উপেন্দ্রকিশোর

সত্যজিৎ রায়
উপেন্দ্রকিশোর সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি কিছু নেই; আর থাকা সম্ভবও না, কারণ আমার জন্মের ছ’বছর আগে তার মৃত্যু হয়।
একশো গড়পাড় রোডে তিনি যে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন এবং যে বাড়িতে তার মৃত্যু হয়, সে বাড়িতেই আমার জন্ম।আমার শৈশব সে বাড়িতেই কাটে এবং তার অনেকখানি অংশ কাটে বাড়িরই একটি অংশ ইউ রায় এন্ড সন্সের ছাপাখানার ভিতর।
এই ছাপাখানায় কি কাজ হয়, কেমনভাবে তা হয়, অন্য ছাপাখানার সাথে তার পার্থক্য কোথায় এ সব বোঝার বয়স তখনও আমার হয় নি। ছ’বছর বয়সে ব্যবসা উঠে যাবার পর গড়পাড় ছেড়ে আমি ভবানীপুর চলে আসি সম্পূর্ণ অন্য পরিবেশে। ইউ রায়ের সঙ্গে যে সূত্রটুকু রয়ে গিয়েছিল সে হল তাঁর লেখা কয়েক-খানা বই, কিছু বাঁধানো সন্দেশ আর তাঁর আঁকা ও ছাপা কিছু ছবি।
মানুষটির সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়নি বলেই বোধহয় তাঁর ছবি ও লেখা মারফৎ ক্রমাগত বেশি করে বোঝার চেষ্টা করেছি। এখনো সে চেষ্টার শেষ হয় নি। সম্প্রতি সন্দেশ কাগজ আবার প্রকাশ করার সুযোগে পুরনো সন্দেশে প্রকাশিত তাঁর লেখা ও ছবিগুলো আবার ভাল করে পড়তে ও দেখতে হচ্ছে।এই পড়া ও দেখার মধ্য দিয়ে বারবার অনুভব করেছি যে শিশুসাহিত্যের অনেকগুলো দিক উপেন্দ্রকিশোর যেভাবে আয়ত্ত করেছিলেন তেমন আর কেউ করেননি। আর যে মানুষটির পরিচয় এই লেখা ও ছবির মধ্যে দিয়ে বেরোয়, তেমন শান্ত অথচ সজীব, সুস্থ, সরস মানুষও বোধহয় কম জন্মায়।
একদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে শিশুসাহিত্যে উপেন্দ্রকিশোরের জুড়ি আর নেই। টুনটুনির বই, ছেলেদের মহাভারত, ছোট্ট রামায়ণ, অথবা সন্দেশে প্রকাশিত তাঁর অজস্র গল্প কবিতা ও প্রবন্ধের ভাব ও ভাষার এমনই গুণ যে নিঃসন্দেহে সাহিত্যপদবাচ্য হলেও এর রস ছোটরা গ্রহণ করতে পারে। এমন অনেক উঁচুদরের সাহিত্য আছে যার পুরোপুরি রসগ্রহণ পরিণত বয়সেই সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ এমনকি সুকুমার রায় বা লীলা মজুমদারের লেখা সম্পর্কে এই কথাই খাটে।
হ য ব র ল বা বুড়ো আংলা পরিণত বয়সে পড়লে যে রস পাওয়া যায়, টুনটুনির বইয়ের রস কিন্তু সে রস নয়। পরিণত বয়সে টুনটুনির বই উপভোগ করতে গেলে মনের কোণে লুকানো শিশুমনটিকে জাগিয়ে তুলতে হয়। উপেন্দ্রকিশোরের লেখার জাদুই এমনি যে তা অনায়াসেই পাঠকের এই শিশুমনটিকে সজাগ ও সজীব করে তোলে। এ কথা আর ক’জন শিশু-সাহিত্যিক সম্পর্কে বলা চলে?
