শেষকৃত্য

মালিনী ভট্টাচার্য


ট্রেন টা যখন ষ্টেশনে এসে থামল তখন সন্ধ্যে নামছে। জন মানুষ নেই। টিম টিম করে একটা হলদে বাল্ব জ্বলছে। কিংশুক নামতে না নামতেই লোহার ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দের সঙ্গে ট্রেন ছেড়ে দিল। সামনের ষ্টেশন আসানসোল। সেখান থেকে শারদীয়া উৎসবের রেশ এই জনহীন প্রান্তরে পৌঁছয় না। এই জায়গার নাম কালিপাহাড়ী। কালি না কালী? কাছাকাছি একটা শক্তিপীঠ আছে বটে, তবে চতুর্দিকের কয়লাখনি থেকে তোলা মাটির কালো পাহাড়গুলোই আরও প্রত্যক্ষ ভাবে জায়গাটার পরিচয় দেয়।পাহাড়গুলো রক্ষী, পাহাড়গুলো জীবন্ত – ঘেঁটু ও অন্যান্য গাছের থেকে নির্গত বুনো গন্ধ তাদের নিঃশ্বাস হয়ে ঝাপটা মারে কিংশুককে। যেন গম্ভীর গলায় কৈফিয়ত চায়- “ এতদিন পরে এখানে কেন? কি চাই?” প্রহরী পরিবৃত, অশৌচের শ্বেত বেশধারী আগন্তুক বড় একা বোধ করে।

ষ্টেশনের বাইরে এসে দাঁড়ায় কিংশুক। কোনও যানবাহন নেই, থাকার কথাও না।সভ্যতা যতবার তার নিদর্শন রাখতে ছেয়েছে এই জমির ওপর ততবারই আচমকা ধস তার গর্ব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ষ্টেশন সংলগ্ন কোনও বসতি নেই।এখান থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে গেলে নিমচা কোলিয়ারী। মাঝখানের পথটুকু অন্ধকারে ঢাকা। নাহ! পুরো অন্ধকার নয়। নবমীর চাঁদের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছে মাটির উপর। ক্যানভাসের ব্যাগটা নিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করে কিংশুক। শৈশবের স্মৃতি ঝালিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা করছে মাঠচেরা সিঁথির মত পথ। খানাখন্দ সাবধানে এড়িয়ে যায়। কেউ কি পিছু নিল? নাহ, লম্বা ঘন ছায়া ছাড়া কেই বা সঙ্গ দেবে?! না, ভুল! ওই তো! বড় বড় পাথরের চাঁই ভেঙ্গে দৌড়চ্ছে নুনিয়া। ছোট মেয়ে নয়, ছোট নদী। মাটিতে ফাটল ধরেছে, সরীসৃপের মত ছোবল মারবে যে কোনও সময়। তবে সে বিষ সম্পর্কে ফাটল ধরানো অবিশ্বাসের সরীসৃপের তুলনায় নগণ্য। হয়তো নদীটা পার হলে জ্বালা জুড়োবে।

কালো করাল দুর্গের মত দাঁড়িয়ে চিমনী, কনভেয়র বেল্ট। ওরা এখন নীরব তবু স্পর্ধিত মাথার ছায়া আকাশ ছুঁয়েছে। ছাইমাখা কয়লা মাটির স্তূপে গজিয়ে ওঠা কিছু আগাছা ছাড়া কোথাও কোনও প্রাণের চিহ্ন নেই। বাজপড়া একটা অর্জুন গাছের সাদা কঙ্কাল শুধু নির্মম আক্রোশে মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু এগোলেই কৃষ্ণগহ্বর। আলোর কণার মত যে প্রাণগুলি ওর ভেতর নেমেছিল তাদের অক্লেশে, চিরতরে গ্রাস করে সে অগ্নি উদগার করেছে। এখন নিশ্চিন্ত নিদ্রায় মগ্ন। সে জানে তাকে বিব্রত করার ধৃষ্টতা কেউ আর কোনদিন করবেনা। খনিমুখ ছাড়িয়ে এগিয়ে চললো কিংশুক। সামনের রাস্তাটা দু’ভাগে বিভক্ত। ডানদিকে গেলে অফিসারদের বাসস্থান । ওখানেই একটা পলাশ গাছ ঘেরা বাংলোয় কিংশুকের শৈশব কেটেছে। পলাশের নামেই বাবা তার নাম রেখেছিল, গাছের ছায়ার মতই বাবা তাকে ঢেকে রেখেছিল। মায়ের আভাব বুঝতে দেয়নি। কিংশুকের মা কে মনে পড়েনা। তার একজন আয়া ছিল যে বাবা অফিস গেলে তাকে দেখাশোনা করতো। তার স্মৃতিও খুব আবছা। শুধু কাঁচের চুড়ি পরা হাত মনে আছে। বাগানে ঝোলানো দোলনায় দোল দিত আর রান্না করতো। ভারী সুন্দর সেই হাতদুটো। আর বাবা ফিরে আসলে কিংশুক গোটা পৃথিবীকে ভুলে যেত। বাবার সঙ্গে বেড়ানো,বাবার সঙ্গে খেলা। বুক মুচড়ে চোখ দিয়ে জল নেমে আসে। কতদূরে চলে গেছ বাবা!একটা এতবড় মিথ্যের উত্তরাধিকার রেখে! কোঁচার কর্কশ খুঁটে আবেগ মুছে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে কিংশুক।

