বাইশে শ্রাবণ

অবিন সেন

অঙ্কণ- জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

হাওয়াতে বড় অসহায় বোধ করছে করবী। যদিও হওয়ার তীব্রতা তেমন কিছু নয়। জানালার পাল্লায় যে ঠকঠক শব্দ উঠছে তা তেমন স্পষ্টও না। মৃদু। তবু যেন গভীর বলে মনে হয় তার। ঘুমের ভিতর বার বার জেগে উঠছে করবী। কেঁপে উঠছে। ঘুমের ভিতরেও একটা জেগে থাকার আবেশ ছড়িয়ে যাচ্ছে করবীর ভিতর। একটা জেগে ওঠার বেদনা। একটা শব্দ। অনবরত সেই শব্দটা তার পিছু নিয়ে চলেছে।
করবী জেগে ওঠে। জেগে ওঠার একটা ক্লান্তি যেন তাকে পেয়ে বসে। বিছানা থেকে সে উঠে পড়ে। বাইরে তখন ঝাপসা অন্ধকার। ভোর হতে ঢের বাকি। অথবা ততটা বাকি নয় যতটা মনে করছে করবী। করবী দেখল। পর্দার ফাঁক দিয়ে যতটা বাইরে দেখা যায় ততটা যেন থমকে আছে। আর হাওয়া। হাওয়ায় আধো অন্ধকার পাতাগুলি দুলছে। আধো অন্ধকারের গায়ে হাওয়া লেগে আছে। তারা দুলছে পর্দায়।
নিখিল ঘুমিয়ে আছে ? করবী ঠিক বুঝতে পারছে না। তবু, কিছুটা দোটানার ভিতরেও সে নিশ্চিত হয়ে নিতে চাচ্ছে। তথা, এক মুহূর্ত সে নিখিলের দিকে তাকিয়ে নিচ্ছে।
নিখিল কিন্তু সে সব কিছু বুঝতে পারছে না।
করবী জানালা থেকে আধো পর্দা সরিয়ে দ্যায়। জানালার সামনেটা আধো অন্ধকারে থই হয়ে আছে। আর শিউলি গাছ। অগণিত শিউলি-ফুল আধো-অন্ধকারেও তারা শাদা। করবী ভেবে নিচ্ছে একটু হাওয়া দিলেই তারা যেন ঝর ঝর করে ঝরে যাবে।
গতকাল বড়মেয়ে মধুরা ফোন করেছিল। চেন্নাই থেকে। তারা এবার পুজোয় আসতে পারছে না। বলছিল।
করবীর তাতে এতোটুকুও মনখারাপ লাগছিল না। সে যেন আগে থেকেই এমনটা বুঝতে পারছিল। কিংবা বুঝতে পারার একটা আবেগ তার মনের ভিতর খেলা করছিল। একটা বোধ। এমনটা হয় তার চিরকাল। করবীর। একটা শব্দ তার মনের ভিতর ঘড়ির মতো ঢঙ করে বেজে ওঠে, তথা তার ভিতরে একটা ভুতে পাওয়ার মতো উপনিবেশ, একটা চলচ্চিত্র ক্রমাগত দুলতে তাকে, আর দুলতে দুলতে তাকে একটা আবেগ দেয়, যেন তারা ভবিষ্যতের দিককার খড় মাটি, সে, যা ঘটবে তা আগে থেকেই বুঝে নিতে পারছে। এমনটা যে হয় সেটা সে নিখিল কে বলেছে একদিন। নিখিল তা বিশ্বাস করতে চায়নি।
ধ্যাত, এমটা আবার হয় নাকি!!
