আমেরিকার ডায়েরি

সুমন সরকার
আমেরিকার ডায়েরি ১
আমেরিকা থেকে লিখছি । ৫ দিন কেটে গেলো , দেখতে দেখতে । বিশেষ ঘোরাঘুরির সুযোগ পাইনি । প্রথম দিকের কয়েকটা দিন তো , অসময় এর ঘুম , ল্যাদ এ বেড়িয়ে গেলো । বেশ কিছু নতুন খাবার গলাধকরন করার সুযোগ হল ।
অনেকদিনের পুরনো বন্ধু সুমিত এর সাথে এক হোটেল এ দুটো দিন কাটল । সেই ছেলেবেলার খুনসুটি , ঠাট্টা ...আবার ফিরে এলো । আমেরিকার শুনশান রাস্তায় , একসাথে হেঁটে বেড়ানো , মাঝে এক ড্রাগ বিক্রেতার সাক্ষাত...জমে গেছিলো ।
কিন্তু ভাল সময়টা বড় তাড়াতাড়ি কেটে গেলো, সবসময় যা হয়ে থাকে । আমাদের হোটেল থেকে পাহাড় দেখা যেতো , আবার রাতে সুনীল আকাশ ভরা চাঁদ । সুমিত এর সাথে গপ্পে মত্ত হয়ে ভুলে গেছিলাম , আমি ২৭ টা বসন্ত পেরিয়ে এসেছি । সুমিত এখন বিবাহিত , আর বিখ্যাত রাশিবিজ্ঞানি । বয়েস বাড়লেও , আমাদের হাসি আদান প্রদানের ইয়ারকি গুলো একই থেকে গেছে । সেই ছোটুর গুল , চেনা চার অক্ষর , হারানো কিপটেমি , আমার ঘন ঘন প্রেমে পড়া , আর ব্যারথতা ... সুমিত কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে চলেছে , কিন্তু ওর বক্তব্য , আমি থাকলেই ওর মুখের ভাষা খারাপ হয়ে যায় । RAINCROSS BALLROOM , BANQUET DINNER TABLE আমরা একসাথে বসেছিলাম । সেই টেবিলএ নামকরা বেশ কজন রাশিবিজ্ঞানি ( যেমন পদ্মশ্রী জে কে ঘোষ কন্যা জয়ী ঘোষ ) ছিল । আলোচনা শুরু হয়েছিল , আমেরিকার sandwitch দিয়ে । কিন্তু , আমি সেটাকে অনায়াসে ঘুঁটে , গোবর , গরু.. তে নিয়ে চলে গেলাম ।। সুমিত অবাক হয়ে গেলো , বাকিরাও এই আলোচোনায় নিজেদের অজান্তে সামিল হয়ে গেলো । হা হা...।।

কোথাও বেড়ানোর সুযোগ নেই । সময় খুব কম । তাই একদিন , একা একা রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লাম । পড়নে আমার প্রিয় কালো পোশাক , চোখে কালো WAYFARER সানগ্লাস । সে এক দারুন অভিজ্ঞতা । শনিবার এ ফারমার মার্কেট বসেছে । রাস্তায় এক বদ্ধ উল্মাদ আমায় দেখে বলছে “ GOD BLESS YOU , MY SON…” ..। রাস্তায় চোখে পড়ল “ ART WORK” নামে একটি দোকান । ভেতরে ঢুকে বেশ ভাল কিছু তৈলচিত্র এ চোখ বোলাতে বোলাতে , দেখলাম দোকানে , এক খানা ১২-স্ত্রিং গীটার রাখা আছে । অনেক কাল গীটার এ আঙুল ছোঁয়াতে পারিনি । অদ্ভুত ভাবে সেই সুযোগ এসে গেলো । বসে গেলাম । বাজালাম আমার ভীষণ প্রিয় মহিনের ঘোড়াগুলির কিছু সুর । বেড়িয়ে এসে , আবার অচেনা রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলাম । হথাত কানে এলো দেবতার কণ্ঠ । একটা বার থেকে ভেসে আসছে এল্ভিস এর কণ্ঠ “ ARE YOU LONESOME TONIGHT…. যদিও তখন চাঁদিফাটা রোদ । কিন্তু , এল্ভিস তো দিন-রাত বদলে দিতে পারে ।
ফিরে আসছি । হোটেল এ ফিরে স্নান করবো । এবার একটা বিষাদের অভিজ্ঞতা । ফেরার পথে , দেখি একটা PERFORMING ART THEATRE এ DON MACLEAN এর শো ! ৪১ ডলার টিকিট । সেটা ছিল পকেট এ । কিন্তু, শো টা ২৫ তারিখ । আমায় ফিরে যেতে হবে ১৪ তারিখ । আমার কপালটা চিরকাল এ আমায় এভাবে ল্যাং মারে । যার AMERICAN PIE , STARRY STARRY NIGHTS এর মতো গান , পুরো SONG-WRITING এর জগত টাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল , তার শো টা এভাবে মিস হয়ে গেলো । ফেরার রাস্তায় হৃদয় এ পূর্ণতা থাকে না অনেক সময় । সেটাই মেনে নিলাম । ঠোঁটের কোনে জোকারের মতো একটা হাসি মেখে নিলাম । আয়নার সামনে নিজেকেও মাঝে সাঝে ধোঁকা দিতে হয় ।


