“তুষার”

সুবীর কুমার রায়


তুষারের কথা আজ এতদিন পরে হঠাৎ মনে হ’ল। কলেজ জীবন বা চাকরীর প্রথম বন্ধনমুক্ত জীবনের কথা মনে হ’লে, যাদের ছবি চোখের সামনে ভাসে, তুষার অবশ্যই তাদের একজন। কী আশ্চর্য ও বিচিত্র এক চরিত্র। তার জীবনের সব কিছুর মধ্যে এক বৈচিত্র্য বিরাজ করে।
লেখাপড়া খুব একটা করে নি। বাবার একটা থিয়েট্রিকাল স্টোর ছিল। সে আমলে উত্তর কলকাতার থিয়েটার হলগুলো এবং যাত্রা দলগুলোর খুব রমরমা বাজার ছিল। আচ্ছা আচ্ছা থিয়েটার দল, কলকাতার নাম করা বড় বড় হলে, তাদের অনুষ্ঠানে ওদের দোকান থেকে সাজপোষাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই ভাড়া নিত। নাট্য জগতের প্রয়োজনীয় সব কিছুই ওদের দোকানে পাওয়া যেত।
দোকানে ওর বাবা অথবা বড় দাদা-ই বেশীর ভাগ সময় দেখাশোনা করতো। ও নিজে খুব কম সময় দোকানে বসতো। কিন্তু নাটকের দলগুলোর প্রয়োজনে তাকে এ হল, ও হল, যেতেই হ’ত। ফলে ছোট বড় নানা অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক, মেক-আপ ম্যান, লাইট ম্যান ইত্যাদি ব্যক্তির সাথে, তার ছিল প্রত্যক্ষ পরিচয়। পরবর্তীকালে সে আমার অফিসেই চাকরী পায়।
স্কুল কলেজ জীবনে প্রত্যেক যুবকের যেমন চায়ের দোকান বা অন্য কোথাও আড্ডাস্থল থাকে, আমারও একটা ইলেকট্রিকাল স্টোরে আড্ডা দেবার স্বভাব ছিল। দোকানটা ছিল তুষারের দোকানের বিপরীতে। ঐ দোকানে প্রতিদিন সকাল, বা কলেজ না থাকলে, সন্ধ্যাবেলা আড্ডা দিতে যেতাম। আর সেই সুত্রেই তুষারের সাথে আলাপ। অদ্ভুত সব কথা বলতে পারতো বলে, তাকে বেশ ভাল লাগতো।
একদিন কোন এক নাটকের দল, তাদের নাটকের প্রয়োজনীয় সাজ সরঞ্জামের বড় একটি লিষ্ট্ তাদের দোকানে দিয়ে গেছে। সেদিন সন্ধ্যায় কোন হলে নাটক মঞ্চস্থ হবে। সকালবেলা দোকানের এক কর্মচারী মালপত্র গোচাচ্ছে। তুষার দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসে, লিষ্ট্ নিয়ে একে একে দাগ দিয়ে দিয়ে মালপত্র বার করাচ্ছে। একটু পরে বেঞ্চের ওপর লিষ্ট্ রেখে তুষার কোন প্রয়োজনে দোকানের ভিতর ঢুকেছে, আর সেই সুযোগে একটা কালো গরু জিভ দিয়ে লিষ্টটা মুখে তুলে চিবতে চিবতে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো। দোকানের বাইরে এসে বেঞ্চে লিষ্ট্ না পেয়ে, তুষার খুব ঘাবড়ে যায়। তারপর গরুর মুখে ঝুলন্ত লিষ্ট্ দেখতে পেয়ে, দু’তিনজন গরুর পিছন পিছন ছুটে, ছুটন্ত গরুর মুখ থেকে ঝুলন্ত লিষ্ট্ উদ্ধার করে। তবে লিষ্টটার অনেকটাই ততক্ষণে গরু হজম করে ফেলেছে। ব্যাপারটার গভীরতা বুঝে তুষারের দাদা ও অন্যা্ন্য কর্মচারীরা তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে। “গরু লিষ্ট্ খেয়ে নিলে, আমি কী করবো”, বলে তুষার আমাদের আড্ডাস্থলে এসে বসলো। শেষ পর্যন্ত কী ভাবে এই বিপদ থেকে মুক্তি পেল জানার সুযোগ হয় নি।
এ হেন তুষারের সাথে চাকরী পাওয়ার পর প্রথম বাইরে যাবার সুযোগ হয়। বাইরে বলতে দীঘা। কিন্তু এখনকার দীঘার সাথে, তখনকার দীঘার কোন মিল ছিল না। নতুন দীঘা, যাকে আমরা নিউ দীঘা বলি, তখন হয়তো কল্পনায় ছিল।
আমি, দীপুদা, মানে ইলেকট্রিক দোকানের মালিক, মাধব ও দি গ্রেট তুষার, একদিন দীঘা গিয়ে পৌঁছলাম। দোতলার ওপর একটা ভাল ঘর পাওয়া গেল। রান্না করার ব্যবস্থাও আছে। কাজেই কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।
প্রথম দিন স্নান সেরে একটা দোকানে গেলাম ভাত খেতে। সেই সময় দীঘায় যাতায়াতের এত সুবিধা না থাকায়, হোটেলের সংখ্যা কম থাকায় এবং অসময়ে যাবার জন্য পর্যটকের ভিড় খুব কম ছিল। একবারে ফাঁকা বললেই ঠিক বলা হয়। একটা ছোট হোটেলে, মিল সিস্টেমে ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারী ও মাছের জন্য দাম ঠিক করে খেতে বসলাম। তুষার যে কত খেতে পারে, সে সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। দোকানদারের তো ছিলই না, তা না হলে সে কখনই মিল সিস্টেমে আমাদের খেতে দিতে রাজী হ’ত না। তিনজনের খাবার তুষার একাই স্বচ্ছন্দে খেয়ে নিয়ে, আবার ভাত চাইলো। আমরা অনেকক্ষণ খাওয়া শেষ করে, শুকনো এঁটো হাতে বসে আছি। হোটেল মালিক জানালো ভাত বসানো হয়েছে, বসতে হবে। তুষার নির্লিপ্ত মুখে ভাতের অপেক্ষায় বসে রইল। বাধ্য হয়ে আমরাও বসে থাকলাম।
যাহোক্, তুষারের ভাত খাওয়া শেষ হলে, রাতের খাবারের প্রসঙ্গে আসা গেল। দোকানদার খুব একটা উৎসাহ দেখাল না। পরদিন দুপুরে মুরগীর মাংস, ভাত পাওয়া যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, জানা গেল আগে থেকে অর্ডার দিতে হবে। সত্তর এর দশকে দীঘার অবস্থা এরকমই ছিল। সে সময় মুরগীর মাংস কিন্তু এখনকার মতো সহজ প্রা্প্য ছিল না। মুরগীর মাংসের দামও, তুলনামুলক ভাবে অনেক বেশী ছিল। বড়লোকের খাদ্য বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে। শেষে রাতে রুটি তরকারী ও পরদিন দুপুরে মুরগীর মাংস ভাতের মৌখিক অর্ডার দিয়ে আমরা ফিরে এলাম।
রাতে খেতে গিয়ে পরের দিনের খাবারের জন্য কিছু অগ্রিম দেবার কথা বলায়, হোটেল মালিক জানালো—“আগ্রিমের প্রয়োজন নেই, কাল অবশ্যই আসবেন। আপনাদের জন্য একটা আস্ত মুরগী রান্না করা থাকবে”।
পরদিন সকলে আমাদের সাথে কুন্ডুবাবুর দেখা হয়ে গেল। এই কুন্ডুবাবুই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সব সময় ভদ্রলোকের হাতে একটা লম্বা টর্চ থাকে। দু’চার কথার পর ভদ্রলোক, আমরা খাওয়া দাওয়ার কী ব্যবস্থা করছি জিজ্ঞাসা করায়, কালকের ঘটনা বললাম। ভদ্রলোক বললেন, “আপনারা চারজন যুবক এসেছেন, ঝাড়া হাত পা, হোটেলে খাচ্ছেন কেন? নিজেরা রান্নার ব্যবস্থা করে নিন। আমি স্টোভ, কেরোসিন এনে দেবার ব্যবস্থা করছি। বাসনপত্র তো হলিডে হোমেই আছে”।
এতক্ষণে জানলাম বাড়িটা আসলে কোন অফিসের হলিডে হোম। কোন পর্যটকের বুকিং না থাকায়, কেয়ার টেকার ও কুন্ডুবাবু গোপনে একটা ব্যবসা করে ফেললেন। এখানে কুন্ডুবাবুর বিরাট পরিচিতি। যাহোক্, কুন্ডুবাবুর পরামর্শ মতো, আমরা ব্যাগ নিয়ে বাজার করে নিয়ে আসলাম। ওদিকে বেচারা মুরগী বিনা কারণে এতক্ষণে বোধহয় প্রাণ দিয়ে বসে আছে।
দীপুদাকে দেখলাম রান্না করতে খুব ভালবাসে। ভাত, ডাল, তরকারী, মাছ ও স্যালাডের ব্যবস্থা করার পর, একটা পায়েস জাতীয় মিষ্টি কিছু করার জন্য ক্ষেপে গেল। অনেক কষ্টে তাকে নিবৃত্ত করে, আমরা চার মুর্তিমান সমুদ্রে স্নান করতে গেলাম। যাবার পথে হোটেল মালিক জিজ্ঞাসা করলো— “কখন আসছেন?”
কিছু বোঝার আগেই তুষার জানালো স্নান সেরে খেতে আসবে, গরম ভাতের ব্যবস্থা করতে।
দীর্ঘক্ষণ সমুদ্রে স্নান করে, হলিডে হোমে ফিরে কলের জলে আর একবার স্নান করে, জামা কাপড় পাল্টে খাবার জন্য তৈরী হ’লাম। দোতলা বাড়ির ওপর তলার একটা ঘরে আমরা আছি। সঙ্গে বাথরুম ও রান্নাঘর। গোটা বাড়িটাতে আর কেউ নেই। কাজের মাসী ঘর পরিস্কার করে দিয়ে গেছে। আমরা চারজন একসাথে খেতে বসলাম। এই প্রথম দীপুদার রান্না খেলাম। ধনেপাতার আধিক্য থাকলেও, মোটের ওপর রান্নাটা সে ভালই করে। পেট ভরে খাবার পরও দেখা গেল প্রচুর ভাত রয়েছে। চারজনের জন্য কতটা চাল নেওয়া প্রয়োজন, সে সম্বন্ধে দীপুদার কোন ধারণা আছে বলে মনে হ’ল না। চারজনে যতটা ভাত খেয়েছি, প্রায় সমপরিমান ভাত তখনও হাঁড়িতে রয়েছে। তুষারকে আজ বাধা দেবার কেউ না থাকায়, গতকালের থেকে অনেক বেশী ভাত খেয়ে, ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। দীপুদা জিজ্ঞাসা করলো এত ভাত বেঁচেছে, কী করা যায়।
আমি বললাম “কাজের মাসীকে দিয়ে দাও, গরীব মানুষ।”
তুষার শুয়ে শুয়ে গর্জে উঠলো— “বাপের পকমিল দেখেছো, না? মাসীকে ভাত দিলেই হ’ল”?
তাহলে অত ভাত নিয়ে কী হবে?
আমি খেয়ে নেব।
কাল দুপুর পর্যন্ত এই ভাত কখনও ভাল থাকে?
আমি এখনই খেয়ে নেব। পয়সা রোজগার করতে হয় না?
দেখলাম তুষার রাজনৈতিক নেতাদের মতো মুখে এক বলে, কাজ করে আর এক জাতীয় চরিত্রের মানুষ নয়। খাট থেকে নেমে এসে, নতুন করে বেশ খানিকটা ভাত নিয়ে, ডাল তরকারী দিয়ে খেতে বসে গেল।
বিকেল বেলা সমুদ্রের ধারে ঘুরে ফিরে ফেরার পথে, হোটেল মালিকের সাথে দেখা হ’ল। কাউন্টারে বসে সে যে দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালো— নেহাত কলি যুগ বলে আমাদের ভষ্ম করে ঋষি হবার সুযোগ থেকে সে বঞ্চিত হ’ল।
রাতেও দীপুদার কৃপায় খাবার ব্যবস্থা বেশ রাজকীয়-ই হ’ল, এবং তিন-এক ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হ’ল, যে সকালের ভাত কালকে মাসীকে দিয়ে দেওয়া হবে।
পরদিন সমুদ্রে স্নান করছি, হঠাৎ দেখলাম কিছুটা দুরে একটা জটলা। দীপুদা ধরেই নিল কেউ সমুদ্রে ডুবে গেছে, এবং সেইমতো আমাকে দুরে যেতে বারণ করলো। অবশেষে খোঁজ নিয়ে জানা গেল সিনেমার সুটিং হচ্ছে। জটলার কাছে গেলাম সুটিং দেখতে। ভিড়ের কাছে গিয়ে অনেক বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীকেই দেখলাম। শুনলাম আগামীকাল উত্তম কুমার আসবেন। ছবির নাম, থাক্ ছবির নামটা না হয় নাই বললাম। কারণ আমার নায়ক উত্তম কুমার বা অন্য কেউ নন, আমার নায়ক শ্রীমান তুষার।
ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ একজন চিৎকার করে তুষারকে ডাকলো। দেখলাম এক যুবক এগিয়ে এসে তুষারের সাথে গল্প করতে শুরু করলো। ফিরে আসার সময় তুষারের কাছে তার পরিচয় পেলাম। ধরা যাক তার নাম, অধম কুমার। সে নাটকে ছোটখাটো রোলে অভিনয় করে। এই ছবিতে সে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে।
পরদিন মাধব দোকান থেকে কী কিনতে গিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল— উত্তম কুমার এসেছেন, সুটিং হচ্ছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে সুটিং দেখতে যাবার জন্য তৈরী হলাম। দীপুদা যেতে রাজী হ’ল না। তার রান্নার কাজ অনেক পড়ে আছে। আমরা তিনজন স্পটে গিয়ে খুব কাছ থেকে উত্তম কুমারকে দেখলাম। অনেকক্ষণ সুটিং দেখলাম। আর দেখলাম সুটিং দলটার ব্যস্ততা ও গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি। দেখলাম না কেবল মহানায়ক অধম কুমারকে।
পরদিন সকালে অন্য একটা স্পটে আবার অনেকক্ষণ সুটিং দেখলাম। আবার দেখলাম সুটং এর ব্যস্ততা। বিকালে সমুদ্রের ধারে অধম কুমারের সাথে দেখা হ’ল। তার বড় বড় কথা শুনতে শুনতে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। তাকে একটু উৎসাহ দেবার চেষ্টাও করলাম।
আপনাদের জীবনটা কত সুন্দর। কতলোক আপনাদের ছবি, আপনাদের অভিনয় দেখে। আপনি এ লাইনে এলেন কী ভাবে?
উত্তমদার ব্যাকিং এ।
আমারও খুব অভিনয় করার সখ। একটা ব্যবস্থা করে দিন না। আপনি চেষ্টা করলে নিশ্চই পারবেন। একটু ব্যবস্থা করে দিন না প্লীজ্।
আসবেন না দাদা, একদম আসবেন না। হাড় ভাঙ্গা খাটুনি। চব্বিশ ঘন্টা পরিশ্রম করতে হয়। আমাদের লাইনে চল্লিশ ঘন্টায় দিন হলে ভাল হ’ত।
ভাল পারিশ্রমিকও তো পান?
হ্যাঁ, তা তো দিতেই হবে। খালি পেটে তো আর অভিনয় আসে না। তবে খাটুনির তুলনায় কিছুই দেয় না।
খাবার বা থাকার ব্যবস্থা নিশ্চই খুব ভাল?
ওটা ভাল দেয়। মিথ্যা বলবো না, সকাল বেলা ব্রেকফাষ্টে মাছ, মাংস, ডিম যা চাইবেন তাই।
ব্রেকফাষ্টে মাছ, মাংস?
না না, ব্রেকফাষ্ট ঠিক নয়, মানে দুপুর বেলা।
কতক্ষণ কাজ করতে হয়?
ঐ যে বললাম, কাজের কী আর শেষ আছে? যখন ডাকবে সঙ্গে থাকতে হবে, বড় পার্ট তো। আপনারা দশটা পাঁচটা করে অভ্যস্ত, আপনারা সুখে আছেন।
তুষার হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসলো, সে আমার পরিচয় জানে কী না। অধম কুমার আমার পরিচয় জানেনা বলায়, তুষার আমাকে দেখিয়ে বললো, “এ একজন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার”।
আমার গলায় একটা ছোট, অতি সাধারণ কোডাক ক্যামেরা। তাও আবার মাধব কার থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছে। ছবি তোলার অভ্যাস বা সুযোগ কোনটাই আমার নেই। গতকাল সমুদ্রে স্নান করার সময় স্রোতের টানে ক্যামেরাটা সমুদ্রে চলে গেছিল। সেটাকে উদ্ধার করে আনলেও, সেটা জলে ভিজে ঠিক মতো কাজ করছে না। শার্টার টিপলে ক্যামেরার লেন্সের মুখ খুলে আর বন্ধ হচ্ছে না। চড়চাপড় মেরে কাজটা সারতে হচ্ছে। যথেষ্ট সন্দেহ আছে আদৌ ছবি উঠবে কী না।
তাই নাকি? আপনি ফটোগ্রাফার? ভেরি গুড। খুব ভাল হ’ল। আপনার সঙ্গে কী কী ক্যামেরা আছে?
