বিজয়া দশমী

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়



-একি রণ! তোমার মত ভবঘুরে সন্ন্যাসীর স্ট্রলিব্যাগে এটা কোত্থেকে এল?
-কি বৌদি? দেখি
-এই যে ভাই দ্যাখো, দ্যাখো কোনো এক কেশবতী আধুনিকার মাথার ক্লিপ। গাঁয়েঘরে কিলিপ বলে আর শহরে বলে হেয়ার ক্লিপ ! রংটা যদিও চটে গেছে, অল্প মরচেও ধরেছে কিন্তু ক্লিপ তো নারীর সম্পত্তি বলেই জানি । অবিশ্যি যদি না তুমি অন্য কোনো কাজে লাগিয়ে থাকো।
ক্লিপটিকে সযত্নে হাতে তুলে নিতেই রণদেবের মনে পড়ে গেল ...
মনের কোণে ভেসে উঠল সেই পুরোণো স্মৃতির রঙচটা ক্যানভাসের ছবি। আবছায়াতে যা মিলিয়েছে কালের স্রোতে কিন্তু রণদেবের স্পষ্ট মনে পড়ল ।
-কি হল রণদেবের, উস্‌কে দিলাম তো পুরোণো কথা ?
-না বৌদি ভাবছি তো সেই কথাটাই । দূরে সরিয়ে দেবার সাধ্যি কৈ ?
-বল না রণ ? তুমি তো ভবঘুরে মানুষ । কত জায়গা থেকে কত স্মৃতি কুড়িয়ে বেড়াও । না হয় বলেই ফেল এই ক্লিপটির স্মৃতি ।
-বলবো। তবে এখন কোনো কাজের অছিলায় উঠে গেলে চলবে না এই বলে দিলাম, চুপ্‌টি করে বসে শুনতে হবে পুরোটা । ডান?
-ঠিক আছে, ডান। বৌদি সায় দিল ।

-তখন আমার কলেজবেলা । পুজোর ছুটিতে বাঁশবেড়েতে গেছি ট্রেনে চেপে । সন্ধ্যের ঝুলে পৌঁছালাম সেই হংসেশ্বরীর মন্দির, ব্যান্ডেল চার্চ আর ইমামবাড়ার স্মৃতিধন্য বাঁশবেড়িয়ায় । পরদিন সব দেখব ঘুরে ঘুরে এই আশায় গেছি । আমার কাঁধে একটা কিটব্যাগ আর হাতে জলের বোতল । ধুলো ভর্তি, খোয়া ওঠা ভাঙাচোরা ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা বেশ এঁকে বেঁকে চলে গিয়েছে । লতাপাতার নিবিড়তায় দুপাশ বেশ ছায়াময়, দু একটা সবুজ জলভরা পান্নাপুকুর ; ভাদ্রের পর থৈ থৈ জলে শাপলা-শালুক-পদ্মফুল ফুটে মা দুর্গার আগমনী শোনাচ্ছে । আশপাশ থেকে কেমন জানি শিউলিঝরা একটা বাতাস ব‌ইছে । এলোমেলো ভাবে দূরের মাঠে অগোছলো কাশফুল দুলছে হাওয়ায় । বিকেলের সোনালী রোদ্দুর পুকুরপাড়ের ঘাসজমির গা ঘেঁষে জলে গিয়ে ঠেকছে । মাঝে মাঝে পাথরের ওপর আলোছায়ার খেলা । আমার দূর সম্পর্কের দিদি-জামাইবাবুর বাড়িতে দুর্গাপুজোর আমন্ত্রণে এই প্রথম যাচ্ছি কোলকাতা থেকে । কোনোদিন আসিনি এর আগে । জামাইবাবু বলে বলে থকে গেছেন ।

যেতে যেতে ভাবছি কাকে জিগেস করা যায় দিদির বর বিপিনবাবুর বাড়ির কথা । দেখি একটি লোক আসছে । কাঁধে তার বাঁক । পিতলের কলসী থেকে ছলাক ছলাক গঙ্গার জল বাইরে পড়ছে । গঙ্গার জলই হবে। হয়ত কোনো পুজোবাড়িরই জল ব‌ইছে সে । বাঁশবেড়িয়ার কাছেই তো ত্রিবেণীর ঘাট আছে । পড়েছি ব‌ইতে । সেখান থেকেই বুঝি জল বয়ে আনছে লোকটি ।

