আমরা তিনজন সমান্তরালে হাঁটি

রাহুল ঘোষ


আমরা তিনজন সমান্তরালে হাঁটি।তিন বন্ধু,তিন কাঠি মন,তিন জোড়া হাত,তিন জোড়া পা,কিন্তু পায়ে হাঁটা পথ সেই একটাই।
আমরা সমান্তরালে হাঁটি।
এটা অভ্যাস।
প্রায় প্রত্যেক রাতেই নয়াসড়কের মোড় থেকে হাঁটতে হাঁটতে পরিচিত চৌহাট্টার মোড়ের ল্যাম্পপোস্টটা ছুঁয়ে আমরা আবার ফিরতি পথে হাঁটা ধরি।সেই পথে কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যেতে চাই নি কোনদিন,একজন আরেকজনের পিছনে পড়ে থেকে শুধু শুধু পথের জ্যামিতিতে কোন বিষমবাহু ত্রিভুজ অথবা সম্পূরক কোণ সৃষ্টি করতে পারতাম না ভুলের বশেও।আমরা সমান্তরালে হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় একটামাত্র সরলরেখা হয়ে যাই,সবার কাছে না,শুধু মাত্র “সেঁজুতি নিবাস” নামাঙ্কিত নেমপ্লেটওয়ালা যে বাড়িটা সেই বাড়িটার ছাদে ঝাপসা চোখে বিলাসী জল নিয়ে ছয় মাস বয়েসী প্রেমিকের সাথে ঝগড়ারত প্রেমিকাটার কাছে।আমরা ধরে নিলাম মেয়েটার নাম সেঁজুতি।তো বেচারীকে তাঁর সাসপিসিয়াস মাইন্ডেড প্রেমিকটা সন্দেহ করছে।তার প্রেমিকের বক্তব্য হচ্ছে এটাই যে সেঁজুতি আরো কয়েকটা এক্সট্রা মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে অথবা সিম।এর উপর আবার বেচারীকে কারণ দর্শাতে হচ্ছে কেনই বা সে হঠাৎ করে ফেইসবুকের পাসওয়ার্ডটা বদলে ফেলল।সচরাচর এইসব গোপন কথা হয়েই থাকে,কিন্তু এই নিঝুম রাতের সর্বশান্ত প্রতিবেশটা ঐ দুইতলার ছাদটাকে আমাদের অনেকটা কাছে নিয়ে এসেছে।তারপর হঠাৎ কোন কিছু ভেঙে পড়ার শব্দ আসে ঐ ছাদটা থেকে।আমরা তিনজন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠিক বুঝে নেই- সেঁজুতি তার একমাত্র মোবাইল ফোনটা ভেঙে ফেলেছে।মেয়েদের রাগ মানেই বিলাসিতা-রাতুলের এই উক্তিটার যথার্থতা আমরা সেই রাতেই পেয়ে যাই।
রাতুল-আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কম,কিন্তু দামী কথা বলা বন্ধুটা।আজকে আমরা এই তিনজন।কিন্তু গতকালও সংখ্যাটা চারে ছিল।আজকে রাতুল আসে নি।তার আসাটা স্বাভাবিকও না।আমাদের মধ্যবিত্ত মোবাইল ফোনগুলোর ফরমায়েসী অন্তর্জালে তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।আমরা তিনজন ফিবোনাক্কি সিরিজ অনুসরণ করে তাকে ফোন করে যাচ্ছি।অথচ ঐ পাশ থেকে একটা একগুঁয়ে স্বাগতস্বর ছাড়া আর কিছুই ফিরছে না আমাদের জন্যে-

“আমাকে আমার মতো থাকতে দাও,আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি”।

কিন্তু আমরা জানি-রাতুলের অথবা আমাদের নিজের বলতে,নিজের মতো বলতে কিছুই ছিল না কোনদিন।তবুও রাতুল মানতে চাইত না।তার নিজের “কিছু একটা”,অথবা “কেউ একজন” আছে বলেই সে জানত।সেই “কিছু একটা”ও আজ নাই এর ঘরের নামতা গুণল।আর তাই তার কোন কিছুই আজকে গোছালো নেই।ঐ ওয়েলকাম টিউনটা ডাহা মিথ্যে বলছে।রাতুলের নিম্নবিত্ত স্কুল মাস্টার বাবাটা আজকে বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথ ভুলে অন্য এক অচেনা পথে হেঁটে চলে গেছেন,কাউকে কিছু না বলেই।তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।তার ফিরতি পথের বাসগাড়িটায় হঠাৎ করেই নাকি আগুন লেগে গিয়েছিল।ঐ আগুনটা কোন সাধারণ আগুন না।এটা আমরা যেমন জানি তেমনি রাতুলও জানে।যে দেশে ভরাপেটে অনশন চলে সেই দেশে কোন আগুনই বেহুদা লাগে না।দিনবদলের মিছিলগুলোই কিনা সেই আগুনের উৎস!

আমি ভাবছি,রাতুলটা বোধহয় খুব কাঁদছে আজকে।ওকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখিনি।তাই জানি না ওর কান্নার রংটা কিরকম।তবু খুব ভাল করেই জানি- ওর দুঃখে ,আক্ষেপে কোন বিলাসিতা নেই।পুড়ে যাওয়া মানুষটাকে দ্বিতীয়বার পুড়াতে হবে-নিঃসন্দেহে খুব কঠিন একটা কাজ।রাতুলকে করতে হবে আজ রাতে সেই কাজটা।বাবার মুখে আগুন দিতে গিয়ে রাতুলের হয়তো মনে পড়ে যাবে টেবিলক্লথের নিচে লুকিয়ে রাখা,তার নিজেরই লেখা,সেই কবিতাটার কথা-

“আমরা ভালোবাসি
মধ্যবাসন্তী রাতের চন্দ্রমুখী ফানুশপাখি।
অথচ সেই আমরাই পিছুটানে ভুলে থাকি
চন্দনকাঠের চিতার পালকি!”

