দেয়ালবন্ধু

সাইফুল্লাহ সাইফ


দীর্ঘদিন দেখা নেই তার । বছর কয়েক আগে শেষবার যখন দেখা হয়েছিল তাকে বেশ অন্যরকম লাগছিল । তার সমস্ত চেহারাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া পরিতৃপ্তময় হাসির দ্যুতি এখনো চোখে লেগে আছে । তার বর্তমান অনুপস্থিতি নিত্য শূন্যতাবোধের যন্ত্রণা দেয় আমাকে । বন্ধুকে ভাবতে ভাবতে তাকে নিয়ে হাইপোথিসিসে নেমে আসি ।
প্রথম হাইপোথিসিস বলে, ‘বন্ধু! তুমি মরে গেছো । পরম নিকষ কালোয় আছো তুমি ।’
বন্ধুর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিমূর্ত চালকের কাছে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে প্রার্থনা করি । কোনো একদিন নিজের সামর্থ্য অনুয়ায়ি বন্ধুর জন্য একটি ছোটখাটো দোয়া মোনাজাতের আয়োজন করার প্ল্যান করি । আচ্ছা, তার মৃত্যুর পর কি কূলখানি হয়েছিল?
শেষমেশ তার উদ্দেশ্যে গায়েবী তরঙ্গে একটি বাক্য ছুড়ে দেই- ‘বন্ধু! আমার প্রাণের বন্ধু! যেখানে, যেভাবে আছো- ভালো থেকো সবসময় ।’

এবার দ্বিতীয় হাইপোথিসিস থেকে- ‘বন্ধু তুমি বেঁচে আছো । আমি যে বায়ু-পানি-মাটির স্পর্শে আকাশের তলে, তুমিও একই বায়ু-পানি-মাটি ও আকাশের তলে বেঁচে আছো । অর্থাৎ তুমি ও আমি এখনো প্রতিবেশী । শূন্য থেকে এক বুক বায়ু ফুসফুসে নিতে নিতে বায়ুতে তোমার গন্ধ অনুভব করি । শরীর-প্রকোষ্ঠের আনাচে-কানাচে ঘুড়িয়ে বায়ুগুলোকে সংঘবদ্ধ করে একটি ইথার বার্তাসহ ফিরিয়ে দেই- ‘বন্ধু! যেখানে, যেভাবে আছো- ফিরে এসো ।’
দিনের আলোগুলোকে প্রিজমের মতো ভাগ করে একেকটি রেখায় বন্ধুর অবয়ব বানাই । অপেক্ষা করি ঘড়ির কাঁটার উপর তার একটি অদৃশ্যমান মূর্তি বসিয়ে ।’

অনেকদিন চলে যায়- প্রথম বন্ধুর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একজন দ্বিতীয় বন্ধুর দেখা পেয়ে যাই । কমিটমেন্টহীন আমরা দুজন প্রতিদিনের প্রতিক্ষণের বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই ।
আমার ঘর- তারঘর,
একই ছাদ,
একই নিঃশ্বাস ।
নতুন বন্ধুকে বলি, ‘কেমন আছো বন্ধু?’
বন্ধু কথা বলতে জানে না । ইশারায় জবাব দেয়- ‘ভালো আছি!’
‘ভালো নেই!’
কথোপকথনের নিয়মে বন্ধু জিজ্ঞেস করে, ‘আর তুমি?’
আমি বলি, ‘ভালো নেই!’
‘ভালো আছি!’

একদিন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বুঝি, বন্ধু সত্যি সত্যি ভালো নেই । প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে । সাদা দেয়ালে চোখের সামনে বন্ধুর পুচ্ছ স্খলন হতে দেখি । দেখি, শরীর থেকে একটি অবিচ্ছেদ্য জৈবিক অংশ মাটিতে পড়ে গিয়েও মূলহীন কিছুকাল বেঁচে থাকা ।
বন্ধুর কষ্টে কি যেন এক খুনের নেশা চাপে আমার । ইচ্ছে করে হাতুড়ি দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে এক মুহূর্তে তাকে দেয়ালের সাথে পিষে ফেলি । তাকে যন্ত্রণামুক্ত করার দায়িত্ব নিতে ইচ্ছে হয় খুব ।

একসময় বন্ধুটি স্বাভাবিক হয়ে যায় । তাজা ফুলের মতো নতুন করে জেগে উঠে সে । স্বচ্ছ জলের মতো চকচকে দেখায় তাকে ।
আমার অবস্থা তখন ঠিক কিছুকাল আগের এক মহাবিপর্যস্ত প্রাণপ্রিয় টিকটিকি বন্ধুটির মতোই ।
তখন তার কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে, ‘বন্ধু! আমাকে খুন করতে ইচ্ছে হয় না তোমার?’

আপনার মতামত জানান