রা

অভিষেক গুহ রায়




রুপুর মন কদিন ধরে খুব খারাপ।
দিদিমাতো আসছেই না...
বাবা মাকে সে আর জিজ্ঞেস করবে না। করলেই শুধু বলবে, দার্জিলিংয়ে গেছে।
দার্জিলিংয়ে রুপুর বড়মাসী থাকে...তার মা আর বড়মাসী, দিদিমার দুই মেয়ে। দিদিমা বছরে চারমাস করে দুই মেয়ের কাছে থাকে...আর বাকী সময়টা রুপুর মামাবাড়ীতে, সেই কল্যাণীতে।
কিন্তু রুপু মনে মনে জানে, দিদিমা এখন দার্জিলিংয়ে নেই।
এটা তো বড়মাসীর বাড়ি যাওয়ার সময়ই নয়, সবে তো দুমাস হল তাদের বাড়িতে এসেছিল দিদিমা। আর এরকম তাকে না জানিয়ে হুট করে থোড়াই দিদিমা চলে যাবে নাকি?
রুপুর দুঃখ হবে দিদিমা যেন বুঝবে না?
প্রত্যেকবার যাওয়ার আগে কত কান্নাকাটি হয়...দিদিমা চলে যাওয়ার দিন রুপুর যেরকম ভীষণ মনখারাপ হয়, দুগগা্‌ ঠাকুর বিসর্জনের দিনও ততটা হয়না।
তার ওপরে দুদিন আগে ড্রাইভারকাকুর সাথে স্কুল থেকে ফিরে ঘরে ঢুকে সে দ্যাখে বড় শোওয়ার ঘরে মা আলো নিভিয়ে শুয়ে আছে। মার তো অফিস থাকে, এ সময়ে তো বাড়ি থাকার কথা নয়। রুপুর আওয়াজ শুনে মা তাড়াতাড়ি ডাইনিংয়ে চলে এসেছিল। রুপু তখন খেয়াল করেছিল, মায়ের চোখের কোণে জল শুকিয়ে আছে...মা কি কাঁদছিল?
বাবাও তো সেদিন ডাক্তারকাকুর সাথে দরজা বন্ধ করে কতক্ষণ কথা বলছিল।
রুপু অত ছোট নয় যে বোঝেনি কিছু একটা হয়েছে। সে এখন যথেষ্ট বড়, ক্লাস ফোর শেষ করে ফাইভে উঠবে। কিন্তু তার একটাই চিন্তা, দিদিমার কিছু হয়নি তো?
সে দুগগা্‌ ঠাকুরকে মন দিয়ে ডাকবে, দিদিমাকে তাড়াতাড়ি ভাল করে দিতে... আচ্ছা, মিশরের সেই দেবতাকে ডাকলে কিরকম হয়?
কিন্তু দিদিমা যা বলছিল সেতো অনেক আগের ঘটনা...এদ্দিনে দেবতাটা নিশ্চয়ই খুব বুড়ো হয়ে গেছে, শুনতে পাবে তো?
ধুর ধুর ওতো দেবতা...দেবতারা আবার বুড়ো হয় নাকি?
এত চিন্তার মধ্যেও রুপুর হাসি পেল।
কি যে আবোলতাবোল সে ভাবছে...হ্যাঁ মিশরের সেই দেবতাকেই সে ডাকবে, তাহলেই দিদিমা ভাল হয়ে এসে তাকে গল্পটা শেষ পর্যন্ত শোনাবে।

“রূপকথা, ও রূপকথা”
কে? কে ডাকছে?
রুপুকে রূপকথা বলে ডাকার লোক তো একজনই...দিদিমা।
রুপু চোখ খুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দ্যাখে, ওমা দরজার কাছে কে দাঁড়িয়ে আছে?
দিদিমা!
রুপু আনন্দে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল।
কিন্তু দিদিমা মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলল।
“আরে, করছিস কি? পাগল মেয়ে...সবাই জেগে যাবে তো।”, দিদিমা ধীরে ধীরে রুপুর বিছানার কাছে এসে বসল।
“তুমি ভাল হয়ে গেছ?”, রুপুর গলা থেকে খুশী ঝরে পড়ছে।
“আমি আবার কবে খারাপ হলাম?”, ঠাকুমা মিষ্টি হেসে রুপুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“তোমার কিছু হয়নি?”, রুপু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“তুই থাকতে আমার কি হবে?”, ঠাকুমা হাসল।
“তাহলে তুমি কোথায় গেছিলে?”
