এই নাও বল

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়



যে কম্পানি এই বল তৈরি করেছে তার নাম ঝাপসা হয়ে গেছে। বলের গায়ে নাম লেখা ছিল। ব্যাট-বলের সংঘর্ষে বলটাই পুরনো হয়ে যায়নি, নামটাও প্রায় লোপ পেতে বসেছে। তবু বলটা যত্ন করে রেখেছে সুহাসিনী, কারণ এটা ওকে উপহার দিয়েছে সমীরণ। ভালোবাসার উপহার, হারানো যায় না, ফেলে দেওয়ারও প্রশ্ন নেই।
বলটার আরো একটা গুরুত্ব আছে। এই বলেই ক্লাব ক্রিকেটে প্রথম আটটা উইকেট নিয়েছিল সমীরণ। এক ইনিংসে আট-আটটা উইকেট কম কথা নয়। নামী-দামি বোলাররাও পায় না সব সময়। এখন এই বলটাই সুহাসিনী ফেরত দিতে চলেছে সমীরণকে। আজ সমীরণরা চলে যাচ্ছে পাড়া ছেড়ে নতুন ঠিকানায়। সেটা পয়সাঅলা লোকদের পাড়া। ঝাঁ চকচকে রাস্তা, বাড়িঘর। দোকানপাট। এমনকী, চওড়া রাস্তার দু’ পাশের গাছপালাগুলোও এখানকার মতো দরিদ্র মনে হয় না। এই বড়লোকদের পাড়াতেই বারোতলার ওপর ফ্ল্যাট কিনেছে সমীরণ। বড় গাড়ি কিনেছে। স্রেফ ক্রিকেট খেলার টাকায়। নিজেও জানে না কত টাকা সে উপার্জন করেছে। আরো কত করবে। একে যদি সাফল্য বলা যায়, তাহলে বলতে হবে এরকম সাফল্য আরো অনেকের জীবনেই ঘটেছে। খেলোয়াড়, ডাক্তার, উকিল, লেখক– সব নানা পেশার লোক। তারা কেউ দুঃখ- কষ্টের পুরনো জীবনটার কথা ভুলে গেছে, কেউ ভোলেনি। যারা ভোলেনি, তারা মুখ ফুটে এসব কথা বলেও না। চুপ করে থাকে, না হলে কথা উঠলেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। সমীরণকেও এদেরই মধ্যে ধরা যায়। টালির বাড়ি, কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টির জমা জল, নলকূপ, দু’ বেলা যাওয়া-আসার পথে সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলো কেউ বা কোনোকিছুই আর ওদের আলোচনার মধ্যে থাকে না। সমীরণ যেখানে পৌঁছেছে সেখানে রাস্তার দু’ পাশে আবর্জনা পড়ে থাকে না। স্মৃতিও ওরকম পরিষ্কার, তকতকে।
সুহাসিনী তাহলে কেন পুরনো বলের স্মৃতিটা যত্ন করে পুষে রাখছে ? টিনের সুটকেশে বাতিল একটা শাড়ির আশ্রয়ে যে বলটা সে নিতান্তই বাঁচিয়ে রেখেছে, তার গায়ে অনাদরের ছাপ পড়তে দেয়নি, সেই প্রাণহীন নিথর বস্তুটার নতুন কী মূল্য আছে তার কাছে ? সমীরণের ভালোবাসার দিনগুলোর কথা কি ওই বোবা জিনিসটার পক্ষে গর্ব করে কাউকে বলা সম্ভব ? সেও তো বাতিলের দলে। তাহলে আর একটা টালির বাড়ির ঝড়-বৃষ্টি-রোদের মধ্যে তাকে বাঁচতে দেওয়া কেন ?
সুহাসিনী ভেবেছিল বলটা সে পাড়ারই ছেলে সন্তুকে দিয়ে দেবে। সন্তুও ক্রিকেট খেলে। ব্যাট- বল দুটোই করে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কতদূর এগোতে পারবে এখনই বলা যাচ্ছে না। সমীরণ ওর আদর্শ, ওর কাছে পরামর্শও নিয়েছে নানা সময়। সন্তুকেই বলটা দিলে সে খুশি হবে। সমীরণদার স্মৃতিটা ওকে কিছুটা অন্তত স্মৃতি দেবে। কিন্তু সুহাসিনী যা ভেবেছিল তা হল না। বলটা নিল না সন্তু। বলল, ‘সমীরণদা শুনলে রাগ করবে। ওটা তোমাকে দিয়েছে, তুমিই রেখে দাও। একজনের দেওয়া জিনিস আর কাউকে দিতে নেই।’
সন্তুর কথাটা মনে রেখেছে সুহাসিনী। আজ যখন সমীরণদের বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য মিনিট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে গলির মোড়ে, সে ভাবল বলটা সে সবার অজান্তে ট্রাকেই রেখে আসবে। একসময় যখন সমীরণ বলটা দেখতে পাবে, সে ভাববে কী করে বলটা আবার ওর কাছে ফিরে এল ? তবে কি সুহাসিনী এসে রেখে গেছে, বিদায়বেলার সঙ্গী হিসেবে ? কাউকে কিছু বলেনি বা আমার বাবা- মা- ভাই- বোন কারো সঙ্গে দেখাও করেনি ? ক্রিকেট বলের ছেঁড়া সেলাইয়ের মতোই থেকে গেছে সম্পর্কটা ?

আর কিছু ভাবতে পারেনি সমীরণ। এরই মধ্যে একদিন সে ওর পুরনো পাড়ায় গেল শুধু সুহাসিনীর সঙ্গে দেখা করার জন্যই। দরজায় কড়া নাড়তেই বেরিয়ে এল সুহাসিনী। পকেট থেকে পুরনো বলটা বের করে ওর হাতে দিল সমীরণ। বলল, ‘এই নাও বল। আগের মতোই আছে। এটা তোমারই।’

আপনার মতামত জানান