খেও না...."

স্বপ্নময় |

এক স্বপ্নময় , শ্বশুরবাড়ির তরফের নেমন্তন্নে গিয়ে ব্যাজারমুখে বসে কব্জিতে বাঁধা ঘড়িতে সময় দেখে | অন্যজন হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় একাডেমি চত্বরে , ছবির একজিবিশনে | এক স্বপ্নময় অফিসে কলম পেষে | অন্যজন ভরদুপুরে হাফ ডে ছুটি নিয়ে চুপিচুপি পার্কের সবুজ গালচেতে পিঠ পেতে দেয় আরামে |

নিজের স্বপ্নগুলো তো স্বপ্নময় নিজের ভেতরেই রেখে দিয়েছিল | আজ যে কেন হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এল ! মন পেরিয়ে , ঠোঁট পেরিয়ে চলকে গেল ট্রেনের কামরায় |

চলকে গেল | উপচে গেল | উল্টোদিকে বসে থাকা মধ্যবিত্ত মানুষটি শুষে নিচ্ছিল স্বপ্নময়ের যাপনকথা | মিথ্যের আলো মাখা | সেই আলোয় স্বপ্নময় লোকটার চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠা অসহায় হিংসের ফুলকি দেখতে পাচ্ছিল | ভালো লাগছিল | খুব ভালো লাগছিল | নিজেকে এতদিনে সত্যি সত্যি দামী আর না - ফুরিয়ে যাওয়া মনে হচ্ছিল |

ট্রেনটা গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকল বর্ধমান জংশনে | এতক্ষণে স্বপ্নময় একটু কৌতূহল দেখাল | ভদ্রলোকের হাতে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে বলল ,

-- জিজ্ঞেস করাই হয়নি | গল্পে গল্পে এতটা সময় পার করে দিলাম... আপনার নামটাই তো জানা হল না |

--- স্বপ্নময় | স্বপ্নময় চক্রবর্তী |

আপনার মতামত জানান