“হুম, এটা একটা প্রশ্ন বটে। আমি গেছিলাম...”, দিদিমা একটু চুপ করে থেকে রুপুর দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হাসল, “মিশরে”।
“মিশরে!!! কেন?”, রুপুর মুখ হাঁ হয়ে গেল।
“অতবড় হাঁ করিস না, মাছি ঢুকে যাবে।”, দিদিমা রুপুর গাল টিপল, “বাহ্‌, আমি না গেলে রাজবৈদ্যকে খুঁজে পাওয়া যাবে কি করে?”
“অ্যা! তুমি তাকে খুঁজতে গেছিলে?”
দিদিমা আবার হাসল, “হ্যাঁ, তাকে খুঁজতেই।”
“কিন্তু মিশর তো অনেকদূর। তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এলে কি করে?”, রুপুর এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছেনা।
“বাহ্‌, আমার রূপকথাকে গল্পের শেষটা বলতে হবে না?”, দিদিমা ফিসফিস করে বলল, “মনে আছে তো কদ্দুর বলেছিলাম?”
রুপুর আবার মনে থাকবে না...সে চোখ বন্ধ করল, ছবির মতো তার মনে আছে দিদিমার কথাগুলো...
নীলনদ...হায়ারোগ্লিফিক... ফ্যারাও...রা...মরুভূমি...

“কতযুগ আগেকার কথা...পুরো দেশটা জুড়ে ধু ধু করছে মরুভূমি। যে দিকে দুচোখ যায় শুধু বালি আর বালি। আর সেই হলুদ বালির মাঝখান দিয়ে শুধু বয়ে চলেছে ঘন নীল রঙের একটা নদ...নামটাও তাই, নীলনদ। এরকম জায়গায় কি আর লোকে থাকতে পারে? কিন্তু তাও ঘুরতে ঘুরতে একদল লোক থাকতে এল। আর শুধু এলই না, শুধু নীলনদের জলের ওপর ভরসা করে গড়ে তুলল এমন এক সভ্যতা যা আজও সারা পৃথিবীর কাছে বিস্ময়।”, দিদিমা থামল।
“আগেকার সেভেন ওয়ান্ডার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড...গ্রেট পিরামিড অফ গিজা।”, রুপু বলে উঠল।
“ঠিক বলেছিস, তবে আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখনও গিজার পিরামিড বোধহয় তৈরি হয়নি। দেখি তো ক্লাসে তোদের কিরকম জিওগ্রাফি পড়ায়...বলতে পারবি মিশরের রাজধানীর নাম কি?”, দিদিমা প্রশ্ন করল।
“উঁহু, মনে পড়ছে না।”, রুপুর অকপট স্বীকারোক্তি।
“যাহ্‌, গিজা জানিস আর এই সোজাটা পারলি না? কায়রো...যদিও সেটা এখনকার সময়ে। তখনকার যুগে মানে মিশর যবে গড়তে শুরু করেছিল সে সময়ে কিন্তু রাজধানী ছিল অন্য একটা জায়গা।”
“কি নাম জায়গাটার?”
