প্রতীক্ষাপ্রান্তর

অদিতি সরকার


অসীম ট্যুরে গেছে পাঁচদিনের জন্য, তিতিরও কলেজে৷ একা বাড়িতে লম্বা দুপুরটা কাটতে চাইছিল না৷ নন্দিনীর দিনের বেলায় ঘুমোনোর অভ্যেস নেই৷ চেষ্টা করে দেখেছে, ঘুম আসেই না৷ বিছানায় শুয়ে শুধুই এপাশ ওপাশ করা৷ সে আরও যন্ত্রণার৷ টিভিটাও দেখার উপায় নেই, সেই কখন থেকে টানা লোডশেডিং চলছে৷ শীতকালেও যে কেন এত কারেণ্ট যায় কে জানে৷ কিছু না পেয়ে আজকের কাগজটা নিয়েই বিছানায় গড়াচ্ছিল নন্দিনী৷ সকালে পাঁচ রকম কাজের তাড়ায় হেডলাইন ছাড়া আর কিছু ভালো করে দেখাই হয় না৷ অবশ্য দেখার আছেই বা কী৷ সেই তো চারটে খুন আর সাতটা ধর্ষণ৷ সঙ্গে গোটা দুই অপহরণও থাকতে পারে৷ আর নয়তো রাজনীতির কচকচি৷ তার সঙ্গে বোঝার উপর শাকের আঁটি পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনের ঘটা তো আছেই৷ খবরের কাগজ না বিজ্ঞাপনের কাগজ বোঝা দায়৷ সময় কাটাতে হাতে ধরে রাখাই সার৷ মন বসছিল না৷ এ পাতা থেকে ও পাতায় এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে ঘুরতে আচমকাই চোখটা পার্সোনাল কলামে আটকে গেল৷ ডান দিকের কোণে একদম তলার দিকে ছোট ছোট কয়েকটা অক্ষর৷ আলাদা করে সেইভাবে চোখে পড়ার কথাই নয়৷ তবু পড়ল৷ হয়ত পড়ার ছিল বলেই৷ ‘জেনিফার ক্যাথারিন ম্যাকলেন অফ হ্যাপি নুক, জোরহাট – পাসড অ্যাওয়ে পীসফুলি, অ্যাট হার রেসিডেন্স৷ ফিউনারেল মাস অন’...
জেনিফার ম্যাকলেন? জোরহাটের জেনিফার ম্যাকলেন? এই নামে অনেকদিন আগে একজনকে চিনত না নন্দিনী? একই নাম, একই জায়গা, অন্য কেউ বলে মনে তো হচ্ছে না৷ হ্যাপি নুকের জেনিফার ম্যাকলেন বলতে তো একজনের কথাই মনে পড়ে৷ মিস ম্যাকলেন তাহলে এতদিনে মারা গেলেন৷ বয়স তো অনেকই হয়েছিল৷ কে দিল নোটিসটা? চার্চ থেকেই হবে নিশ্চয়ই৷ নন্দিনী অন্যমনস্কভাবে হাতের কাগজটা ভাঁজ করতে করতে ভাবে৷ শেষ কবে দেখা হয়েছিল যেন? বহুদিন হয়ে গেল তাও তো৷ আশ্চর্য, একেবারে ভুলেই গিয়েছিল মহিলার কথা৷ অথচ একসময়...
#
অসীমের পোস্টিং তখন ছিল অসমের জোরহাটে৷ বিয়ে ও তার পরবর্তী বাধ্যতামূলক লোকলৌকিকতা, তথাকথিত হানিমুন ইত্যাদির পাট চুকলে নন্দিনী ওখানেই গিয়ে প্রথম সংসার পেতেছিল৷ তথাকথিত- কারণ তখন তো আর লোকে এত ঘটা করে মধুচন্দ্রিমা পালনে বেরোত না৷ ওই একটু সপ্তাহান্তিক পুরী কি দার্জিলিং ভ্রমণেই প্রেমের চাঁদ একেবারে হাতে এসে ধরা দিত৷
নন্দিনী অসীমের বিবাহোত্তর প্রথম একা একা বেড়াতে যাওয়াও পুরীতেই৷ প্রথম সমুদ্র দেখা৷ যতদূর চোখ যায় শুধু ঢেউ আর ঢেউ৷ সে যে কী আশ্চর্য আনন্দ৷ প্রথম দুজনে একা হওয়া৷ প্রথম সত্যিকারের চেনাশোনা৷ তা সে সব পর্ব মিটিয়ে অসীম বউকে নিয়ে একেবারে লম্বা পাড়ি দিল সেই সুদূর আসাম৷ হ্যাঁ, তখন আসামই বলত লোকে, অসম তখনও চালু হয় নি৷
জোরহাট টাউন থেকে একটু দূরে কিছুটা ভেতরের দিকে ছিল ওদের বাড়িটা৷ বেশ নির্জনই ছিল পাড়াটা সেই সময়৷ এককালে খাঁটি সাহেবপাড়াই ছিল, দিন যেতে যেতে তখন অবশ্য দোআঁশলা৷ অধিকাংশ সাহেব বা আধাসাহেবই বাড়িবুড়ি বেচে কেউ ইংল্যাণ্ড কেউ অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমিয়েছে৷ যাবার সময় যে যা দামে পেরেছে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে৷ যারা কিনেছে সস্তায় দাঁও মেরেছে৷ প্রচুর জায়গা, বাগান, ফলের গাছ টাছ নিয়ে এক একটা বাড়ি৷ এরকমই কোনো সাহেবের ফেলে যাওয়া বাড়ির একতলাটা অসীমের অফিস থেকে তাদের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছিল৷
কলকাতায় ও রকম বাড়ি স্বপ্নের অতীত৷ বিরাট বড় বড় চারখানা ঘর, আলো ভরা বাথরুম, বাদশাহি রান্নাঘর, সঙ্গে আবার আলাদা প্যাণ্ট্রি, চারদিক ঘুরিয়ে কাঠের জাফরি ঝোলানো টানা বারান্দা, মানে এককথায় এলাহি ব্যাপার৷ কিন্তু এত বড় বাড়িতে সারাদিন একা একা কাটাতে নন্দিনীর দম বন্ধ হয়ে আসত৷ তাদের মানিকতলার বাড়িও যথেষ্টই বড়৷ কিন্তু সেখানে ছিল কাকা কাকি জেঠা জেঠি তুতো ভাইবোন সবাইকে নিয়ে বিশাল যৌথ পরিবার৷ একা থাকা তার অভ্যেসই ছিল না কোনদিন৷ চেষ্টা করলেও ও বাড়িতে একা থাকা যেত না৷