দু’চারটে ক্যামেরার নাম শুনেছি। সেই মতো বললাম, একটা ইয়াসিকা, একটা নিকন ম্যাট, আর এটা।
খুব ভাল, খুব ভাল। আপনাকে কিন্তু একটা উপকার করতে হবে। উত্তমদার সাথে আমার একটা ছবি তুলে দিতে হবে। জাষ্ট্ একটা পাবলিসিটি আর কী। একটা কাগজের সাথে জানাশোনা আছে, তাতে ছাপার ব্যবস্থা করে নেব। আপনারা চিন্তা করবেন না, আপনাদের উত্তমদার অটোগ্রাফ ম্যানেজ করে দেব। উত্তমদার সাথে আপনাদের ছবিও তুলে দেবার ব্যবস্থা করে দেব।
আমি একটু কিন্তু কিন্তু করতেই, সে জানালো আগামীকাল সকালে সে আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। কোন অসুবিধা হবে না।
আমরা এগিয়ে গেলাম। সে আমাদের ফিল্মী কায়দায় আঙ্গুল নেড়ে সী-ইউ গোছের কী একটা বললো। ব্যাপারটাকে কোন গুরুত্ব না দিয়ে, ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতে করতে, বাসায় ফিরে এলাম।
পরদিন সকাল ন’টা-সাড়ে ন’টা নাগাদ দীপুদা রান্নার জোগাড়ে ব্যষ্ত, মাধব আর আমি মাছ বেছে পরিস্কার করছি, হঠাৎ একটা চিৎকার— এই তু-উ-উ-ষা-আ-আ-র-র। আবার সেই একই সুরে চিৎকার।
মাথা উচু করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি, মূর্তিমান বিভীষিকা বেশ ড্রেস দিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর কথা ভুলেই গেছিলাম। এবার আমার ভয় পাওয়ার পালা। সত্যিই যদি সে আমাদের উত্তম কুমারের কাছে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে এই ক্যামেরায় ছবি তুলতে গেলে মারধর না খেতে হয়।
দীপুদাকে বললাম বলে দাও আমরা বাড়ি নেই, বাজারে গেছি। কিন্তু দীপুদা কিছু বলার আগেই, তুষার তাকে ওপরে এসে চা খেয়ে যেতে বললো।
নারে এখন হাতে একদম সময় নেই, ওকে পাঠিয়ে দে। ফেরার সময় চা খেয়ে যাব। শুধু চায়ে হবে না, দুপুরে মাংস ভাতের ব্যবস্থা কর। কথাগুলো বলতে বলতে, সে দোতলায় উঠে এল।
বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত হাত ধুয়ে, জামা প্যান্ট পরে, অকেজো ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে তৈরী হ’লাম।
এটা না নিয়ে ভাল ক্যামেরাটা সঙ্গে নিয়ে নিন। বুঝতেই পারছেন একটা পাবলিসিটির ব্যাপার, ছবিটা ভাল হওয়া প্রয়োজন। দাদার সাথে আপনাদের ছবিটাও ভাল হ’লে, বড় করে বাঁধিয়ে রাখতে পারবেন। একটা স্মৃতি।
“বাবুরা অন্য ক্যামেরাগুলোর ফিল্ম্ শেষ করে রেখেছেন। অনবরত ছবি তুলে বেড়াচ্ছে। আসলে প্রফেসনাল ফটোগ্রাফার তো, ছবি তোলাটাই নেশা”— হাসিমুখে কথাগুলো বলে, তুষার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো।
শেষ পর্যন্ত মাধবকে নিয়ে, অধম কুমারের সাথে চললাম, উত্তম কুমারের ছবি তুলতে। কী রকম একটা ভয় ভয় করতে লাগলো। সমুদ্রের ধারে গিয়ে অধম বাবুর বন্ধুর সাথে দেখা হ’ল। যে ছবির সুটিং হচ্ছে, তার পরিচালক নাকি এই বন্ধুটির কাকা। শুনলাম এই বন্ধুটিও নাকি এই ছবিতে অভিনয় করছে।
আপনাদের অভিনয় করতে দেখলাম না তো?
কেন? গতকাল গুরু যখন গাড়ি নিয়ে বাংলোতে ঢুকলেন, তখন আমি এগিয়ে এসে প্রণাম করলাম, সে দৃশ্যটাই দেখেন নি?
