অরণি

তপোময় ভট্টাচার্য্য


ধরা যাক মেয়েটির নাম অরণি
এলোমেলো চুল, সাধারন পোশাক
গোল ফ্রেমের চশমা আর মাথায় বিনুনী
এই নিয়েই বেশ ব্যস্ত জীবন
স্কুল, কোচিং , নাচের ক্লাস
সময় পেলে কখনো শ্রাবনী সেন বা দেবব্রত বিশ্বাস ।
চলছিল বেশ;
কখনও সুনীল কখনও সমরেশ –
একটু একটু করে বেড়ে উঠছে অরণি ।
মেয়ে ডাক্তার হোক- বাবা মা চায়
অনেক নাম হবে, খ্যাতি, যশ;
অরণির মন পড়ে থাকে কবিতায় ।
কথার পিঠে কথা কেমন জীবনের সাথে মিলে যায় !
এভাবেই একদিন অরণি পেল অনির্বানকে –
হঠাৎ পরিচয়ে সামান্য আলাপ,
তার চেহারা নাকি কবিতা কোনটা মুগ্ধ করেছিল অরণিকে?
অরণি আজও সেটা বুঝতে পারেনি;
যেমন বুঝতে পারেনি কিভাবে তার ডাকনাম তনু হলো
অথবা একটু আসছি বলে দাদা কেন আর বাড়ি ফেরেনি ।
ঠাকুমার কাছে বসে সেদিন অনেক কেঁদেছিল;
সেদিন তবু পাশে অনির্বান ছিল ।
অনির্বান এক অদ্ভুত জীব;
কবির কোন লক্ষনই নেই ওর
অরণি ভাবে যদি একটা পাঞ্জাবীও পড়তো বড়জোর—
অনির্বান ভালোবাসে রক্ গান, চাইনিজ্ খাবার
দেদার বাউন্ডুলেপনা আর ওর কালো গীটার ।
তবু কেমন ভাবে মিলে গেল ওরা;
কেউ তো বিশ্স্বাসই করেনি, স্বাতী- মিতা- সুমনারা
সবাই হেসেছিল ঠোঁট বেকিয়ে ।
সত্যিই ওর অনেক স্বপ্ন ছিল অনির্বানকে নিয়ে ।
স্বপ্নরা বুঝি স্বপ্ন থাকতেই ভালোবাসে;
অনির্বান যেমন এসেছিল, একদিন তেমনই গেল হারিয়ে ।





অরণির আর মন বসেনি কবিতায়
সময় এসে দাঁড়িয়ে গেল কলেজের দরজায় ।
পড়াশুনার ফাঁকেই কাটছে দিন-
হলুদ সালোয়ার, ব্যাগে মায়ের দেওয়া টিফিন ।
দেমাগী অটো বা ঘেমো বাসেই রোজকার যাতায়াত
আর এখানেই শুরু অরণির দ্বিতীয় অধ্যায়
বাসস্টপে আলাপ—ইলেক্ট্রিকালের পারিজাত ।
পারিজাত হিসেবি ছেলে , সংক্ষিপ্ত পরিবার
ওদের বাড়ি বাঁকুড়াতে; একটা ছোট বোন
মায়ের মহিলা সমিতি আর বাবা ডাক্তার ।
পারিজাতের চোখে স্বপ্ন ছিল অনেক কিছু করার ।
একই স্বপ্নে মিলে গেল দুটি মন
অরণির ফাইনাল ইয়ার তখন
পারিজাতের চলছে চাকরির খোঁজ
আরনী ভাবে পড়াশুনাটাও মন্দ নয় তেমন ।
তবু চাকরি নিল দুজনেই, পোস্টিং সান হোসে;
ঠিক ছিল সবই, শুধু আটকালো হিসেবে ।
হিসেবী মানুষ হিসেবে ভুল রাখেনা;
সংসারী এখন পারিজাত, স্ত্রী নিলাঞ্জনা ।
আবার একা হয়ে গেল অরণি
স্বপ্নের সাথে ভেঙ্গে গেল বাস্তবও
শ্বশুরের ব্যবসায় ব্যস্ত পারিজাত
যোগাযোগ রাখেনি অরণিও ।





সান হোসেতে সকালটা বড় অদ্ভুত –
অরণির জানালায় রোদ্দুর ধরা দেয় ।
নির্জন চায়ের কাপের অনুভুতির সাথে তখন রাত নামে কোলকাতায় ।
ব্যর্থ প্রেমিকের মত অপেক্ষাতে ল্যাম্পপোষ্ট,
জেগে থাকে কুকুরের পাহাড়ায় ।
শহরের সব নেশা, সব সুর মুছে গেলে পড়ে –
সুর বেজে ওঠে অনির্বানের গীটারে;
লুকিয়েই গান গায় এক কেরানী জীবন ।
আলো আঁধারীর মাঝে অরণি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়,
বুক ভরে টেনে নেয় রডোডেনড্রন;
চন্দ্রিমাদের ছাতিম গাছের কথা মনে পড়ে ।
আজ দুবাই কাল প্যারিস পরশু বস্টন –
ভালো আছে পারিজাত ।
বাঁকুড়ার পাট চুকে গেছে গেল বছরে,
ঠিকানা এখন ব্যাঙ্গালোরের এক বহুতল ।
বদলেছে অরণিও, বদলেছে জীবনের রঙ,
বাগবাজারের বাড়ি, চেনা গলি, চাপাকল ।
দাদার কথা মনে পড়ে ওর;
তেতলায় দাদার ঘর, জামা, জুতো, পোস্টার
গুছিয়ে রাখে মা; যদি দাদা ফেরে –
অরণি রোজ হাঁফিয়ে ওঠে একলা ঘরে ।
ঠান্ডা কাঠের বাক্সের জীবন;
হৃদপিন্ডহীন শহরখানা গলা টিপে ধরে ।
খেতে বসে রোজ ভাতের থালায় আঁকিবুঁকি –
ফিরে যাবে অরণি?
ফিরে যাবে ওই তেতলার ঘরের বাসিন্দা হয়ে?
দাদার মত তারও যে ঘরে ফেরা বাকি ।

আপনার মতামত জানান