সেই হট্টমালার দেশ থেকে বিয়ে হয়ে এসে পড়ল এই ভূতবাংলায়৷ প্রথম দিন দেখেই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ‘ও বাবা, এ যে ক্ষুধিত পাষাণ৷’ এহেন বেফাঁস মন্তব্যে অসীম অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ চোখে তার তখনও নতুনের গন্ধ মাখা বউয়ের দিকে তাকায়৷ এর পর থেকে নন্দিনী আলটপকা কথাবার্তার ব্যাপারে নিজেকে খুবই সতর্ক এবং সংযত করে ফেলেছিল৷ কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাগল পাগল লাগত৷ ঘর মোছা বাসন মাজার জন্য একজন আর কাপড়চোপড় কাচার জন্য একজন, এই দু জন স্থানীয় আদিবাসী কাজের মেয়ে ছিল, কিন্তু সারাদিনের জন্য নয়৷ সকাল সকাল এসে দশটার মধ্যে সব কাজ সেরে তারা চলে যেত৷ কতটুকুই বা কাজ থাকত দুজনের সংসারে৷ তাদের ওদিককার ভাষাও নন্দিনী সবটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারত না৷ ফলে সঙ্গী হিসেবে তারা খুব একটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে নি৷
তিতির হয় নি তখনও৷ অসীম অফিসে বেরিয়ে গেলে অত বড় বাড়িতে একলা নন্দিনী৷ সঙ্গী বলতে সারাদিন ট্র্যানজিস্টরে বিবিধ ভারতী আর না হলে রেডিও সিলোন৷ এখনকার মত ঘরে ঘরে টিভি তখন কোথায়? শূন্যতা যেন বিশাল হাঁ করে তাকে গিলে খেতে এগিয়ে আসত৷ উপরতলায় কোনো ভাড়াটেও ছিল না যে গল্প করে সময় কাটাবে৷ পাড়াটাও এত চুপচাপ৷ লোকজন বাস করে বলে বোঝাই মুশকিল৷ কলকাতার শোরগোলের একেবারে বিপরীত৷ কী করে যে দিনগুলো কাটত এখন ভাবলেও অবাক লাগে৷ তখনই কোনও এক সময় মিস ম্যাকলেনের সঙ্গে নন্দিনীর পরিচয়৷
নন্দিনীদের বাড়িটার ঠিক পাশেই একটা একতলা বাংলো প্যাটার্নের ছোট বাড়ি ছিল৷ রঙচটা, ধুলোটে৷ চওড়া কাঠের গেটের রং এককালে হয়ত সাদাই ছিল, বা অন্য কিছুও হতে পারে, বলা মুশকিল, কারণ বহুদিনের অযত্নে অবহেলায় সেটা একটা অবর্ণনীয় শেড ধরে নিয়েছিল৷ কার্নিশে যেখানে সেখানে বেয়াড়া বট অশ্বত্থের চারার যথেচ্ছ জবরদখল অভিযান৷ দেওয়ালের জায়গায় জায়গায় বৃষ্টি গড়ানো শ্যাওলাটে সবুজ দাগ৷ গেটের পাশে বহু বছরের ময়লায় কালচে হয়ে যাওয়া ফলকে কষ্ট করে পড়া যায় ‘হ্যাপি নুক’৷ বাগান হয়তো কোনকালে একটা ছিল, নন্দিনীর চোখে যেটা পড়েছিল তাকে বাগানের অপভ্রংশও বলা চলে না৷
এই বাড়িতেই থাকতেন জেনিফার ম্যাকলেন৷ একাই৷ কাজের লোকটোকও কেউ ছিল না৷ অন্তত নন্দিনী তো কোনওদিন কাউকে থাকতেও দেখে নি, আসতে যেতেও দেখে নি৷ থাকলে কি আর একদিনও কাউকে দেখা যেত না? সঙ্গী বলতে একটি বৃদ্ধ পমেরেনিয়ান কুকুর৷ এত দিন পরে হঠাৎ তার নামটাও আজ নন্দিনীর মনে পড়ে গেল৷ পিক্সি৷ তাকে নিয়ে রোজ সকাল বিকেল হাঁটতে বেরোতেন৷ চুপচাপ মাথা নিচু করে কোনো দিকে না তাকিয়ে একটু ঝুঁকে হেঁটে যেতেন, আবার ওই ভাবেই বাড়ি ফিরে আসতেন৷ যতদিন নন্দিনী ছিল ওখানে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা এ রুটিনে কোনদিন ছেদ পড়তে দেখে নি৷
মিস ম্যাকলেনের মত নিরুত্তাপ মানুষ নন্দিনী আজ পর্যন্ত আর দ্বিতীয় একজন দেখল না৷ কোনও মানুষ যে তার চারপাশের জগৎ সম্বন্ধে এতটাই নিরাসক্ত হতে পারে ভাবা যায় না৷ কারমেল কনভেণ্টে ইংরেজি পড়াতেন৷ শোনা কথা, ছাত্রীরা নাকি আড়ালে বলত ‘আইসবার্গ’৷ স্বভাবের জন্য না চেহারার জন্য সেটা জানা যায় নি৷ তবে দু দিক থেকেই নামটা মানানসই৷