বন্ধুটি বেশ জোর গলায় প্রতিবাদ করলো—“তুই কোথায়? ঐ দৃশ্যে তো আমি প্রণাম করলাম”।
শেষে মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে আসা গেল, যে তারা দু’জনেই প্রণাম করেছে।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর। আরও অনেকের সাথে, মাত্র দশ ফুট দুর থেকে গতকাল ঐ দৃশ্য দেখেছি, দু’জনের কাউকেই প্রণাম করতে দেখিনি।
এই ক’দিন সুটিং এর গাড়িগুলোকে অনবরত ছোটাছুটি করতে দেখেছি। এক স্থান থেকে অপর স্থানে, এক স্পট্ থেকে অপর স্পটে, যাতায়াতে তারা সদাই ব্যস্ত।
অধম কুমার জানালেন, উড়ি্য্যার বর্ডারে সুটিং হচ্ছে। তিনি আরও জানালেন, চিন্তার কোন কারণ নেই, হাত দেখালেই সুটিং এর যে কোন গাড়ি তাদের ও আমাদের লিফ্ট দেবে।
কিন্তু তার হাত দেখানো সত্বেও কোন গাড়ি না দাঁড়ানোয়, আমরা হেঁটেই উড়িষ্যার বর্ডারে চললাম। বন্ধুটি কিন্তু বারবার তাকে সাবধান করে অতদুর যেতে বারণ করতে লাগলো।
কাকা কিন্তু গতকালই সন্ধ্যায় তোকে হোটেল ছেড়ে দিতে বলেছেন। গিয়ে কাজ নেই, ফিরে চল্। হোটেল ছেড়ে দিতে হবে।
একটু পরেই তো ফিরে আসবো। জাষ্ট্ দু’টো ছবি তুলেই ফিরে এসে লাগেজ নিয়ে কলকাতায় ফিরে যাব।
এই ভাবে আমরা আরও অনেকক্ষণ হাঁটার পরও, কোথাও কোন সুটিং হ’তে দেখলাম না। সম্ভবত এদের ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।
শেষে বন্ধুর কথায়, অধম কুমার আমাকে বললেন— “দুঃখিত দাদা, আপনাকে উত্তমদার সাথে ছবি তুলে দিতে পারলাম না, বা অটোগ্রাফ জোগাড় করে দিতে পারলাম না”।
এমন ভাবে কথাগুলো বললো, যেন আমরাই তাকে আমাদের ছবি তোলার জন্য নিয়ে যাচ্ছি। একবার ভাবলাম ওর একটা অটোগ্রাফ চেয়ে দেখি কী করে, কিন্তু অযথা আর সময় নষ্ট করতে ইচ্ছা করলো না।
যাহোক, ওরা ফিরে গেল। আমরা আরও কিছুক্ষণ সমুদ্রের ধারে ঘোরাফেরা করে, অনেকটা পথ হেঁটে, ঘেমেনেয়ে বাসায় ফিরলাম। তুষার সব শুনে বললো “ও থিয়েটারে ছোটখাটো অভিনয় করে। বোধহয় এই ছবিতে কাউকে ধরে মৃত সৈনিকের অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে।
তাই যদি জানিস তো ওকে উসকে আমাকে বিপদে ফেললি কেন?
আরে ও তো চিরকালের মুরগী। ওকে মুরগী করাতে কত আনন্দ, তোরা বুঝবি কী?
এই হল শ্রীমান তুষার। কত অদ্ভুত সব মানুষের সাথে যে ওর পরিচয়, ভাবলেও অবাক হতে হয়।
সেবার ডিসেম্বর মাসে আমরা চারজন আবার একসাথে বেরলাম। লক্ষ্য— শিমুলতলা, দেওঘর। সাত দিনের টুর। চারদিন শিমুলতলা, তিনদিন দেওঘর। অফিসেরই হলিডে হোম বুক করা হ’ল। টিকিট কাটাও হ’ল, এখন শুধু যাওয়ার অপেক্ষা। দীপুদা রান্নার দায়িত্ব নিয়ে নিল। তুষার শুধু বললো শিমুলতলা মুরগীর জায়গা, প্রাণভরে মুরগী আর ডিম খেতে হবে।
নির্দিষ্ট দিনে খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে আমরা শিমুলতলা স্টেশনে পৌঁছলাম। অসম্ভব ঠান্ডা। স্টেশন থেকে বেরিয়ে, চা খেয়ে, অনেকটা পথ হেঁটে, একপ্রান্তে আমাদের হলিডে হোমে পৌঁছলাম। রাস্তায় দীপুদা দুপুরে কী কী রান্না হবে ঠিক করে ফেললো। তুষার শুধু জিজ্ঞাসা করলো -- “দুপুরে মুরগী না খাসি”?
দীপুদা জানালো শুধু মুরগীর ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া যায় না। কাজেই ডাল, ভাজা, তরকারীও সে করবে। হলিডে হোমে মালপত্র রেখে, মুখ হাত ধুয়ে, আবার অনেকটা পথ হেঁটে, স্টেশনের কাছে চা জলখাবার খেতে আসা হ’ল। এখানে রাস্তার পাশে একটা মিষ্টির দোকানে দেখলাম গরম গরম কচুরি. সিঙ্গারা, জিলিপী ভাজা হচ্ছে। এই দোকানটায় খদ্দেরও অনেক। একটু অপেক্ষা করে, একটা বেঞ্চ খালি হতে, আমরা চারজন জায়গা দখল করলাম। খাবারের অর্ডার দেওয়া হ’ল। সামনে একটা বিশাল রাক্ষসে কড়াতে বড় বড় অগুনতি ল্যাংচা সদ্য তৈরী হয়ে চিনির রসে সাঁতার কাটছে। সংখ্যায় যে কত হবে সঠিক বলা যাবে না। বিশাল কড়ার দু’পাশে ততোধিক বিশাল দু’টো হাতল। আমরা কচুরি পর্ব প্রায় শেষ করে এনেছি। এরপরে দু’টো করে ল্যাংচা, না চারটে করে জিলিপী, এটা যখন প্রায় স্থির করে ফেলেছি, ঠিক তখনই ঘটলো সেই হাড় হিম্ করা কান্ডটা।
হঠাৎ তুষার “ওরে বাবারে” বলে বেঞ্চে বসা অবস্থায়, ডান পা টা বিদ্যুৎ গতিতে শুন্যে তুললো। ওর পায়ে ছিল শিলিগুরি থেকে কেনা হালকা বিদেশী হাওয়াই চপ্পল। চোখের পলক ফেলার আগে দেখলাম, ওর পা থেকে হাওয়াই চপ্পলটা হাওয়াই জাহাজের মতো শুন্যে উড়ে গিয়ে, ঐ ল্যাংচার এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করছে। চারপাশে অনেক ক্রেতা দাঁড়িয়ে, বসে খাবার খাচ্ছে। ঐ দৃশ্য দেখে সকলে হৈ হৈ করে উঠলো। কিন্তু আমাদের কপাল ভাল, কড়ার হাতলে আঘাত পেয়ে হাওয়াই চপ্পল ভূপতিত হ’ল।
হাওয়াই চপ্পল ল্যাংচার কড়াইতে পড়লে দোকানদারের সাথে একটা রফা হয়তো করা যেত, বিশেষ করে আমরা যখন বড় খদ্দের, কিন্তু সেটা তো এত লোকের উপস্থিতিতে সম্ভব হ’ত না। কে আর সাধ করে, পয়সা দিয়ে, রসে ভেজা চটি ও ল্যাংচার একসাথে অত ঘনিষ্ট অবস্থান দেখেও, ল্যাংচাকে আদর করে ঘরে তুলবে বা পেটে পুরবে?