ছোট একটা দোকানে কুপি জ্বলছে। দশদিন আগে ঘটা খনি দুর্ঘটনার পর এলাকা শ্মশানপুরীর চেহারা নিয়েছে।শীত তার অচ্ছাভ চাদর ঢেকে থাবা পাতছে নিঃশব্দে; উত্তরীয়টা ভালো করে জড়িয়ে নিলো কিংশুক। বিজলীবাতি জ্বলছেনা। অবশ্য কবেই বা বিজলী বাতি মজদুর লাইনের অন্ধকার দূর করতে পেরেছিল? ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া কতৃপক্ষ আর জনগনমনের অধিনায়কেরা ক্রমাগত বাগযুদ্ধ ও প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা করে ক্লান্ত। মৃত্যুর থেকে সাময়িকভাবে নিষ্কৃতি পাওয়া অবশিষ্ট পুরুষেরা একটা কাঠকয়লার আগুন ঘিরে বসেছে; কথা বলছে মৃদুস্বরে। তাদের বিকল্প ব্যবস্থা কি হবে সে সম্পর্কে তারা অনিশ্চিত। কেউ বাবার চাকরি পাবে,কেউ ভাইয়ের। শোকে মুহ্যমান হওয়ার সময় নেই। বৃহৎ পরিবারগুলির ক্ষুধার্ত মুখে তুলে দিতে হবে খাবার। শুধু কিছু অর্ধ-উলঙ্গ,অনাহারী, অবোধ শিশু তাদের ঘিরে আপনমনে খেলে চলেছে। ওরা জানেনা ওদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিংশুকের দিকে কিছু কৌতুহলী দৃষ্টি ভেসে এল। ক্লান্ত, অবশ পা টেনে মুদির দোকানে গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, “বুধয়া মারানের বাড়ীটা কোনদিকে?” অবিন্যস্ত চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, অশৌচের বেশ সত্ত্বেও তাকে অভিজাত বংশোদ্ভব বলে চিনতে ভুল হয়না। “এই লাইনের একেবারে শেষেরটা স্যার। খুব স্যাড কেস বুঝলেন। জোয়ান ছেলেটা- ওই যোগীশ্বর- “ হাত তুলে তাকে নিরস্ত করে কিংশুক বলল- “জানি।“

রাস্তা অপ্রশস্ত, নোংরায় ভরা- আনাজের খোসা, খোলা নর্দমা, পশুর বিষ্ঠা। তবু এগোতে এগোতে কিংশুক পিছতে থাকে। স্কুল থেকে ফিরে যোগিয়ার সঙ্গে কত খেলা- বৃষ্টির জলে নৌকা ভাসানো, গুলতি ছোঁড়া, ঘুড়ি ওড়ান- শুধু খাদানের দিকে খেলতে গেলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আস্ত বুধয়া। যোগিয়া কে বলতো , “ ছোটা সাহিব কে হিখানে লিয়ে ইসেছিস?” একটা চাপা কান্নার আওয়াজে চমকে উঠল সে। স্বজনহারার হাহাকার কেউ ভিজে আঁচলে চাপা দিচ্ছে। একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিংশুক। হিসেবমত এটাই বুধয়ার বাড়ী। ইতস্তত করে কড়া নাড়্ল সে। ত্রস্তপায়ে ক্রন্দনরতা অন্তরালে চলে যায়। ভাঙা পুরুষ কণ্ঠ প্রশ্ন করে, “কঔন?” কি বলবে ভেবে পায়না কিংশুক। স্থবির পা এসে ছিটকিনি খোলে। কাঁপা হাতে লণ্ঠন ধরে থাকা এক অশীতিপর বৃদ্ধ অবাক চোখে তাকে দেখে-“ আপনি কে বটেন?”
“আমি কিংশুক রায়। রায়সাহেবের ছেলে। আমরা চার নম্বর বাংলোয় থাকতাম।“
“ছোটা সাহিব!”
মুহূর্তের জন্য আলো হয়ে ওঠে ছানি পড়া দুটো চোখ। পরক্ষণেই কিংশুকের বেশ লক্ষ্য করে ডুকরে কেঁদে ওঠে, “ই কি হল ছোটা সাহিব?!
শান্ত গলায় কিংশুক বলে, “ভেতরে চল বুধয়া। কথা আছে।“