রোগাপাতলা ছোটখাটো চেহারা৷ গায়ের রং পুরনো খবরের কাগজের মত৷ সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন মুখ৷ পাতলা ফ্যাকাশে ঠোঁট৷ ফ্যাকাশে সবজেটে চোখের মণি৷ ফ্যাকাশে বাদামি চুল৷ চিরটাকাল পরনে হালকা রঙের ছাঁটকাটহীন ঢোল্লা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুলের ফ্রক৷ সব মিলিয়ে একজন ফ্যাকাশে মানুষ৷ কেউ ডেকে কথা বললে উত্তরে বাধ্য হয়ে ভদ্রতাসূচক দু চারটে কথা যা বলার বলতেন, নইলে চুপচাপ৷ গলার আওয়াজও চেহারার মতই নিষ্প্রভ, নিরুত্তেজ৷ কোনও ওঠাপড়া নেই৷ স্কুল, বাড়ি আর পিক্সির মধ্যেই ওঁর জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল৷ প্রতি রবিবার অবশ্য নিয়ম করে চার্চে যেতেন৷ আর প্রতি মাসে দুয়েক দিন বাড়ি তালা বন্ধ রেখে সম্ভবতঃ গৃহস্থালির টুকটাক কেনাকাটার জন্য টাউনেও যেতেন৷ কারণ এবং গন্তব্য স্থলটা লোকের ধরে নেওয়া৷ কোনওটাই কারও সঠিক জানা ছিল না, কারণ উনিও কোনওদিন কাউকে ডেকে বলেন নি, আর ওঁর কাছে কোনওদিন কেউ জানতেও চায় নি৷ কাকেই বা বলবেন, কেই বা জানতে চাইবে৷ আর কোথায়ই বা যাবেন৷ কুকুরটি ছাড়া তো তিনকুলে কোথাও কেউ ছিলও না৷ অন্ততঃ আছে বলে কেউ জানত না৷ উনি যে দিনগুলো বাড়ির বাইরে থাকতেন সেই কটা দিনের জন্য পিক্সি চার্চের ফাদার অ্যাণ্টনির কাছে থাকতে যেত৷
নন্দিনী বলতে গেলে সেধেই আলাপ করেছিল৷ ওঁর বাড়িতেও গিয়েছিল কয়েকবার৷ উনি অবশ্য বিশেষ আসতেন টাসতেন না৷ দেখা হলে বেড়ার পাশে বা গেটের ওধারে দাঁড়িয়েই সামান্য দু চারটে সৌজন্যমূলক কথা বলে চলে যেতেন৷ বাড়ির ভেতরে ঢুকতে স্পষ্টই অনীহা ছিল৷ তবে পরের দিকে মাঝে মধ্যে কেক বা বিস্কিট গোছের কিছু ভালমন্দ বানালে ডাক দিতেন৷ নন্দিনী খেয়েও আসত, নিয়েও আসত৷ জিজ্ঞাসা করে করে শিখেও নিয়েছিল ওঁর কাছ থেকে নানারকম কিছু কিছু৷
একদিন, শুধু একদিনই মিস জেনিফার ক্যাথারিন ম্যাকলেনকে অন্যরকম দেখেছিল নন্দিনী৷ একটা পুরো দিন৷
#
সেদিন সকালে একটু বেলার দিকে মিস ম্যাকলেনের গেটের লেটারবক্সে পিওন চিঠি ফেলে গিয়েছিল একটা৷ নন্দিনী নিজের শোবার ঘরে কী যেন করছিল৷ জানালা দিয়ে ব্যাপারটা দেখতে পেয়ে মনে মনে একটু অবাকই হয়েছিল৷ এতদিনের মধ্যে কোনও দিনও ও বাড়িতে কোনও চিঠিপত্র আসতে দেখে নি সে৷ পিক্সির ডাকাডাকির আওয়াজ পেয়েই আসলে তার চোখ বাইরের দিকে গিয়েছিল৷ সে বেচারাও পিওন নামক খাকি পোশাকধারী অপরিচিত জীবটিকে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে পাহারাদারির সহজাত সারমেয় প্রবৃত্তি পালনের তাগিদে পরিত্রাহি চেঁচিয়ে যাচ্ছিল৷ একটু পরে মিস ম্যাকলেনের ভাবভঙ্গি দেখে নন্দিনীর অবাক হওয়ার মাত্রাটা আরও বেড়ে গিয়েছিল যেন৷ পিক্সির চিৎকারে উনিও বেরিয়ে এসেছিলেন৷ পিওন তখন চলে যাচ্ছে৷ যেতে যেতে হাতের ইশারা করে বুঝিয়ে দিল চিঠি দিয়ে গেছে৷ উনি খানিকক্ষণ যেন কিছু না বুঝে পিওনের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে ছিলেন৷ তারপরে পায়ে পায়ে গেটের দিকে এগোলেন৷
নন্দিনী ঘটনাটা কী ঘটছে দেখার জন্য জানালার পাশ থেকে সরে নি, ওখান থেকেই তাকিয়ে ছিল৷ মিস ম্যাকলেন লেটারবক্স থেকে চিঠিটা বার করে একটু হতবুদ্ধি ভাবে প্রথমটা ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ বাদামি কাগজের খামটা হাতে নিয়ে ভুরু কুঁচকে উলটে পালটে দেখছিলেন, বোঝার চেষ্টাই করছিলেন হয়তো তাঁকে কে চিঠি লিখতে পারে৷ তারপরে ওখানে দাঁড়িয়েই খামটা ছিঁড়ে চিঠিটা বার করলেন৷ নন্দিনী আশ্চর্য হয়ে দেখল চিঠিটা পড়তে পড়তেই ওঁর হাবভাব কেমন পালটে গেল৷ দূর থেকেও সে বুঝতে পারছিল মহিলা থরথর করে কাঁপছেন৷ হাত বাড়িয়ে একবার গেটটা ধরারও চেষ্টা করলেন৷ নন্দিনীর ভয় হচ্ছিল উনি পড়ে টড়ে না যান৷ হয়ত কোনও খারাপ খবর আছে চিঠিতে৷ তারপরে আরোই অবাক হয়ে গেল যখন দেখল উনি ওদের বাড়ির দিকেই আসছেন৷
মিস ম্যাকলেন বেল বাজানোর আগেই নন্দিনী বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল৷ জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন উনি৷ মুখচোখ যেন কেমন কেমন৷ নাকের তলায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে৷ কিছু না বলে অকস্মাৎই নন্দিনীর দিকে চিঠিটা বাড়িয়ে ধরলেন৷ নন্দিনীও কিছু না বুঝেই ওঁর হাত থেকে ওটা নিয়ে নিল৷ পড়তে ইশারা করছিলেন মিস ম্যাকলেন৷ তখনও কথা বলতে পারছিলেন না৷ নন্দিনী আগে ওঁকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘরে বসাল৷ খাবার জল এনে দিল তাড়াতাড়ি এক গ্লাস৷ উনি এক নিশ্বাসে জলটা শেষ করে গ্লাসটা ফিরিয়ে দিলেন৷ তারপরে কেমন যেন গা ছেড়ে দিয়ে সোফার পিছনে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করলেন৷ নন্দিনী নজর ফেরাল হাতে ধরা চিঠিটার দিকে৷