“মেমফিস্‌। মিশরের রাজাদের বলা হত ফ্যারাও। এই ফ্যারাওরা মিশরে অনেকদিন ধরে রাজত্ব করেছিল। একদম শুরুর দিকের এক ফ্যারাও মেনেস আবিষ্কার করেছিল মেমফিস্‌ রাজ্যটা।”
“এই মেনেস কে নিয়েই গল্পটা?”, রুপু জিজ্ঞেস করল।
দিদিমা হেসে ফেলল, রুপুর আর তর সইছে না বুঝতে পেরে, “না, মেনেসকে নিয়ে নয়। মেনেসের ব্যাপারে আজ অবধি কোনও খবরই প্রায় পাওয়া যায়নি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মিশরের লোকেরা কিন্তু ঠাকুর দেবতা ভীষণ মানত। কিছু গণ্ডগোল হলেই ভাবত, দেবতা বোধহয় রাগ করেছে। আসলে মরুভূমির ধারের শহর তো, প্রাকৃতিক বিপর্যয় লেগেই থাকত...সাধারণ মানুষ মনে মনে তাই আতঙ্কে থাকত। তবে সব দেশের মতোই দেবতাকে ওরা যত না ভক্তি করত তার থেকে বেশী ভয় পেত। আর তাই দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য যাগযজ্ঞ, পূজাঅর্চনা কিসব এলাহী ব্যাপারই না করত।”
“তুমিও ঠাকুরকে যে অত ধুপ ঘোরাও সেটা কি ভয় পেয়ে?”, রুপু দুষ্টু হাসি হাসল।
“খাবি এক চাটি”, দিদিমা মিছিমিছি রাগ দেখিয়ে চোখ বড় করল, “আমি কাউকে ভয় পাইনা, খালি ভয় পাই মানুষকে। কারণ, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু মানুষ নিজেই।”
“অ্যাঁ! তাই নাকি?”, রুপুর ঠিক ব্যাপারটা হজম হোল না।
“বড় হ বুঝবি। যাকগে্‌ যেটা বলছিলাম সেটা শোন। তো এই দেবদেবীদের নিয়ে কিন্তু একটা ভারী মজার ব্যাপার ছিল। অনেক দেবতার শরীরটা ছিল মানুষের আর মুখটা ছিল কোনও না কোনও জন্তুজানোয়ারের...শিয়াল , কুকুর, ভেড়া, ঈগল এইসবের। আর কি অদ্ভুত সব নাম তাদের...আনুবিস, তা, নেপথিস, আইসিস, ওসিরিস। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতা ছিল রা, সূর্যের দেবতা।” দিদিমা থামল।
“তারপর?”
“তারপর? তারপর এই রা কে নিয়েই আমাদের গল্প।”


“বড় হয়ে যদি মিশরের ইতিহাস পড়িস তো দেখবি মিশরের সিংহাসনে অনেক বড় বড় ফ্যারাও রাজত্ব করে গেছে। কিন্তু আমি যার কথা বলছি সে ছিল খুব কম সময়ের জন্য...নাম নেফারসেক। নেফারসেক যখন সিংহাসনে বসে সে সময় গোটা মিশর জুড়ে অশান্তি চলছে। একে তো সে বছর ভাল ফসল হয়নি, তার ওপরে আগের ফ্যারাও ছিল খুব অত্যাচারী। মিশরীয়দের মনে প্রচুর ক্ষোভ জমা হয়ে আছে। সব মিলিয়ে খুব কঠিন সময়। নেফারসেক তো চিন্তায় পড়ে গেল। তড়িঘড়ি সে তার মন্ত্রী-সামন্ত, পুরোহিতদের নিয়ে জরুরী সভা ডাকল অবস্থা কি করে সামাল দেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে।”
“নেফারসেক কি ভাল ফ্যারাও ছিল?”, রুপুর কৌতূহলী প্রশ্ন।
“ভাল কিনা জানিনা। তবে ভাল খারাপ যাই হোক, অশান্তি নিয়ে রাজত্ব চালাবে কি করে? সভায় প্রচুর তর্কবিতর্ক হোল। শেষ পর্যন্ত সবাই একমত হোল যে, দেবতা রাগ করেছেন...তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে। প্রধান পুরোহিত ওরফে প্রধানমন্ত্রী জানাল তার দুদিনের সময় চাই, দেবতার কিসে রাগ কমবে জেনে সে জানাবে। তাহলেই শান্তি ফিরে আসবে।”, দিদিমা অনেকক্ষণ বলে একটু থামল।
কিন্তু রুপুর মনের প্রশ্ন কে থামাবে, “দেবতা মানে রা?”
“আবার কে? রা কে সবাই বিশাল ভয় পেত। সবাই বিশ্বাস করেই নিয়েছে, সে রাগ করেছে বলেই না এত কান্ড।”
“হুমম্‌! তারপর?”