তারপর সে হেসেছে।
মস্তি, মস্করা করেছে, করবীকে নিয়ে।
তারপর করবীও তা নিয়ে ভাবতে বসেছে। সত্যি, এমনটা আবার হয় নাকি। তারপরেই ঢঙ করে একটা শব্দ করবীর মনের ভিতর বেজে ওঠে।
জানালার সামনে থেকে কি একটা ফুলের গন্ধ আসছিল। গন্ধটা মৃদু। কিন্তু সেটা তার ভোরবেলাকে বেশ আরাম দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বহুকাল আগের একটা পুরানো চিঠি সে ফের পড়তে বসেছে। চিঠিটা। তার মনে পড়ছে কলিং বেলের শব্দের মতো চিঠিটা এই মাত্র তার মনে এলো। সেই ভাঁজ করা চিঠিটা এখন খুলতে বসেছে করবী।মনে মনে। সুবীর একবার তাকে এমন একটা চিঠি লিখেছিল। বিয়ের আগে। করবী তখন কলেজ ইউনিয়ন করত। সেদিন কলেজ স্কয়ারে ছাত্র সমাবেশের উপর পুলিশ খুব লাঠি চার্জ করেছে। সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে দৌড়চ্ছে। যে যেদিকে পারছে। সেদিকে। করবীর জীবনে এমন ঘটনা প্রথম । সে খুব ভয় পেয়েছিল। আকাশ মেঘলা। দু ফোঁটা চার ফোঁটা ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। করবী সম্বিত হারিয়ে ফেলেছিল। যখন হুস ফিরে এলো তখন সে দেখল, সুবীর তার হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে দৌড়চ্ছে। বেশ কিছুটা দৌড়ে তারা একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়েছে। করবী খুব হাঁপাচ্ছিল। সুবীরও। ইলশে গুড়ি বৃষ্টিতে তারা কাক ভেজা। গাছের নীচে দাঁড়িয়ে খুব আরাম পাচ্ছিল করবী।
এর পর বহুবার এমন দৌড়েছে করবী। এবং ক্লান্ত হয়েছে। সুবীরের সঙ্গে তার আর খুব একটা যোগাযোগ ঘটেনি। সুবীর তখন পুরো দমে সক্রিয় রাজনীতিতে নেমে পড়েছে। তাদের মাঝে মেঝে হঠাৎ দেখা হয়ে যেত। এমনি একবার দেখা হবার পরে সুবীর বলেছিল—‘চলো করবী আজ তোমার সঙ্গে অনেকটা হাঁটি’।
---কোথায়?
---রাস্তায় !
দ্বিধা বিভক্ত করবী অবাক।
--রাস্তায় ?
--হ্যাঁ ।
সুবীর ঘাড় নেড়ে কথাটা বলেই থেমে যায়। সে করবীর হাত ধরে। প্রথমবার।
করবী যেন সুবীরের শরীরের একটা গতি জাড্য টের পাচ্ছিল । সুবীরের কঠিন হাতের ভিতর করবীর নমনীয় হাত সেই গতি জাড্য শুষে নিচ্ছিল। করবী কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না সে কি করবে? না, তেমনটা কিছু না। করবী পরে ভেবে দেখেছে। তার শরীরের ভিতর রুম ঝুম করে একটা বাদ্য যন্ত্র বাজছিল। করবী সে যন্ত্রের নাম জানে না। তারা অনেক্ষন পথে হাঁটল। ফুটপাথে। করবীর খারাপ লাগছিল না। ভালো ও কি লাগছিল ? কিসে তা বুঝতে পারছিল না। সুবীরের হাতের ভিতর করবীর হাত ধরা ছিল। সুবীর অনবরত কথা বলে যাচ্ছিল। মার্কস। লেনিন। করবী তার কোনো কথা বুঝতে পারছিল না। সে কেবল সুবীরের রক্তের ভিতর যে গতি জাড্য অহরহ বাদ্য যন্ত্র হয়ে বাজছিল, সেটা তার সমস্ত শরীরে তড়িতাহতের মতো খেলে যাচ্ছিল।
এক সময় তারা দেখল পথের ধারে এক মাঠে কিসের একটা ছোট মেলা চলেছে।
তা দেখে সুবীর বলল
--চলো মেলা দেখি। বহুকাল কোনো মেলা দেখিনি।
--মেলায় ঢুকে করবীর সম্যক ভালো লাগছিল। চারদিকে ছোটো ছোটো নানা সামগ্রীর দোকান। ছোটদের ছোট নাগরদোলা।
করবী অকারণে দু একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জিনিস-পত্রের দর-দাম করল। দোকান দারের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক করল। এসব যেন খেলা। মাথার উপর মৃদু হাওয়া। হাওয়ায় ধুলো। হেমন্তের হিম। তার, খেলতে খেলতে খেলার নেশায় পেয়ে বসেছিল।সুবীর তখন বক বক করছিল না।
করবী দেখল এক জায়গায় গ্যামলিং জাতীয় একটা খেলা চলছিল। সুবীর বলল
--চলো করবী জুয়ায় তোমায় জিতে নিই।
বলেই সে হা হা করে হাসল। সমস্ত শরীর উপচে সে হাসল। সে হাসির হিল্লোল করবীর ভিতরেও ছড়িয়ে পড়ল। সেও হাসল
--তাই নাকি? চলো তো দেখি ?
