ফেরা

অনির্বাণ নাগ


ভোর হয়ে এল প্রায় । মালতী নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠল । গলার কাছ থেকে ফটিকের হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ল মালতী । ফটিক মালতীর তিন বছরের সন্তান । এতক্ষন মায়ের গলা জড়িয়ে , বুকের কাছে মাথাটি গুঁজে ঘুমিয়ে ছিল ফটিক। অন্যপাশে নিবারন ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকছে ।সারারাত নিজের সাথে লড়াই করেছে মালতী ।অবশেষে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলে মালতী । নিবারন মদ্যপ । প্রতি রাতেই মদে চূড় হয়ে বাড়ি ফেরে । এই পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে এটা প্রায় গা সওয়া হয়ে গেছে মালতীর । কিন্তু ব্যাপারটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল গতকালই ।

গ্রামের মদমাতালদের বিরুদ্ধে একজোট হতে আন্দোলনের দাক দিয়েছিল মহিলা সমিতি । মদের ঠেক ভাঙতে গ্রামের সমস্ত মহিলারা মিছিল করেছিল । লাঠির আঘাতে গুড়িয়ে দিয়েছিল চোলাই-এর আড্ডাগুলি । মালতীও আকাশের দিকে মুষ্ঠি তুলে যোগ দিয়েছিল মিছিলে । মুখে ছিল শ্লোগান-" মদের ঠেক ভাঙতে , জোট বাঁধো একসাথে । "

সেই রাতে আকন্ঠ মদ গিলে বাড়ি ফিরেছিল নিবারন । মালতী দরজা খুলে দিতেই মালতীর উপর আছড়ে পরেছিল নিবারনের দানবীয় রাগের সুনামি । কিল চড় ঘুষির অবিরাম আঘাতে মালতী প্রায় আধমড়া হয়ে গিয়েছিল । লজ্জায়, অপমানে মালতী পাথর হয়ে গিয়েছিল । আঘাৎটা শরীরে নয়, বুকের ভিতর লেগেছিল ।

ভোরের আবছা আলোয় ঘুমন্ত ফটিকের মুখটার দিকে একবার পিছু ফিরে তাকায় মালতী । বড় মায়া জাগে ছেলেটার প্রতি । কিন্তু না, আর পিছু ফেরা নয় । নিজের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়াটা হয়েই গেছে মালতীর । নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় মালতী । অনেকটা দূরে ঐ আমবাগানের দিকে হাঁটা দেয় মালতী । গাছের ডালে ঝুলেই এ ঘেন্নার জীবন শেষ করবে মালতী। একটার পর একটা স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখেও , শুধুমাত্র পেটের ঐ শত্রুটার জন্য বুকে পাথর চাপা দিয়ে চুপ করে ছিল । কিন্তু আর কত ? গলার কাছে কান্নাটা দলা পাকিয়ে ওঠে । মালতী তাড়াতাড়ি পা চালায় আমবাগানের দিকে ।

শেষবারের মতো ভোরের মায়াবী আলোমাখা আকাশের দিকে তাকায় মালতী । আনমনা হয়ে পড়ে মালতী । একটা অবিরাম চিঁ চিঁ আওয়াজে মালতীর ঘোর ভাঙে । গাছের কোটরে একটা শালিখছানা চিঁ চিঁ করে ডেকে যাচ্ছে । এখনো পাখনা গজায়নি, চোখ ফোটেনি । মা শালিখটাও একটানা চিৎকার করেই যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে কোথায় যেন উড়ে গিয়ে আবার ফিরে ফিরে আসছে । ব্যাপারটা কী ? মালতী যা দেখলো, তাতে তার বুকের স্পন্দন বন্ধ হবার যোগার । কোটরের উপরের ডালে পেঁচিয়ে আছে সাক্ষৎ যমদূতের মতো দাঁড়াশ সাপটা । মা শালিখটা প্রানপন চেষ্টা করছে যমদূতটাকে তাড়াবার । কিন্তু ঐটুকু শরীরে কী আর অতবড় বিষধরকে ঠেকিয়ে রাখা যায় ! সাপটা বারবার চেষ্টা করছে এগিয়ে আসার । কিন্তু মা শালিখের বাঁধায় আবার পিছিয়ে যাচ্ছে । হটাৎ লেজের উপড় ভড় করে , শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে বিদ্যুৎগতিতে মা শালিখটাকে মুখে পুরে দ্রুত অদৃশ্য সেই মৃত্যুদূত । শালিখছানাটি তখনো কেদেঁই চলেছে । মালতীর মনে হয় ফটিক ঘুম ভেঙে মা'কে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছে আর কাঁদছে ।

না, আর দেরী করা চলে না । দ্রুত ঘরমুখো হয় মালতী । মালতী দৌড়চ্ছে বাড়ির দিকে । পা ভারী হয়ে আসছে তার । নিঃশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে তার । কিন্তু থামলে চলবে না । পূবের আকাশে রঙের খেলা শুরু হয়েছে । ফটিকের ঘুম ভাঙার আগেই ঘরে পৌছতে হবে মালতীকে ।

আপনার মতামত জানান