শববাহক

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

অলংকরণ- তৌসিফ হক



ছবি আঁকাটা বাবার আর হল না। মানে সে অর্থে হল না, যে-অর্থে উনি চেয়েছিলেন। উনি তখন আর্ট কলেজের ছাত্র, কলকাতার মেসে থাকেন। হঠাৎই খবর পৌঁছল দাদু অসুস্থ। জেলা হাসপাতালে ভর্তি। উনি ফিরে এলেন। শুরু হল তিন সপ্তাহ ধরে হাসপাতাল চত্বরে উৎকণ্ঠিত আসা-যাওয়া। আগে থেকেই দাদু অবশ্য শয্যাশায়ী মাস তিনেক ধরে। চিকিৎসাও ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। ডাক্তার জবাব দিয়ে দেওয়ার পর ওঁকে বাড়ি এনে রাখা হল। কিছু উনি থমকে রইলেন। তারপর যে আশ্বিনের সন্ধ্যেবেলা উনি চলে গেলেন - আক্ষরিক অর্থেই সেদিন ওঁকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ারও টাকা ছিল না। এদিক-ওদিক থেকে কিছুটা জোগাড় করে দু'টো বড় হ্যারিকেন হাতে বাবার সঙ্গে শ্মশানবন্ধুরা চলল নবদ্বীপের দিকে।

দাদু যে বেকার ছিলেন তা নয়। জেলা কালেকটরেটের ডাকসাইটে কর্মী ছিলেন। গ্রামে প্রতিপত্তি ছিল। নদিয়ার চাপড়া অন্তর্গত কলিঙ্গগ্রাম থেকে উঠে এসে জেলা-শহর কৃষ্ণনগরে পাঁচকাঠা জমির উপর পুরোনো বাড়ি কিনে, বড়ো আর মেজোমেয়ের বড় ঘরে বিয়ে দিয়ে সঞ্চয় তলানিতে এসে ঠেকেছিল। অপরিণামদর্শী লোকটা বর্তমানে বাঁচতেন। সাবুর মাড় দেওয়া ধুতি পরতেন, পাকা মাছের মাথা ছাড়া ভাত রুচতো না, বাজার থেকে ধার করে পরিচিতি বৃত্তে ধার দিতেন। এহেন লোক যে মরার সময় পাহাড়প্রমাণ ঋণের বোঝা রেখে যাবেন। তা তো বলাই বাহুল্য। তার উপর ওই মারণ রোগ কপর্দকশূন্য করে ছেড়েছিল।

দাদুকে দাহ করে ফিরে ঘাড়ের উপর অদৃশ্য একটা ভার অনুভব করলেন বাবা। মেরুদণ্ড বেঁকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। কাকা তখন নাবালক - হাফপ্যাণ্ট পরে। মুখের কথা স্পষ্ট হয়নি। দুই পিসি অবিবাহিতা। মা সম্পন্ন ঘরের মেয়ে, হাড়হাবাতের জীবনযাপনে অনভ্যস্ত। দাদু ব্যবস্থা নিয়েই রেখেছিলেন। কানাই সান্যাল দাদুর বাল্যবন্ধু, ওঁর তরজির জেলা কালেক্টরিতে কেরানির পোস্টে একটা চাকরি হয়ে যাবে এমনই কথা চলছিল। তবু বাবার মন পড়ে ছিল কলকাতায়। যে একবার মহানগরীর স্বাদ পেয়েছে, তার কি এই এঁদো শহরের গলিতে মন টেকে?

দাদু আঞ্চলিক থিয়েটারে অভিনয় করতেন। বাজখাঁই গলা ছিল। সেই সূত্রেই রাজকমল মিত্রের সঙ্গে ওঁর একটা সখ্য ছিল। রাজকমল মিত্র প্রথম জীবনে দাদুদের অফিসে স্টেনোগ্রাফার ছিলেন। পরে সূযোগের সদ্ব্যবহার করে কলকাতায় গিয়ে দাপুটে অভিনেতা হয়ে ওঠেন। দাদুর চিঠি হাতে বাবা গিয়েছিলেন কমলবাবুর কাছে। উনি ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন - কাননবালার স্টুডিওতে ব্যাকগ্রাউণ্ড আঁকা বা সেট তৈরির কাজ। বাবা মনেপ্রাণে ওই কাজটাই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সংসারের ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের সময় এটা একরকম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। কাজে ওকে নামতেই হবে, তার জন্য আর্টকলেজ ছাড়তে হলেই কিছু করার নেই। সেই মানসিক প্রস্তুতিও তাঁর ছিল।