চিঠিটা লিখেছেন কোনও এক ডাক্তার এস পি বরুয়া৷ ইংরেজিতে লেখা চিঠির বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায়-
‘ডিয়ার জেনিফার,
আশা করি ভালোই আছ৷ তোমার জন্য সুখবর আছে একটা৷ তুমি হয়ত জেনে খুশি হবে যে ফ্র্যাংকলিনের মধ্যে আজকাল আগের থেকে অনেক বেশি উন্নতি দেখা যাচ্ছে৷ গত সপ্তাহে ওর ঘরে রাখা তোমার ছবিটা দেখে তোমাকে চিনতে পেরেছিল৷ কাল নিজে থেকেই বলল, জেনি খুব ভাল চকোলেট কেক বানায়৷ আমার মনে হচ্ছে নতুন ওষুধটায় বোধহয় কাজ হচ্ছে৷
যে জন্য তোমাকে চিঠিটা লেখা৷ আমি ভাবছিলাম এ মাসে তুমি না এসে যদি আমিই ফ্র্যাংকলিনকে নিয়ে তোমার কাছে যাই তাহলে কেমন হয়? একটা চেঞ্জও হবে ওর৷ তাই এই বৃহস্পতিবার বিকেলে তোমার বাড়ি আসছি আমরা৷ তৈরি থেক৷’ তারপরে আবার পুনশ্চ দিয়ে লিখেছেন-‘ খুব বেশি কিছু আশা কোর না৷ এই রিঅ্যাকশনগুলো প্রায়ই খুব একটা পার্মানেণ্ট হয় না৷ তবুও লেট আস হোপ ফর দ্য বেস্ট৷’
বৃহস্পতিবার? বৃহস্পতিবার তো আজকেই৷ কিন্তু কে এই ডাক্তার বরুয়া? যে ফ্র্যাংকলিনের কথা চিঠিতে আছে সে-ই বা কে? আর এই চিঠি পেয়ে মিস ম্যাকলেনেরই বা অমন অবস্থা কেন হল? নন্দিনী সত্যি কিছুই বুঝতে পারে না৷ এ প্রহেলিকার উত্তর একমাত্র মিস ম্যাকলেনই জানেন৷ ধাঁধায় পড়ে সে মিস ম্যাকলেনের দিকে তাকায়৷ আর অবাক হয়ে দেখে মিস ম্যাকলেন কেমন যেন অদ্ভুত চোখে ওর দিকেই চেয়ে আছেন৷ চেয়ে আছেনও, আবার নেইও৷ ওঁর ওই ফ্যাকাশে সবুজ চোখের দৃষ্টি যেন নন্দিনীকে ভেদ করে, এ ঘর ছাড়িয়ে কোথায় কতদূরে উধাও হয়ে গেছে৷
আস্তে আস্তে একটি দুটি করে কথা বলতে আরম্ভ করেন জেনিফার ম্যাকলেন৷ তারপরে বাঁধভাঙা বন্যার মত বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক দিনের অনেক জমে থাকা কথা৷ গলার আওয়াজ থরথর করে কাঁপে৷ আর নন্দিনী স্তব্ধ হয়ে শুনতে থাকে এক আশ্চর্য কাহিনী৷ যাকে কাহিনী না বলে রূপকথা বলাই বোধহয় উচিত৷
#
আসাম চা বাগিচার দেশ৷ আর চা বাগিচা মানেই প্ল্যাণ্টার৷ প্রথম দিকে খাঁটি সাহেবরাই বাগান চালাত৷ পরে আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে৷ সে জায়গায় আসতে শুরু করে দেশি সাহেবরা৷ এ কাহিনীর যখন শুরু তখন সবে এদেশ স্বাধীন হয়েছে৷ কিছু কিছু বাগানে দুয়েকজন সাদা চামড়া সাহেব তখনও ছিল৷ তাদেরই একজন রঙালি টি এস্টেটের ছোট সাহেব প্যাট্রিক ম্যাকলেন৷ প্যাডি সাহেব৷ প্যাডি সাহেবকে সবাই চিনত দুটো কারণে৷ এক নম্বর কারণ তার দিলদরিয়া স্বভাব৷ গায়ের রঙটা তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত ঠিকই, তা নইলে এদেশের লোকেদের সঙ্গে মেলামেশায় সে সাহেব আর নেটিভের কোনও ফারাকই রাখত না৷ কত প্ল্যাণ্টারদের কত অত্যাচারের কাহিনী সে সময় বাগানের কুলি কামিনদের মুখে মুখে ফিরত, কিন্তু প্যাডি সাহেব সম্বন্ধে কেউ কোনওদিনও অমন কথা ভাবতেও পারত না৷ আর দু নম্বর কারণ তার মা-মরা একমাত্র মেয়ে জেনি মেমসাহেব৷ জেনিফার ক্যাথারিন ম্যাকলেন৷ বলতে গেলে সেটাই তখন সাহেবকে চেনার প্রধান কারণ৷ বিশেষ করে উঠতি যুবকদের মধ্যে৷ উনিশ বছরের জেনি পাহাড়ি ঝর্ণার মত চঞ্চল, পরিদের মত সুন্দর৷ প্যাডি সাহেব তার মেয়েকে রাইডিং শিখিয়েছে, শ্যুটিং শিখিয়েছে৷ জেনি মেমসাহেব যখন তখন একাই ঘোড়া ছুটিয়ে দু চক্কর ঘুরে আসে৷ ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে তার আগুনের মত লাল চুল হাওয়ায় উড়তে থাকে, ঝকঝকে সবুজ দু চোখ দুরন্ত যৌবনের তীব্র আনন্দে জ্বলজ্বল করে৷ জেনি মেমসাহেবকে দেখলে অতি বড় গোমড়ামুখোদেরও মন ভাল হয়ে যায়৷ সেই সময় আশপাশের ছোটবড় যত গার্ডেনের সব ইয়ং ম্যানদের জীবনের একটাই লক্ষ্য, কে জেনিকে একটু খুশি করতে পারে৷ পিকনিক, টি-পার্টি, ক্রিসমাস ড্যান্স সবের মধ্যমণি জেনি ম্যাকলেন৷ মিস স্টুয়ার্ট, মিস ব্রাউনদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না৷ জেনির সঙ্গে একটা ড্যান্স মানে জীবন সার্থক৷ জেনি কারও দিকে চেয়ে একটু হাসলে সে নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ভাবতে একটুও দ্বিধা করে না৷