বৌদি বললে, কোন্‌ বিপিন বাবু গো? যিনি গতবছর ডেঙ্গুজ্বরে মারা গেলেন?
-হ্যাঁ, গো বৌদি, তুমি ঠিক ধরেছ, রণদেব বলল ।
-অতঃপর শুধালাম জলের ভারীটিকে ।
-আচ্ছা ভাই বিপিনবাবুর বাড়ি জানো? দুর্গাপুজো হচ্ছে ধুমধাম করে ।
-বিপিনবাবু? লোকটি বাঁক রেখে বলল ।
-হ্যাঁ, বহুদিনের পুজো , নাম করা বাড়ি বাঁশবেড়িয়ার
লোকটি বললে "ভিন্‌ গাঁ থেকে আসা হচ্ছে বুঝি"
-হ্যাঁ, ভিন গাঁ মানে এর পাশেই, কোলকাতা থেকে আসছি, তুমি চেনো এনার বাড়ি ?
-তেনার বাড়ি চেনবো না ! কি যে বল বাবু, তেনাদের পুজোবাড়ির গঙ্গাজল ব‌ইছি আজ কত বছর ধরে । খানিকটা সুমুকে যাও । বাগানের মাঝে যে মস্ত কোঠাবাড়িটা সেইটেই বিপিনবাবুর বাড়ি । ঢুকেই পেত্থমে মস্ত বারবাড়ি তাপ্পর ঠাকুর দালান । সেখানেই পুজো হচ্ছে ।
কি মনে হল আমার্, পকেট থেকে একটা পাঁচটাকার কয়েন বার করে লোকটার হাতে দিলাম । একে পুজোবাড়ির কাজ করছে তায় বার আমাকে গাইড করলে । গালভরা হাসি ওর চোখেমুখে উপছে পড়ল । ছোটমোটো ভালোলাগাতে আমারো খুব সুখ মনে ।
-আসুন দাদাবাবু, আপনাকে পৌঁচে দি ঐ পুজোবাড়ি ।
এতক্ষণে আমি কেবলবাবু থেকে দাদাবাবুর পদমর্যাদায় উত্তীর্ণ হলাম । মনে মনে হাসিও পেল । গ্রামে গঞ্জে এখনো সামান্য বখশিসের কি মাহাত্ম্য তা প্রায় শহরে থেকে ভুলতেই বসেছিলাম । কিন্তু নাঃ ওই লোকটির সাথে যেতে চাইনা । জীবনভর তো একলাই চলেছি । একাকীত্ব আমাকে লেপটে রয়েছে সারাজীবন । আড়াল থেকে ভীড় দেখেছি । দুজনায় বড্ড কোলাহল । বড্ড গুলজার । চলে যেন শান্তি পাইনা । তার চেয়ে এই যে আমার একলা চলার পথ.. এই আমার বেশ ভালো ।
ওকে বললাম না, আমি একলাই যেতে পারবো ।
হ্যাঁ, আমি একলাই চলতে পারি, র‌ইল যারা পেছনে পড়ে তাদের কথা ভাবতে ভাবতে । স্মৃতির ডালি ভরে উঠুক । ঐ যে দূরের গাছে ঘুঘুটা ডাকছে একলা তারই সুরে । আশ্বিনের সন্ধ্যের ঝুলে শিউলির গন্ধ নিয়ে চলেছি । নির্জন পথ ধরে হেঁটে চলেছি । বুনোফুলের যৌবনগন্ধ, পাখিদের ঘরে ফেরার গান আর আমার একলা চলার পাথেয় এই মনটাকে বয়ে নিয়ে ।
একটু এগিয়েই দেখি বাগানের মাঝে মস্ত সামিয়ানা । লোকলস্কর সব এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে । বেশ ব্যস্ত সমস্ত পুজো পুজো গন্ধ আশপাশে ।খুব উঁচু উঁচু গাছের ফাঁকে ফাঁকে অতীতের রুক্ষ ঝুলপড়া, উইধরা, ইট বের করা স্মৃতি । সে স্মৃতি গম্ভীর ।
কালের মন্দিরা বেজে চলেছে । নাটমন্দিরে ঢাকে কাঠি পড়ল বুঝি । সময়ের দলিল দেখিয়ে দিল মস্ত বড় মরচে পড়া লোহার ফটক ।
সামনে দুরে গির্জার মত স্বমহিমায় দুটি ঝাউগাছ । সামিয়ানার মাথায় নুয়ে পড়া বেলপাতার শাখাপ্রশাখা । পোড়া ইঁটের মধ্যে থেকে উঁকি দেয় একলা অশ্বত্থ ।
বারবাড়িতে পা দিয়েই দেখি হুল্লোড়ে কচিকাঁচারা আমার দিকে ছুট্টে এল । কারো পরণে ঢোলা হাফপ্যান্ট । কারো বাজনদারের মত বুশ শার্ট । মেয়েগুলোর ডবল ঝুঁটি, নতুন ফিতে, রঙীন ক্লিপ । ফ্রকের ঝুল হাঁটু ছাড়ানো । সব মিলিয়ে জমজমাট পুজোবাড়ি । কচিকাঁচা পরিবেষ্টিত হয়ে বারমহলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বললাম "একটু ভেতরে ছবিদিকে খবর দাও না ভাই !'
ওরাই নিয়ে গেল ভেতরে । অন্দরমহলে । গেলাম তাদের পেছন পেছন । আমার অন্তরমহলও বটে । ছবিদি আমাকে যে কত স্নেহ করেন তা আমি ভুলিনা আর ভুলবোও না কোনোদিন । তাই ছবিদির সাথে দেখা হবে সেই ভালোলাগায় আপ্লুত তখন আমি । শ্বেতপাথরের সিঁড়ি । কালো পাথরের বর্ডার দেওয়া । সিঁড়ি পেরিয়ে চীনেমাটির কাপ-প্লেট ভাঙা কাঁচ বসানো রঙীন বারান্দা । এ যেন এক অপূর্ব শিল্পকর্ম । মনে পড়ে গেল সেই কথা "যাকে রাখবে, সেই থাকবে' । ভাবলাম সত্যি তো ! এ জগতে কিছুই যাবেনা ফেলা ! জুতো খুলে বারান্দা পেরিয়ে কাঠের সিঁড়ি । মাঝখান দিয়ে একটা পুরোনো সবুজ জুট কার্পেট নিঃশব্দে গিয়ে মস্ত এক ঘরের চৌকাঠে গিয়ে ঠেকেছে । পাশের দেওয়ালে কয়েকটা মলিন অয়েল পেন্টিং । ঘরের দুপাশে নীচের মতোই কাঁচ বসানো বারান্দা । আরো সব ঘর রয়েছে লাগোয়া । একটু পরেই দেখি কচিকাঁচারা সব উধাও । একটি বছর বরো তেরোর মেয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললে "চলুন, আসুন ভেতরে" মেয়েটি এগিয়ে যায় । সেই মস্ত ঘরের দরজা পেরিয়ে আমাকে নিয়ে চলে এক জোড়া খাটের সামনে । মেহগিনি পালিশ চটে গেছে সেই খাট জোড়ার । পঙ্খের কাজে ধুলোও বুঝি জমেছে অনেক । মোটামুটি ঝাড়পোঁছ করা ঘর দোর । জানলায় পুজোর জন্যে ধোপদুরস্ত হাফ পর্দা । বিছানায় কাচা বেড কভার । মেয়েটি আমাকে খাটের পাশে একখানা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল ।