অচিরেই দাদুর শেষ দিনগুলো ঘনিয়ে আসায় বাবাকে পাতাতাড়ি গুটিয়ে এখানে চলে আসতে হল। অগত্যা সেই চিত্রকরের কালেকটরির কেরানি হয়ে ওঠা। ক'জনেই বা তেমন ভাগ্যবান হন যাঁর নেশা আর পেশা এক হয়েছে। চাকরিটাও সহজে হয়নি। মাস দুয়েক নির্লজ্জতার সীমা ছাড়িয়ে বড় সাহেবের কাছে হাঁটাহাঁটি চালিয়ে তবে চাকরি পাওয়া। তারও অনেক পরে নিয়োগপত্র হাতে আসা। এর ফলে অবশ্য বড় সাহেব কানু সান্যালের কাছে কৃতজ্ঞ থাকার অলিখিত দায় বয়ে বেড়াতে হয়েছিল বাকি জীবন। কানুবাবুর বাড়ি থেকে মাঝে মাঝেই ডাক আসত।

বড় সংসার, সেজোপিসির বিয়ের কথা চলছে। বড়পিসির স্বামীর অকালমৃত্যুতে তার একমাত্র সন্তান আশীষ মামা-বাড়িতে আশ্রিত, আমি সবে জন্মেছি। অফিস থেকে গিরে বাবা গোয়াড়ি বাজারের মজুতদারের ঘরে খাতা লিখতেন। বিভিন্ন লোকের ইংরেজি দরখাস্ত ড্রাফটিং করে দিয়ে দু'পয়সা কামাতেন। কিন্তু মন পড়ে থাকত অন্যত্র। সেরকম মোক্ষম সুযোগ চলে এলে চিলেকোঠার ভ্যাপসা গন্ধ ওঠা ঘরে হ্যাণ্ডমেড কাগজে একের পর এক স্কেচ করে যেতেন। বিষয় মূলত মানুষের শরীরের বিভিন্ন ভঙ্গি বা মুখের বিচিত্র অভিব্যক্তি - আনন্দ।, যন্ত্রনা, বিষাদ, বিরক্তি, ঔদাসীন্য, আর্তনাদ ইত্যাদি।

কাছেই কুমোরপাড়া। জলঙ্গী নদীর ধারে এই পালপাড়াটি কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের এক অপ্রধান ঘাঁটি। সারা বছর ঠাকুর গড়ার কাজ চলছে পুরোদমে। কোথাও না পাওয়া গেলে বাড়ির লোক জানত ঠিক লোকটা জীতেন পালের বাড়ি বসে আছে - মূর্তি তৈরিতে হাত লাগিয়েছে। প্রতিমায় রঙ চাপাচ্ছে বা প্রেক্ষাপটের সিনারি এঁকে দিচ্ছে। জীতেন পালকে নিত্যনতুন আইডিয়া যোগান দেওয়া, বাবা হয়ে উঠেছিল পালপাড়ার ঘরের লোক। ওদের মধ্যে লোকটাকে ভায়নক সাবলীল দেখাত। কিন্তু বাড়িতে লোকটা নেহাতই বেতালা!