জেনি কাউকে নিরাশ করে না৷ কিন্তু কাউকে আশাও দেয় না৷ আজ ব্রিজ পার্টিতে ডিকি রবার্টসনকে পার্টনার করলে পরের দিন নাচের ফ্লোরে তার সঙ্গী হয় জেরি উইলিয়ামস৷ কেউ তার কাছে বিশেষ নয়৷ সবাই তার ভাল বন্ধু, ব্যস৷
বিশেষ তার এক জনই৷ সেই ছোটবেলা থেকেই৷ ফ্র্যাংকি৷ তখন ছিল শুধুই ফ্র্যাংকি৷ বড় হয়ে হল টগবগে তরুণ আর্মি অফিসার ক্যাপ্টেন ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন৷ প্যাডি সাহেবের বন্ধু ফ্রেডি ক্লিফটনের একমাত্র ছেলে৷ খাঁটি সাহেব ছিল না অবশ্য সে৷
ফ্রেডি ক্লিফটন এদেশে আসার আগে ছিল বার্মায়৷ আজকাল যে দেশের নাম হয়েছে মায়ানমার৷ তখন লোকে বার্মা বলেই জানত৷ ফ্রেডি ক্লিফটন ভালবেসে বিয়ে করেছিল সেই বার্মারই এক সুন্দরী মেয়েকে৷ ফ্র্যাংকি ছিল তাদের ভালবাসার ফসল৷ মিশ্র রক্তের সন্তান৷ ওই যাদের বলা হয় অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান৷ অনেকে তখন বলত ইউরেশিয়ান৷ মোট কথা সংকর রক্ত৷
তাতে অবশ্য বাগানের কারো কিছু আসত যেত না৷ ওখানে অনেকেরই জন্মের ইতিহাস ফ্র্যাংকির মতই৷ তাও তো তার মা পাতা তোলা কামিন ছিল না৷ যথেষ্ট শিক্ষিত, ধনী ঘরের মেয়ে ছিল তার মা৷ কেবল বিজাতীয়, বিধর্মীকে বিয়ে করার অপরাধে সে মেয়ের পরিবার তাকে ত্যাগ করে৷
ফ্র্যাংকির যখন বারো বছর বয়স তখন তার মা বাবা দুজনেই এক সাঙ্ঘাতিক কার অ্যাকসিডেণ্টে মারা যায়৷ এ দেশে তার আর কেউ ছিল না৷ বহু দূর আয়ারল্যাণ্ডে এক কখনও না দেখা কাকা ছিল বটে, সে ভাইপোকে নিয়ে যেতেও চেয়েছিল, কিন্তু ফ্র্যাংকি নিজে তার কাছে আদৌ যেতে চাইছিল না৷ ঝুটঝামেলায় না গিয়ে প্যাডি সাহেব ফ্যুনারেল হয়ে যাবার পর সটান ফ্র্যাংকিকে নিজের কাছে রঙালিতে নিয়ে চলে এসেছিল৷ জেনির বয়েস তখন আট৷ সেই থেকে জেনি আর ফ্র্যাংকি একসঙ্গেই বড় হয়েছে৷
দশ বছর বয়েস থেকেই জেনি জানত সে ফ্র্যাংকির৷ কী করে জানত জানে না৷ কিন্তু জানত৷ ফ্র্যাংকিও যেমন জানত জেনি তার৷ একমাত্র তার৷ তারা দুজন একে অপরের জন্যই তৈরি৷ আর কেউ কখনও তাদের মধ্যে আসবে না, আসতে পারে না৷ এই ধ্রুব সত্যিটা মনের মধ্যে গেঁথে রেখেই জেনি দশ থেকে উনিশ হয়েছে, ফ্র্যাংকি হয়েছে তেইশ৷
‘হি ওয়জ সাচ আ হ্যাণ্ডসাম ডেভিল য়ু নো৷ অ্যাণ্ড ডেয়ারিং৷ আর্মি জয়েন করল৷ ইউনিফর্ম পরে আমার সামনে দাঁড়াত, নানডিনি, বিলিভ মি, আমি মেল্ট করে যেতাম৷ আমাকে পেছনে বসিয়ে কী স্পিডে যে মোটরবাইক চালাত ভাবতে পারবে না৷ আই থট মাইসেল্ফ দ্য লাকিয়েস্ট গার্ল অ্যালাইভ৷’
নন্দিনী রূপকথা শুনছে৷ এই মিস ম্যাকলেনকে সে চেনে না৷ দেখে নি কোনওদিন৷ মিস ম্যাকলেনের গলায় উনিশের জেনি কথা বলে চলে৷ গলার আওয়াজ আর কাঁপছে না এখন৷ সেই কণ্ঠস্বরের সম্মোহনী ওঠাপড়া নন্দিনীকে আবিষ্ট করে ফেলে৷ রূপকথার নায়িকা স্মৃতিমগ্ন হয়ে নিজের কাহিনী শোনাতে থাকে৷
‘সেদিন সানডে ছিল, জান৷ আমাদের ফর্মাল এনগেজমেণ্ট হয়ে গেল৷ ফ্র্যাংকি আমাকে আংটি পরাল৷ আমি পরালাম ফ্র্যাংকিকে৷ চার্চে বিয়ের নোটিস পড়ল৷ তিন মাস পরে আমাদের বিয়ে৷ উই ওয়্যার সো হ্যাপি দ্যাট ডে৷’ হালকা হাসির রেখা জেনিফার ম্যাকলেনের ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়৷
নন্দিনী অবাক বিস্ময়ে মিস ম্যাকলেনের দিকে চেয়ে দেখতে থাকে৷ তার চোখের সামনে মধ্য চল্লিশের বর্ণহীন মিস ম্যাকলেন আস্তে আস্তে খোলস ঝরিয়ে আদ্যন্ত জেনি হয়ে ওঠে৷ পুরনো কাগজের মত গালে গোলাপি রক্তোচ্ছ্বাস, চোখে পান্নার দ্যুতি৷