" আমি বৌদিকে ডেকে আনছি " বলে লাফিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে সে অন্তর্হিত হল সেখান থেকে ।

পথশ্রমে ক্লান্ত আমি তখন সেই নরম বিছানার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চ্যেয়ে আছি । শ্বেত পাথরের চকচকে মেঝে, কালো বর্ডার দেওয়া । পরিষ্কার লাগছে বেশ, চেয়ারে বসে পড়লাম । বাঁদিকে একখানা লেডিস রাইটিং টেবিল । আয়না লাগানো । পাশে মস্ত সিন্দুক । টেবিলে পেতলের গোলাপদান । গোলাপ নেই । ঝকঝকে মাজা । সাবেকী আনলায় পাটে পাটে কাপড় কুঁচোনো । ছবিদির শাড়িই হবে । ঘরের বাইরে তখনো অল্প আলো উঁকি দিচ্ছে কিন্তু ঘরের মধ্যেটা বেশ অন্ধকার ।
মনে মনে ভাবলাম " মেয়েটা তো আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে! এই হল গ্রামের লোকের সাথে শহরের লোকেদের ফারাক ।'
আমার উল্টোদিকে দুটৌ জানলা । তাদের মাঝখানে একটা শ্বেতপাথরের কনসোল । নীচে তার বড় দেরাজ আর তার ওপরের দেওয়ালে পেল্লায় অয়েল পেন্টিং । স্বর্গত: কারোর প্রতিমূর্তি । ঠিক দেখতে পারলাম না । ফুলের মালা ঝুলছে তার থেকে । সামনে একটা প্রদীপ জ্বলছে । তবুও প্রদীপের আলোয় মুখটা বুঝতে চেষ্টা করলাম । কিন্তু পারলামনা ।
ঘরের ডানদিকে আর্শির পাল্লা দেওয়া আলমারী । তারপাশে যেটা সবচেয়ে বেশি করে চোখে পড়ে তা হল একটি দু'নলা বন্দুক । কাত করে শোয়ানো । চোখে ভেসে ওঠে ছবিদির মুখে শোনা ওঁর শ্বশুরের সেই লম্বা চওড়া চেহারাখানি । হ্যাঁ, ওনাকেই এই বন্দুক মানায় ! পকেট থেকে রুমালটা বার করে চশমাটা পুঁছে নিয়ে সেই অয়েল পেন্টিং এর সামনে গিয়ে দাঁড়াই । টিকোলো নাক, তীক্ষ্ণ চোখ , বড় কপাল আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি । প্রতিকৃতির ধরণটা অনেকটা বিপিনবাবুর মতো । তার মানে ঐ অয়েল পেন্টিং খানি ছবিদির স্বর্গত শ্বশুর মশায়ের । একথা বুঝতে বাকী র‌ইল না । দৃষ্টি গিয়ে পড়ল জানলার বাইরে । কয়েকটা সবুজ পাম গাছে আর ওপাশে লম্বা লম্বা সাবুগাছে ঝুরি নেমেছে তাও ঠাওর করলাম আলো আঁধারে । পুজোবাড়ির আলো জ্বলছে কিনা বাইরে তাই একটু স্পষ্ট হল । কিন্তু ঘরের ভেতর নিপাট ছায়া । মনটা যেন ম্লান হয়ে যায় সেই আলোতে । ধুস্! ছবিদির যে কি হল! এতক্ষণ বসিয়ে রেখে মেয়েটা কোথায় উধাও হল রে বাবা । চেয়ার ছেড়ে মসৃণ শ্বেতপাথরের মেঝে দিয়ে হেঁটে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম ।
বৌদি বললে " হ্যাঁ, গো রণ। ওনাদের খবর তো অনেকদিনই পাই না '