কী রে? কী করছিলি বলতো? এখনি তো বিরাট টাকা ক্ষতিপুরণ দিতে হ’ত।
মাইরি আর কী। আমি কী করবো, কুকুর পা চাটলে আমার কী করার আছে?
আসলে সকলে খাবার খেয়ে, শালপাতা দোকানের সামনে রাস্তাতেই ফেলছে। একটা কুকুর শালপাতা থেকে তরকারী চেটে খাচ্ছিল। বেঞ্চের নীচে, তুষারের পায়ের কাছে একটা শালপাতা চেটে খাওয়ার সময়, তুষারের পায়ের গোড়ালি চেটে দিয়েছিল। হঠাৎ ভয় পেয়ে ও পা তুলতেই এই অঘটন।
বাজারে গিয়ে মুরগীর দর করে তো আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসলাম। এখানে তো আমাদের হাওড়া, কলকাতার থেকেও মুরগীর দাম বেশী। অনেকক্ষণ বাজারে ঘুরে কাঁচা আনাজ, ডিম, চাল ও অন্যান্য্ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাসায় ফিরে এলাম।
দীপুদা মহানন্দে রান্না শুরু করলো। আমরা এক রাউন্ড চা খেয়ে, চারপাশটা ঘুরে দেখতে গেলাম। অনেকখানি জমি, তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। জমির একপাশে হলিডে হোম। হলিডে হোমের ঘেরা জমিতে, একটা বিশাল ইঁদারা আছে। বেশ বড় বড় গাছপালাও অনেক আছে।
দুপুরে ইঁদারার ঠান্ডা জলে স্নান সেরে, দীপুদার হাতের ডাল, ভাজা, ডিমের ঝোল দিয়ে আহার সারলাম।
বিকেলের দিকে চারজনে ঘুরতে বেরিয়েছি, হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন তুষারকে ডাকলো। পিছন ফিরে দেখি রোগা ছিপছিপে একটা বছর ত্রিশের ছেলে। মাথায় পাগড়ীর মতো করে গামছা জড়ানো, সরু গোঁফ ঠোঁটের দু’পাশে গোল করে পাকানো, বাঁ হাতে একটা সরু লাঠি, ডান হাতে কী যেন ছুড়ে ছুড়ে মুখে ফেলে চিবচ্ছে। ওর একটু পিছনে, একটা বছর কুড়ি-বাইশ বছরের বিবাহিতা মেয়ে ও বছর পঁচিশের একটা ছেলে। মেয়েটার নতুন বিয়ে হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। ছেলেটার পোষাকও বেশ মার্জিত। তুষারতো তাকে দেখে অবাক, আমরা আতঙ্কিত।
কী রে কবে এলি?
দিন তিনেক হ’ল এসেছি। তোরা কবে এসেছিস?
আজ ভোরে। কিন্তু তোর এ কী দশা? মাথায় গামছা জড়িয়েছিস কেন? এ রকম পাকানো গোঁফই বা কেন রেখেছিস?
এ কথার কোন জবাব না দিয়ে, সে পিছনের মেয়েটার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল। তার স্ত্রী। নতুন বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর বেড়াতে এসেছে। হয়তো হনিমুনে এসেছে। সঙ্গের ছেলেটা তার ছোট ভাই, অর্থাৎ মেয়েটার দেবর।
তা তুই এ রকম জোকার সেজেছিস কেন?
আরে জসমিন দেশে যদাচার। এখানকার লোক আমাকে স্থানীয় লোক মনে করে ঠিক দাম নেবে। তোরা এখানকার বাজারটা ঘুরেছিস? বাজারের হাল দেখেছিস?
মেয়েটাকে দেখে মনে হ’ল স্বামীর পাগলামিতে সে লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জা পাওয়াটাই স্বাভাবিক। হনিমুন করতে এসে জিনিসপত্রের দাম কম নেবে বলে, কারোকে গামছা মাথায় জড়িয়ে, হাতে লাঠি নিয়ে, সরু পাকানো গোঁফ রেখে, ভেজানো ছোলা খেতে খেতে, নতুন বউকে পিছনে ফেলে, রাস্তা হাঁটতে দেখিনি। তুষারের সৌজন্যে এ জীবনে আরও কত দেখবো, কে জানে।
পরদিন সকালে তুষার তাল তুললো–- সাঁওতাল এলাকায় এসে মহুয়া খাব না, এ হতেই পারে না। মহুয়ার নাম ওর মতো আমরাও শুনেছি, কিন্তু জিনিসটা কখনও চোখে বা চেখে দেখিনি। ওর কথায় বুঝলাম, ও নিজেও কখনও খায় নি বা চোখেও দেখে নি।
এখানে সাঁওতাল দেখলি কোথায়? একজন সাঁওতালও তো চোখে পড়লো না।
আরে আছে আছে। খোঁজ নিলেই জানা যাবে।
খোঁজ নেওয়ার পাটটাও সেই সারলো। বাইরে থেকে ঘুরে এসে জানালো, স্টেশন ছাড়িয়ে দুরে যে ঢিবি পাহাড়টা দেখা যায়, তার নীচে সাঁওতালদের বাস। সব খোঁজ নিয়ে এসেছি, এবার দয়া করে আমার সঙ্গে তোরা চল্।
দীপুদা রান্না করবে তাই যাবে না। মাধব জানালো অতটা পথ হাঁটা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আমিও একটা জুতসই অ্যালিবাই খোঁজার আগেই, সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো। যাবার আগে দুপুরে মাংস ভাতের মেনু ঠিক করে দিয়ে গেল।
বাইরে এসে দেখি দুরে, বহুদুরে তুষারের সেই স্বপ্নের ঢিবি পাহাড়। দশ-বিশ কিলোমটার দুরে হলেও হতে পারে। এখান থেকে ঠিক দুরত্ব বোঝা মুশকিল। আমি ওকে ওখানে না যাবার জন্য অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম।
