দেওরিয়া তাল

সোমনাথ দে



রূপকুন্ড ট্রেকিং শেষ করার পর বেশ অনেকটা সময় আমাদের হাতে ছিল। আমি একবার ভাবলাম যে বাড়ি চলে যাই। অপু দা [আমার সফর সঙ্গী] কে বলতেই একটা ধমক দিল। বলল যেইরকম প্লান করা হয়েছে ঠিক সেই রকম কাজ হবে। বলল-" চল এইবার আমরা দেওরিয়া তাল যাব"।
কোথায় দেওরিয়া তাল? কী ভাবে যায়? কিছুই জানি না। অগত্তা অপু -দার পদাঙ্ক অনুসরণ করা ছাড়া গতি নেই। লহারজং থেকে সকাল বেলা জীপ ধরে চলে এলাম কর্ণ প্রয়াগ সেই খান থেকে এলাম রুদ্রাপ্রাযাগ। তারপর উখিমঠ। এইবার আসতে হবে সারি গ্রাম। আমরা যখন উখিমঠ পৌছই তখন বেলা অনেক টা ছোটো হয়ে এসেছে কোনো রকেম একটি গাড়ি কে রাজী করলাম কিন্তু সে মাসতুরা অবধি এসে আমাদের নামিয়ে দিল।
ড্রাইভার সাহেব এর থেকে আর বেশি যেতে রাজি নয়। অপু দা ও একটু মেজাজ নিয়ে বলে উঠলো ড্রাইভার কে –“ভাগবান তুমহারা ভালা কারে ____” । মাসতুরা থেকে সারি গ্রাম টা বেশ অনেকটাই দূর, আমরা দুজন পিঠে বোঝা টা নিতে হাটা মারলাম সারি-র দিকে। রবি কিরণ তখন পশ্চিম দিকে প্রায় ধলে পরেছে। অসাধারণ রাস্তা পাহাড়ের এর ঢাল কেটে বানানো। একদিকে সারি বেধে উচু উচু পাইন গাছ। তার ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে সূয, আরও কত নাম না জানা গাছ। নিচ থেকে বয়ে যাচ্ছে মন্দাকিনী নদী, পান্না র মত রং অরুণ আলো পরে কখনো চিক-চিক করছে। ফের গায়ে ধাক্কা লেগে উপরে ভেসে আসছে শব্দ। পাইনএর একটা ফল কে নিয়ে খেলতে খেলতে পৌছে গেলাম সারি গ্রাম। তখন বেলা প্রায় ৫ টা। কিছু খাবার জন্য একটা দোকানে ঢুকলাম অর্ডার ও দিলাম মনের মত। অপু দা একটু ব্যাস্ত একটা গাইড খোজার জন্য। একদিক ওদিক ঘুরে একটু থীতু হয়ে বসতেই ছিপ-ছিপে চেহারার একটি মাঝ বয়েসী ছেলে আমাদের সাথে এসে আড্ডা জুড়ে দিল। কথায় কথায় নাম জানলাম বিজেন্দ্র মহন। পেশায় গাইড। ও কিছুতেই মানতে চায়না যে আমরা রূপকুন্ড ট্রেক শেষ করে এসেছি আর এর পরে আর দুটো ট্রেক আছে তারপর বাড়ি ফিরব। যাইহোক ওর সাথে বিস্তর দর কষা-কষি পর ঠিক করলাম আমরা দেওরিয়া তাল, তুঙ্গনাথ- চান্দ্রাশিলা ট্রেক করে নেব। আর কাল বিলম্ব না করে বেড়িয়ে পরলাম। রাস্তা টা প্রথম থেকেই খারাই দুরত্ব মোটা-মুটি ৩কি.মি সামনেই একটা
মন্দির, তার পাস দিয়ে উপর দিকে উঠে গেছে রাস্তা টা। কিছু টা উপরে যেতেই অন্ধকার নেমে এলো। সঙ্গে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। তার মধ্যে পথ চলছি, আরও কিছুটা উপরে উঠে একটা বসার জায়গা পেলাম। একটু না বসে পারছি না। সামান্য ক্লান্তি তে চোখ টা বুজে আসতেই কে যেন বলে উঠলো -"ছোটে বাবু লাগতা হায়ে আপ বহুত থাক গায়ে "। ধর পরিয়ে চোখ টা মেলতেই দেখি বিজেন্দ্র পাশে দাড়িয়ে আছে, বললাম- 'একটু বোসো গুরু ', কি বুঝলো জানি না ধপাস করে বসে পড়ল। ওর সাথে গল্প করছি এমন সময় অপু দা এসে বলল -"তারাতারি চল দেখছিস না অন্ধকার হয়ে গেছে "। আবার হাটা শুরু করলাম চারপাশে বেশ ঘন জঙ্গল উচু উচু গাছ। এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা ঘিরে আছে। কোথাও আবার শুনছি গুন গুন কিছু পোকার শব্দ। অন্ধকারে বিশেষ বোঝা যায় না। টর্চ এর আলো টা কে সঙ্গী করে উপরে উঠে চলেছি আমরা তিন-জন। মেঘ টা একটু কেটে যেতেই চাঁদের আলো এসে পরেছে জঙ্গল-এর রাস্তা টার উপর সোনালী আলোর হাত ধরে রাস্তাটা ও সোনালী
হয়ে গেছে। মনে হয় পূর্ণিমা আশে-পাশে হবে। আরও খানিক টা এইভাবে উপরে উঠলাম, বিজেন্দ্র বলল-"হাম লোগ পহচ গায়ে , ম্যে পহেলেসেই টেন্ট লাগা দিয়া "।
বেশ ঠান্ডা লাগছে, কথায় এলাম কিছু বুঝতেই পারছি না। টর্চ এর আলো টা ফেলে শুধু এই টুকই বুঝতে পারছি যে সামনে বেশ অনেক বড় মাঠ আর তারপরে বেশ খানিক টা নেমে গেছে আবার উঠে গেছে। বা-দিকে একটা ঝুপড়ি, সেই খানে আগুন জালিয়ে রান্না হচ্ছে। বিজেন্দ্র আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে একটা টেন্ট এর মধ্যে চালান করে দিল। বেশ বড় টেন্ট টা চার জনের ভালো ভাবে হয়ে যায়। স্লিপিং ব্যাগ টা নিয়ে গায়ে দিলাম। কিছু পরেই বিজেন্দ্র গরম চা নিয়ে এল চা এর সাথে 'টা' নিয়ে তিন-জনে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। বিজেন্দ্র দেওরিয়া তাল এর ইতিহাস টা ও বলল, এর সাথে "মহাভারত" এর বিশাল যোগ সুত্র। এই পবিত্র লেক থেকে জল পান করার আগে যক্ষ-র প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে ছিল পান্ডবরা।
রাত একটু বাড়তেই টেন্ট এর মধ্যে খাবার চলে এল। বিজেন্দ্র ও চলে গেল আর বলে গেল কাল সকাল এ আসবে। টেন্ট-এ খেয়ে-দেয়ে স্লিপিং ব্যাগ টা নিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিলাম। ভোর হতে না হতেই ঘুম থেকে উঠে পরার বাতিক টা তত দিনে রপ্ত করে ফেলেছি। সময় ৪.৩০ টা। টেন্ট-এর চেন তা খুলতেই দেখছি মেঘ-কুয়াশা তে ঢাকা এক টুকরো সকালের আকাশ। হাই তুলে টেন্ট-এর চেন টেনে আবার ঘুমনোর চেষ্টা করলাম । এই বার সময় সকাল ৬.০০ টা। উঠে পরলাম। অপু দা কে ঠেলা মেরে বললাম -'কি গো বাইরে যাবে নাকি ', অপু -দার সদুত্তর -"ধুর ঘুমোতে দে ঝামেলা করিস না"। অগত্তা আমি জ্যাকেট টা পরে বাইরে বেরিয়ে পরলাম। সবুজ ঘাসের গালিচা দিয়ে মোরা। আর সামনেই দেওরিয়া তাল আর তার ঠিক পিছনে দেখা যাচ্ছে মাউন্ট চোখামবা। যদিও অল্প সময়ের জন্য দেখা পেয়েছিলাম। বা-দিকে একটা ছোট্টো জঙ্গল, কত রকম পাখি এসে বসেছে। অদ্ভুদ গলার শব্দ। একবার এই ডাল তো পরক্ষনে ওই ডাল। জঙ্গল এর কোনো কোনো জায়গা তে বেশ লাল-সাদা রং এর ফুল ফুটে আছে। সত্যি কবি গুরু কে স্মরন না করে পারছি না -
"ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে,
ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে,
ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান,
বিস্ময়ে তাই জাগে---- "
দেওরিয়া তাল কে মাঝখানে রেখে তিনদিকে জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। পুরটা এক পাক মারলাম। দেওরিয়া তাল-এ জলের রং একদম পান্নার মত সবুজ। জল টা ঢেউ খেলছে হওয়া র সাথে সাথে। জল স্থির হয়ে গেলে চোখামবা-র প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়। অনেক টা সময় কাটানোর পর ফিরে এলাম, দেখলাম বৃজমোহন চলে এসেছে। বিজেন্দ্র কে পাখি গুলোর নাম জানতে চাইলে ও কী যেন একটা বলে ছিল পরে আমি জানতে পারলাম ওই গুলো আসলে Magpie, Scaly-bellied green woodpecker।
আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম যে আজ দিনটা একদম অলস ভাবে কাটাব। টেন্টে বসে বা-দিকে গাছ টা তে দেখছি একটা Magpie খুব ডাকছে। আরও একটু বেলা হতেই দেওরিয়া তাল-এ জল তুলে স্নান করে নিলাম। বেশ ঠান্ডা জল। যাইহোক, দুপুরে খেয়ে নিয়ে একটু দূরে একটা গাছ এর নিচে mat টা পেতে হালকা ঘুম মারলাম। একটু বেলা টা ছোট হতেই উঠে পরলাম, বাহঃ চোখের সামনে মাউন্ট চোখামবা স্পষ্ট দখেতে পাচ্ছি। আরও বেশ কিছু পাহাড় চূড়া দেখা যাচ্ছে। বিজেন্দ্র এসে দাড়ালো চা নিয়ে ওর কাছে জানতে চাইলে এক এক করে শৃঙ্গ গুলো চিনিয়ে দিল। বা-দিক থেকে নীলকন্ঠ বান্দারপুঞ্চ, Yellow Tooth, কেদার। আর ডান দিক দিয়ে পন্চ্চুল্লি। সমস্ত দেওরিয়া তাল জুরে ধীরে ধীরে কেমন চুপ-চাপ হয়ে এলো। অন্ধকার ও নেমে এলো ক্রমশ। না! আর বাইরে থাকা তা ঠিক হবে না, চলে এলাম ওই ঝুপড়ি টার দিকে যেখানে রান্না হচ্ছে। ওদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাতের খাবার টা ও খেয়ে নিলাম। রাতের ঠাণ্ডায় দেওরিয়া তাল জুড়ে এক অদ্ভূদ নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। টেন্টের ফিরে গেলাম। পরের দিন সকালে নিজের মতো আরও একবার দেওরিয়া তাল ঘুরে বিদায় জাণালাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম তুঙ্গনাথের দিকে.......

আপনার মতামত জানান