গুনগুন করে কত দিনের কত কথা বলে যান মিস ম্যাকলেন৷ আর নন্দিনীর চোখের সামনে আস্তে আস্তে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে রঙালি টি এস্টেট, জেনি মেমসাহেব আর সুদর্শন, ডাকাবুকো ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন৷
আর তার পরে সেই রাতের কথা৷ জেনি আর প্যাডি সাহেবের সঙ্গে ডিনার সেরে ইউনিটে ফিরছিল ক্যাপ্টেন ক্লিফটন৷ ঠিক কী যে সে রাতে হয়েছিল কেউই জানে না, কিন্তু পরের দিন সকালে রাস্তার পাশে দোমড়ানো মোচড়ানো মোটরবাইকটা ও তার থেকে অনেকটাই দূরে ন্যাকড়ার পুতুলের মত তালগোল পাকিয়ে পড়ে থাকা ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটনের রক্তাক্ত অচৈতন্য শরীরটা দেখেছিল ভোরের পথচলতি বাগানশ্রমিকরা৷ খুব সম্ভবতঃ কোনও মাতাল লরির ধাক্কায় বাইক শুদ্ধু রাস্তা থেকে ছিটকে গিয়েছিল ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন৷
‘ওরাই ওকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল৷ পকেটে ডায়রি ছিল, তাতে আমার ছবি, ঠিকানা ছিল৷ হাসপাতাল থেকে আমাদের খবর দেয়৷’
মাথায় সাঙ্ঘাতিক আঘাত লেগেছিল ফ্র্যাংকির৷ বাঁচার আশাই ছিল না৷ দীর্ঘ সাঁইত্রিশ দিন কোমায় অচেতন ছিল সে৷ তারপরে জ্ঞান যখন ফিরল তখন ক্যাপ্টেন ফ্র্যাংকলিন ক্লিফটন নিজের নামটুকুও মনে করতে পারে না আর৷ হাসপাতালের বিছানায় ফ্র্যাংকি তখন স্মৃতিহীন, ভাষাহীন এক মানবশরীর৷ শুধুই চেয়ে থাকে শূন্য চোখে, কিছুই বোঝে না, চেনে না কাউকেই৷
প্যাডি সাহেব অনেক করেছে তখন৷ মিলিটারির ডাক্তার ছাড়াও আরও বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছে৷ সবারই এক কথা৷ আশা ছাড়লে চলবে না৷ সময়, সময়ই করতে পারে যা করবার৷ ফ্র্যাংকির খুব ভাল বন্ধু ছিল ডাক্তার বরুয়া৷ সে-ও তাই বলে গেছে অহর্নিশ৷ ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো৷
ধৈর্য ধরেছে জেনি৷ প্যাডি সাহেবের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে গেছে একদিন, কিন্তু জেনির ভরসা ভাঙে নি৷ প্যাডি সাহেব অনেক বুঝিয়েছে মেয়েকে, মন পালটাবার অনেক চেষ্টা করেছে, তারপরে একদিন বোধহয় মনের দুঃখেই ফট করে মাথার শিরা ছিঁড়ে ওপরে চলে গেছে৷
এই হ্যাপি নুক বাড়িটা অনেকদিন আগে কিনেছিল প্যাডি সাহেব৷ কখনও কোনও দরকারে বাগান থেকে টাউনে এসে রাত হয়ে গেলে এখানেই থেকে যেত৷ সাহেব মারা যাবার পর জেনিরও বাগানের পাট চুকে গিয়েছিল৷ সেই তখন থেকেই জেনি এখানে৷ সেও আজ প্রায় ছাব্বিশ বছর হয়ে গেল৷ এখান থেকে মাসে মাসে হাসপাতাল যেতেও সুবিধে৷ ধৈর্য ধরে থাকতে থাকতে ফ্র্যাংকির মুখে ধীরে ধীরে একটা দুটো কথা ফুটল৷ আর দিনে দিনে কখন যেন রঙালির চুলবুলি জেনি মেমসাহেব আস্তে আস্তে সব রঙ ঝরিয়ে ফ্যাকাশে মিস ম্যাকলেন হয়ে গেল৷
সেই ফ্র্যাংকি আজ ডাক্তার বরুয়ার সঙ্গে আসছে, জেনির বাড়িতে৷
‘তুমি বিকেলে একটু থাকবে আমার সঙ্গে, নানডিনি, প্লিজ়? আয়্যাম ফিলিং সো নার্ভাস৷ ফ্র্যাংকি এতদিন পরে আসছে আমায় মিট করতে৷’ নন্দিনী খুব অবাক হয়ে দেখে মিস ম্যাকলেন সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরীর মত টুকটুকে গোলাপি হয়ে যাচ্ছেন৷
বিকেলে মিস ম্যাকলেনকে চেনা যাচ্ছিল না৷ ঘন সবুজ সিল্কের একটা অপূর্ব ফ্রক পরেছেন৷ পুরনো কাটের জামা, কিন্তু কী যে সুন্দর মানিয়েছে ওঁকে৷ ঝলমল করছেন যেন৷ নন্দিনী কখনও লক্ষ্যই করে নি, মিস ম্যাকলেনের হাত পায়ের পাতা কী অদ্ভুত সুন্দর৷ ঝিনুকের মত পাতলা, শাঁখের মত মসৃণ৷ লম্বা আঙুলের ডগায় বাদাম শেপের হালকা গোলাপি নখ৷ চোখ মুখ চেপে রাখা উত্তেজনার আঁচে গনগন করছে৷ এই অপরূপা মিস ম্যাকলেন কোথায় ছিলেন এতদিন? নন্দিনী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না৷
অস্থির ভাবে ঘরের মধ্যে ছটফট করে বেড়াচ্ছিলেন জেনিফার৷ বার বার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন৷ লজ্জাও পাচ্ছিলেন, নন্দিনী তাঁর অস্থিরতা বুঝতে পারছে বলে৷ টেবিলে একটা ট্রে আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছেন৷ চায়ের যাবতীয় সরঞ্জাম, আর একটা বড় প্লেট ভর্তি নিজের হাতে তৈরি চকোলেট কেক৷ এত উত্তেজনার মধ্যেও কখন যেন ঠিক সময় করে বানিয়ে ফেলেছেন৷