সদ্যবিধবা বধূটি একটা জলচৌকি পেতে দিয়ে গেছে । পাশে রেখে গেছে এক ঘটি জল আর রেকাবিতে এক টুকরো গুড়। সে এখন শাড়ীর দোলনায় শোয়া নবজাতকের পরিচর্যায় ব্যস্ত। লন্ঠনের ম্লান আলোয় নোনাধরা দেওয়াল থেকে এক যুবকের ছবি তার দিকে চেয়ে আছে। চোখটা সরিয়ে নিল কিংশুক। উলটো দিকের দেওয়ালে সেপিয়ার মলিনতা নস্যাৎ করা এক রূপসী নারী। তার দুহাত আলিঙ্গন করে আছে শিশু পুত্র কে।হাত দুটো কিংশুকের অত্যন্ত পরিচিত। যোগিয়ার মা, তার মাতৃসমা। আজ প্রথম সে তার অসামান্য সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারল- চোখ ফেরানো যায়না। এত দিন সে সত্যিই অন্ধ ছিল। বুধয়া বিলাপ করেই চলেছে- একবার মহৎ হৃদয় পূর্বতন মালিকের জন্য, একবার অকালমৃত পুত্রের জন্য। একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে কিংশুকের। যোগিয়ার স্ত্রী কে ডেকে বলে, “এই শোনো।“ অবগুণ্ঠণবতী নিঃশব্দে চৌকাঠে দাঁড়ায়, উত্তর দেয় না।
“লেখাপড়া জানো তুমি?”
“উ আট কেলাস তক পড়িছে,” বুধয়া উত্তর দিলো।
ব্যাগটা হাতে তুলে দেয় যোগিয়ার স্ত্রীর।
“এতে যা আছে তোমাদের কাজে লাগবে।“
পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল থাকে সে।
“ইতে কি আছেক বাবু?”
অন্ধকার উঠোন পেরোনো, রাস্তায় পা দেওয়া কিংশুক উত্তর দেয়, “যোগিয়ার ভাগ।“

কতক্ষন ধরে উদ্ভ্রান্তের মত ছুটছে কিংশুক জানেনা। ভারসাম্য রাখতে একটা পাথরের চাঁইয়ের ওপর ভর দেয়। দম যেন আটকে আসছে। কই! ব্যাগটা নামিয়ে নির্ভার লাগলো না তো। কত ক্রোশ পেছনে পড়ে সেই ফ্যালফ্যালে চোখের বৃদ্ধ আর অনুভুতি হারানো যুবতী? ওর নাগাল পাবেনা তো?! চটিগুলো ছুটতে গিয়ে কোথায় পড়ে গেছে- খালি পায়ে কাঁকর আর কাঁটার জ্বালা। নুনছালও উঠেছে বোধহয়। তার অবস্থা দেখে বিদ্রূপে কুলকুল করে হাসছে নুনিয়া। তবু তার কাছেই স্বান্ত্বনা খুঁজলো কিংশুক। কাদা ভেঙে জলে নেমে এক আঁজলা জল মুখে ঝাপটা দিলো। আহ! তবে এখনও তার কাজ শেষ হয়নি। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে সে সদ্যমৃতদের তর্পণ করল সে। কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে কোঁচার খুঁট খুলে মুক্তি দিলো দু’ টুকরো কাগজকে। অপ্রতিহত ভাবে ভেসে গেল রায়সাহেবের ইচ্ছাপত্র আর প্রবাসী ছেলেকে লেখা শেষ চিঠি। দুটো সাদা নৌকো রওনা দিলো বৈতরণী পার হওয়া পিতা-পুত্রের উদ্দেশ্যে।

আপনার মতামত জানান