“ফ্যারাও তো মনে বিশাল দুশ্চিন্তা নিয়ে প্রাসাদে ফিরে গেল। নেফারসেকের ছিল এক রাণী আর এক ছেলে। ছেলেটা তখন খুবই ছোট, এই তোর থেকে হয়তো বছর পাঁচেক বড় হবে। ভীষণ ডানপিটে। আর তার দস্যুগিরির প্রধান সাকরেদ ছিল রাজবৈদ্যের ছেলে। বৈদ্য মানে বুঝিস তো? ডাক্তার। তা সেই ডাক্তারের ছেলে আর ফ্যারাওয়ের ছেলের তো একেবারে গলায় গলায় বন্ধুত্ব। যাই হোক, ফ্যারাও রাণীকে পুরো ঘটনাটা জানাল। সব শুনে রাণীও ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। উৎকণ্ঠা নিয়ে তারা অপেক্ষা করতে লাগল, দুদিন পরে পুরোহিত কি বলে।”
“এতে এত চিন্তার কি আছে?”, রুপু বুঝতে পারল না।
“চিন্তার ছিল। সেটাতে আসছি একটু পরে। রা যে সে দেবতা নয়, তাকে সন্তুষ্ট করা কোনও সামান্য ব্যাপার যে ছিল না, এটা নেফারসেকের অজানা ছিল না। আর সেটাই সত্যি হোল। দুদিন পরে রাজপুরোহিত গম্ভীরভাবে এসে জানাল, রা কে শান্ত করার একমাত্র উপায় রাজরক্ত। রাজপরিবারের সদস্যকে উৎসর্গ করতে হবে, তাহলেই রা সন্তুষ্ট হবে। শুনে তো রাণী অজ্ঞান হয়ে গেল, আর ফ্যারাওয়ের দুশ্চিন্তায় নাওয়া খাওয়া বন্ধ।”
“ইসস্‌, রা কি নিষ্ঠুর দেবতা।”, রুপু রাগ চেপে রাখতে পারল না।
“উঁহু, এখানে রা এর কি দোষ? রা কি নিজের মুখে এসে এ কথা বলেছে? বলেছে তো পুরোহিত। চালাকিটা দ্যাখ, রাজরক্ত মানে রানী হলে চলবে না, ফ্যারাও নিজেও নয় তাহলে দেশ চালাবে কে? রইল বাকী কে তাহলে? ফ্যারাওয়ের সবেধন নীলমণি একমাত্র ছেলে।”, দিদিমা বোঝাল।
“কিন্তু ওকে মেরে পুরোহিতের লাভ কি?”, রুপুর এখনও ঠিক ব্যাপারটা পরিষ্কার হোল না।
“বুঝলি না, আরে তাহলেই তো রাস্তা সাফ, মিশরের সিংহাসনের আর কেউ দাবীদার রইল না। এরপরে শুধু ফ্যারাও একা। তাকে সরালেই ব্যাস, পুরোহিতের ফ্যারাও হওয়া কে আটকাচ্ছে?”, দিদিমার অকাট্য যুক্তি।
রুপুর মাথা ঝিমঝিম করছে, এত ঝামেলা, “তো ফ্যারাও কি করল?”
“ফ্যারাও আর কি করবে? রাজপুরোহিতের ওপরে কথা বলার সাহস ফ্যারাওয়েরও ছিল না...তার ওপরে সে বলছে নাকি রা এর নিজের মুখের কথা। খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল গোটা দেশে। ফ্যারাওতো অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু না, রা নাকি এছাড়া মানবেই না। মানে পুরোহিত এরকম মওকা আর ছাড়ে নাকি? ঠিক হোল কুড়িদিন পরে মিশরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নতুন বছরের প্রথম দিন রা য়ের জন্মদিন, সেইদিন উৎসর্গ করা হবে।”
“তারপরে?”
“তারপরে অনেক রাত হয়েছে, এবারে যে শুতে হবে রূপকথা। বাকীটা কালকে।”, দিদিমা রুপুর কপালে চুমু খেয়ে লাইট নিভিয়ে দিল।

সারাদিন স্কুলে রুপু উৎকণ্ঠায় ছটফট করতে লাগল, কখন রাতে বাকীটা শুনবে। উফ্‌! ক্লাসগুলো যেন শেষই হচ্ছে না। তার আজকে কিছুতেই পড়ায় মন বসছে না...খালি একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল, রা কি এত বড় অন্যায়টা হতে দেবে? কিসের ক্ষমতাশালী দেবতা তাহলে সে? কিছু কি সে করবে না? চুপটি করে মন্দিরে বসে থাকবে?