ক্রমশ ওঁর অবসর কমে এসেছিল। আমি বড় হওয়ার পর ওঁকে সেভাবে ছবি আঁকতে দেখিনি। শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি তাই নিজেকে উনি কখনওই শিল্পী বলতেন না। কেউ বললে লজ্জায় ওঁর মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠত। যেন লুকোনোর মতো কোনও আড়াল খুঁজছেন ইজেল, তেলরঙ, দামি তুলি তো দূরের কথা, জলরঙও নিজের জন্য কেনার পক্ষপাতি ছিলেন না। সংসারের অবস্থার নিরিখে ওগুলোকে উনি বিলাসিতা ভাবতেন বা চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতা আর এর ওর প্র্যাকটিকাল খাতায় ছবি এঁকে দেওয়া, টিচার ট্রেনিং-এর খাতায় ফুল, ফল, নকসা, নৈসর্গিক দৃশ্য এঁকে দেওয়াতে ওঁর ভরপুর আগ্রহ ছিল - কারণ ওগুলোতে টাকা পাওয়া যায়।

এমনিতে টগবগে লোক। লম্বা, উল্টে আঁচড়ানো চুল, বলিষ্ট হাত-পা। জোরে জোরে কথা বলছে, মা'র সঙ্গে ঝগড়া করছে - পরক্ষণে রাগ ভাঙানোর চেষ্টায় মা'র পেছনে পেছনে ঘুরছে, আমাকে আর ভাইকে পড়াচ্ছে, দমাদ্দম পেটাচ্ছে, বেঞ্চি বাজিয়ে গান জুড়ছে - উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা। কিন্তু কোথাও একটা অভিমান, একটা আক্ষেপ প্রচ্ছন্ন। কাউকে বুঝতে দিতেন না একটা ঘন অপচয়ের বোধ। উনি যেন একটা মাটির কলসি, যার তলায় একটা চোরা ছিদ্র দিয়ে সমস্ত পারিবারিক তৃপ্তি চুঁইয়ে পড়ে যায়। গতরাতে যতই কানায় কানায় ভর্তি থাক, সকালে উঠে দেখলে তাতে জল থাকে না। ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন, ছটফট করতেন, বাড়ির মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসছে। ফুরসত পেলেই জলঙ্গীর বাঁধে গিয়ে বসে থাকতেন যেখানে বুড়ো বটের ঝুরিগুলো জলতল ছুঁয়েছে।

আমাকে সাইকেলে চাপিয়ে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া মানেই শুরু হত প্রলম্বিত স্মৃতিচারণ - কলকাতার মেসবাড়ির গল্প, আর্ট কলেজের সহপাঠী, অতিথি শিক্ষক, কলকাতার রাস্তাঘাট, সৌধ, অট্টালিকা। কথায় কথায় ওঁর দেখা বড় বড় মানুষের গল্প - লেডি রানু মুখোপাধ্যায়, জয়নাল আবেদিন, জর্জদা, কমল মজুমদার। আউটডোরে দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকার বর্ণনা। আমার মনে হত সব বানানো গল্প। এ ধরনের অতিপরিচিত, আটপৌরে পোশাক পরা, নিম্নবিত্ত মানুষের মুখে ওসব গল্প বড্ড বেমানান- প্রায় অলীক।

আমাদের বাড়ির বাইরের ঘরের বিবর্ণ দেওয়ালে একটা বাঁধানো ছবি ঝুলতো। বাবার আঁকা ছবি, ডাকের উপর সাদা রঙের কাজ। তলায় লেখা শববাহক, আমি ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম। কিছু মানুষ একটা মৃতদেহ কাঁধে করে শ্মশানঘাটের দিকে চলেছে অন্ধকার ঠেলে। অদ্ভুত গতি ছিল ফিগারগুলোর শরীরে। দুর্গম রাস্তা, নিশুতি রাত, অস্পষ্ট চাঁদ - আমার গা শিরশির করত। ছবিটা মা'র খুব অলক্ষুণে মনে হত। বাইরের ঘরে কোথায় ঠাকুর-দেবতার ছবি থাকবে, তা না মরা নিয়ে যাওয়ার ছবি। ছবিটা চিলেকোঠার ঘরে রাখাই ভাল। লোকে কী বলবে! শত রাগারাগি সত্ত্বেও বাবা ছবিটা ওখান থেকে সরাতে চাননি। আসলে ওটাই ওর শেষ অক্ষত ছবি। আর ওর পেছনে একটা ইতিহাসও আছে।