রণদেব শুরু করল আবার..
-ভাবছি পুজোবাড়িতে ছবিদির অনেক কাজ । বাড়ির বড় বৌ তো । সব কিছুর ভারই তো ওর ওপর । আবার বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে ঐ প্রতিকৃতির দিকে চেয়ে থাকি । চাঁপাফুলের গোড়ে পরানো । মিষ্টি তার গন্ধ । কিন্তু কনসোলের ওপর প্রদীপটার বুক জ্বলছে । সলতে পুড়ে যাচ্ছে । তেল রয়েছে পর্যাপ্ত । তাই ভালো করে জ্বলছেনা । প্রদীপের ম্লান আলোতে ছবিটাও নিষ্প্রভ । হঠাত কি মনে হল আঙুল দিয়ে সলতেটাকে একটু উসকে দিতে গেছি, পেছন থেকে কে বলে উঠল " উঁহু, উঁহু, আঙুল দিয়ে সলতে উসকোতে নেই ! হাতটা যে পুড়ে যাবে '

মেয়েলি গলার স্বরে চমকে পেছন ফিরে দেখি বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা একটি মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে..

যে কিশোরী এই ঘরে নিয়ে এসেছিল সে নয় । এ তো অন্য মেয়ে । কিশোরীর চেয়ে অনেকটা বড় । দেরাজের সামনে ঘন কালো চুলের পাশ থেকে একটা ক্লিপ বের করে নিয়ে সলতে বাড়িয়ে দিল প্রদীপের মুখে । বন্ধ হল প্রদীপের বুকজ্বলা । একঝলক আলো এসে পড়ল ওর মুখের ওপর । অদ্ভূত মিষ্টি চেহারা । ডাগর ডাগর কালো চোখ, মসৃণ গাল, পাতলা ঠোঁট আর নিটোল গড়ন । কানের লতিতে একটুকরো সোনার পাতের ছিলেকাটা দুল চকচক করছে । সবশুদ্ধ একটা জ্বলজ্বলে ভাব । মনে হল আমার ছায়াঘন বৈরাগী জীবনের পথে ছড়িয়ে পড়লো একমুঠো আলোর আবীর । দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণে এসে আমি যেন সত্যি দুর্গা দেখলাম ! আমার সেই বিহ্বলতায় মেয়েটির কোনো চপলতা নেই । নেই কোনো হেলদোল তার লাবণ্যে । সে এগিয়ে গেল আনলার দিকে । একটা পাট করা শাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে ।
তার চলন, তার হাবভাব, আপাদমস্তক এক লহমায় নিরীক্ষণ করে নিয়েছি এর মধ্যে ।

ও চলে যেতেই আবার তৈলচিত্রের প্রতিকৃতির সামনে হাজির হলাম । কোথায় গেল সেই বৃদ্ধের মুখ? আমি যেন সেখানে দেখছি এক নারীমূর্তি । স্নিগ্ধ-ডাগর-আয়ত-কালো চোখ, সেই চিবুক । মাথায় একরাশ কালো চুলের ঢেউ । আর চাঁপার গন্ধ যেন সেই অনুভূতিকে তাড়িয়ে নিয়ে তোলপাড় করছে আমার মনের ভেতরকে । শিরশিরে সেই অনুভূতি । এ আমার কি হোল! আগেও তো অনেক নারী আমার চোখে এসেছে ধরা দিতে কিন্তু আমি ধরা পড়িনি সেই জালে ।