স্কুল শেষের ফাইনাল ঘণ্টাটা পড়ামাত্র ব্যাগ কাঁধে গাড়ির দিকে পড়িমড়ি করে ছুট লাগাল রুপু। ড্রাইভারকাকু তো দেখে অবাক...অন্যদিন স্কুলের পরে রূপসা, অনামিকাদের সাথে রুপুকে খেলা থেকে টেনে হিঁচড়ে আনতে হয়...আর আজকে একেবারে নিজের থেকে লক্ষী মেয়ের মতো...কি জানি বাবা!
বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দার করে উঠে কিন্তু রুপু থতমত খেয়ে গেল। একী বাবা এত তাড়াতাড়ি বাড়িতে? মাও তো চলে এসেছে দেখছি। দুজনেরই মুখ গম্ভীর...কি হয়েছে?
“ওষুধটা দিয়েছি। আপাতত তো স্টেবল আছে...রাত অবধি দেখা যাক, যদি কিছু বাড়াবাড়ি হয় তো তখন...আরে রুপু ডার্লিং কেমন আছো?”, ডাক্তারকাকু ঠাকুমার ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলল।
“দিদিমার কি হয়েছে?”, রুপু সোজা জিজ্ঞেস করল।
“দিদিমার? আররে নাথিং। ওই একটু জ্বর জ্বর হয়েছিল আরকি।”, ডাক্তারকাকু হেসে উত্তর দিল।
“আমি যাই দেখে আসি।”, রুপু কাঁধ থেকে স্কুলের ব্যাগটা ছুঁড়ে সোফায় ফেলে বলল।
“না রুপু, দিদিমা এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমোচ্ছে। এখন ডিস্টার্ব কোরো না। যাও হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। সন্ধ্যেবেলা দেখা করবে।”, মার কথা শুনে রুপু আর পা বাড়াল না।
...................................................
“তোমার কি হয়েছে দিদিমা?”, রুপু রাতে দিদিমার গলা জড়িয়ে ধরে বুঝল দিদিমার গা বেশ গরম।
“আমার? ধুর কিছুই হয়নি। ওই দুটো ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে।”, দিদিমা ম্লান হাসি হাসল।
“উহু্‌, তোমার গা গরম। তাহলে তুমি শুয়ে পড়ো, কালকে শুনবো।”
“কাল অবধি তর সইবে তোর? এসে থেকে ছটফট করছিস আমি যেন বুঝিনি।”, দিদিমা ভ্রু কুঁচকে তাকাল রুপুর দিকে।
রুপু হেসে ফেলল, সত্যি উত্তেজনা তো কিছু কম হচ্ছে না তার।
“শোন তাহলে, গোটা মিশরে তো এই খবরে একেবারে শোরগোল পড়ে গেছে। এদিকে রাজপ্রাসাদের মতোই মেমফিসে্‌র আরেকপ্রান্তে একটা বাড়িতে কিন্তু নাওয়া খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। সে বাড়িতে থাকে মিশরের রাজপুত্র মেনকাফের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, রাজবৈদ্যের ছেলে রাহোটেপ। ঘোষণার দিন রাতে প্রাসাদ থেকে ক্লান্তশ্রান্ত অবস্থায় রাজবৈদ্য বাড়ি ফিরলেন। তার এখন কাজ অনেক বেড়ে গেছে। ফ্যারাও আর তার রাণী দুজনকেই সামাল দিতে হচ্ছে...তার জীবনের বোধহয় সবচেয়ে কঠিন সময়। খাওয়া দাওয়া করে সবে তিনি নিজের ঘরে একটু বিশ্রাম নিতে ঢুকেছেন, হঠাৎ চোখে পড়ল দরজায় একটা ছায়া। উঠে দেখেন দরজার কাছে রাহোটেপ দাঁড়িয়ে আছে। কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করতে গিয়ে তিনি থমকে গেলেন, রাহোটেপের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। আর সে চোখে যে ব্যাথা লুকিয়ে আছে এতবছরের অভিজ্ঞতায় সেরকম রাজবৈদ্য আগে কখনও দেখেননি। রাহোটেপ কি বলতে চায় তিনি বুঝে গেছেন। হাত বাড়িয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি আর উপরে চৌকাঠের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, এ অসম্ভব কি করে সম্ভব করবো আমি? হে সর্বশক্তিমান রা পথ দেখাও।”, দিদিমা দম নিতে থামল।
