দিশা

সপ্তর্ষি ভট্টাচার্য

অলংকরণ- তৌসিফ হক



বাবাই, মাতুন, তাতুনদের বেশ আমেজ এসে গেছিল। একে অপরের পেছনে লাগা আর জমছে না। এই সময় বিদিশা ঢুকে ওদের বাঁচিয়ে দিল।

"কি গো বুয়া, হবে নাকি এক গ্লাস?"

বিদিশা জানে যে ওরা মজা করে বলেছে। সে বলল,"না বাবা, তোমরা খাও। আমি কি এসব খাই?"

বাবাই এদের মধ্যে তর্কবাগীশ। সুযোগ পেয়েই জিজ্ঞেস করল,"কেন? খাও না কেন?"

"আমার পছন্দ হয় না। আমার নারায়ণ পুজো থাকে। তাছাড়া বাবা পছন্দ করতেন না। জানোই তো।"

"জান কৃষ্ণ মদ্যপান করত? মহাভারতে আছে।"

"জানি না বাবা। বললাম তো বাবা পছন্দ করতেন না। শৌনকও খায় না। আমি..."

এবার মাতুন পেছনে লাগার বিষয় পেয়ে গেল। বলল,"তোমার শৌনকটা কি গো? ড্রিংকও করে না?"

বিদিশা কোন উত্তর দিল না।

"আচ্ছা শৌনক কি খেতে পছন্দ করে গো? তুমি কখনও ওকে রান্না করে খাইয়েছ?"

বিদিশা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তারপর বলল,"সেবার...যেবার দাদা বৌদি আর বুবুন, দাদার অফিসের লোকজনের সঙ্গে দার্জিলিং গেল... সেবার শৌনককে খাইয়েছিলাম। খিচুড়ি আর চিংড়ি মাছ। খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিল।"

মাতুন অনেক কষ্টে হাসি চেপে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তোমরা সবসময় এরকম লুকিয়ে দেখা করতে কেন গো? আমাদের সঙ্গে আলাপই করালে না।"

বিদিশা আবার চুপ করে গেল। তাতুন বলল,"আসলে পিসেমশাই বড় লাজুক। বুয়া ও কোথায় থাকে গো? একদিন চ আমরাই দেখা করে আসি।"

বিদিশা প্রায় ওকে থামিয়ে দিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,"আরে গত কয়েক বছর তো ও আমেরিকাতে আছে। ফিরলে বলব একদিন দেখা করতে। আসলে এত ব্যাস্ত লোক। সবসময় কাজ করছে।"

সেদিন রাতে শোবার আগে অভ্র আর সুপ্রীতি বারান্দায় বসে গল্প করছিল। বিদিশা ওদের পেছনে এসে দাঁড়াল। অভ্র বলল, "বুয়া ওই মোড়াটা নিয়ে বস।"

বিদিশা দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, "শৌনক ফোন করেছিল।"

অভ্র কি বলবে ভেবে পেল না। বিদিশা আবার বলল,"ব্যাঙ্গালোরে এসেছে এই কদিন হল। শরীরটা ভাল যাচ্ছে না ওর।" বলতে বলতে কেঁদে ফেলল বিদিশা।

শৌনক নিয়ে অনেক গল্প অভ্র বিদিশার কাছে শুনেছে। কিন্তু বুয়াকে এরকম আবেগপ্রবণ হতে দেখে নি এই বিষয়ে। সে কি ভাবে ব্যাপারটা সামলাবে ঠিক করতে পারল না। "এই বুয়া, এবাবা, কাঁদছ কেন? আরে বস বস," বলে অভ্র বিদিশাকে নিজের জায়গায় বসিয়ে দিল। বিদিশা বসে চোখ মুছে বলল, "বুবুন, দাদা বেঁচে থাকতে তো শৌনকের কথা বলতেও পারতাম না। দাদা শুনলে রেগে যেত। কিন্তু তুই তো অন্যরকম," বলে অভ্রর হাতটা ধরল,"তুই হলি আমার ছোট্ট গোপাল ঠাকুর। বাবু আমার একটা ছোট্ট উপকার করে দিবি?"

"কি বল?"