"কি রে রণ! ওমনি করে অবাক হয়ে কি দেখছিস?'
আমার পেছনে কে এসে দাঁড়িয়েছে ? চেনা গলা । সম্বিত ফিরল আমার ।
চমক ভেঙে গেল, সত্যি তো । ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি সেই বৃদ্ধেরই তো ছবি । যাকে চিনতে অসুবিধে হয়না ছবিদির শ্বশুর বলে । আমার চিন্তাগুলো ওলটপালট হয়ে গেল । ছবিদিকে পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করলাম ।
আমার চিবুক ছুঁয়ে ছবিদি বললে, আমার শ্বশুরমশাই, চিনতে পেরেছিস? চলে যাবার বছর দেড়েক আগে তোর জামাইবাবু তুলেছিল ছবিখানা । অনেক কষ্টে মত করেছিলেন উনি । যাক গে । এবার বল কেমন আছিস ? পাশটাশ করে এখন তো বেশ ভব্যিযুক্ত হয়েছিস দেখছি !
-তা তোমার আশীর্বাদে এখন কলেজে থার্ড ইয়ার । পরের বছর ফাইনাল । তারপর আবার পড়ব ।
-শুনছিলুম তুই নাকি এমন ভবঘুরে হয়েই থাকবি চিরটাকাল?
-তাই বুঝি তোমার কাছে এলুম । ওসব গুজবে কান দিওনা ছবিদি । আমাকে একগ্লাস জল খাওয়াবে ?
-শুধু জল ? দাঁড়া, এদ্দিন বাদে এলি । এতবছর ধরে বলছি পুজোয় আসতে আসিস না তো কখনো । এবার ছাড়ছিনা তোকে । দিন কয়েক থেকে তবে যাবি ।কলেজ তো ছুটি এখন ।
-হ্যাঁ, তা তো ছুটি । লক্ষীপুজোর পরে খুলবে ।
-তবে আবার কি ! দেখেছ ? তোকে এতক্ষণ অন্ধকারে বসিয়ে রেখেছে, একটা আলো দেয়নি ঘরে । পুজোর সময় এদের মন যে কি উড়ু উড়ু থাকে সর্বদা ।
-গরম বেশ লাগছিলনা । আশ্বিনের পুজোর গন্ধ একটু একটু করে হিমেল হাওয়া ছড়িয়ে দেয় গ্রামবাংলার গরম সন্ধ্যেয় তাই খোলামেলা বড় ঘরে মাথার ওপর ফ্যান চলছিলনা টেরও পাইনি তবে ইলেকট্রিক অনবরত আসা যাওয়া করে এই গ্রামে। বাইরে পুজোর প্যান্ডেলে অস্থায়ী বিজলিবাতীর কানেকশান । গাঁয়ের জীবনে ফেসবুকের জন্য মন উচাটন নেই। সোশ্যালনেট বস্তুটা এখনো তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি । ভাবলাম, দিনকয়েক শিকেয় তোলা থাক ফেসবুকের কূটকচালি। আমার আনস্মার্ট সেলফোন। তাই আপাততঃ আমারো কোনো হেলদোল নেই এ ব্যাপারে। গ্রামের দুর্গাপুজো দেখব এবার।
-দেখতো ভাই কি অন্ধকারে বসে আছিস এতক্ষণ! নে জলটল খেয়ে জামাকাপড় ছেড়ে নে । মুখ হাত পা ধুয়ে মন্দির মন্ডপে মায়ের মুখ দর্শন করে আয় । এতটা পথ ট্রেনে এসেছিস তুই । হ্যাঁরে কোলকাতার সব খবর ভালোতো?

-কোলকাতার সব খবর ঠিকঠাক তো ? বৌদি বলল
-হ্যাঁগো কোলকাতার সব খবর মোটামুটি । বলেই রণদেব আবার ভাসিয়ে দিল তার পুরোণো স্মৃতির খেয়াখানি ।
...............
ছবিদি চৌকাঠের বাইরে পা রাখল । যতক্ষণ দিদি ঘরের মধ্যে ছিল আমিও ছিলাম ওর কথার মধ্যে । চলে যেতেই আমার মন আবার সেই প্রদীপের আলোয় । সেই আলোয় দেখা কানের লতিতে ঝুলছে চিকচিকে একফোঁটা দুলের ছিলেকাটা পাতা, সেই চাঁপার কলির মত আঙুল দিয়ে মাথার ক্লিপটি খুলে নিয়ে উসকে দেওয়া মূহুর্ত । ভাবনার পরত সরাতে সরাতে প্রদীপের সামনে গিয়ে দেখি ক্লিপটি পড়ে আছে কনসোলের ওপর । শ্বেতপাথরের কনসোলের ওপর একখানা মাথার ক্লিপটি কিন্তু আমার কাছে তার গুরুত্ব অনেক । কি মনে করে ক্লিপটি সযত্নে পকেটে করে বারান্দায় এসে আবার ভাবনার খোলাখাতা মেলে দাঁড়াই । নরম চুলের ফুলেল তেলের গন্ধ পাই যেন । দিনের আলো সময়ের পথ ধরে অনেকটাই এগিয়ে গেছে । গাছপালা সব ঝুম অন্ধকারে ডুবে । শুধু বাগানে সামিয়ানা খাটানো চত্বরে সন্ধ্যে আরতির কাঁসরঘন্টা শুরু হয়ে গেছে । নতুন ধুতিতে ঢাকী নতুন উদ্যমে ঢাক বাজিয়ে চলেছে । আমিই শুধু ডুবে গেছি সেই মেয়েটির গহন রহস্যে । বাসন্তীরঙা শাড়িতে, মেঘরঙা চুলে... দুর্গাপুজোর পটভূমিকায় আবিষ্কার করে চলেছি নিজেকে । ভাসছে আর ভাসছে দূরের আলেয়ার মত সেই দুটো চোখ । স্পষ্ট হয়ে উঠছে মুখাবয়ব, কোমল পেলব হাতের আঙুল, আরো কত কিছু যা দেখা হয়ে ওঠেনি শুধু বেঁচে রয়ে গেছে কল্পনায় ।

হঠাত বৌদি বললে, চা নিয়ে আসি রণদেবের ?
রণ বললে, নাহ্‌ এই অবেলায় আর চা খাব না গো ।

সে আবার শুরু করল বাঁশবেড়িয়ার গল্প...

রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর ছবিদির সাথে অনেক গল্পগাছা হল । কত কথা ! সে সব যেন শুরু হয়েও শেষ হলনা । ছোটবেলায় দিদির বিয়ের পর আমাদের কেমন নতুন জামাইবাবুকে পাকড়ে ধরে কোলকাতায় মহাজাতি সদনে পি সি সরকারের ম্যাজিক দেখতে যাওয়া। সাথে আমাদের সিমলেপাড়ার বাড়ি থেকে জড়ো হওয়া একপাল কুচোর দল , সব তুতো ভাইবোনেরা । ছবিদির বিয়ের আগের কথা, ছবিদিকে আমাদের সিমলেস্ট্রিটের বাড়িতে দেখতে আসার কথা । আমি এনেছিলাম বরপক্ষের জন্য সিমলে পাড়ার বিখ্যাত গোলাপী আইসক্রিম সন্দেশ । মা জলের কুঁজোতে একফোঁটা কর্পূর ফেলে দিতেন । ছবিদির সাথে ছোটবেলার কত স্মৃতি! পৃথিবী ঘোরার প্ল্যান করা, হিমালয় অভিযানে যাবার কত্ত ফন্দী, মানচিত্রে নতুন দেশের নাম খোঁজা অথবা নাম-দেশ-ফুল-ফল খেলা ! ছবিদিরা থাকত মতিঝিলে । ছবিদিরা আসছে শুনলে ব‌ইখাতা শিকেয় তোলা সেদিনের মত । আমার কচি মনের কত সবুজ স্বপ্ন সে সব !
তারপর ঘরে এলেন বিপিনবাবু মানে ছবিদির বর, আমার জামাইবাবু । এ মানুষটিও আমাকে ছোট থেকে দেখে আসছেন বলে বেশ একটা দেখলেই "ফিলগুড" ফ্যাক্টর কাজ করত মনে । আমায় অনেক উপদেশ দিলেন, ভবঘুরের মত কেন জীবন কাটচ্ছি, আমি নাকি ব্যাবসায় হাত দিলে সোনা ফলে যেত, আর কত পড়বে? ইত্যাদি ইত্যাদি ।
পুজোবাড়ি । সকলে নানা কাজে ব্যস্ত । কত রকমের কাজ, কত মানুষ..সব‌ই রকমারি ।
আমি দুদিন হল এসেছি । কিন্তু একদিনও আরতির সময় গিয়ে দাঁড়াইনি বলে ইতিমধ্যে জল্পনা কল্পনাও শুরু হয়ে গেছে । সবার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছি । কি যেন এক অদ্ভূত জীব আমি ।আমার মত শহুরে এক মানুষের সাথে যেন গাঁয়ের এই পুজোবাড়ি এক্কেবারে বেমানান । আমি যেন মেলামেশায় সাবলীল ন‌ই । কোন্‌ এক উপগ্রহ থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি । এমনি হাবভাব এদের । শুধু ছবিদি আর বিপিনবাবু ছাড়া । আমি নাকি কারোর সাথে আলাপচারিতায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিনা এই সব কানাঘুষো শুনতে লাগলাম ।
আমি হয় দিদির সাথে রান্নাঘরে বসে গল্প করি অথবা ছাদে বসে বসে আপনমনে অলসকবিতার জন্ম দিয়ে চলি । লোকজনকে আমার দূর থেকে দেখতেই বেশি ভালো লাগে । অনেকের মাঝখানে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি । সেখানে না পারি দুচোখ ভরে দেখতে , না পারি সকলকে মন খুলে চিনতে । আমার এ স্বভাবটা অনেকে ভাবে অহংকার । ভুল বোঝে অনেকেই । শুধু দিদি জানে আমি এমনটি । এ বাড়ির সবাই যেন দূরে দূরে থেকেই গেল ! ভাবলাম কাল দশমী । বিসর্জনের পরপরই রওনা দেব । দিদিকেও জানাবো না । কারণ কোলকাতা চলে যাচ্ছি শুনলে দিদি কিছুতেই ছাড়বে না দশমীতে । কিন্তু কালই চলে যাব । কিন্তু কোথাও যেন একটা না পাওয়ার টানাপোড়েনে আমি বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম । ঐ যে সেই পল্লবী নামের মেয়েটি, সেই বাসন্তী শাড়ি পরা, সেই উসকে দিয়েছিল সলতের আগুণ আর সেই সাথে আমার মন, সে যেন আমাকে নেপথ্যে টেনে রেখেছিল অদৃশ্য এক বাঁধনে । হৃদয় খুঁড়ে আমি শুধু হাতড়ে চলেছি সেই পল্লবিত উদ্ভিনযৌবনাকে ।
যদি একটি বার তার সাথে নিভৃতে কথা বলে যেতে পারতাম ! দিদির মুখে নামটা শুনেই কেমন যেন আকর্ষণটা বেড়ে গিয়েছিল । এই মেয়ের নাম পল্লবী! আর হবেনাই বা কেন । বৃষ্টির পর পাতার রূপ কেমন হয় সে তো আমি জানি । পাতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জল নেবার কেমন আকুতি থাকে তা তো আমার অজানা নয় । সেই যে প্রদীপের আলোয় একটিবারের দেখা! তবু সারাদিনের পর হিসেবের খাতা মেলাতে গিয়ে দেখি সমস্তটা রাত, পরের দিনগুলো শুধু ওকে দেখে আর ওর কথা ভেবেই কেটে গেছে । সকালে উঠে দেখি স্নান সেরে সাদা শাড়ি পরে পুজোর নৈবেদ্য গোছানোয় ব্যস্ত । আমি তখন বারান্দায় বসে, খবরের কাগজ পড়ার অছিলায় । পিঠে একরাশ কালো চুল আর মুখে হাসি লেগেই আছে । একবার ভেবেছি নীচে গিয়ে ডেকে এনে আলাপ করি । আবার ভেবেছি কুটুম বাড়ি । শেষ অবধি হয়ে ওঠেনি । সেদিন ছবিদির সাথে একথা সেকথায় জানতে পারি ছবিদির মামাশ্বশুরের মেয়ে পল্লবী । ভারী লক্ষ্মী মেয়ে, খুব কাজের, বাড়ির ছোটোরা তো পল্লবীদিদি বলতে অজ্ঞান একেবারে । ছবিদি আরো বললেন তাঁর মামা শ্বশুরের কান্ড ।
এক বুড়োর সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছেন তিনি। বছর চল্লিশের ঐ বুড়ো জমিদারের অগাধ সম্পত্তি অথচ লেখাপড়া বিশেষ কিছুই নেই । আমি বলে বসলাম অদ্ভূত মানুষ তো তোমার মামাশ্বশুর । অমন মেয়ের আর জামাই পেলেন না । শেষে কি না একটা বুড়ো বর । বল্‌ত বাপু ওঁকে এখন বোঝায় কে! আমি তো তোর কথা সর্বাগ্রে ভেবেছিলাম রে রণ কিন্তু তুই তো বিবাগী ভবঘুরে । বেশ কিছুদিন যাবত শুনছি তোর সংসারে মতি নেই । তাই তো আর কথা বাড়াইনি ।
দিদির কথাগুলো আমার কর্ণপটহে প্রবেশ করছিলনা যেন । পল্লবীর জীবনের ভবিষ্যতটা তলিয়ে দেখতে চাইছিলাম ।