বাবা মাঝেমাঝেই অফিসের ডেস্কে বসে স্কেচ করতেন। সহকর্মীদের অনুরোধে ওদের পোট্রেট এঁকে দিতেন। এসডিও-র পিএ সাধন চট্টোপাধ্যায়ের প্রোফাইল নিখুঁত নামিয়ে দেওয়ার পরে আপ্লুত সাধনবাবু ছবিটা নিয়ে তামা অফিস চত্বরে প্রায় সব কর্মীদের দেখিয়ে বেরিয়েছিল। খবরটা এসডিও প্রমথরঞ্জন মজুমদারের কানে পৌঁছয়। প্রমথবাবু শিল্পরসিক মানুষ ছিলেন, ওঁর হস্তক্ষেপে বইমেলা উপলক্ষে স্থানীয় টাউনহলের মাঠে আর্ট এক্সিবিশনে বাবার 'শববাহক' ছবিটা জায়গা পায় সহরের নামকরা শিল্পীদের পাশে। ছবিটা মাউণ্ট বোর্ডের ফ্রেমে ওঁর নামসহ প্রদর্শিত হচ্ছে দেখার পর বাবা তো সঙ্কোচে এগজিবিশন মুখো হননি। ছবিটাকে নাকি এক ধনী ভদ্রলোক কিনতে চেয়েছিল - ভাল দাম দিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ বাবাকে পীড়াপীড়ি করেছিল - বাবা রাজি হয়নি। ছবিটা অনেক মানুষ দেখেছে এটার চেয়ে বেশি নাকি ওর কোনও প্রত্যাশা ছিল না।

সেদিন বাবা আমার ড্রয়িংখাতায় একটা হাটের ছবি এঁকে দিচ্ছিল। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। একটা ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। বিষয় ছিল হাট বসেছে শুক্রবারে। বাইরের ঘরে আসন পেতে আঁকছিলাম। বাবা এসে বললেন হচ্ছে না, পার্সপেক্টিভ ভুল হচ্ছে। তারপর নিজেই হাত লাগালেন, আমার সামনের ফিগারগুলোকে মুছে। উনি আঁকার মধ্যে বুঁদ হয়ে আছেন। আমার চোখ ঘুরপাক খাচ্ছে চারদিকে। আচমকা প্রশ্ন করলাম - আচ্ছা, দেওয়ালে টাঙানো ওই ছবিটা কি দাদুকে শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়ার ছবি? ড্রয়িংশীটে পেনসিল চালানোর মগ্নতার ভেতর থেকে বেশ নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বাবা কী যেন বললেন।
কী বললেন? শুনতে পেলাম না।
বাবা হাসলেন - বললেন, ওটা আমাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার ছবি।
- এসব আবার কি কথা, তোমার সব কিছুতেই আড্ডা। আমি রেগে উঠেছিলাম।
বাবা ম্লান গলায় বললেন - আসলে ওটা সেইসব মানুষদের মধ্যে একজনের শব নিয়ে যাওয়ার ছবি, যাদের এ-জন্মে কিছু করা হয়ে উঠল না।
- তুমি পরজন্মে বিশ্বাস করো!
- না, মানুষের একটাই জন্ম, একটাই মৃত্যু। কেউ কেউ পারে, বেঁচে থাকাটাকে ফলপ্রসূ করতে পারে। ওই লোকটা পারেনি। আসলে লোকটা জড়িয়ে পড়েছিল। লোকটা চোখ সরিয়ে নিতে পারেনি, পালাতে গিয়েও পিছনে তাকিয়ে ফেলেছিল, করুণ চোখগুলোর যে এত আঠা থাকে লোকটা তো প্রথমে জানত না।
আপন মনে বাবা বলে যাচ্ছিলেন। আমাকে বোঝাবার জন্য নিশ্চয়ই না - আমি তখন কী বুঝি? হয়তো নিজেকেই বলেছিলেন কথাগুলো। নিজেকেই বোঝার চেষ্টা করছিলেন হয়তো।
- সে তো গেল শবটার কথা। তাহলে ছবিটার নাম শববাহক কেন?
- এখানে লোকটা একই সঙ্গে শব, আবার শববাহকও। যে শব সে তো বেঁচেই গেল, মুশকিলটা হল শববাহকের।
- বুঝতে পারলাম না।
- আসলে মানুষকে তো যে কোনও একটা জীবনে বেছে নিতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপছন্দের হলেও তাকে অন্য আর এক জীবনযাপন করতে হয়, যেটা সে আদৌ চায়নি। কিন্তু যে-জীবনটা সে বাঁচতে চেয়েছিল সেটার বোঝা তো কাঁধ থেকে নামতে চায় না। ফলে বাকি জীবন সেই ভার বয়ে নিয়ে বেরানোই তার ভবিতব্য হয়ে ওঠে।

