মনে পড়ে অরুন্ধতী

দেবায়ুধ চট্টোপাধ্যায়


অহমীয়া কবিতার সঙ্গে আমার বিশেষ পরিচয় কোনোকালেই ছিল না। এখনও যে আছে এমনটা দাবি করলে সেটা উচ্চমার্গের ফাটবাজি ছাড়া আর অন্য কিছু হবে না। পড়ার মধ্যে পড়েছি একগুচ্ছ হিরেন ভট্টাচার্য, প্রণয় ফুকন, নীলমণি ফুকন... নবকান্ত বড়ুয়ার ব্যাপারে উনি শঙ্খবাবুর বন্ধু এবং অহমীয়া সাহিত্যের একজন doyen, এটা বাদে আর কিছুই জানতাম না। দিল্লি আসার আগে বাংলা ভারতের অন্য সাহিত্যের সঙ্গে আমার কোনোরকম আদানপ্রদান হয়ে ওঠে নি। কিন্তু একটা কবিতা কাকে কখন কিভাবে ভাষার উর্ধ্বে উঠে, বর্ডারের সীমানা পেরিয়ে অবলীলাক্রমে ঘায়েল করে তা কবিতা নিজেও কি জানে? ব্যাপারটা খোলসা করা যাক।
একদিন রা নামের এক বন্ধুর মালকাগঞ্জের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে আমরা কয়েকজন হাভাতে মিলে সেই দুপুর দুটো থেকে গুছিয়ে নেশা করছিলাম। নেশা মানে অফুরন্ত গাঁজা এবং সস্তার সিগারেট সহযোগে ওল্ড মংক। রা গুয়াহাটির ছেলে। ক্রমে বিকেল পড়ে আসছিল,পুরানি দিল্লীর আকাশ ছেয়ে গেছিল শেষ শ্রাবণের মেঘে, মৃদুমন্দ হাওয়াও উঠেছিল, বৃষ্টি হবে হবে। এমন ক্রান্তিকালে অল্প নেশাচ্ছন্ন অবস্থায় ওই রা এবং আমার আরেক অহমীয়া মাদকমিত্র রূপম হঠাৎ করে কবিতা পড়তে শুরু করল, একটা অহমীয়া কবিতা। পুরোটা না বুঝলেও বারবার কানে ধাক্কা খাচ্ছিল অরুন্ধতী শব্দটা। ওদের মুখস্থ ছিল, গোটা কবিতাটা বার দুয়েক একসঙ্গে পড়ার পর স্রেফ দু'লাইন ইংরিজিতে বলল- Do you remember your poet, Arundhati? Your hair-bun smells of the evening...আমারও নেশা চড়ছিল, নিজেকে ঠিক থাকতে পারিনি... রার কাছে চেয়ে বসলাম। ভাই, লেখাটা আমার চাই। ছবি তুলে আপলোড কর... ও জড়ানো গলায় রীতিমত আবেগ তাড়িত হয়ে বলল, আরে ভাই, আমি তোমাকে কবিতাটা নিজের হাতে লিখে দেবো সাদা কাগজে, এত ভালো, এত প্রিয় কবিতা আমি হাজার হাজার কপি হাজার হাজার বার হাতে লিখে বিলি করতে পারি... রূপম আবার আরেক কাঠি ওপরে, ও অরুন্ধতী ছাড়া আর কোনো মেয়ের প্রেমে পড়তে পারবে না তাই এখনও কিরপাল আশ্রমের পাশে নিজের এক কামরার ফ্ল্যটে মন দিয়ে কুমারত্ব এবং ক্রিটিকাল থিয়োরির সাধনা করে চলেছে।
অবশেষে রার সৌজন্যে কিছুদিন পর (সোবার অবস্থায়) ‘মনত পড়েনে অরুন্ধতী’ এবং তার ইংরিজি অনুবাদ পড়লাম। এত তীব্র, এত অনন্য, এত উন্মাদ একটা প্রেমের কবিতা আমি এতদিন পড়িনি কেন? অরুন্ধতী আমার জীবনে কেন আসে নি এর আগে? যতবার কবিতাটা পড়েছি ততবার বুকের মধ্যে দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে, মনে হয়েছে পাগল হয়ে যাবো। অরুন্ধতী তো এসেছে আমার নাগরিক যাপনচর্যায়, অন্য নামে, অন্য বেশে। এই কবিতাটা তো আমারই লেখার কথা ছিল, নবকান্তবাবু বয়স এবং মেধা, এই দুইয়ে আমার চেয়ে সহস্র আলোকবর্ষ এগিয়ে থাকার কারণে আগেই লিখে ফেলেছেন। তাই প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমার অরুন্ধতীকে বাংলায় নিজের ভাষায় নিজের ছন্দে অনুবাদ করা রীতিমত অবশ্যক হয়ে ওঠে, আমি বক্তিগত শব্দের মূর্ছনায় অহমীয়া থেকে অরুন্ধতী ছিনিয়ে এনে বাংলার মনমধুপে প্রতিষ্ঠার দুঃসাহস দেখাতে দ্বিধা করিনি। আমি পেশাদারী অনুবাদক নই, একমাত্র যে সব লেখা আমায় উন্মাদ করে তোলে, সেগুলোকেই অন্য ভাষায় নিজের মতো করে transcreate করতে আমার ভালো লাগে। যেমন এখন ভালো লাগে সমস্ত কিশোরীর নাম গোপনে অরুন্ধতী রাখতে, ইচ্ছে করে তাদের মেঘের মতো চুলে মুখ ডুবিয়ে আত্মা ভরে বিকেলের গন্ধ খুঁজে নিতে... অরুন্ধতীদের সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গুর পাহাড়ে নির্মিত বাস্তবিক দূরত্ব তো কবিতার নিয়মে বেড়েই চলে... বেড়ে চলারই কথা, কিন্তু বাংলার অরুন্ধতী, ইংরিজি অরুন্ধতী, অহমীয়া অরুন্ধতী, হিন্দি তিব্বতি ফ্রেঞ্চ স্প্যানিশ সমস্ত অরুন্ধতী, তোমরা ওই স্পর্শবিহ্বল বরফগলানো রাতের আশ্লেষ মনে রেখেছ কি? মনে রাখবে তো তোমাদের এই কবিদের?