“খুব কষ্ট হচ্ছে ঠাকুমা?”, গল্পে বুঁদ রুপুর এতক্ষণে খেয়াল হল দিদিমা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
“নারে সোনা, ও কিছু না, একটু জল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।” দিদিমা রুপুর মাথায় হাত বুলিয়ে ঢকঢক করে পাশে রাখা কাঁচের গ্লাস থেকে কিছুটা জল খেল, “আহ্‌! তো সেদিন সারারাত তো রাজবৈদ্যর দুচোখে আর ঘুম এল না। ছটফট করতে করতে ঘরের এদিক থেকে ওদিক পায়চারী করতে লাগলেন। ভোরের দিকে তিনি যখন ঘরের দরজা খুললেন, সারারাতের ক্লান্তি ছাপিয়ে তার চোখ দুটো তখন জ্বলজ্বল করছে। তক্ষুনি প্রহরী দিয়ে তার প্রধান শিষ্যকে ডাকিয়ে তাকে ফ্যারাও আর তার রাণীর কিভাবে শুশ্রূষা করতে হবে সেসব প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে দিলেন...কারণ সামনের কদিন তিনি রাজবাড়ি যেতে পারবেন না, ব্যস্ত থাকবেন। কিন্তু নেফারসেক যদি রাগ করে এই ভেবে শিষ্য কিন্তু কিন্তু করছে দেখে তিনি মুচকি হেসে একটা চিরকুটে কিছু লিখে তাকে দিয়ে বললেন শুধু রাণীকে এবং শুধুমাত্র রাণীকেই যেন সেটা সে দেয় তাহলে রাণীই সব সামলে নেবেন। এরপরে বাড়িতে বলে দিলেন, আগামী বারো থেকে চোদ্দ দিন তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। এই জানিয়ে তার ঘরে ঢুকে কুলুপ এঁটে দিলেন।”, দিদিমা থামল।
“চিরকুটে কি লেখা ছিল?”, রুপু আর থাকতে পারল না।
“আমি কি করে জানব? লেখা তো নয় ছবি, সেকি আর আমি বুঝি?”, দিদিমা হাসতে গিয়ে কাশি শুরু হয়ে গেল।
রুপু তাড়াতাড়ি জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ছবি? কেন ছবি কেন?”
দিদিমা জল খেয়ে একটু সুস্থির হয়ে বলল, “কারণ তখনকার মিশরের লেখা ছিল ছবি এঁকেই। ওরকম ছবিওয়ালা লেখাকে বলা হয় হায়ারোগ্লিফিক। রাজবৈদ্য রাণীর কাছে হায়ারোগ্লিফিক ভাষায় চিরকুট পাঠিয়েছিলেন।”
“আচ্ছা, বুঝলাম। মানে তুমি এখন বলবে না।”, রুপু ভুরু কুঁচকে বলল।
দিদিমা মুচকি হেসে আবার শুরু করল, “এভাবে তো দেখতে দেখতে দিন কেটে যেতে লাগল। নেফারসেক তো এদিকে শয্যাশায়ী। আঠারো নম্বর দিনে রাজবৈদ্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা দিলেন রাজপ্রাসাদের দিকে। প্রাসাদে ঢুকে তিনি নির্দেশ দিলেন, আজ আর কাল তিনি ফ্যারাওয়ের শয়নগৃহে কাটাবেন, কেউ যেন না ঢোকে। এমনকি রাণীর প্রবেশও নিষিদ্ধ। সবাই আশ্চর্য হলেও রাণী হলেন না। তিনি হুকুম দিয়ে কড়া পাহারা বসিয়ে দিলেন ফ্যারাওয়ের ঘরের সামনে। তারপর এল সেই দিন। গোটা মিশরের লোক ভেঙ্গে পড়ল রাজপ্রাসাদের সামনে। ফ্যারাওয়ের সভার সব মন্ত্রী, পেয়াদা মায় প্রধান পুরোহিত পর্যন্ত লাল টকটকে কাপড় পড়ে হাজির। কিন্তু ফ্যারাওয়ের পরিবারের কারোর