আরে এ তো অনেক দুর। ওখানে গিয়ে ফিরে আসতেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তার থেকে চল্ রান্নাবান্নায় হেল্প্ করে, ক্যারাম খেলি।
অনেক দুর বলে কী এখানে কেউ মহুয়া খায় না? তুই কী এখানে ঘুমতে, খেতে আর ক্যারাম খেলতে এসেছিস? এই বয়সেই এত কুঁড়ে হলে বুড়ো হলে কী করবি ব্যা? ওরা রান্নাবান্না দেখুক, আমরা এই কাজটা অন্তত করি।
সত্যি, আমাদেরও তো একটা কাজ করা দরকার। তাই তুষারের এই মহান কাজে, আমাকে সঙ্গ দিয়ে সাহায্য করতেই হ’ল। প্রায় ঘন্টা খানেক হাঁটার পরও দেখি পাহাড়টা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। দুরত্ব এক ইঞ্চিও কমেছে বলে মনে হ’ল না।
তুষার প্লীজ্ ফিরে চল্। দু’-তিনদিন এখানে থাকবো। তার একটা দিন এভাবে নষ্ট করিস না।
আশ্চর্য, এখানে ঘরে বসে তুই কী রাজকার্য করবি বল্ তো? তাছাড়া এতটা পথ হেঁটে এসে, এখন আর ফিরে যাবার কোন মানে হয় না।
এখনও ফিরে চল্, এরপর আরও বেশী পথ হেঁটে ফিরতে হবে। ফিরতে ফিরতে অনেক বেলাও হয়ে যাবে।
আরে হলিডে হোমে ফিরে তো শুধু স্নান সেরে মাংস ভাত খাওয়া। আর কোন্ কাজটা আছে শুনি?
কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ঐ শীতেও সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। অবশেষে আরও অনেকটা পথ, অনেক সময় নিয়ে হাঁটার পর, পাহাড়টার কাছে পৌঁছালাম। ছোট ছোট ঝুপড়ির ঘর। সামনে মাটির দালান, পালিশের মতো চকচক্ করছে। কী যে পরিস্কার করে ওরা জায়গাটাকে রেখেছে, ভাবা যায় না। জল তেষ্টায় আমার ছাতি ফাটার উপক্রম। আমাদের দেখেই মেয়েরা বাচ্ছা কাঁকে ঘরে ঢুকে গেল। দু’জন পুরুষ এসে আমাদের কী প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করায়, তুষার মহুয়ার কথা বললো।
ক’বোতল লাগবে?
চার বোতল।
একজন ভিতরে চলে গেল। অপরজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আমরা কোথা থেকে এসেছি।
কলকাতা।
কলকাতা? সেখানে আমার ভাই থাকে। সে কেমন আছে জানো?
কলকাতার কোথায় থাকে?
ওর মাথা খারাপ আছে। আমার বৌকে চাকু মারতে গেছিল। কলকাতায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সে কেমন আছে বলতে পার?
কলকাতার কোথায়? কোন হাসপাতালে?
কলকাতার হাসপাতালে।
বুঝলাম কলকাতা মানে তার কাছে তার পাহাড়ের কোলে পাড়ার মতোই। এ বিষয়ে এর সঙ্গে কথা বলা বৃথা।
ঠিক আছে, ফিরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে চিঠি লিখে জানাবো।
ঠিক আছে বাবু।
একটু খাবার জলের কথা বলতেই, ভিতর থেকে চকচকে ঘটি করে ঠান্ডা জল এনে দিল। ঘটিটা সোনার তৈরী কী না জানিনা, রঙ দেখে মনে হয়, হলেও হতে পারে।
এরমধ্যে ভিতর থেকে তালপাতার ছিপি লাগানো, বিয়ারের বোতলের মতো চারটে সবুজ রঙের বোতল নিয়ে, আগের লোকটা বাইরে এল।
তুষার দাম জিজ্ঞাসা করায় সে দাম জানালো। মহুয়ার দামের থেকে বোতলের কশন্ মানি বেশী। তুষার একটুও সময় নষ্ট না করে, আমাকে সান্তনা দিল— “কাল বোতল ফেরৎ দিলেই তো টাকা পেয়ে যাব। চিন্তা করিস না”।
হায় রে! এই দশ টাকার জন্য কাল সকালে আবার দশ-বিশ কিলোমিটার পথ হাঁটতেও সে প্রস্তুত। এখন আর তার হনিমুনে আসা বন্ধুকে অস্বাভাবিক মনে হ’ল না। সে নাকি কোন যাত্রা দলে তবলা বাজায়। সে কনিষ্ঠ কী না, গঙ্গারামের ভাই কী না, বা যাত্রা দলে পাঁচ টাকা পায় কী না জানিনা, তবে তাকে তুষারের বন্ধু হিসাবে মানায়।
যাহোক্, তুষার দাম মিটিয়ে, দু’হাতে দু’টো বোতল নিয়ে, আমাকে বললো— “দাঁড়িয়ে না থেকে একটু হাত লাগা”।
আমরা সঙ্গে কোন ব্যাগ নিয়ে আসিনি। চার চারটে মহুয়ার বোতল, হাতে ঝুলিয়ে এতটা পথ যাওয়া ঠিক হবে কী না ভাবছি।
চল্। দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? সময় নষ্ট করিস না। বাড়ি ফিরতে হবে তো না কী?
খানিক পথ এসে বললাম— “তুষার, এভাবে দু’হাতে দুটো করে বোতল নিয়ে গেলে পুলিশ ধরতে পারে”।
কেন? পুলিশ ধরবে কেন? মগের মুলুক না কী? পয়সা দিয়ে কিনেছি তো, নাকি মাগমা পাওয়া গেছে?