"আমি একবার শৌনকের সাথে দেখা করতে যাব। তুই একটু ব্যবস্থা করে দে বাবা।"

অভ্র বেশ হকচকিয়ে গেল। এরকম আবদার তো আগে কখনও করেনি বুয়া। সে একবার বউয়ের দিকে অসহায় ভাবে তাকালো। সুপ্রীতিও খানিকটা অবাক হয়েছে। অভ্র বিদিশাকে ভোলাবার জন্যে বলল, "বুয়া কেঁদ না। শোন না, এই অনির পরীক্ষাটা শেষ হোক, আমরা সবাই মিলে ব্যাঙ্গালোরে যাব বড়দির ওখানে। কেমন?"

"না বাবা। আমাকে একা যেতে হবে। আমি কটা দিন শৌনকের কাছে কাটিয়ে আসি। তোরা পরে এসে আমায় নিয়ে যাস। ওর শরীরটা ভাল নেই, কেউ দেখবার নেই।"



বিদিশা জানলার বাইরে তাকিয়ে আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।

"আপনার চা টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। "

বিদিশা চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো যে তার হাতে ওটা ছিল। আস্তে আস্তে কাপটাকে ঠোঁটের কাছে এনে একটা চুমুক দিল। চাটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ওটা রেখে টেবিলে রেখে আবার জানলার বাইরে তাকালো।

তন্ময়ী খাতায় একটা ছোট্ট নোট লিখে বিদিশার দিকে তাকালো। বিদিশা জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দুটো বড় ক্লান্ত। তন্ময়ী সম্বিত ফেরাতে ওকে ডাকলো ,"বিদিশাদি," বিদিশা তাকালো ওর দিকে। "কি বলছিলেন?" বিদিশা শুন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তম্নয়ীর দিকে।

তন্ময়ী ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করল,"শৌনক কেন দেখা করতে পারল না সেবার?"

বিদিশার যেন কি একটা মনে পড়ল,"সেবার... সেবার ও কলকাতা এসেছিল। কিন্তু কি যেন হল ?... ও হ্যা। সেবার দাদা বৌদির বন্ধুরা হঠাৎ আমাদের বাড়িতে নাইট স্টে করলো। আমি আর কি করি , ওকে বারণ করে দিলাম। ভেবেছিলাম সেবার দাদাকে সব বলে দেব। কিন্তু বন্ধুদের সামনে ... যদি দাদা রাগারাগি করত। "

"আচ্ছা শৌনক আপনার সাথে সবসময় রাতেই কেন দেখা করতে আসত বলুন তো? আর যখনই আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করবার উঠত কোন না কোন ভাবে সেটা ভেস্তে যেত। আপনার খারাপ লাগত না?"

"লাগত তো। রেগেও যেতাম। কিন্তু পরে বুঝেছি। আসলে ইন্দিরার ভীষণ সন্দেহ বাতিক ছিল।"

"ইন্দিরা কে?"

বিদিশা চুপ করে তাকিয়ে রইলো। তারপর বলল, "ওর বউ।




"কি পাগলামি করছ বল তো বুয়া? তুমি বললেই আমি তোমাকে একা একা ছেড়ে দেব। তুমি কোনদিন একা এতদূর গেছ?" অভ্রর মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আজ দুদিন ধরে প্রায় দশ ঘন্টা করে এক নাগাড়ে কাজ করতে হয়েছে। আজ ভেবেছিল একটু ঘুমিয়ে শান্তি পাবে। কিন্তু তার কি আর উপায় আছে?

বিদিশা চিতকার করে বলল,"না যাইনি। তোর বাপ যেতে দেয় নি। আর এখন তুই দায়িত্ব ফলাচ্ছিস। আমি বাচ্চা নাকি? আমি বলে দিলাম আমি ব্যাঙ্গালোর যাবই। তুই আমায় টিকিট কেটে দিবি কিনা বল? নাহলে আমিই কাটব... কাল লক্ষ্মীকে বলে রাখব..."

অভ্র আর পারল না। খাবার ছেড়ে উঠে পড়ল। "যা খুশী কর গিয়ে। যেখানে খুশী যাও। আমাকে বিরক্ত করবে না।" তারপর গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বিদিশা তারস্বরে চিতকার করে উঠল, "হ্যাঁ। আমার জন্যে করবি কেন রে জানোয়ার। সব নিজের বউয়ের জন্যেই কর। বাপের বেটা তো। আমি নিজেই বুঝে নেব নিজেরটা। কিচ্ছু করতে হবে না।"

বিদিশা ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে গেল। সুপ্রীতি গম্ভীর মুখে বসে রইল। অনিকেত কেমন হকচকিয়ে গেছে। দিদানকে কোনদিন এরকম করতে সে দেখেনি। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে অনিকেতকে বলল,"খেয়ে নাও। আর মাছ নেবে?"