বাবা ছবিটাকে যতদূর সম্ভব যত্নে রাখতেন। ওটা ড্যাম্প ধরে পলেস্তারা খসা দেওয়ালে ঝোলানো থাকলেও, মাঝে মাঝেই ওটার সামনে-পেছনে ন্যাকড়া বোলাতেন। উনি যখন অসুস্থ তখন অবশ্য কড়ি বড়গাওয়ালা চুন-সুরকির ফাটা ছাদ চুঁইয়ে বৃষ্টির জলের রেখা ছবিটাকে প্রায় নষ্ট করে দিয়েছিল। ওটার দিকে আমাদের কারও নজর পড়েনি। শেষ দিনগুলোয় বাবাকে রাখা হয়েছিল ভেতরের ঘরে - তাই হয়ত ব্যাপারটা ওঁর নজর এড়িয়ে গিয়েছিল।

উনি মারা গেলে আষাঢ়ের এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে। ওঁর প্রস্টেট ক্যান্সার হয়েছিল। দীর্ঘ রোগাক্রান্ত যন্ত্রনার দিনগুলো শেষ হয়ে এল ওইদিন - সেটা এক চরম নিষ্কৃতিও বটে। ধূপ আর রজনীগন্ধার ঝাঁঝালো গন্ধে ভারী বাতাস। পাড়ার লোকজন ভিড় করে রয়েছে গলির দু'ধারে। সন্ধেবেলা মাচাটা কাঁধে তুললাম। হরিধ্বনি উঠল। ম্যাটাডোর দাঁড়িয়ে রয়েছে অদূরে। বাবার সেই লম্বা-চওড়া শরীরের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, দীর্ঘ রোগভোগে গুটিয়ে শুকিয়ে যাবতীয় স্বধর্ম হারিয়ে ফেলেছিল। শীর্ণ মৃতদেহের ওজন তো আরও অনেক হালকা হওয়ার কথা ছিল - কিন্তু এত ভারী লাগছে কেন? হঠাৎই ইঙ্গিতটা সুষুম্নাকাণ্ড বেয়ে ঊর্দ্ধমুখী স্রোতের মতো গুরুমস্তিষ্কে ঝিলিক লাগিয়ে দিয়ে গেল। মনে পড়ে গেল ছবিটার নামকরণ সম্পর্কে বাবার সেই ব্যাখ্যা বোঝাপড়াটা আরও পরিষ্কার হয়ে এল। ঠিকই তো! শুধু তো একটা প্রাণহীন দেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছি না। এই মুহূর্তে আমার কাঁধে একটা পূর্ণাবয়ব অচরিতার্থ ইচ্ছের শব। ভারী - তাই খুব ভারী। জানি আমার সহ-বাহকেরা এই ভারটা টের পাচ্ছে না - আমার ভাইও না। ভয় গলা শুকিয়ে এল। সঙ্গে ভয়ানক এক অসহায়তা। এমনটা না হলেই বোধহয় ভাল হত - কিন্তু হয়েছে।

বাবা আমাকে তার উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন। সেই সব গোপন ইচ্ছের উত্তরাধিকার। ইচ্ছে বড় খারাপ জিনিস। সে মানুষের সর্বস্ব দাবি করে। এখনও যদি না পারি - যথেষ্ট নির্মম হতে না পারি। রাস্তা বেছে নিতে ভুল হয়, তাহলে এই ভার কাঁধ থেকে নামবে না। আমি নিশ্চিৎ মাচাটাকে সামনে মাঠটায় রাখা ম্যাটাডোরটায় তুলে দিয়ে আসার পরেও ভারটা থেকেই যাবে।

আপনার মতামত জানান