বৌদি বলল রণদেবের, তা, পল্লবীর কি সত্যিই ঐ বুড়োটার সাথে বিয়ে হয়েছিল ?
-জানিনা ভাই বৌদি । রণ বলল

পরের দিন ভোরে উঠেই মনটা ভারী হয়ে উঠল । একে তো বিজয়া দশমী তাতে আবার পল্লবী প্রসঙ্গ যেন নতুন করে আমার মনটাকে আরো খারাপ করে দিল । কেন এসেছিলাম এই পুজোবাড়িতে ! খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে । মনে হল সেই মূহুর্তে পল্লবী আমার খুব কাছের । মেয়েটার বুঝি আপনার বলতে কেউ নেই । নিজের বাবা হয়ে ঐ সোনার প্রতিমাকে যার তার হাতে তুলে দিতে চায় সে কেমন বাবা ! আর যাই হোক সে ওর বাবা নয় । ঝিম ধরে গেল মাথায় । বুক টন টন করে উঠল । মনে হল একমাত্র ওর যদি আপনার বলতে কেউ থাকে সে আমি । কিন্তু মনকে বোঝাতে লাগলাম , ওর আপনার হতে যাব আমি কোন অধিকারে ? নাহ! কোন অধিকারে আমি নিজেকে পল্লবীর অভিভাবক করে তুলেছি ? কতটুকুই বা শক্তি আর সামর্থ্য আমার ।
সারাটাদিন এধার ওধার ঘুরে ঘুরে কাটালাম । কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না । এক অস্থির চঞ্চলতা আমাকে গ্রাস করে ফেলল । ঠিক করলাম সন্ধ্যের ঝুলে দশমীর মিষ্টিমুখের পর ভালোয় ভালোয় বিদেয় নেব । দিদিকে বলা যাবেনা তাহলে ছাড়বেনা । পরে একখানা চিঠি লিখে দেব । সন্ধ্যেয় সকলে প্রতিমা নিরঞ্জন করে ফিরে এল । প্রণাম, আলিঙ্গন, মিষ্টিমুখের পালা শেষ হল । চুপচাপ নিজের ঘরে এসে কিটব্যাগটা গুছিয়ে রাখলাম । মনটা যেন সায় দিয়েও দিচ্ছিলনা । হঠাত ভাবলাম আর দুটো দিন থেকেই যাই । কি আর হবে তাতে । দিদি বেচারা না বলে চলে গেলে বড্ড রাগ করবে । অবিশ্যি তার চেয়ে আরো একটা বড় কারণ ও ছিল । পরক্ষণেই মনে হল নাহ:, তা হয়না। আজই চলে যেতে হবে আমাকে । কিন্তু যাবার আগে একটি বার পল্লবীর সঙ্গে কি একটি কথাও বলতে পাব না ?
সাতপাঁচ ভাবছি । বাউন্ডুলে, ভবঘুরের এহেন মনোবিকার কেন হল ? একেই কি বলে প্রথম প্রেমে পড়া ? কলেজ স্কোয়ারে, কফিহাউসে বন্ধুরা ঘন্টার পর ঘন্টা বান্ধবীদের সাথে কেন সময় কাটায় ? যৌবনে নারীসঙ্গ আসেনি.. যার সাথে হেঁটে যাব মাইলের পর মাইল । নারীকন্ঠে আকৃষ্ট হা‌ইনি কখনো । কিন্তু সেদিন আমার সব ওলটপালট । উথালপাথাল জীবনের বোঝাপড়া ।