তবু তোর এগুলো কেনা ঠিক হয় নি। আইনত এরা এগুলো বিক্রী করতে পারে কী না, তাই বা কে জানে?
আমার কথায় তুষার একটু ভেবে বললো— “তবে চল, দুটো বোতল ফেরৎ দিয়ে আসি”।
তাতে কী সুবিধা হবে জানিনা, তবু আমরা ফিরে এসে দুটো বোতল ফেরৎ দিয়ে দিলাম। কিন্তু পূর্বের লোকটা জানালো, সে আমাদের দেওয়া টাকা দিয়ে ধার শোধ করে দিয়েছে। কাজেই আজ সে টাকা ফেরৎ দিতে পারবে না। কাল সকালে দু’টো বোতল ফেরৎ দিতে আসলে, দু’টো ফাঁকা বোতলের জমা রাখা টাকা ও ফেরৎ দেওয়া দু’টো মহুয়ার বোতলের দাম সে আমাদের দিয়ে দেবে।
অসম্ভব গরীব লোক। কাল কেন, কোন কালেই টাকা ফেরৎ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কাজেই টাকার চিন্তা ছেড়ে, কোন মতে তুষারকে নিয়ে ফিরে যাবার চেষ্টা করলাম।
দাঁড়া, দাঁড়া। তোর বুদ্ধিতে চললেই হয়েছে আর কী। কাল কোথা থেকে টাকা ফেরৎ দেবে ভেবে দেখেছিস একবার? তার থেকে চারটে বোতল নিয়েই যাওয়া যাক্।
পুলিশের ভয়, হাতে করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার অসুবিধা, ইত্যাদি বুঝিয়ে কোন মতে ওর হাতে দু’টো বোতল ধরিয়ে, ফেরার পথ ধরলাম।
দুপুর রোদে হলিডে হোমে ফিরে দেখি, দীপুদারা স্নান সেরে খাটে শুয়ে গল্প করছে। আমাদের ফিরতে এত বেলা হওয়ায়, রাগে গজগজ্ করতে শুরু করলো।
তুষার জানালো বেড়াতে এসে সময় ধরে কিছু করা যায় না। তাহলে বেড়াতে আসা কেন? টাইম টেবল্ নিয়ে বাড়িতে বসে থাকলেই তো হয়। ফিরে গিয়েই তো আবার সেই ঘানি টানতে হবে।
একটু বিশ্র্রাম নিয়ে, জামা প্যান্ট ছেড়ে ইঁদারার জলে স্নান করতে গেলাম। তুষার বোতল খুলে মহুয়াটা দু’নম্বর কী না পরীক্ষা করতে বসলো।
একটু পরেই তুষার ইঁদারার কাছে এসে জানালো— “আর চিন্তা নেই, এখন থেকে এবলা ওবলা শুধু মুরগীর রোষ্ট”।
মুরগী পেয়েছিস? থ্যাঙ্ক ইউ। কোথায় পেলি?
তোদের মতো খাওয়া, ঘুম আর ক্যারাম নিয়ে থাকলে তো আমার চলে না। সব দিক তো আমাকেই সামলাতে হয়। সব দিকে নজর রাখতে হয়। ঐ লোকটা মুরগী নিয়ে যাচ্ছিল। আমাকেই তো সব দায়িত্ব নিতে হয়, তাই নিয়ে নিলাম।
একটু দুরে একটা লোককে ঝাঁকা মাথায় যেতে দেখলাম। তুষারের ওপর আজ সকালের সমস্ত রাগ ভুলে, নতুন করে একটা ভালবাসা, একটা শ্রদ্ধা জন্মালো। খুশী মনে ভিজে গায়ে বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখি, একগাদা দু’এক দিনের গোল গোল মুরগীর বাচ্ছা উঠানময় চরে বেড়াচ্ছে। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, সবে ডিম থেকে বেরিয়েছে।
আরে এগুলো নিয়ে কী করবি? এ তো সবে ডিম ফুটে বেরিয়েছে। একদিনের বাচ্ছা। এগুলো কখনও খাওয়া যায়?
দুর বোকা, তোর আর বুদ্ধি কোনদিন পাকবে না। বুদ্ধি থাকলে সব হয়। গম ছেটাবো বড় হবে। তারপর এবলা ওবলা মুরগীর রোষ্ট, আর কচি মুরগীর ঝোল।

আমরা তো আর দু’দিন থাকবো। গমই বা পাবি কোথায়, আর বড়ই বা কবে হবে, যে রোষ্ট্ খাবি?
ও বোধহয় এবার বুঝলো যে কাঁচা কাজ হয়ে গেছে। শেষে ভিজে গায়ে দৌড়ে গিয়ে, লোকটাকে ডেকে এনে, অনেক অনুরোধ করে মুরগীর বাচ্ছাগুলো ফেরৎ দিতে সক্ষম হলাম। তবে সেকেন্ডহ্যান্ড বই এর মতো, বিক্রয়মূল্য অবশ্যই ক্রয়মূল্যের থেকে অনেক কম হ’ল।
পরদিন সকালেই দীপুদা ও তুষার জানালো শিমুলতলা জায়গাটা তাদের ভাল লাগছে না। আজই তারা দেওঘর চলে যেতে চায়।
ইচ্ছা না থাকলেও শিমুলতলার পাততাড়ি গুটিয়ে দেওঘর চলে আসতে বাধ্য হলাম। শিমুলতলা আমার ভাল লেগেছিল। ছেড়ে যেতে কষ্টও কম হচ্ছিল না। তবু কষ্টের মধ্যেও সান্তনা— সঙ্গে অতগুলো মুরগী ছানা বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে না, বোতলের দাম আদায় করতে দশ-বিশ কিলোমিটার পথ অহেতুক হাঁটতে হচ্ছে না, আর অবশ্যই তুষারের মতো একজন জিনিয়াস সঙ্গে আছে। দেওঘরের কথা আর একদিন বলা যাবে।

আপনার মতামত জানান