গাড়ির শব্দটা একই সঙ্গে দুজনের কানেই আসে৷ নন্দিনী মিস ম্যাকলেনের দিকে তাকায় একঝলক৷ যেখানে ছিলেন সেখানেই একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন উনি৷ মুখ থেকে সব রক্ত নেমে গিয়ে বরফের মত সাদা দেখাচ্ছে৷ এক হাত দিয়ে অন্য হাতটা এত জোরে আঁকড়ে ধরেছেন যে আঙুলের গাঁটগুলো চামড়ার নিচে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে৷ গলার কাছে নীলচে শিরা দেখা যাচ্ছে৷ বন্ধ দরজাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন জেনিফার৷ নন্দিনীই এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খোলে৷
দুজন মানুষ৷ একজনকে স্পষ্টই বোঝা যায় এদিককার অধিবাসী বলে৷ চেহারায় মঙ্গোলয়েড ভাব প্রবল৷ খুব সম্ভব ইনিই ডাক্তার এস পি বরুয়া৷ এক হাত দিয়ে আরেকটি মানুষের কাঁধ জড়িয়ে রেখেছেন৷ আর সে...আর সে...সেই মানুষটি এক বিশাল বৃক্ষের বাজ পড়া শুকনো কাণ্ড৷ ঝুঁকে পড়া লম্বা শরীর, পোড়া তামাটে গায়ের রং৷ নীল হাওয়াই শার্ট তার গায়ে ঢলঢল করছে৷ গাল ভাঙা, চোখের কোলে গভীর ক্লান্তি৷ কানের দু পাশে কিছু পিঙ্গলে সাদায় মেশানো চুল৷ বাকি মাথা ফাঁকা৷ বয়স আন্দাজ করা অসম্ভব৷ পঞ্চাশও হতে পারে, পঁচাত্তরও হতে পারে৷ পিঠে ডাক্তার বরুয়ার হাতের চাপ অনুসরণ করে পা ঘষে ঘষে সে এগিয়ে আসতে থাকে নন্দিনীর দিকে৷
‘হ্যালো জেনি৷’ নন্দিনী ডাক্তার বরুয়ার কথায় সচেতন হয়ে পিছনে তাকায়৷ কখন যেন মিস ম্যাকলেন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন৷ ‘আমরা এসে গেছি৷’
কথার জবাব দেন না জেনিফার৷ তাঁর দৃষ্টি শুধু দ্বিতীয় মানুষটির দিকে৷ ডাক্তার বরুয়া তার পিঠে চাপ দেন৷ ‘চিনতে পারছ ফ্র্যাংক? তোমার জেনিকে?’
ফ্র্যাংক নীরব থাকে৷ চোখে কোনও ভাষাই ফোটে না৷ মিস ম্যাকলেন নিজের হাতদুটো এত শক্ত করে মুঠি করেন তালুতে নখ কেটে বসে যায়৷ মুখ একবার লাল একবার সাদা হয়৷ নন্দিনীর ভেতরে কী একটা ভাঙতে থাকে, ভেঙে ভেঙে যায়৷
ডাক্তার বরুয়া আস্তে আস্তে ফ্র্যাংককে ভেতরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসান৷ সামনে টেবিলে মিস ম্যাকলেনের সাজানো ট্রে৷
‘দেখেছ ফ্র্যাংক, চকোলেট কেক৷ তুমি তো ভালোবাস৷ দ্যাখো, জেনি নিজে বানিয়েছে, তোমার জন্য৷ টেক ওয়ান, ম্যান৷’
ফ্র্যাংকি দুহাতে দুটো কেকের টুকরো তুলে নেয়৷ বাচ্চাদের মত একবার এ হাত একবার ও হাত থেকে কামড়ায়৷ থুতনিতে গুঁড়ো গুঁড়ো ঝরে পড়া কেক মাখামাখি হয়ে যায়৷ শব্দ করে চিবোয় ফ্র্যাংকি৷ অথচ কী আশ্চর্য, মুখে কোনও অভিব্যক্তি ফোটে না৷
‘আর এক পিস কেক নেবে ফ্র্যাংকি?’ জেনিফার খুব নরম গলায় বলে৷
ফ্র্যাংকি কোনও উত্তর দেয় না৷ শুনতে পেল কী না তাও বোঝা যায় না৷ তাকিয়ে থাকে সোজা, নির্বিকার৷ ফাঁকা দৃষ্টি জেনিফারকে ভেদ করে চলে যায়৷ তার হাতে মুখে আইসিঙের ক্রীম আর কেকের গুঁড়ো লেগে থাকে৷ সে বুঝতেও পারে না, বসে থাকে স্থির৷ জেনিফার ফ্র্যাংকির সোফার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে৷ অসীম মমতায় পরিষ্কার নরম ন্যাপকিন দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দেয়, হাত মুছিয়ে দেয়৷
গোধূলির রং আস্তে আস্তে সন্ধ্যায় পালটে যেতে থাকে৷ আগে থেকে সাজিয়ে রাখা ট্রে-র কাপ ভর্তি চায়ে সর পড়ে যায়৷ ঘরের কোনায় কোনায় অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে৷ টেবিলবাতিটা জ্বেলে দেয় নন্দিনী৷
জেনিফার ফ্র্যাংকির দুটি হাত মুঠিতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেই থাকে৷ হাতদুটি অল্প অল্প কাঁপে, পাতলা দুটি ঠোঁট কত কিছু বলতে চেয়ে থিরথির করে৷ কিন্তু কোনও কথাই বেরোয় না৷ ফ্র্যাংকির মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে চোখের পলকও বুঝি পড়ে না তার৷ অথচ ফ্র্যাংকি পাথরের মূর্তির মত স্থির৷ বোধহীন, ভাষাহীন৷