তা ঐ মেয়েকেই তো বিয়ে করে নিতে পারতে তুমি রণদেবের- বৌদি বললেন
-মাঝেমাঝে এখনো স্বপ্ন দেখি সেই মেয়ের । আমার জীবনে সে এসেও এলনা । আমি ঠিক তেমনি ভবঘুরের মত জীবন কাটিয়ে গেলাম....এই কথা বলে রণ আবার শুরু করল ।
থেমে গেছে হুল্লোড় । পুজোর হৈচৈ । দুগ্গাপুজো যেন বাঙালীর মেয়ের বিয়ে । বিসর্জনের বাজনা বাজতে না বাজতেই সব শুনশান । আসর-বাসর সব শেষ । যে যার ঘরে ঢুকে পড়েছে ইতিমধ্যে । দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছিল । আমার মনের প্রতিমারও সেই সাথে বিসর্জন হয়ে যাবে ভাবছিলাম । একরাশ মনখারাপ নিয়ে কলকাতা ফিরতে হবে । সারাটা ট্রেনে যেতে যেতে মনে পড়বে সেই চোখদুটো আর কানের লতিতে চিকচিকে সেই ছিলেকাটা পাতার দোলাটা ।
চমকে উঠি হঠাত । মনে হল কে যেন হাতে একটা থালা নিয়ে দরজার সামনে দিয়ে ছবিদির ঘরের দিকে চলে গেল । ও বোধহয় পল্লবী হবে । চুপচাপ বসে ভাবছি যদি সে হয় তাহলে ডাক দেব একবার । যা হবার হবে । ভাগ্যটা নিতান্তই দুর্ভাগ্য মনে হল এই প্রথম । দেখি হ্যাঁ, সেই মেয়েই তো তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামছে, হাতে মিষ্টি ভর্তি রেকাব, পরণে নীল ঢাকাই শাড়ি ।

গলায় যেন কি আটকে গেছে । কথা অর বার হয়না । ডাক দিলাম "পল্লবী' ।
ও থমকে তাকিয়ে দেখল আমাকে । কিন্তু সাহসে বুঝি কুললো না । সিঁড়িতেই চুপ করে দাঁড়িয়ে র‌ইল ।
আমি বললাম শোনো এই দিকে ।
ধীর পায়ে সে এসে দাঁড়াল দরজার গোড়ায়, মাথাটা নীচু করে । গ্রামের মেয়েরা বুঝি এ যুগেও এত লাজুক স্বভাবের হয় । কেরোসিনের দেওয়ালগিরির লালচে আলোয় মুখটা স্পষ্ট তার, কানের দুলও চিকচিক করছে যথারীতি । আমি চেয়ে দেখি ও মাটির দিকে তাকিয়ে আছে । আলো পড়েছে ওর মুখের একপাশটায় । সরু কালো ভ্রূযুগলের নীচে আয়ত চোখ । টিকোলো নাক । আরো নীচে পাতলা লাল উঁচু ঠোঁট জোড়া । কানের পাশের চুলগুলো এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো মোহময় করে তুলেছে পল্লবীকে । কেমন যেন ছবি ছবি স্নিগ্ধতা সব মিলিয়ে ।

ক্রমশঃ অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম । সংযত হয়ে বলে ফেললাম "ক্ষমা কোরো আমাকে"

সে বললে, কিন্তু কেন বললেন না তো ।

কথার পিঠে কথারাই এনে দেয় কথাবলার শক্তি । তোমার মাথার সেই ক্লিপটা নিয়ে চললাম । না বলে পরের জিনিস নেওয়াকে চুরি করা বলে । আমাকে তুমি বারণ কোরো না পল্লবী। আমি ফেরত দিতে পারবো না । কথাগুলো নিঃসাড়ে বলে হঠাত থেমে গেছি । আমার দেহরসের স্নায়বিক উত্তেজনার উথালপাথাল ঢেউ আমাকে বলল তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে । মনে হল ছুঁয়ে দেখি ওকে । হাত রাখি ওর হাতে । কিম্বা আমার দুহাতে জাপটে ধরি ওর সেই বিদ্যুত লতার মত শরীরকে । অথবা হাতদুটো দিয়ে ওর মুখখানা আলোয় তুলে দেখি একটিবার ।

হঠাত পায়ে কিসের যেন ছোঁয়া লাগল । চোখ নামিয়ে দেখি পল্লবী আমাকে প্রণাম করছে । বিজয়ার প্রণাম ।
চোখে পড়ল ওর গালদুটোতে সিঁদুরখেলার আলতো দাগ। মাদুর্গাকে বরণের সময় গেছিল বোধহয় মন্ডপে ।

এঁয়োস্ত্রীরাতো আইবুড়ো মেয়ের গালে সিঁদুর ঘষে দেন যাতে তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায়..বাড়িতে বলতে শুনেছি ।

পাঞ্জাবীর পকেটে সেই ক্লিপখানা রয়েছে । চেপে ধরলাম তাকে । আমার কম্পিত হাতের তালু দিয়ে ।
"দেব না, দেব না, দেব না, কক্ষণো ক্লিপটি পল্লবীকে আমি ফেরত দেব না " আজ থেকে ঐ ক্লিপটি আমার ।



আপনার মতামত জানান