ঘুরন্ত চাকতির উপর লেখা সংখ্যা গুলোকে বিদ্ধ করবে বলে লোহার শলাকাটি হতে তুলে নিয়েছে সুবীর। সে করবীকে একটা সংখ্যা বলতে বলছে।
করবীর যেন আর কোনো মজা লাগছিল না। সে কোন সংখ্যাটি ধরবে ? করবী চোখ বুজে ফ্যালে। করবী কি ভয় পাচ্ছিল ? সুবীর যদি জিতে নেয় তাকে ? করবী আবার তার ভিতরে একটা বাদ্য যন্ত্রের শব্দ টের পাচ্ছিল। সে একটা স্বগতোক্তির মতো করে সংখ্যা বলল। চোখ খুলল। সুবীর সেটা শুনতে পেয়েছে কিনা বুঝতে পারছে না করবী। না পারলে। করবী আবার চোখ বুজে ফ্যালে।
সুবীর যেন চিৎকার করে বলে দ্যাখো করবী
--তোমাকে আমি জিতে নিচ্ছি!
করবী চোখ খুলতে পারছিল না। দেখতেও পারছিল না, সুবীর ঠিক সংখ্যাকে গাঁথতে পারল কিনা।
করবী চোখ বন্ধ করে আছে। সুবীর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল
--চলো। পেয়ে গেছি!
কি পেয়েছে সুবীর? করবী কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।
সুবীর তার হাত ধর টেনে নিয়ে চলল। করবী যন্ত্রের মতো তাকে অনুসরণ করল। সুবীর ফিস ফিস করে তার কানের কাছে বলল
--চলো । ডায়মন্ডহারবার চলো।
করবী যেন তার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলনা। কি বলে সুবীর? তার কি মাথা খারাপ? করবী কিছু বলার আগেই যথা নিয়ম অনুসারে আবার সুবীর তার হাত ধরে। এমন ভাবে যেন এটাই হবার ছিল। সেই সুপুরুষের দৃঢ় হাত। গাণ্ডিব হাতে পার্থ বীর স্বয়ম্বর সভায় পাঞ্চালীকে জিতে নেবার পর। যেমন।
করবীর সারা শরীরের ভিতর এক ভীরু পাখি ঢুকে পড়ে। যে পাখি ক্রমাগত ডানা ঝাপটে ঝাপটে শেষে নিস্তেজ। করবী তা বুঝতে পারছে। কিন্তু করবীর যেন কিচ্ছু করার নেই। করবী একটা মলাট-হীন বইয়ের মতো। হওয়ায় এলো মেলো পাতগুলো উড়ছে। কিন্তু করবী বুঝতে পারছে না। আর পারলেও করবীর কিছু করার নেই। একটা নীল রঙের বাসে ওঠার আগে একটা ওষুধের দোকানের টেলিফোন থেকে করবী বাড়িতে টেলিফোন করে দিয়েছে, অর্থাৎ এক বন্ধুর বাসায় সে থেকে যাচ্ছে এবং থেকে যাবার একটা অছিলা সে সুন্দর ভাবে বলে দিয়েছে।
করবী দেখছিল সুবীরের সবকিছু যেন মুখস্থ চিত্রনাট্যের মতো করে চেনা। করবীরও তাই। এমনটা যে হবে তা যেন করবী জানত। করবীর ভিতরে কে যেন এই জানাটা ইনজেকশনের মতো পুষ করে গিয়েছে। একটা কুয়াসার ধানক্ষেত পুষ করে দিয়েছে। তারা যে হোটেলটায় উঠল , করবী দেখল সে হোটেলের মালিক সুবীরকে চেনে। করবী বুঝতে পারছে। করবী দেখছে, সে, সুবীর, হোটেল-ওলা সবাই যেন একটা সাজানো চিত্রনাট্যে অভিনয় করছে। এবং সেটাই আবার অবাক হয়ে করবী দেখছে। যেন উল্টো দিকের চেয়ারে বসে।