কবিতা-
রাতে যখন বৃষ্টি নামে, মনে তোমার পড়ে তোমার
কবির কথা, অরুন্ধতী?
ঝাপসা পিদিম আভায় যখন ঝলসে ওঠে তোমার খোঁপা
বিকেল বিকেল ঘ্রাণে উদোম ওই অপরূপ তোমার খোঁপা
মনে তোমার পড়ল কিছু, অরুন্ধতী?
চন্দ্রমাখা মেঘের সারি বিষাদ সুখে তলিয়ে গেছে
বোধ্য তো নয় সে সব লেখা
তোমার আমার মধ্যে শুধুই স্বপ্নাহত বাধার পাহাড়
বাড়তে থাকে, বাড়ছে কেবল
মনে তোমার পড়বে না তাও, অরুন্ধতী?
ঘাসের ডগায় অবলীলায় মুক্ত ছড়ায় চাঁদের আলো,
আকাশ জুড়ে অনেক আকাশ
মেঘের মতো তোমার চুলে চাঁদের নাগর লুকোচুরি
জোয়ার আনে, (সমুদ্র নেই) খেলছে আমার শীর্ণ আঙুল
এমন কি ওই তোমার বরফ ছোঁয়ায় আছে
কি তীব্র সুখ, আনন্দ কি...
অরুন্ধতী
অরুন্ধতী
হাজার আকাশ অজস্র ভিড় পেরিয়ে আসা ঝড়ের পাখির মুহূর্ত নীড়
সহস্রাধিক স্বপ্ন থেকে এসছে উঠে একটি রাত, ওই
কল্পনা আর অসংখ্য ঘুম পেরিয়ে আসা রাতের কথা
মনে তোমার পড়ে কি আজ, অরুন্ধতী
#
বৃষ্টিপাগল সে রাত তোমার মনে পড়ে, অরুন্ধতী?



অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান