কলকাতা কবিতাগুচ্ছ

বিশ্বজিৎ রায়


কলকাতাকে

কলকাতা মাই লাভ
কোন ছন্দে ধরব!

শপিং মল যে ছন্দে গড়া
সে ছন্দেই যে মরব
এমন যখন গ্যারান্টি নেই ।

যখন যেমন খুশি
লারে লাপ্পা লাপ্পা লারে
কলকাতা নেকু পুষি ।

গায়ে মাথায় পায়ের পাতায়
ইচ্ছে মতো হাটছে ।

কলকাতা মাই বাপ ।

সকাল বিকেল জাহাজ আনতে
কুমীরের খাল কাটছে ।




ওয়ান ওয়ে

যত দিন যাচ্ছে তত কলকাতা কলকাতা হয়ে উঠছি
আমি না কি তুই বলা খুব মুশকিল !

হয়তো দুপুরবেলা ইচ্ছে হলো
গিয়ে দেখি রাস্তাবন্ধ , মেন অ্যাট ওয়ার্ক
যে গলি কানা ছিল তা খুব তাড়াতাড়ি
খুলে যাবে ফ্লাইওভারের দিকে
ও রাস্তা দিয়েই ছুটে যাবে হুস হাস গাড়ি
অনেক অনেক লোক
খাঁজহীন খোঁজহীন ফ্ল্যাট ফ্ল্যাট বাড়ি ।

রাত্রি আটটায় যেতে গিয়ে দেখি
রাশি রাশি লালবাতি ,
তোর দিকে যাওয়ার
প্রতিটি পথকে সিটি পুলিশের লোক
ওলটানো চক্রব্যূহ করে ছেড়ে দিল –
ওই দিক থেকে আসতে পারে শুধু
তোর দিকে নৌকা বয়ে যেতে পারে না
আইন আইন ফাইন ফাইন ।


ইয়ে কলকাত্তা ওয়ান ওয়ে হ্যায় বাবুয়া ।

অভিমন্যু ,
আজকাল রাত আটটায় মেরি জানের
খুব ঘুম পায় ।



নাইট রাইডার

জামা ছোটো হয়ে গেলে কলকাতা তখন
সে সব অজীর্ণ-পুরনোকে পাঠাতো না বন্যাত্রাণে ।

মাসতুতোর ছোটো হয়ে যাওয়া জামা
আর পিসতুতোর খাটো প্যান্ট পরে
কিশোরবেলার দাদা সুনীল গাওস্কর দেখেছিল
ইডেন উদ্যানে ।

কী ব্যাট ! কী ব্যাট !
ছুটে আসা সাদা কালো বিদ্যুতের
আপেল আপেল গোলা
ব্যাটের মাঝখানে লেগে থমকে প্যাসেঞ্জার
এক রান , দুই রান, মাঝে মাঝে চার ।

বিদেশ থেকে দাদা
ছুটি-ছাটায়
এখন যখন দেশে –
নাভিপদ্ম খুলে
নতুন ছোটো জামায়
রাত জাগে আর ছোটে
কলকাতার নাইট রাইডার ।


ফ্লাইওভার

এক একটা সম্পর্কের ভেতরে আজকাল
দেখ না দেখ ফ্লাইওভার ঢুকে যাচ্ছে
বিবিজান,
যেমন গড়িয়া হাট ।

টুকটুক করতে করতে
বিকেল সন্ধে সারারাত
হেটেছিল যারা
তাদের একজন আজ চেনে উড়ালপুলের মাথা
অন্যজন খুঁজে নিচ্ছে নিচতলা ।

একজন উড়ে যাচ্ছে দিকবিদিকে
অন্যজন কুড়িয়ে নিয়েছে
পড়ে থাকা পাঁচসিকে ।

কী আর বলব বিবিজান
আর কটা দিন
পারো তো গলিপথ মাখো ।
না হলে
ডাঁয় আনতে বাঁয় কুলোয় না সংসারে
যে কোনো রাতেই কানা গলি
একছুটে ফ্লাইওভারের কাছে
চলে যেতে পারে ।



ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন লাইব্রেরি

এখন বন্ধ ।
যখন খোলা ছিল তখনও কি চোখে পড়ত সবার ?
শরৎচন্দ্র বিমল মিত্র টেবিলে এসে
বসে থাকত বাসনা মাসিমার ।
রোগা তবলার রিহার্সাল
হাত খোলতাই পাউডার –
হারমোনিয়ামে বৃন্দগান
ক্যারম বোর্ডের ঘুটি
গলিরাস্তার বাঁকে
দাঁড়িয়ে ছিলেন
লাচ্চা পরোটা , আলুর দম , শুকনো পাউরুটি –

ঢাকা পড়েছে
উই খাচ্ছে
নাচছে প্রমোটার
ঘুরছে ফিরছে ছিঁড়ে ফেলছে মিত্র পাঠাগার ।




বাসনা কাকিমা

জীবনের সার্চ ছিল কি ছিল না ,
সার্চিং ফর অ্যা মেড সার্ভেন্ট ছিল ।

সকাল বিকেলবেলা
পুরনোকে নিয়ে পুড়তে পুড়তে
খুঁজতে খুঁজতে
পেয়েও যেতেন
একদিন নতুন সহায়িকা ।

সুইস পার্ক , দুহাজার চার , বাসনা কাকিমা ।

বিদেশে ছেলে । স্বদেশে মেয়ে ।
দুজনেই বেশ অনেকদূরে
নিচের তলায় এক ভাড়াটে
ওপর তলায় একা ।

জেগে থাকতেন
ঘুমোত যখন আপ্ত সহায়িকা ।

জেগে জেগে কী ভাবতেন !
আকাশ পাতাল নেই ।

ওল আর কচু মাখার কথা
ইলিশ রাঁধার ব্যাকুলতা
ভয় করত যেই ।


রাত্রিবেলার যাত্রীবেলার
দেশ ভাঙা সেই দিন
সার্চ ছিল না
হিসেব হিসেব তার ।


চাঁদের আলোয় মেঝে ঢাকলে
ক্লান্তচোখ দিন গুনত
বাসনা কাকিমার ।




কবি সম্পর্কে- গোত্রে যদুবংশীয় । এখন বিশ্ববাং । মানে বিশ্বভারতীতে বাংলা পড়ান । ব্রহ্মলোকে থাকেন, কলকাতাকে মিস করেন । কলকাতার প্রেমিক, ঘেন্নাও করেন ষোলো আনা । ইনি কলকাতার দিওয়ানা ।


অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান