হাসি

মৌ দাশগুপ্ত


ছোটবেলা থেকেই আমার মুখটা বেশ হাসিহাসি টাইপের। না হাসলেও অনেকই ভাবত আমি
বুঝি হাসি লুকাচ্ছি। কম অশান্তিতে পড়েছি এই নিয়ে। দাদা রেজাল্ট খারাপ
করে বাবার হাতে বেধড়ক্কর মার খেতে খেতে দেখল আমি নাকি হাসছি, অতএব বাবার
ওপর রাগের শোধ নিয়ে নিল আমার পিঠে তবলা বাজিয়ে। স্কুলে পড়া না পাড়ায়
বদরাগী ভুগোলের দিদিমনি কানে আচ্ছাসে মোচড় মেরে দাঁড় করিয়ে দিলেন
বেঞ্চে,তারপরেও দুটো গাট্টা ফাউ পেলাম ঐ হাসিহাসি মুখের জন্য। অবশ্য আমি
এমনিতেও হাসতাম বেশী। অঙ্ক দিদিমনির ‘স’ কে ‘শ’ বলা নিয়ে, ভানু কাকীমার
তোতলা স্বভাবের জন্য এক গ্রাম প্রোটিনকে ‘অ্যাক গাম পোতিন’ বলা নিয়ে,মাধব
স্যার আমাদের দুই ভাইবোনকে ঘরে পড়াতে বসিয়ে ঘুমে ঢুলে পড়লে পড়ে কিংবা
দাদু বকতে শুরু করলে ফাজিল ছোটকা’টা দাদুর আড়ালে মুখ ভ্যাংচানো শুরু করলে
সবার আগে আমারই পেট থেকে ভুসভুসিয়ে হাসির ফোয়ারা বেরিয়ে আসতো। চাপতে
পারতামনা।



মা বলত, '' অত হাসিস কেন বলতো? তুই মেয়ে না ? লোকে কি বলবে? বিয়ের পর
শ্বশুড়বাড়ীতে উঠতে বসতে কথা শুনবি যে! " মা ভুল বলেনি, এখন বুঝি ।মায়ের
আঁচল ছেড়ে ঘোর সংসারী এখন। শ্বশুর শাশুড়ী,বর, দুই ছেলে মেয়ে। সংসারের সব
কাজ সেরে নিয়ে হাসতে গেলেও গুনাগার দিতে হয়। স্বভাব গম্ভীর কত্তামশাই রাগ
করেন, না বুঝে হাসছি মনে করে ছেলে মেয়ের সামনেই ‘বোকা, বুদ্ধির ঢেঁকি’
ইত্যাদি সোহাগের নামে ডেকে ফেলেন। শ্বাশুড়ী মা বিরক্ত হন, বাপের বাড়ীর
শিক্ষা সহবত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বেশী হাসি দেখলে একরত্তি-মেয়েটারও
কেমন চোখ গোলগোল হয়ে যায় , ছেলের অন্যায় আবদারের মাত্রা বাড়ে। স্কুলে
পড়াই, ছাত্রছাত্রীরা একটুও ভয় পায় না। সহকর্মীরাও আমায় খুব একটা পাত্তা
দেয় না। কাজের লোক কথায় কথায় মুখঝামটা দেয়, এমনি ঘরের পোষা কুকুরটারও
বেশী বেশী খিদে পেয়ে যায় । হাসিটা তবে তোলা থাক । তাই মুখ ব্যাজার করাটা
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রপ্ত করে নিয়েছি। সময় কম লাগেনি, তবু শেষমেশ
শিখে ফেলেছি। বাথরুমের আয়নাটা অবধি আমার হাসিমুখ দেখেনি আজ দীর্ঘদিন হল।
প্রচন্ড রাশভারী দিদিমনিসুলভ একটা ওজনদার মুখোশ বয়ে বেড়াতে বেড়াতে হাসির
সাথে কাট্টি করে দিয়েছি হয়ত এ জন্মের মত।



আজ আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে দেখি টিভির লাফটার শো দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে
ঠিক আমার ছোটবেলার মত। সবার হাসি থামলেও মেয়ের হাসি আর থামেই না। শাশুড়ী
মা বললেন, ‘দ্যাখো কান্ড, মায়ের মুখে হাসিটি নেই, আর মেয়ের হাসি থামার
নাম নেই।‘ কত্তামশাই বললেন ‘কার মেয়ে দেখবে তো, শ্বশুরমশাইয়ের মেয়ে
রামগরুড়ের ছানা হতে পারে, তা বলে আমার মেয়ে তো আর তা নয়। হাসছে হাসুক।‘
ছেলে কান থেকে হেডফোন নামিয়ে বললো, ‘সত্যি মা টা যেন কি, একটুও হাসে না।‘
আড়াল থেকে সরে গেলাম। সামলাতে পারছি না, পেট থেকে ভুসভুসিয়ে হাসির
ফোয়ারা বেরিয়ে আসে আর কি। বিরিঞ্চি বাবার সত্য হতে পারলে বেঁচে যেতাম।
মেয়ে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ রেখে বললো, ‘ প্লিজ মা,
সবসময় মুখটা এইরকম হাসিতে ভরিয়ে রেখো । হাসলে না তোমার ভারী মিষ্টি লাগে।
খুব খুব ভালো লাগে তোমায়।“ তারপর থেকে কত চেষ্টা করছি মুখোশটা ছিঁড়ে খুলে
ফেলার। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে এমন জং ধরে আটকে গেছে যে খুলতে গিয়ে চোখে জল
চলে আসছে কিন্তু পোড়ামুখে হাসি যে আর আসছে না।

আপনার মতামত জানান