রক্তাক্ত বর্ষা

শাম্মী তুলতুল



বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মেয়েটি আমার কাছে দৌড়ে এসেছিল; অনেকক্ষণ জড়িয়েও ধরেছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটিকে ওরা আমার বুক থেকে ধরে নিয়ে গেল!
আমি একটা কাপুরুষের চোখে মেয়েটি চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখলাম। ঠিক দেখা না, অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু ওর কথাগুলোই কানে বাজতেছিল, একটু রক্ষা করো। দয়া করো আমার ওপর। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
আকাশে বিদ্যুৎ হুংকার দিয়ে জানান দিচ্ছে। সব কিছু তছনছ হবে। কিছুতো একটা ঘটবেই। অধোরে বৃষ্টি কেউ কারো চেহেরা দেখার নয়। কিন্তু ঝোপের আড়াল থেকে কারা এতো কথা বলছে? সামনে গিয়ে দেখি ফোন আলাপ, আধমরা কইরা রাখছি, যদি অনুমতি দেন পুরোটাই
না না পুরা মারার দরকার নাই। --------- তবে খোঁচায়, খোচায় মারবা যতক্ষন না ভালোমানুষীর র“প মাথা থেইক্ক্যা না পালায়। কিন্তু দস্তগীর সাব মনে রাইখেন, নীতিবান আফসার চৌধুরীর নীতিবান কন্যা । অত সহজে হার মানার না।
ফোনে এত কথা বলা ঠিক ওইবোনা পরিস্তিতি বুইঝ্যা সব টেকেল দাও।
ঠিক আছে দস্তগীর সাব, ফোন রাখি তইলে, সালাম।
মানে কি?মেয়েটা কি রানী ছিল?
কাহিনী অচিন্তপুর গ্রামের। পুরো গ্রামটিতেই শয়তানের আড্ডাখানা, হাতে গোনা, কয়েক জন ফেরেস্তা বাস করলেও, পরতে পরতে চলে শয়তানের কর্তৃত্ব। রাজা না হয়েও তারা রাজা। তাও আবার নিজের অংশের নয়, গ্রামের নিরীহ লোকদের অর্থকষ্টে গড়ে তোলা সেই সব অংশের মালিক। প্রতি ঘরে মেয়ে বড় হলেই যেন পাপ নামে। অবশ্য অভাবে পড়ে অনেকে গায়ের কাপড় ফেলে দিয়ে ব্লাউজ, পেটিকোট পড়তে অভ্য¯’ হয়ে যায়।এটা দোষের কিছু না।অভাব যখন দরজায় কড়া নাড়ে তখন বাবা মাও সন্তান ফেলে দোড়ায়। বিশেষ করে মেয়েরা শরম নামক এই শব্দটার সাথে অপরিচিত হয়ে যায়। গ্রামের বড় হর্তাকর্তা দস্তগীর মাতব্বর।যে হাতে সব সময় তজবী থাকলেও তজবির আড়ালে যেনো মেয়ে মানুষের নামই জপে বেশী । দিন রাত মনের মধ্যে চলে মেয়ে মানুষের জপ। নারী আর টাকার গন্ধ পেলেই তার মন খুশীতে উরু –উরু–। স্বার্থের বেলায় সব রাজী।পুরা গ্রামটাই তার হাতে অর্থাৎ তার হাতে রাখার চেষ্টা কিন্তু ওই মিয়া বোঝেনা সবাই তার হাতের ময়লা না। গ্রামে নতুন কারো আগমন ঘটুক না কেন, তার কাছে হাজিরা দেওয়া ছাড়া পুরো গ্রাম অশুদ্ধ হওয়ার মতো। আমার তো আবার নাক উচুঁ। এই তত্ত্বে আমি রাজী না। কারো বাপের খাইও না, পড়িও না।
মাষ্টার সাহেব, গ্রামের নিয়ম নীতি জাইন্যা পড়াইতে আইসেন,
কেন আমি সব কিছু শিখে পড়েই তো এখানে পড়াতে এসেছি, সরকারী চাকুরী, সরকারের খাই, পড়ি, তার চেয়ে বেশি কিছু না।
পথ দেইখ্যা চইলেন। নইলে পায়ে কাটা এমন ভাবে বিধবো বাহির করতে পারবেন না। বাকীটা আমার লোক বুঝাইয়া দিবো আপনেরে।
আমি সব কিছু বুঝেও না বোঝার ভান করি। দেখি কার কত দম আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় বড়ই বিষাক্ত একটা গ্রাম। সব জায়গায় বিষে ভরা, সহজ সরল দরিদ্র এই জনগোষ্টী অনেকটা আতংকেই দিন যাপন করে এই গ্রামে। তবে র“নী আতংকে থাকার মানুষ না, এত সাহস কোথায় পায় মেয়েটা?
সাহসের কথা বলছেন? ছোট বেলা থেকেই গ্রামের বর্বরতা, বেহায়াপনা, দুঃখ, দুদর্শা দেখে বড় হয়েছি। তাই কোনকিছুতেই ভয় পায় না। এমনকি মৃত্যুও গায়ে মাখিনা। বীরের মতো মরতে চায়।
বাপরে আপনার সাহস দেখে আমি পিছু হাটি।
কি দেখলেন সাহসের এখোনো, মাত্রইতো এলেন।
তার মানে?
যেদিন দেবীর রুপ নিবো সেদিনই বুঝবেন সাহস কারো কয়।