সামান্য খাওয়া দাওয়ার পর তারা খুঁটি নাটি কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সুবীর তার পাঞ্জাবীর একটা বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছে বলে আক্ষেপ করে। এই নিয়ে অনেক্ষন সে আক্ষেপ করল। করবীর ব্রেসিয়ারের হুক আটকে গিয়েছ। সুবীরকে সে খুলে দিতে বলল। সুবীর তার পর অধৈর্যের মতো টানা টানি করল। করতে গিয়ে পট করে সেটা ছিঁড়ে গেল। সেই নিয়ে এবার করবী আক্ষেপ করল। যেন একটা নির্মম খেলা নিয়ে তারা খেলতে বসেছে। নির্মম আর রুথলেস একটা খেলা। করবীর সারা শরীর আগুনের মতো। খাণ্ডব দাহনের মতো সুবীর পুড়ছিল। পুড়ছিল। এবং পুড়ছিল।
এতদিন পরে এর বেশী করবীর আর মনে পড়ছে না। কিন্তু এটা তো ভোলার কথা নয়। কিন্তু করবী ভেবে দেখেছে সে ভুলে গিয়েছে। ভোরবেলা করবী বাথরুমে গিয়ে দেখল সুবীর বাথরুমের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে। তার মাথার উপর শাওয়ারের জল খোলা। সুবীরের হাতে একটা ব্লেড। তার কবজি থেকে রক্তের রেখা গড়িয়ে নামছিল।
করবী ভয় পেল না। না করবী ভয় পায়নি। একদিন যেমন সুবীর তাকে নিয়ে দৌড়েছিল। সেদিন করবী সুবীরকে নিয়ে দৌড়ল। আনাড়ি সুবীর হাতের ঠিক জায়গাটা কাটতে পারেনি। একটু ব্যান্ডেজ দিতে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়।
সেই প্রথমবার করবী অনুভব করেছে মৃত্যুর কোনো শব্দ নেই। কিন্তু করবী জানে তার বুকের ভিতর সেদিন এক অজানা শব্দ বেজে উঠেছিল। সেই শব্দ শুনে করবী বাথরুমে যায়। কি সেই শব্দ করবী তা জানে না। কিন্তু আজীবন সেই শব্দ করবীকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরেছে।
আজো ভোরবেলা তেমনি একটা শব্দ করবী শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু কিসের সেই শব্দ করবী বুঝে উঠতে পারছে না। আর না পেরে সে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে পড়ছে। সে একবার নিখিলের দিকে তাকাচ্ছে। আর মায়া মমতায় ভরে যাচ্ছে সে। নিখিল বীর নয় । সে ভীরু। সে মায়ার পুরুষ। তার মায়া মমতা উলের কাঠির মতো ক্রমাগত করবীকে বুনে চলেছে। সে কারণেই বোধহয় কখনো সুবীরের কথা তাকে বলতে পারেনি করবী। করবী তার নিজের ভিতরে অনেক অঢেল আলো আলো আঁধারির ভিতর খুঁজে দেখেছে। সেখানে কোথাও সুবীর নেই। না । কোথাও না।
বহুদিন পরে একবার সুবীর তাকে চিঠি দিয়েছিল। দু-চার লাইনের, কিন্তু যেন গোপন একটা চিঠি। সে চিঠি করবী পড়ে দ্যাখেনি। আবার পড়ে দেখেছে। এমনটাও বলা যায়। কিংবা দু দণ্ড সে সেই চিঠি হাতে বসে থেকেছে। তার পর সে চিঠি সে রেখে দিয়েছে। চিঠির জন্য কোনো বাদ্যযন্ত্রের বোল সে টের পায়নি মাথার ভিতর।