ঘরের মধ্যে ক্রমশ তুষারের মত ভারি হয়ে জমতে থাকা একরাশ হিমশীতল নৈঃশব্দ্য নন্দিনীকে চেয়ারে গেঁথে রাখে৷ নড়াচড়া করলেই যেন কী একটা ঘটে যাবে৷ সে শুধু দু চোখ মেলে এই ট্র্যাজিক মূকাভিনয় দেখতেই থাকে৷ গলার কাছে কী যে ভীষণ কষ্ট শক্ত হয়ে ডেলা পাকায়, সে জোর করে করে গিলে গিলে সেই ডেলাকে নিচে পাঠায়৷ চেয়ার ছেড়ে উঠতেও পারে না, কোনও কথাও বলতে পারে না ৷ কেমন আচ্ছন্ন হয়ে বসে থাকে৷ শীত শীত করে তার৷ কতক্ষণ যে কেটে যায় এমনি করেই৷
ডাক্তার বরুয়াই শেষে উঠে দাঁড়ান৷ শব্দ করে গলা পরিষ্কার করেন৷ ‘সরি জেনিফার৷’ নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে অনেক ক্ষণ পরে ওঁর কথাটা যেন ভীষণই জোরে বেজে ওঠে মনে হয় ৷ চোখ তুলে তাকাতে পারছিলেন না ভদ্রলোক৷ গলা নামিয়ে আবার বলেন, ‘এবার যেতে হবে আমাদের৷’
ডাক্তারের গলার আওয়াজে ঘোর ভাঙে জেনিফারের৷ ‘ফ্র্যাংকি আমার কাছে থাকতে পারে না? প্লীজ ডাক্তার? ও তো অনেক ভালো আছে আগের থেকে৷ ওকে তো এখন তোমরা এখানেই রাখতে পার৷’ জেনিফারের কণ্ঠস্বরে একরাশ আকুল আর্তি ধরা পড়ে৷ অসহায় আশা ভরা দুটি চোখ ডাক্তার বরুয়ার দিকে চেয়ে থাকে৷
জ্বলন্ত টেবিলবাতিটার চারপাশে একটা মথ অবিশ্রাম গোল গোল পাক খাচ্ছিল৷ ডাক্তার বরুয়া সেইদিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন৷ অনেকক্ষণ এমন ভাবে চুপ করে থাকেন যে মনে হয় জেনিফারের প্রশ্ন যেন কানেই যায় নি৷ তারপর চোখ না সরিয়েই খুব নরম গলায় বলেন,‘ এইরকম সোবার কোয়ায়েট মোমেণ্টগুলো ফ্র্যাংকির লাইফে খুবই রেয়ার, জেনিফার৷ তুমি পারবে না৷ পারবে না ম্যানেজ করতে তুমি৷ মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হবে..’ জেনিফারের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ না করেই থেমে যান ডাক্তার৷
এতক্ষণে বুঝি বাঁধ ভাঙে৷ কী অসহ্য এক আক্ষেপে জেনির মুখ দুমড়ে মুচড়ে যায়৷ শব্দহীন কান্নায় বিকৃত মুখ দু হাতে ঢেকে ফেলে সে৷ কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে শরীরটা৷ ডাক্তার বরুয়া আর নন্দিনী দুজনেই যন্ত্রণার এই নিঃশব্দ প্রকাশের সামনে অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে থাকে শুধু৷ গতে বাঁধা সান্ত্বনাবাক্য এখানে এত অর্থহীন৷
অস্বস্তি কাটানোর জন্য নন্দিনী চায়ের সরঞ্জামগুলো সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷ ডাক্তার বরুয়া ফ্র্যাংকির দিকে তাকান৷ এ ঘরের চারজন মানুষের মধ্যে একমাত্র ফ্র্যাংকিরই কোনও বিকার নেই৷ সে যেমন পাথরের মত বসে ছিল তেমনই বসে থাকে৷
গেটের বাইরে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়ানো গাড়িটা এই সময়ে একবার জোরে হর্ন বাজায়৷ চমকে তাকিয়ে নন্দিনী এতক্ষণে দেখতে পায় গাড়িটার গায়ে বড় বড় সাদা অক্ষরে লেখা ‘সেণ্ট জর্জেস অ্যাসাইলাম’৷
#
পরের দিন সকালেও মিস ম্যাকলেনকে দেখেছিল নন্দিনী৷ রোজকার মতই হালকা রঙের হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুলের ঢোল্লা ফ্রক পরে পিক্সিকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন৷ মাথা নিচু, চোখ রাস্তার দিকে৷ বর্ণহীন, নিষ্প্রাণ, ফ্যাকাশে এক প্রৌঢ়া৷
#
টিউব লাইটটা হঠাৎ দপদপ করে জ্বলে উঠে নন্দিনীর চোখটা ধাঁধিয়ে দিল৷ যাক, এতক্ষণে কারেণ্ট এলেন তাহলে৷ বাবা, পাঁচটা বাজে৷ এক্ষুণি জানালাগুলো বন্ধ না করলে সন্ধ্যের পরে মশার জ্বালায় ঘরে টেঁকা যাবে না৷ তিতিরের কলেজ থেকে ফেরার সময় হয়ে এল৷ সবিতাও বিকেলের কাজ করতে এসে যাবে আর একটু পরেই৷ নন্দিনী দ্রুত হাতে খোলা চুল গোছাতে গোছাতে বিছানা থেকে নামে৷ আলস্যমন্থর স্মৃতিমেদুর দুপুরের ভার তাকে ছেড়ে চলে গেছে, এবার আবার সংসারের অভ্যস্ত ছন্দ তার আপাদমস্তক অধিকার করে নিতে শুরু করে৷
কাগজটা দলামোচড়া হয়ে খাটের উপরেই পড়ে থাকে৷

আপনার মতামত জানান