তন্ময়ী বিদিশার নোটগুলো ঝালাতে ঝালাতে চিন্তিত অভ্রকে একবার আর চোখে দেখে নিল। দায়িত্ববান লোক অভ্র। পিসিমাকে যে সে ভালবাসে তাও স্পষ্ট।

তন্ময়ী আর কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে নোটগুলো পড়ে নিল। তারপর খাতাটাকে একপাশে রেখে বলল, "অভ্র আপনি এত চিন্তা করবেন না। আপনি একটা কাজ আমাকে বিশ্বাস করে করতে পারবেন?"

"কি বলুন? মানে বুয়াকে কি কোথাও ভর্তি করতে..."

তন্ময়ী অভ্রকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "না না। ব্যাপারটা আরও সহজ। আপনার পিসিমার কোন মানসিক অসুখ নেই। আচ্ছা আপনার পিসিমার বিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়নি কখনও?"

"হয়েছিল। আসলে ঠাকুরদার ইচ্ছে ছিল না বুয়ার বিয়ে হোক। যতদিন উনি বেঁচেছিলেন তেমন চেষ্টা করা হয়নি। বাবা চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন বুয়ার বয়সটাও বেড়ে গেছিল। আর বুয়া বড় ঘরকুনো সাদামাটা। কেউ ঠিক এগিয়ে আসেনি।"

"হমম। এই শৌনকের গল্প কবে থেকে উনি বলেন।"

"বাবা মারা যাবার পর থেকে। তখন থেকেই মাথায় সিঁদূর দেওয়া, শাখা পলা পড়া শুরু করল। আসলে আমি কখনও এই নিয়ে প্রশ্ন করিনি। ভাবতাম যদি এই ভেবে শান্তি পায় তো পাক।"

তন্ময়ী শুনে চুপ করে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল, "ওঁকে ছেড়ে দিন।"

অভ্র ঠিক এই উপদেশ আশা করে নি। বলল, "দেখুন উনি তো একা খুব একটা যাতায়াত করেন না। এতদূর একটা অজানা অচেনা শহরে কি করে ছাড়ি বলুন তো?"

"শৌনক আসলে একটা alibi । আপনার বাবা, ঠাকুরদা... আপনিও, পিসিমাকে বড় overprotect করেছেন। সে আপনাদের থেকে দুর্বল চরিত্রের বলে কখনও এর থেকে ভেঙে বেরতে পারেন নি। সবই মানিয়ে নিয়েছেন। তার নিজের ইচ্ছা, আকাঙ্খাগুলো একে একে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। আমার ধারণা ওনার মধ্যে স্বাবলম্বী হবার তাড়নাই এই রকম ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। ওকে একবার ছেড়েদিন।"

"কিন্তু উনি তো কখনও... "

"জানি। তবুও। উনি তো শিশু নন। এখানেও মাঝেসাঝে নিশ্চয়ই একা যাতায়াত করেন। উনি ম্যানেজ করে নেবেন।"

অভ্র চুপ করে বসে রইল। তন্ময়ী আবার বলল, "আপনার দিদিকে একবার জানিয়ে দেবেন যে উনি আসছেন, যেন খোঁজখবর নেন। আর আপনার পিসিমার মোবাইল ফোন আছে?"

অভ্র দুদিকে মাথা নাড়ল।

"তাহলে একটা কিনে দিন। আর ওনাকে একবার ছেড়ে দিন। দেখুন না কি হয়।"

অভ্র সন্তুষ্ট না হয়ে বসে রইল।



প্লেনটা রানওয়ে থেকে উড়ে গেল। অভ্র তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। পিসিমার জন্য ভালই লাগল।



বিদিশা এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্নদৃষ্টিতে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল শৌনককে। খানিকপরে কাকে যেন দেখে স্থির হয়ে গেল। মুখে ফুটে উঠল হাসি। বিদিশা হাত নাড়ল।

আপনার মতামত জানান