দেখা নেই। পুরোহিত তো এদিকে ভেতরে ভেতরে অস্থির। শেষে সবার ধৈর্যের বাঁধ যখন ভাঙ্গতে বসেছে, তখন রাজপ্রাসাদের সদর ফটক খুলে গেল। আর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং নেফারসেক, পুরোদস্তুর যোদ্ধার বেশে। কিন্তু ছেলে মেনকাফ কই? সবাই শ্বাসরুদ্ধ করে অপেক্ষা করছে কি ঘটতে চলেছে ভেবে, এত লোক কিন্তু এতটুকু আওয়াজ নেই। প্রধান পুরোহিত আর থাকতে না পেরে বলে উঠল, যে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, এক্ষুণি উৎসর্গের কাজ করতে হবে। নেফারসেক বিদ্যুৎগতিতে জানিয়ে দিলেন, যে রা তার উৎসর্গ পাবেন, কিন্তু তার ছেলে মেনকাফকে নয়, প্রধান পুরোহিতকে। পুরো জনতা চমকে উঠল এ কথা শুনে। পুরোহিত মুখ খুলে অভিশাপ দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করতে গেছিল, কিন্তু তার আগেই নেফারসেক কোমর থেকে তলোয়ার বার করে রক্ষীদের নির্দেশ দিলেন পুরোহিতকে গ্রেপ্তার করে বধ্যভূমিতে নিয়ে যেতে।”
“মেনকাফ বেঁচে গেল তাহলে?”, রুপু আর থাকতে পারল না।
“হ্যাঁ, তা গেল। তখনকার মতো ঝামেলাও মিটে গেল। কিন্তু মিশরের সমস্যা মিটল না, গ্রীষ্মের তাপ বাড়তে থাকল আর ফসলের আকাল বাড়তেই লাগল। লোকে ভাবতে শুরু করল, এসব হচ্ছে রা র কথা অমান্য করার ফল। তারা গেল ক্ষেপে, সদলবলে একজোট হয়ে তারা একদিন চলল রাজপ্রাসাদের দিকে। এদিকে আগে থাকতেই সে খবর পেয়ে নেফারসেক তার পরিবার আর বিশ্বস্ত অনুচরদের নিয়ে গোপনে প্রাসাদের গুপ্ত পথ দিয়ে পালিয়ে যায় মিশর ছেড়ে চিরকালের মতো। এইভাবে শেষ হয় তার সংক্ষিপ্ত রাজত্বকাল।”
“আর রাজবৈদ্য?”
“তাকে বা তার পরিবারকে উৎসর্গের দিনের পর থেকে আর কেউ কোনোদিন দেখেনি। তবে মিশর ছেড়ে যাওয়ার সময় মেনকাফ প্রতিজ্ঞা করেছিল, যারা তার এতবড় উপকার করেছে তারা যেখানেই থাকুক, খুঁজে সে বের করবেই।”


“রুপু আজকে আর স্কুল নয়, দিদিমা আসছে।”, সকালে ঘুম ভেঙ্গে মার মুখে প্রথম এই কথাটা শুনল রুপু।
কিন্তু দিদিমাকে যে দেখল, কাল রাতে? সেটা কি স্বপ্ন? যাই হোক, মনটা তার শোনামাত্র খুশী হয়ে গেল, কত্তদিন পর দিদিমাকে দেখতে পাবে। গল্পটাও তো তার পুরো শোনা হয়নি। মেনকাফ বন্ধু রাহোটেপ আর তার বাবাকে খুঁজে পেল কিনা? রাজবৈদ্যই বা ফ্যারাওকে দরজা বন্ধ করে কি করেছিল যে সে রাতারাতি মত পাল্টে এরকম সাহস দেখাল?
বেলা এগারোটার সময় বাড়ির নীচে তাদের গাড়ির হর্ন শোনা গেল। রুপু দৌড়ে গিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল দিদিমাকে দেখবে বলে। বাবা দিদিমাকে ধরে ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে বাড়ির দিকে নিয়ে আসতে লাগল।
“দিদিমা!!”, রুপু আর থাকতে না পেরে খুশীতে চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু কি আশ্চর্য! দিদিমা একবার খালি মুখ তুলে রুপুর দিকে তাকাল তারপর তার পাশ দিয়ে বাবার হাত ধরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। কি ঠান্ডা সে দৃষ্টি, দিদিমা কি তাকে চিনতে পারল না?