আজ ভোর বেলা সেই সেই অদ্ভুত শব্দটা টের পাচ্ছিল। কি ভীষণ আকুতি টের পাচ্ছিল। পাচ্ছে। ভয়? করবী ঠিক বুঝতে পারছে না।
গতকাল রাত্রে খাবার পরে। না না। খাবার টেবিলে তারা ঝগড়া করছিল।না না, তার আগেও। করবী মনে করতে পারছিল না। শেষ কবে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে। নিখিল ভীরু। আর অসহায়। নিখিল কখনো ঝগড়া করেনি করবীর সঙ্গে, ঝগড়া করার জন্য কোনো হ্রেষা তার মাথার ভিতর বেজে ওঠেনি । কখনো। বেজে ওঠার কোনো অভিলাষ টের পায়নি।
অথচ সেই নিখিল । ৬১ বছরের নিখিল। ৫৫ বছরের করবীর সঙ্গে ঝগড়া করেছে।
গতকাল ছিল ২২শে শ্রাবণ। নিখিলের সখ হয়েছিল বাড়িতে তারা কবি প্রয়াণ দিবস পালন করবে। চাকরি থেকে রিটায়ার কারার পরে নিখিলের এমন দু চারটে খেয়াল জাগছে। ইদানীং। করবীরও তাতে সায় ছিল। সেই মতো সকালবেলা থেকে নিখিল আলমারি থেকে সমস্ত রবীন্দ্র রচনাবলীটা নামায়। ধুলো ঝাড়ে পরিষ্কার করে। মাঝে মাঝে দু-একটা পাতা সে পড়ে নিয়েছে। করবীও কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে নিখিলের পাশে বসেছে। আবৃত্তির সময় তারা সমবেত আবৃত্তি করছিল।
সন্ধ্যাবেলা নিখিল অন্ধকারে বসেছিল। বারান্দায়। করবী ভিতরে কি কাজ করছিল। হাতের কাজ সেরে এসে সে নিখিলকে কিছু বলতে গেল। নিখিল রেগে উঠল। করবী অবাক হয়েছিল। তার পর শোবার সময় পর্যন্ত নিখিল তার সঙ্গে কথা বলেনি।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ছিটে আসতে করবী জানালার সামনে থেকে সরে এলো। তার বুকের ভিতর একটা বিশাল ড্রাম যেন ক্রমাগত বাজছিল। কেবল বাজছিল। হঠাৎ করবীর কি যেন মনে পড়ে যায়। সে দ্রুত বসার ঘরে যায়। জলদি হাতে আলো জ্বালে। বইয়ের র্যা ক থেকে, একটা গোপন কোন থেকে একটা বই সে বার করে। তার পর তন্ন তন্ন করে সে বইয়ের পাতা উলটে যায়। তার হাত কাঁপছিল। না । সে খুঁজে পাচ্ছিল না। ত্রিশ বাছর আগের করবীকে লেখা সুবীরের একমাত্র চিঠিটা সে খুঁজে পাচ্ছে না। ভীষণ ভয় পেয়ে যাচ্ছে করবী। তবে কি নিখিল?
নিখিল?
কি লেখা ছিল তাতে?
করবী তো পড়েছিল ?
করবীর ভিতর থেকে আর একটা করবী বলে ওঠে..না সে চিঠি করবী পড়েনি?
তবে? করবী কি চিৎকার করে বলবে..?
--নিখিল এই চিঠি তুমি কেন পড়েছ?
না, না,...নিখিলের কাছ থেকেই করবীকে জানতে হবে সেই চিঠিতে কি লেখা ছিল?
পাগলের মতো করবী শোবার ঘরে দৌড়ে গেল।
করবী ক্রমাগত ঠ্যালা দিতে দিতে জাগাতে চাইছিল। যেন বলতে চাইছিল—‘নিখিল তুমি কি পড়েছ..যা পড়েছ তা মিথ্যে’। ঠিক এমনটাই করবী বলতে চাইছিল।
কিন্তু নিখিল কিছু শুনছিল না। শুনতে পাচ্ছিল না। নিখিল জাগছিল না। জেগে ওঠবার কোনো বেদনা সে অনুভব করছিল না ।




আপনার মতামত জানান