অনামক

সুমনা রায়


নোংরা গলিটায় একে একে জ্বলে উঠছে মাতালের ঘোলাটে চোখের মত হলুদ আলোগুলো। মুখে রং, চুলে বেলির মালায় সেজে মেয়েগুলো এসে দাঁড়াচ্ছে গলির দু'ধারে। অশালীন অঙ্গভঙ্গীতে মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে পথচারী পুরুষগুলোর। মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে হাসি ঠাট্টায় ঢলে পড়ছে এ ওর গায়ে। আমিনার আজ শরীর ভাল নেই। তবু উপায় কি? এক রাত ফাঁকা যাওয়া মানে সেদিনের মত রোজগার শূন্য। ঘরের ভাড়া, দালালের টাকা, পুলিশের তোলা সব মিটিয়ে কটা টাকাই বা থাকে হাতে? শুধু নিজের নয়, বাচ্ছাটার খরচও তো চালাতে হবে। দ্বিধা কাটিয়ে সে পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় বাইরে।

আরে, সেই ছেলেটা না? মাঝারি লম্বা, কাল রং, রোগার দিকে চেহারা। বেশ কদিন ধরে গলিতে দেখছে ছেলেটাকে। পুরুষের দৃষ্টি চেনে আমিনা। সাধারণত এখানে যারা আসে, এ ছেলেটার দৃষ্টি তাদের থেকে আলাদা। আজও ওর চোখদুটো যথারীতি আমিনার চোখে এসে স্থির হয়। এই প্রথম ওকে ইশারায় ডেকে নেয় আমিনা। ছেলেটা ওর পেছন পেছন সিঁড়ি পেরিয়ে উঠে আসে দোতলার ঘরে। খাটের বদলে টেবিলের সামনে থেকে চেয়ারটা টেনে বসে। এক গ্লাস জল চায়। জলটা শেষ করতে অনেকটা সময় নেয় ছেলেটা। ঘরের ভেতরটা দেখতে থাকে তাকিয়ে তাকিয়ে। আমিনা বুঝে নেয় এ ছেলে আগে এসব জায়গায় আসেনি। হাত ধরে নিয়ে এসে বসায় খাটের ওপর ওর মলিন বিছানায়। ছেলেটি চমকে ওঠে, ' জ্বর যে তোমার!' আমিনা হাসে, 'তাতে তোমার কিছু কম পড়বে না গো!' ছেলেটা কপালে হাত দিয়ে তাপ দ্যাখে। জিজ্ঞেস করে, 'কি করে এলে এখানে?'

আজ থেকে কতদিন আগে তার প্রেমিকপ্রবরটি এখানে বেচে গেছে ওকে। তারপর লজ্জা, ভয়, সংকোচ পেরিয়ে কবে যে অভ্যেস হয়ে গেল এই নষ্ট জীবন! ঝাপসা স্মৃতি হাতড়ে আবার সেসব ফেরৎ আনে আমিনা। ছেলেটা চুপ করে বসে শোনে। মাথায় হাত বুলিয়ে দ্যায়। নরম স্বরে বলে, 'এখান থেকে বেরোতে ইচ্ছে করে না? আমাকে বিশ্বাস করো যদি...' আমিনা চমকে উঠে নিষ্পাপ দুটো চোখের দিকে তাকায়, 'ছোট্ট একটা ছেলে আছে আমার।' 'সে খবর জানি আমি', হাত ধরে ছেলেটা। এতদিনের পুরুষসঙ্গের পর আজ প্রথম অন্য এক অনুভূতিতে আমিনার দেহ, ভেতরটা ভরে ওঠে।

আপনার মতামত জানান