রুপু কাঁধে একটা হাতের ছোঁয়া পেল...ঘাড় ঘুরিয়ে দ্যাখে মা।
“দিদিমার কি হয়েছে? তোমরা যে বললে দার্জিলিংয়ে গেছে?”, রুপু উদ্বিগ্নস্বরে প্রশ্ন করল।
মা রুপুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “না সোনা, দার্জিলিংয়ে নয়। সেটা তোমাকে না বললে তুমি চিন্তা করতে, দিদিমা নার্সিংহোমে ছিল।”
“কি হয়েছে? আমায় দেখে চিনতে পারল না কেন?”, রুপুর পুরোটা না জানা অবধি শান্তি নেই।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তোর দিদিমার যেটা হয়েছে সেটাকে বাংলায় বলে, স্মৃতিভ্রংশ...মানে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, সব ভুলে গেছে।”
“আমাকেও?”
“সবাইকে।”
“ঠিক হবে না?”
“হবে হয়তো। এখুনি ঠিক বলা যাচ্ছে না। ওষুধ তো চলছে, হলেও সময় লাগবে।”, মা চিন্তিত স্বরে বলল।
রুপু ঝুপ করে বসে পড়ল সোফায়, তারপরে নিজের মনে বলল, “তাহলে তো গল্পটাও আর মনে নেই দিদিমার।”
“কোন গল্প?”, মা রুপুর পাশে বসল।
“মিশরের একটা গল্প। শেষটা আর জানতে পারলাম না।”, রুপুর মুখ গোমড়া হয়ে গেল।
“মিশরের গল্প? ফ্যারাও নেফারসেকের কি?”, মা জানতে চাইল।
রুপু হাঁ করে মায়ের দিকে তাকাল, “তুমি জানো?”
মা আলতো হাসল, “হ্যাঁ, তোর দিদিমা আমাকেও তো গল্প বলত নাকি?”
“মেনকাফ কি তাহলে রাহোটেপ আর রাজবৈদ্যকে খুঁজে পেয়েছিল?”, রুপুর গলায় উত্তেজনা।
“দাঁড়া, দাঁড়া অত কি মনে আছে? মেনকাফ মানে ফ্যারাওয়ের ছেলে তো। হু মনে পড়েছে...হ্যাঁ, তা পেয়েছিল।”, মা উত্তর দিল।
“আর ফ্যারাওয়ের কি হয়েছিল? রাজবৈদ্য কি করেছিল?”
মা একটু চুপ করে রইল, তারপরে ধীরে ধীরে মুখ খুলল, “কি কাকতালীয় ঘটনা। এই গল্পটাই তোকে দিদিমা বলছিল?”
“হ্যাঁ, কেন কি হয়েছে?”, রুপু অবাক হয়ে গেল।
মা কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে রুপুর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “রাজবৈদ্য ফ্যারাওকে একটা ওষুধ খাইয়েছিল, যেটা সে চোদ্দদিন ধরে বানিয়েছিল। আর সেটা খেয়ে ফ্যারাওয়ের যেটা হয়েছিল সেটা তোর দিদিমার যা হয়েছে...স্মৃতিভ্রংশ। সে সব ভুলে গেছিল, সে কে, কি ব্যাপার সব। তখন রাজবৈদ্য তাকে একদিন ধরে নতুন করে সব সাজিয়ে বলে মাথায় ঢোকায় যে রা হচ্ছে এমন একজন দেবতা, যে শুধু ফ্যারাওয়ের কথাই শোনে। তাই রা আসলে ফ্যারাওয়ের সন্তানকে নয়, শয়তান মানে পুরোহিতের বলি চাইছে। নাহলে তখনকার দিনে ফ্যারাওয়ের অত সাহস হোত না, রা বা পুরোহিতের কথা ফেলে নিজের হুকুম চালানোর।”
রুপু হাঁ করে মায়ের মুখের দিকে কিচ্ছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, তারপর মার বুকে মুখ গুঁজে আস্তে আস্তে বলল, “সেই রাজবৈদ্য এখানে থাকলে দিদিমাকে ভালো করে দিতে পারত, না মা?”
মা রুপুকে জড়িয়ে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল, “হয়তো।”



আপনার মতামত জানান