আমেরিকার ডায়েরি 2
আমেরিকায় থাকার শেষ দিনে , অনেক অভিজ্ঞতা একসাথে হয়ে গেলো । বিদেশী পাহাড় দেখলুম । যদিও হোটেল এর ঘর থেকে সেটাকে খুব এ কাছের মনে হতো , কিন্তু হাঁটা শুরু করে দেখলাম , দিল্লী অনেক দূর । শে হাঁটছি তো হাঁটছি...। এনথু র ভাঁড়ার এ টান পড়ল । হেবি কেত মেরে , হাফ প্যান্তুল পরিহিত হয়ে যাত্রা শুরু করলাম বটে , কিন্তু রাস্তা আর ফুরয় না । পাহারি রাস্তায় দেখি ৭০ বছরের বুড়োরা দিব্বি সাইকেল চালিয়ে উঠছে । আর বেঙ্গল বিড়ি ফোঁকা হৃৎপিণ্ড নিয়ে আমরা দুই বঙ্গ খোকা জিব বার করে ছবি তুলছি । রাস্তায় এক আমেরিকান পরিবার এর সাথে আলাপ জমল । গৃহকর্তা স্ত্রী, পুত্র , কন্যা, কুত্তা র লটবহর নিয়ে নিকোটিন ছাপা হলদে দাঁত বার করে পাহাড় চরছেন । আমাদের ছবি তুলে দেবেন বললেন । ওনার কুত্তা টিও আমাদের সাথে পোশ দিতে সামিল হল । তিনটি ছবি তুলে , বেশ রঘু রাই মার্কা কলার তুলে উনি এগিয়ে গেলেন । আমরা দেখলাম , উনি কামেরার যাবতীয় কেত মেরেছেন , কিন্তু ক্লিক তাই করেননি । তাই একটি ছবিও ওঠেনি , আমাদের । এসময় চার অক্ষর ছাড়া কিছু মাথায় আসেনা । আমরা এগিয়ে গেলাম । রাস্তায় কত রকম জে মানুষ দেখলাম । কেউ কানে হেডফোন লাগিয়ে ছুটছে , শুনছে কম, চিৎকার করে গাইছে বেশি ; স্বামী পরিতক্তা এক নারী তার শিশু কন্যা কে নিয়ে একা জীবন বাঁচার পাঠ দিচ্ছে ; অরধনগ্ন অবসর প্রাপ্ত এক হিপি তার দুল ঝোলানো স্তনবৃন্ত প্রদরশন করে ৭০ দশক এর ভুলে যাওয়া দামাল পনায় শাণ দিচ্ছে ...।। আর আমরা দুই বাঙালি ভাবছি কখন পাহাড়ের চুড়োয় পৌছাব । যাক সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো । আমরা জয় করলাম , মাউন্ত রুবিদো ।অত উঁচু তে একটা মজার দৃশ্য দেখলাম । যীশুর ক্রস এর নিছে , বসে এক মার্কিন কপত-কপতি প্রেমে মগ্ন । আমরা ভিক্টোরিয়া তে পুলিসের তাড়া খাওয়া মাল । ভাবছি , এই বুঝি পুলিস এসে এদের থেকে ১০০ টাকা চুমু খাবার ঘুষ নেবে । নাহ ! ওখানে পুলিশ নামে প্রাণীটির দেখা মিলল না । এবার ফিরতে হবে । ওঠার সময় এক বোতল জল শেষ করেছি । আর এক খানা গোল্ড ফ্লেক লাইট । নামছি যখন , ভীষণ জোর হিসি পেয়ে গেলো । কিন্তু ওখানে কোনও সুলভ নেই । কোনওমতে চেপে , ইস্ত দেবতা কে স্মরণ করে এগিয়ে গেলাম । কিন্তু আর পাড়া গেলো না । কুকুরের অপকর্ম করাবার জায়গা আছে , কিন্তু মানুষের জন্য কোনও ব্যাবস্থা নাই ।অগত্যা , পাহাড়ের কোলে ঝরনা ঢেলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই । এদিকে পকেটে এক্তিও ডলার নেই । ভাবছি ধরা পড়লে কত ফাইন হতে পারে । চুলোয় যাক । পাহাড়ের গায়ে দুজনেই কাজ সেরে দিলাম । পাশ দিয়ে সাইকেল আরোহী , হেঁটে সুগার কমানো পার্টি চলেছে ।এদের দেখে আমরা ভাবছি, এরা বুঝি থানায় গিয়ে বলে দেবে । মনে হচ্ছিল , আমরা যেন , মাটি কুপিয়ে লাশ গুম করছি ।
হোটেল এ ফিরে গোছগাছ সেরে এবার ফেরার পালা । নিউ ইয়র্ক এ ৯ ঘণ্টা অপেক্ষা করার ছিল । তাই ঘুরতে গেলাম টাইম স্কোয়ার এ । আহা ! কি শহর । অনেক খাজা বাংলা সিনেমার শুটিং স্পট দেখছি মনে হল । জিনিসপত্রের আগুন দাম । কিছু কেনা হল না। তবে ওখানে দুখানা পাগল কে দেখলাম । একজন নিগার , যে হেবি সেজে গুজে রাস্তায় বসে আছে , আর ভীষণ যত্নে তার সুটকেস টা আগ্লাছে । মারকেজের উপন্যাস এর মতো । একজন খালি গায়ে নিজেকে আলেকজ্যান্দার ভেবে রাস্তায় লাফালাফি করছে ।

আপনার মতামত জানান