আমরা হাঁটতে হাঁটতে চৌহাট্টার মোড়ের সেই ল্যাম্পপোস্টটা ছুঁয়ে ফেলেছি।এবার ফিরতি পথে আবার হাঁটা শুরু।বন্ধু টুটুল শিষ দিয়ে গাইছে অঞ্জন দত্তের সেই গানটা-

“সবাই কেন গাইতে গেলে প্রেমের গানই গায়
ঘুরে ফিরে সেই ভালবাসার কথাটাই,
আমি অন্য কিছু গাইব বলে তোমার কাছে এসে
সবাই কেবল সবাই হয়ে যাই।
আমি অন্য কিছু নই আমি সবাই।।
তাই সবার মতই উঠতে হবে আমাকেও কাঁধে
বয়ে যেতে হবে একই গঙ্গায়,
আমি অন্য কারও হাতের ভেতর একমুঠো ছাই
আমি অন্য কিছু নই আমি সবাই।”

বন্ধু নিশাতের দুপুরের আধখাওয়া গোল্ডলিফ সিগারেটটা আবার ধোঁয়া ছাড়তে শুরু করেছে।তাকে অনেক বার প্রশ্ন করেছিলাম,সে কেন সিগারেট খায়?উত্তরে সে প্রতিবারই আমার মুখের উপর একপশলা সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে বলে দিয়েছে –“অনেক দুশ্চিন্তা, তুই বুঝবিনা”।

আমি জানি ,আমি বুঝি।

আমার এই বিড়িখোর বন্ধুটা অনেক দুঃখ লুকিয়ে রেখেছে তার বুকপকেটে।গতমাসে তার মায়ের কাছ থেকে আসা চিঠিটা আমি তার বুকশেলফের চোরাকোণ থেকে বের করে লুকিয়ে পড়ে ফেলেছি,জানি অন্যায়,তবু সেই পাপটা করেই আমি অনেক বড় একটা সত্যিকে আবিষ্কার করেছি।নিশাতের বড়াপু,আমি চিনি ঐ আপুটাকে,রোখসানা আপু,গতমাসের কোন এক বেহায়া শনিবারে ফটিকঘরের সিলিংয়ে নীল ওড়নার একগিঁড়োতে আটকে গিয়ে সীমানা পেরিয়ে গিয়েছে।তার মায়ের চিঠিটা আমি যখন পড়ছিলাম,তখন আমার মনে হয়েছিল আমি বোধহয় কোন চিঠি পড়ছি না,পড়ছি একটা বেসরকারি কবিতা-

“যুবতীর আত্মহত্যার প্রশ্নে যৌনতা লেপ্টে থাকে ।
মেয়েটিকে কি ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে
ফাঁসে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ?
কারা করেছে ? কে ?
নাকি কেউ পেট বাঁধিয়ে সটকে পড়েছে বলে
অপমান হতাশায় মেয়েটি নিজেই নিজের হন্তারক হয়েছে ?
মেয়েটির ভগ্নিপতি কি ভজকট বাধিয়েছিল ?
নাকি চাচাতো , মামাতো , তালতো ভাই ?
নাকি বাড়ির ওই সুদর্শন কেয়ারটেকার ?
আমি দেখি , লাশের বাঁ হাতের তালুতে লেখা -
“ মা , তোমরা যার সঙ্গে আমার বিয়ে পাকাপাকি করেছ
তাকে আমার পছন্দ নয় ।”

চিঠিটা পড়ার আগে আমি প্রতিবারই ওর হাত থেকে সিগারেট কেড়ে নিতাম।সিগারেটের বদলে পাঁচটাকার মিষ্টি খিলিপান কিনে দিতাম।চিঠিটা পড়ার পরে আর সিগারেট কেড়ে নেই না।আমার সাহস কিংবা বন্ধুত্বের দাবি কোনটাতেই আর তেমন কুলোয় না।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা আবার সেই সেঁজুতি নিবাসের সামনে এসে গেছি।সেঁজুতির ঘরটা অন্ধকার।শুধু থেমে থেমে বেডল্যাম্পটা একবার নিভছে,একবার জ্বলছে।বেচারী এখনও ঘুমায়নি,হয়তো এখনও কাঁদছে।

আমাদের এই বর্ণচোরা শহরটায় বেঁচে থাকা অথবা ঠিকে থাকা মানুষগুলো,ওরা সবাই নিজেদের মতো করেই কমবেশি সুখী।আবার পদ্মপাতার শিশির জলের সাথে জলফড়িংয়ের প্রেমের গল্প লিখতে লিখতে ওরা প্রায়শই অন্যের দাবি মেনে,অন্যদের হিংসে করে অন্যমনে দুঃখী হয়ে পড়ে।সেঁজুতিদের বারোয়ারী ছাদের দখিণ কোণায় একটা সুন্দর বাসন্তী চাঁদ উঠেছে।আমার সেঁজুতির জন্যে খুব করুণা হচ্ছে,বেচারী ঐ চাঁদটাকে মিস করছে ফাঁকতালে।

আমরা তিনজন এখনও হাঁটছি,কান্নার রং আর হাসির অর্থ ভাগাভাগি করতে করতে।সেই সমান্তরালেই।এটা অভ্যাস---।।

আপনার মতামত জানান