রানী দেখতে ছোটখাটো, তবে মানানসই আমার বুক বরাবর হবে। মিষ্টি তার চেহেরা। চিনি না হলেও চলবে, টোল পড়া গালে যখন সে হাসে লুটিয়ে পড়তে মন চায়, পড়নে সবসময় থাকে তাঁতের শাড়ী। একদম পরিপাটি, ভাজভাজ। কথা বলার ধরণ সোজা সাপটা। কোন ব্যক্তি তার প্রেমে পরবে না বলুনতো? গ্রামেই জন্ম কিন্তু‘ দেখলে মনে হবে না সে গ্রাম্য মেয়ে, অবশ্য পড়ালেখা শহরেই। বাবা হেডমাস্টার আফসার সাহেব এমন অন্ধকার জায়গা থেকে সড়িয়ে সমাজে মেয়ে নামক চিন্তাকে শহরে পড়ালেখা করিয়ে গ্রামে আবার ফিরিয়ে এনেছেন। স্যালুট জানায় আফসার সাহেবকে। রানীর সাথে আমার পরিচয় স্কুলে চাকরীর সুবাধে। প্রথম প্রথম রানী বুঝতেই দেইনি ও হেডস্যারের এর মেয়ে ছিল। সবসময় চুপচাপ খাকতো । মানুষতো আছেই। ভালবাসা উজাড় করে দেয় পশুপখীর জন্যেও। স্কুলের মাঠে কুকুর, বিড়াল, গর“, ছাগল যায় থাকুক না কেন সবার সাথে কথা বলে, ওরাও যেন ওর কথা বুঝে মাথা নাড়ে। আমি অবাক হয়ে মনে মনে পাগল বলতাম। কিন্তু নাহ প্রখর এক ক্ষমতা আছে ওর মধ্যে। বুঝিনা এত ক্ষমতা আসে কোথেকে ওর এই নীরব,নরম পরিপাটী শরীরটাতে।এখনতো রীতিমতো রানীকে না দেখলে আমার ঘুম হারাম। কিš‘ তার চোখের দিকে তাকালেই আমি ভীতু হয়ে যায়। ভালবাসি শব্দটা গলাই আটকে যায়। মুখ দিয়ে বের হয় না। প্রস্তুতি নিয়ে ও ভালবাসি বলার সময়টাও আর পেলাম না। অবশ্য রানীর ভালোর জন্য। দস্তগীর মাতব্বর এর নিলর্জ্জ চোখের উপর এতই সোজা রানীর উপর অন্য কারো চোখ পড়া। অবশ্য রানী তা হতে দেওয়ার না। তাইতো সন্দেহ করে আমাকে ডেকে শাসিয়ে দিলেন। আমিও তর্কজুড়ে দিলাম। এমন ভাবে চোখ রাঙ্গায় যেনো চোখ রাঙ্গানোর স্পেসাল ট্রেনিংপ্রাপ্ত । রানীর একদিন দেখা করতে এলো হঠাৎ বৃষ্টি ভেজা রাতে। আমার বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।আমি তখন গভীর ভাবনায় বুকে বালিশ চেপে ধরে নিজের সাথে নিজেই কথা বলছিলাম।ও হ্যাঁ প্রসঙ্গ অবশ্য রানী ছিল তাই আমি অনেকটা চমকে গেলাম।খুব সুন্দর একটা তাতের শাড়ী পড়া।সামনের চুলগুলো ফুলানো, বৃষ্টির পানিতে ফুলা চুলগুলো লেপ্টে গেছে। আর পিছনের বেনীটা একদম কোমর পর্যন্ত। কিš‘ এতরাতে কি এমন প্রয়োজন ভিজে ভিজে আসতে হলো আমার কাছে?আমি তার দুইকাধে হাত দিয়ে বললাম কি ব্যাপার রানী এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে?
আপনাকে এখনি চলে যেতে হবে। ওরা বাবাকে রক্ষা দেয়নি, আপনারও রক্ষা হবে না ।
আমাকে বাঁচাতে এসেছো বুঝলাম। তোমার কি হবে একবার ভেবেছো?
ভাবাভাবির কিছু নেই,
আমাকে নিয়ে চিন্তারও কিছু নেই বেঁচে থাকলে দেখা হবে। জানেন তো আমি সাহসের বীজ বুনেছি শরীরে ও মনে ।
আমার দু’হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল রানী। সেই আমি হাতে চুড়ি পড়ে পালিয়ে এলাম।কিন্তু নাহ আজ রানীকে যে বাঁচাতেই হবে। বৃষ্টিতো কোনভাবেই থামার না। হাটছিতো হাটছি, কোথায় সে? বুকটা ধড়পড় করে উঠলো ।এতো টাণ্ডা শীতল হাওয়াতেও শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে আমার । আমাকে বাঁচিয়ে রানী মরতে পারেনা। কোনোদিক না তাকিয়ে ছুটছি আর ছুটছি। হটাত আমার পা কে যেনো ধরে ফেললো। অন্ধকার চারপাশ। বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় একমাত্র ভরসা। রানীর হাতের পরশ আমি ছাড়া আর কে বুঝবে। আমি গ্রামটাকে বাঁচাতে পারলাম না। আমি পারলাম না সাহসের সাথে আমার শরীর অক্ষত রাখতে। আমি পারলাম না দস্তগীর মাতব্বরের মুখোস খুলতে। কিন্তু যতটুকু করতে পেরেছি তার থেকে নতুন করে শুর“টা আপনি করবেন।
আর বলার সুযোগ হলো না রানীর।দেহ নিঃশ্বাস ছেড়ে দিল আমার কোলে। তার শরীরে বেয়ে যাওয়া রক্ত ধূয়ে মুছে এক হয়ে গেল বৃষ্টির পানিতে।আর সেই পানি দিয়ে আমিও সাহসের জল পান করলাম!

আপনার মতামত জানান