রঁদেভু

সন্দীপা মালাকার


শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বারিস্তার কাঁচের দেওয়াল দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে এই বছরের প্রথম বৃষ্টির ধারা।
অঝোরে ক্লান্তিহীনভাবে ঝরে পড়ছে কিছু ফ্যাকাসে নীল রঙ… বাইরেটা ঝাপসা… এনরিকে, কাপুচিনো আর বৃষ্টির গন্ধ মিশে আড্ডার পরিবেশটা বেশ ভালই তেরি হয়েছে… তবুও কি যেন একটা নেই… কি যেন একটা।
Îউফ কি যে একঘেয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে কাল রাত থেকে! সব বৃষ্টি আজই হতে হল।
Îসত্যি! ক্যালকাটার এই প্যাচপ্যাচে গরম আর এই বৃষ্টির জল জাস্ট ইনকারিজিবল…
Îএত বড় বড় শহর দেখলাম। কিন্তু যে কোনও শহর মনে হয় ফার বেটার দ্যান ক্যালকাটা…
ভাবতে অবাক লাগলেও সত্যি যে এরাই একদিন স্কুলের ছাদে একসাথে বৃষ্টিতে ভিজেছে… ক্লাসে জল ঢুকিয়ে ক্লাস না করার বাহানা বানিয়েছে… রাস্তায় শুকনো জায়গা ছেড়ে জলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেছে… কাউকে কাউকে বৃষ্টিতে বেশি ভিজে বাসে ওঠার জন্য বাস থেকে নামিয়েও দেওয়া হয়েছে…
রিক্তারা চার বন্ধু আজ বহুদিন পরে একসাথে হয়েছে… মানে যাকে বলে গেট-টুগেদার… দশটা বছর ফেলে এসেছে ওরা অতীতের রাস্তায়… তবুও তানিয়া, দিয়া, অহনা, রিক্তা চারজনের কাছেই পরস্পরের নামগুলো আজও খুব প্রিয়, যা তাদের একসাথে কাটানো অনেক মুহূর্ত মনে করায়… অনেক কান্না, অনেক ভাললাগা, অনেক পাগলামি…
তাই হয়ত এতগুলো বছর এত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিটা রবিবার তারা একসাথে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য অরকূট বা জি-টকে অনলাইন হয়েছে পরস্পরের রিসেন্ট আপডেটস জেনে নিতে…
এইভাবে কখন যে সময় এগিয়ে গেল, শরীর মন সব কিছুতেই বয়স বাসা বাঁধল কেউ খেয়াল করেনি।
Îজানিস আগের উইক এণ্ডে বাল্টিক সি ঘুরে এলাম। হোয়াট আ ভিউ! জাস্ট অসাম। ওদেশে না গেলে কতকিছু যে মিস করতাম…
Îএত জায়গা যাস তো একবার কুনমিংটা ঘুরে যা না… এ জায়গাটা আমাদের দেশের স্প্রিং সিটি… দারুণ ওয়েদার… চিনে আমার দেখা বেস্ট জায়গা…
Îআর বলিস না। তোদের মতো সুখ তো সবার নয়। সারাদিন পরে ল্যাব থেকে ফিরে ভুলে যাই ইউ এস না ইন্ডিয়া কোথায় আছি! তখন শুধু বিছানাটাই ফোকাসড হয়। আর সাথে যদি হুইস্কি থাকে তো নিজেকেই ভুলে যাই।
একজন শুধুই চুপ থাকে। আজ তার সব কথাই কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
তানিয়া একটা সিগারেট ধরাল। বাকিদেরও অফার করল। বাকিরা রেগুলার স্মোকার না হলেও এতদিন পরে দেখা হওয়া উপলক্ষে আর তাদের জীবনে প্রথম একসাথে সিগারেট খাওয়ার দিনটাকে মনে করে সবাঈ একটা করে সিগারেট ধরাল।
রিক্তা ছাড়া এরা আজ প্রত্যেকেই অন্য দেশের বাসিন্দা। কেউ বা কাজের সূত্রে কেউ বা শুধুমাত্র বিয়ে করে স্পাউস হয়ে…
রিক্তার মৌনতাকে ভেঙে হঠাৎই তানিয়া বলে উঠল, এই হয়েছে আমাদের রিক্তাটা। কি যে চায়, বোঝা মুশকিল। এমন একটা জব করিস যে চাইলেই বাইরে কোথাও সেটল করতে পারিস। আর তুই তো সেইরকমই চেয়েছিলিস। স্যালারি বাড়বে, লাইফস্টাইল পালটাবে। কেন যে জীবনটাকে নষ্ট করছিস এখানে পড়ে থেকে! এত হোমসিক তো তুই ছিলিস না!
রিক্তা চুপ করে থাকে। তার হাতের সিগারেটটা নিঃশব্দে পুড়ে চলে…
ওর মনটার মতোই…
সে শুধু ভাবতে থাকে কলকাতা নামটা আর আজ কেউ একবারও বলছে না…
কলকাতা কি আজ এতটাই ফিকে হয়ে গেছে এদের মনে? সেই ছোট থেকে উত্তর কলকাতার স্কুল, কলেজ…
কলেজ ছুটির পরে কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস, নন্দন, আউট্রাম ঘাট, বৃষ্টির দিনে নৌকায় করে গঙ্গায় ভেসে বেড়ানো সেই মানুষগুলোই কি আজ তার সামনে?
সময়ের পলি কি এতটাই জমে গেছে যে আজ সে তার প্রিয় বন্ধুগুলোকে চিনতে পারছে না! দূরত্বটাই কি সব? এতগুলো বছরের এতগুলো রবিবারের এতগুলো ঘন্টা শুধুই কি ফেলে আসা সময়ের ফেলে আসা মনের অবয়ব? সামনা সামনি মানুষগুলো কি আজ সত্যিই এতটা পালটে গেছে!
প্রতি সপ্তাহে কাদের পাঠিয়েছে রিক্তা পুরনো আড্ডার জায়গাগুলোর ছবি? কলকাতার পথঘাট আকাশ?
সবটাই কি কল্পনা ছিল?
এনরিকের গানটা আস্তে আস্তে ছন্দ হারাচ্ছে, ছন্দপতন ঘটছে আজ এতদিন পরে কাছাকাছি হওয়া চারটে মনের মেলবন্ধনে…
ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সবকিছু… স্পষ্ট হয়ে উঠছে কফি হাউসের একটা টেবিল, চারটে কাপ, এলোমেলো কিছু কথা আর একটা সুর…
‘হোয়্যার হ্যাভ অল দ্যা ফ্লাওয়ারস গন…’

আপনার মতামত জানান