ছবি আঁকিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের সবচেয়ে আশ্চর্য দুটি গুণ হল তাঁর বহুমুখীতা-versatility এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যশিল্পের সফল সমন্বয়। তিনি প্রধানত দুরকমের ছবি এঁকে গেছেন। এক হল তাঁর শখের আঁকা তৈলচিত্র, যার অধিকাংশই হল ল্যান্ডস্কেপ আর দ্বিতীয় তাঁর ইলাস্ট্রেশনস; তৈলচিত্রে তিনি যে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর অনেকগুলোই আমি নিজে দেখেছি। গিরিডির শালবন বা উশ্রি নদী, দার্জিলিংয়ের পাহাড়, পুরীর সমুদ্র। এর সবগুলিতেই লক্ষ্য করার বিষয় হল যে প্রকৃতির একটি বিশেষ রূপ, ভাব বা mood-ই যেন তাঁকে বার বার মুগ্ধ করেছে- এবং সেটা হল একটা গভীর প্রশান্তির ভাব। এই বিষয়ে প্রশান্তির সম্মুখীন হয়ে যেন তাঁর প্রকাশভঙ্গিও একটা অনুরূপ শান্ত ভাব লাভ করেছে। এইসব ছবির টেকনিকে কোন উগ্র কারসাজি নেই, বর্ণেরও কোন বাহুল্য নেই। শিল্পীর ভাষা যেন, আমি এখানে কিছুই নয়, প্রকৃতিই সব। প্রকৃতি সুন্দর, প্রকৃতি শান্ত, তাই আমার ছবিও শান্ত ও সুন্দর। ইংরেজিতে যাকে বলে devout ভাব, সেটাই হল এই সব ছবির প্রধান গুণ।
ভাবে ও রীতিতে এইসব তৈলচিত্রের একেবারে বিপরীত হল তাঁর ইলাস্ট্রেশনস। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কবিরা যে সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন তা এই সব ইলাস্ট্রেশনেই সবচেয়ে বেশি পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। টেকনিক পাশ্চাত্য-ঘেঁষা হলেও দিশি গল্প তাঁর ছবিতে বিলিতি বা দো-আঁশলা হয়ে যায় নি। আর নিজে বৈজ্ঞানিক হবার দরুণ তিনি নিজে অ্যানাটমি বর্জন করে কোনদিনই তথাকথিত ওরিয়েন্টাল সুলভ মাত্রাতিরিক্ত অলঙ্করণের দিকে যান নি। কিন্তু এই ন্যাচারিলসমের গণ্ডির মধ্যেই বিচিত্র ছিল তাঁর প্রকাশভঙ্গি। একদিকে বিলিতি একাডেমিক শিল্পের প্রভাব, অন্যদিকে জাপানি উডকাট, রাজপুত ও মুঘল মিনিয়েচার ও বাংলার লোকশিল্প এবং আরও অন্যদিকে তাঁর নিজস্ব অসাধারণ পর্যবেক্ষণ শক্তি- সব মিলে এমন একটি ভঙ্গির উদ্ভব হয়েছিল, যা উপেন্দ্রকিশোরের নিজস্ব ভঙ্গি এবং যার ফলে তাঁর ছবি দেখলে কখনোই অন্যলোকের আঁকা বলে ভুল হত না। সন্দেশের প্রথম তিন বছরের সংখ্যাগুলোয় এবং সীতা দেবী, শান্তা দেবী প্রণিত হিন্দুস্থানী উপকথায় তাঁর শেষদিকের কাজের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন পাওয়া যায়।
ভাব ও ভাষার যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে, সেটা উপেন্দ্রকিশোরের লেখায় চমৎকারভাবে প্রমাণিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ যে না পড়েছে সে বুঝতে পারবে না কঠিন জিনিস কত প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা সম্ভব।
এই সরলতা বোধ করি উপেন্দ্রকিশোরের অনেকগুণের সব থেকে বড় গুণ। অনেক সাধ্য, সাধনা, চিন্তা, অনেক গবেষণা, অনেক মানসিক পরিশ্রমের পরে শিল্পী এই সরলতার স্তরে পৌঁছতে পারেন। যারা শিল্পী, সৃষ্টির মূল তত্বের অনেক রহস্যই তাদের জানা হয়ে যায়। কলকাতায় বসে হাফটোন ব্লকের মৌলিক উন্নতি সাধন বা টুনটুনির বইয়ের মতো শিশুসাহিত্য রচনা, অথবা ‘জাগো পুরবাসী’র মতো গান রচনা একাধারে এই সবই উপেন্দ্রকিশোরের পক্ষে সম্ভব ছিল।

মহাবোধি সোসাইটি হলে উপেন্দ্রকিশোর শতবার্ষিকী সভায় পঠিত। প্রবন্ধ পত্রিকা, শারদীয়া থেকে পুনর্মুদ্রিত।

আপনার মতামত জানান